Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ইডেন থেকে মেলবোর্ন কেন শুরু হতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে টেস্ট ম্যাচ ময়নাতদন্তে আসল কারণ

১৯৪৫ থেকে ১৯৯৯—এই দীর্ঘ সময়ে একটিও টেস্ট ম্যাচ দু’দিনে শেষ হয়নি। অথচ ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটেছে ১২ বার। আধুনিক ক্রিকেটে পিচের চরিত্র, বোলারদের দাপট ও ব্যাটিং ব্যর্থতার জেরে ২০২৪ সালে ভারত–দক্ষিণ আফ্রিকার টেস্ট মাত্র ১০৭ ওভারেই শেষ হয়ে যায়—টেস্ট ক্রিকেটের বদলে যাওয়া বাস্তবতারই স্পষ্ট ছবি

টেস্ট ক্রিকেট এক সময় ছিল ধৈর্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা। এখানে শুধু ব্যাট বা বল নয়, লড়াই হত মানসিক শক্তি, সহনশীলতা এবং সময়ের সঙ্গে। পাঁচ দিন ধরে চলা এই ফরম্যাটে ক্রিকেটারদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ ছিল সময় নিজেই। প্রথম দিন শুধু টিকে থাকা, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে ম্যাচের ভিত তৈরি করা, চতুর্থ দিনে ফলের সম্ভাবনা তৈরি করা এবং পঞ্চম দিনে শেষ লড়াই—এই ছকে বাঁধা ছিল টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই পরিচিত ছবিটা যেন দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

ইডেন গার্ডেন্স থেকে মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড—বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে ঐতিহাসিক মাঠগুলোতেই এখন এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ছে। ম্যাচ শুরু হওয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে টেস্ট। দর্শকদের চোখে এখনও ঠিক মতো বসার আগেই ফল বেরিয়ে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি প্রবণতা, যা ধীরে ধীরে টেস্ট ক্রিকেটের চরিত্র বদলে দিচ্ছে।

এক সময় টেস্ট ম্যাচ মানেই ছিল দীর্ঘ ব্যাটিং ইনিংস, ক্লান্ত বোলারদের বিরুদ্ধে ব্যাটারদের ধৈর্যের পরীক্ষা এবং প্রতিটি সেশনের আলাদা গুরুত্ব। এখন সেই জায়গায় দেখা যাচ্ছে তাড়াহুড়ো, ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা এবং ফল বের করার অদম্য তাগিদ। পাঁচ দিনের ক্রিকেট যেন নিজেই নিজের সঙ্গে লড়াইয়ে নেমেছে—টিকে থাকার লড়াই।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই পরিবর্তনের গভীরতা বোঝা যায়। কয়েক দশক আগেও টেস্ট ম্যাচ মানেই ছিল শেষ দিন পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনা। বহু ম্যাচ অমীমাংসিত থাকত, কারণ ব্যাটাররা উইকেটে সময় দিতেন, বোলাররা পরিকল্পনা করে ধাপে ধাপে আক্রমণ করতেন। আজ সেই জায়গায় অমীমাংসিত ম্যাচ প্রায় ব্যতিক্রম। ফল আসছে দ্রুত, কখনও কখনও অস্বস্তিকর দ্রুততায়।

এই পরিবর্তনের নেপথ্যে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমেই আসে ব্যাটারদের মানসিকতার প্রশ্ন। আধুনিক ক্রিকেটে আক্রমণাত্মক খেলা যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। টি-টোয়েন্টি ও এক দিনের ক্রিকেটে দ্রুত রান তোলাই সাফল্যের চাবিকাঠি। সেই অভ্যাস নিয়েই অনেক ব্যাটার টেস্ট ক্রিকেটে নামছেন। ফলে বল দেখা, পরিস্থিতি বোঝা, উইকেটে সময় দেওয়া—এই মৌলিক বিষয়গুলো ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে।

