নব্বইয়ের দশকে এক ছবির জন্য ১ কোটি টাকা পারিশ্রমিক নিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন চিরঞ্জীবী। সেই রেকর্ড বহু আগেই ভেঙেছে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগৎ। বর্তমানে এক একটি ছবির জন্য কয়েকশো কোটি টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক নিচ্ছেন তারকারা। কিন্তু শাহরুখ খান বা প্রভাস নন, বর্তমানে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত ভারতীয় অভিনেতার নাম জানলে অবাক হতে পারেন অনেকেই।
ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে তারকাদের পারিশ্রমিক নিয়ে কৌতূহল নতুন নয়। এক সময় দর্শকরা যেমন সিনেমার গল্প, গান কিংবা অভিনয় নিয়ে আলোচনা করতেন, তেমনই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকত নায়কদের পারিশ্রমিকও। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সিনেমার বাজার যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনই বদলেছে তারকাদের আয় ও পারিশ্রমিকের অঙ্ক। নব্বইয়ের দশকে যে পরিমাণ অর্থ একটি ছবির জন্য অবিশ্বাস্য বলে মনে হত, আজকের দিনে সেই অঙ্ককে বহু গুণ ছাপিয়ে গিয়েছে ভারতীয় চলচ্চিত্রের শীর্ষস্থানীয় অভিনেতারা। আর এই দীর্ঘ যাত্রাপথের সাম্প্রতিকতম অধ্যায়ে নতুন ইতিহাস গড়েছেন তেলুগু সুপারস্টার অল্লু অর্জুন।
এক সময় ভারতীয় সিনেমায় এক কোটি টাকার পারিশ্রমিক ছিল স্বপ্নের মতো। সেই সময়ে দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় অভিনেতা চিরঞ্জীবী প্রথম ভারতীয় তারকা হিসেবে একটি ছবির জন্য এক কোটি টাকা পারিশ্রমিক দাবি করেছিলেন বলে জানা যায়। সেই খবর তখন গোটা চলচ্চিত্র মহলে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। প্রযোজক, পরিচালক থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শক— সকলেই বিস্মিত হয়েছিলেন। কারণ তখনকার বাজারে এক কোটি টাকা ছিল বিরাট অঙ্ক। কিন্তু সময়ের চাকা থেমে থাকে না। ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের প্রসার, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের ফলে সিনেমার ব্যবসার পরিধি বহুগুণ বেড়ে যায়। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তারকাদের পারিশ্রমিকও।
দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় সিনেমার পারিশ্রমিকের তালিকায় আধিপত্য ছিল বলিউড তারকাদের। বিশেষ করে তিন খান— শাহরুখ খান, সলমন খান এবং আমির খান— প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই তালিকার শীর্ষস্থান নিজেদের দখলে রেখেছিলেন। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তাঁদের জনপ্রিয়তার বিস্ফোরণ ঘটে। একের পর এক ব্লকবাস্টার ছবি উপহার দিয়ে তাঁরা শুধু বলিউড নয়, গোটা দেশের দর্শকদের মন জয় করেন। ফলে তাঁদের পারিশ্রমিকও ক্রমাগত বাড়তে থাকে।
এই সময়েই ভারতীয় সিনেমায় একটি নতুন প্রবণতা দেখা যায়। অভিনেতারা শুধু নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং ছবির লাভের অংশ নেওয়ার প্রথাও শুরু হয়। এই মডেল অনুযায়ী কোনও অভিনেতা ছবির ব্যবসা ভালো হলে অতিরিক্ত আয় করতে পারেন। এই ব্যবস্থার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন শাহরুখ খান। তাঁর প্রযোজনা সংস্থা এবং ব্যবসায়িক দূরদর্শিতার কারণে তিনি সিনেমার লাভের অংশীদার হওয়ার মডেলকে জনপ্রিয় করে তোলেন। পরে আমির খানও একই পথে হাঁটেন এবং ছবির ব্যবসার উপর নির্ভর করে বিপুল অঙ্কের অর্থ উপার্জন করেন। এক সময় আমির খানই প্রথম ভারতীয় অভিনেতা হিসেবে ১০০ কোটির বেশি পারিশ্রমিক অর্জনের নজির গড়েছিলেন।
২০১০-এর দশকের শেষ দিকে এসে ভারতীয় সিনেমার বাজারে বড় পরিবর্তন শুরু হয়। দক্ষিণ ভারতীয় ছবিগুলি ধীরে ধীরে সারা দেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ‘বাহুবলী’ সিরিজ ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করে। তেলুগু ভাষার একটি ছবি যে শুধু দক্ষিণ ভারত নয়, উত্তর ভারতেও সমান জনপ্রিয় হতে পারে, তা দেখিয়ে দেয় এই ফ্র্যাঞ্চাইজি। এর পর একে একে ‘কেজিএফ’, ‘আরআরআর’, ‘কান্তারা’, ‘পুষ্পা’ প্রভৃতি ছবি প্যান-ইন্ডিয়া বাজারে অসাধারণ সাফল্য পায়। ফলে দক্ষিণ ভারতের অভিনেতাদের জনপ্রিয়তা এবং বাজারমূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে।
এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় সুবিধাভোগী অল্লু অর্জুন। তেলুগু চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় এই অভিনেতা দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ ভারতের দর্শকদের কাছে সুপারস্টার হিসেবে পরিচিত। তবে ‘পুষ্পা: দ্য রাইজ’ মুক্তির পর তাঁর জনপ্রিয়তা গোটা ভারত জুড়ে বিস্ফোরণ ঘটায়। ছবির সংলাপ, গান, স্টাইল এবং অল্লু অর্জুনের অভিনয় দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বিশেষ করে তাঁর অভিনীত ‘পুষ্পা রাজ’ চরিত্রটি এক সাংস্কৃতিক ঘটনায় পরিণত হয়।
প্রথম ছবির বিপুল সাফল্যের পর দর্শকদের প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতেই ২০২৪ সালে মুক্তি পায় ‘পুষ্পা ২: দ্য রুল’। মুক্তির আগেই ছবিটি নিয়ে উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একযোগে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমা বক্স অফিসে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে। ব্যবসায়িক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে ছবিটির আয় ১৭০০ কোটিরও বেশি টাকায় পৌঁছায়। শুধু ভারতেই নয়, বিদেশের বাজারেও ছবিটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়। বিপুল টিকিট বিক্রি, ডিজিটাল স্বত্ব, স্যাটেলাইট স্বত্ব এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমে ছবিটি প্রযোজকদের জন্য বিশাল মুনাফা এনে দেয়।
এই বিপুল সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন অল্লু অর্জুন। তবে তাঁকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় তাঁর পারিশ্রমিক ঘিরে। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘পুষ্পা ২’