এক সময় টেস্ট ক্রিকেটে নতুন ব্যাটারের কাজ ছিল প্রথমে বল দেখা, শরীর ও মনকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। এখন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, প্রথম বল থেকেই বড় শট খেলার চেষ্টা। এতে কখনও দ্রুত রান আসে ঠিকই, কিন্তু ঝুঁকিও বাড়ে। ফলস্বরূপ দ্রুত উইকেট পড়ে, ম্যাচের দৈর্ঘ্য কমে আসে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক ক্যালেন্ডারের চাপ। ক্রিকেটাররা এখন বছরে অসংখ্য ম্যাচ খেলছেন, যার বেশির ভাগই সাদা বলের ফরম্যাটে। টানা সিরিজ, আইপিএল বা অন্যান্য টি-টোয়েন্টি লিগের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে টেস্ট ক্রিকেটের জন্য আলাদা করে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় কমে যাচ্ছে। মানসিকভাবেও ক্রিকেটাররা অনেক সময় সাদা বলের ছন্দ থেকে বেরোতে পারছেন না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ঘরোয়া ক্রিকেটের ভূমিকা। চার বা পাঁচ দিনের ঘরোয়া ম্যাচ এক সময় টেস্ট ক্রিকেটের প্রস্তুতির প্রধান মঞ্চ ছিল। সেখানে ব্যাটাররা শিখতেন নতুন বল সামলানো, দীর্ঘ সময় উইকেটে থাকা, স্পিন বা পেস—দু’রকম পরিস্থিতিতেই মানিয়ে নেওয়া। এখন সেই অভ্যাস অনেকটাই কমে এসেছে। জাতীয় দলের ব্যস্ততার কারণে অনেক ক্রিকেটারই ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত খেলছেন না। ফলে টেস্ট ক্রিকেটের জন্য প্রয়োজনীয় সহনশীলতা ও টেম্পারামেন্ট তৈরি হচ্ছে না।

ক্রীড়াবিজ্ঞানের প্রভাবও আলোচনার বাইরে নয়। ফিটনেস, রিকভারি, ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট—এই সবকিছু ক্রিকেটকে পেশাদার করেছে ঠিকই, কিন্তু তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। অতিরিক্ত বিশ্রাম, নির্দিষ্ট ওভারের সীমা, শরীর বাঁচানোর মানসিকতা অনেক সময় ক্রিকেটারদের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করছে। টেস্ট ক্রিকেটে যেখানে দীর্ঘ স্পেল বা লম্বা ইনিংসই সাফল্যের চাবিকাঠি, সেখানে এই সীমাবদ্ধতা সমস্যা তৈরি করছে।

পিচের চরিত্রও একটি বড় আলোচ্য বিষয়। অনেক জায়গাতেই এখন পিচ এমনভাবে তৈরি হচ্ছে, যাতে প্রথম দুই দিনেই ম্যাচের রাশ ধরে ফেলা যায়। ঘাস বেশি রাখা হচ্ছে, বা এমন চরিত্র দেওয়া হচ্ছে যাতে বোলাররা শুরু থেকেই অতিরিক্ত সাহায্য পায়। ফলে ব্যাটারদের পক্ষে টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। যদিও অতীতেও কঠিন পিচ ছিল, কিন্তু তখন ব্যাটাররা লড়াই করতে শিখেছিলেন। এখন সেই লড়াইয়ের মানসিকতাই যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে টেস্ট ক্রিকেট আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ফরম্যাটটি এখনও মর্যাদাপূর্ণ, এখনও ক্রিকেটাররা মুখে এর গুরুত্ব স্বীকার করেন। কিন্তু মাঠের ছবিটা বলছে অন্য কথা। পাঁচ দিনের ধৈর্যের যুদ্ধের বদলে আমরা ক্রমেই দেখতে পাচ্ছি দু’-তিন দিনের নিষ্পত্তি। প্রশ্ন উঠছে—এই বদল কি সময়ের দাবি, না কি টেস্ট ক্রিকেটের আত্মার ক্ষয়?

ইডেন থেকে মেলবোর্ন—এই ঐতিহাসিক মাঠগুলো যেন সেই প্রশ্নটাই বার বার তুলে ধরছে। টেস্ট ক্রিকেট কি তার পুরনো চরিত্র ফিরে পাবে, না কি আধুনিকতার চাপে নতুন রূপেই এগোবে—তার উত্তর হয়তো সময়ই দেবে। কিন্তু আপাতত পরিসংখ্যান আর মাঠের বাস্তবতা বলছে, টেস্ট ক্রিকেট বদলাচ্ছে, দ্রুত এবং গভীরভাবে।

২০১৮-’১৯ সালের অস্ট্রেলিয়া সফরে একাই ২১০ ওভার ব্যাট করেছিলেন চেতেশ্বর পুজারা। সেই ইনিংস আজও টেস্ট ক্রিকেটে ধৈর্যের পাঠ হিসেবে আলোচিত। অথচ চলতি অ্যাশেজ় সিরিজে পার্‌থ ও মেলবোর্ন মিলিয়ে চার ইনিংসে গোটা ইংল্যান্ড দল ব্যাট করেছে মাত্র ১২৭ ওভার। এই একটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য যে, টেস্ট ক্রিকেটের চরিত্র কতটা বদলে গিয়েছে। পাঁচ দিনের লড়াই এখন আর নিয়ম নয়, বরং দু’-তিন দিনের মধ্যেই ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়াই যেন নতুন স্বাভাবিকতা।

আরও গভীরে গেলে বদলের ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়। ১৯৬৯ থেকে ১৯৮৫—এই ১৬ বছরে যতগুলি টেস্ট ম্যাচ হয়েছে, তার ৪৩.১ শতাংশ অমীমাংসিত ছিল। অর্থাৎ, পাঁচ দিনের লড়াইয়ের পরও ফল আসেনি। সেখানে গত পাঁচ বছরে অমীমাংসিত টেস্টের হার নেমে এসেছে মাত্র ৮.২ শতাংশে। ব্যতিক্রম হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে ভারত-ইংল্যান্ডের মধ্যে তেন্ডুলকর-অ্যান্ডারসন ট্রফি, যেখানে পাঁচটি টেস্টই গড়িয়েছে শেষ দিন পর্যন্ত এবং মাত্র একটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। কিন্তু সেটি ব্যতিক্রমই। সামগ্রিক প্রবণতায় ইডেন-মেলবোর্নের সংখ্যাই অনেক বেশি।

news image
আরও খবর

সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হল সময়ের বিচারে। ১৯৪৫ থেকে ১৯৯৯—এই ৫৪ বছরে একটি টেস্টও দু’দিনে শেষ হয়নি। অথচ ২০০০ সাল থেকে গত ২৬ বছরে ১২টি টেস্ট ম্যাচ শেষ হয়েছে মাত্র দু’দিনে। ২০২৪ সালে কেপটাউনে ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট শেষ হয়েছিল মাত্র ১০৭ ওভারে—যা হিসাব করলে একটি একদিনের ম্যাচের থেকে মাত্র সাত ওভার বেশি। গত ১২৯ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম অ্যাশেজ় সিরিজেই দু’টি টেস্ট দু’দিনে শেষ হয়ে গিয়েছে। এখনও একটি ম্যাচ বাকি। প্রশ্ন উঠছেই—কেন এমন হচ্ছে?

অনেকের প্রথম উত্তর—কঠিন পিচ। কিন্তু সত্যিই কি শুধুই পিচ দায়ী? নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে ব্যাটারদের টেকনিক, মানসিকতা, টি-টোয়েন্টির সর্বগ্রাসী প্রভাব, ঘরোয়া ক্রিকেটকে অবহেলা এবং আধুনিক ক্রীড়াবিজ্ঞানের উল্টো প্রতিক্রিয়া?

ব্যাটারদের মানসিকতা বদলের কথাই ধরা যাক। গত মরসুমে আইপিএল জয়ের পর বিরাট কোহলি বলেছিলেন, তিনি টেস্ট জয়কে আইপিএল জয়ের থেকে পাঁচ ধাপ উপরে রাখেন। বিশ্বের তারকারা মুখে টেস্ট ক্রিকেটের গুরুত্ব স্বীকার করলেও বাস্তবে সেই মানসিকতার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যাচ্ছে। সুনীল গাওস্করের ক্রিকেটীয় দর্শন ছিল, টেস্টে প্রথম ঘণ্টা বোলারকে দেওয়া, তার পর ধীরে ধীরে ম্যাচ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। আজকের ক্রিকেটে সেই ধৈর্যের চিহ্ন প্রায় নেই।

ঘরোয়া ক্রিকেটের অন্যতম ধ্রুপদী ব্যাটার অনুষ্টুপ মজুমদারের চোখে বর্তমান প্রজন্মের ব্যাটিং ভয় ধরাচ্ছে। তাঁর মতে, এখনকার ব্যাটাররা প্রথম বল থেকেই ক্রিজ় ছেড়ে মারতে যায়। বল দেখা, ধৈর্য ধরা—এই মৌলিক বিষয়গুলোই হারিয়ে যাচ্ছে। টেস্টে ক্রিজ়ে সময় না দিলে রান আসবে কী করে? তার ফলেই দু’দিনে ম্যাচ শেষ হয়ে যাচ্ছে।

এই মতের সঙ্গে একমত অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন ক্রিকেটার স্টুয়ার্ট ল। তাঁর মতে, টেস্ট খেলতে শুধু দক্ষতা নয়, সাহসও লাগে। মানসিক ভাবে শক্ত না হলে পাঁচ দিনের ক্রিকেটে টিকে থাকা অসম্ভব। কিন্তু আধুনিক ক্রিকেটাররা বিনোদনের কথা বেশি ভাবে, প্রথম বল থেকেই ব্যাট চালায়। টেস্টে সফল হওয়ার মানসিক প্রস্তুতিই অনেকের মধ্যে নেই।

টি-টোয়েন্টির আর্থিক আকর্ষণ এই মানসিক বদলের বড় কারণ। ল-এর মতে, কেউ যদি দেখে আইপিএল খেলে একজন ক্রিকেটার বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে আর ঘরোয়া লাল বলের ক্রিকেট খেলে একজন সাধারণ জীবন কাটাচ্ছে, তা হলে তরুণদের কাছে সিদ্ধান্ত কঠিন নয়। পাঁচ বছর টি-টোয়েন্টি খেললেই যদি সারা জীবনের রোজগার হয়ে যায়, তা হলে পাঁচ দিনের কঠিন লড়াইয়ে নামবে কেন?

এই জায়গায় অভিভাবকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার অরুণ লাল। তাঁর অভিজ্ঞতায়, ছোট থেকেই বাবা-মায়েরা সন্তানদের টি-টোয়েন্টির দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। অ্যাকাডেমিগুলিতেও লাল বলের অনুশীলন প্রায় নেই। প্যাড-গ্লাভস পরে শুধু চার-ছক্কা মারার চেষ্টা—এর বাইরেও যে ক্রিকেট আছে, সেটাই শেখানো হচ্ছে না। গলদটা শুরু থেকেই।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাদা বলের ক্রিকেটের অতিরিক্ত চাপ। বছরে ৪০-৫০টা সাদা বলের ম্যাচ খেলে ক্রিকেটারদের টেস্টে নামতে হচ্ছে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে। আলাদা প্রস্তুতির সময় নেই। মানসিকভাবেও তারা সাদা বলের মোড থেকে বেরোতে পারছে না। ফলে টেস্ট ক্রিকেটে প্রয়োজনীয় ধৈর্য ও টেকনিক তৈরি হচ্ছে না।

ক্রীড়াবিজ্ঞানের প্রভাবও বিতর্কের বাইরে নয়। খেলোয়াড়দের ফিট রাখার জন্য বিজ্ঞান এসেছে ঠিকই, কিন্তু তার উল্টো প্রভাব পড়ছে বলেই মনে করেন স্টুয়ার্ট ল। পেসারদের বিশ্রাম দেওয়া হচ্ছে, ফিরে এসে তারা ছন্দ হারাচ্ছে। ব্যাটিং অনুশীলনে ‘নো-ফিট’ ধারণা চালু হয়েছে—এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বড় শট খেলা। অথচ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পায়ের নড়াচড়াই ছিল ব্যাটিংয়ের প্রাণ। এই ধরনের অনুশীলন ব্যাটিংয়ের মান বাড়ানোর বদলে কমিয়ে দিচ্ছে।

ডগ স্টিকের ব্যবহারও একটি বড় কারণ। এই যন্ত্র দিয়ে বল ছোড়া সহজ হলেও এতে বলের সিম দেখা যায় না। অথচ টেস্ট ক্রিকেটে সিম পজিশন বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃত্রিম এই অনুশীলনে অভ্যস্ত হয়ে ব্যাটাররা ম্যাচে গিয়ে সমস্যায় পড়ছে।

সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে ঘরোয়া ক্রিকেটকে অবহেলা করার ফলে। ভারতের জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা এখন খুব কমই চার বা পাঁচ দিনের ঘরোয়া ম্যাচ খেলেন। বোর্ড নির্দেশ দিলে তবেই নামেন। ফলে টেস্টের জন্য প্রয়োজনীয় স্ট্যামিনা ও টেম্পারামেন্ট তৈরি হচ্ছে না। নেটে ২০-৩০ ওভার ব্যাট বা বোলিং না করলে কী করে টেস্টে লম্বা ইনিংস বা স্পেল আসবে?

এক সময় সচিন তেন্ডুলকর, রাহুল দ্রাবিড়েরা কেরিয়ারের সেরা সময়ে রাজ্য দলের হয়ে খেলেছেন। সেই অভ্যাস আজ নেই। ঘরোয়া ক্রিকেটই শেখায় নতুন বল সামলানো, স্পিনে লম্বা ইনিংস খেলা। সেই শিক্ষাটাই হারিয়ে যাচ্ছে।

পিচ অবশ্যই একটি ফ্যাক্টর। ইডেন ও মেলবোর্নের উইকেট নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। মেলবোর্নের পিচকে ‘অসন্তোষজনক’ বলেছে আইসিসি। ১০ মিলিমিটার ঘাস রাখা হয়েছিল, যা বোলারদের অতিরিক্ত সাহায্য করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হল—আগে কি কঠিন পিচ ছিল না? ছিল। গাওস্কর, সচিনেরা সেগুলো সামলেছেন, লড়েছেন, উইকেট ছুড়ে দেননি। পিচ অজুহাত হতে পারে, কিন্তু আসল সমস্যা ক্রিকেটারদের মানসিক ও টেকনিক্যাল ব্যর্থতা।

আজ টেস্ট ক্রিকেট এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে তার অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে না, কিন্তু তার চরিত্র বদলে যাচ্ছে দ্রুত। পাঁচ দিনের ধৈর্যের লড়াই কি আর ফিরবে? নাকি দু’-তিন দিনের ফলাফলই ভবিষ্যৎ? ইডেন থেকে মেলবোর্ন—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আজ টেস্ট ক্রিকেটের ময়নাতদন্ত

Preview image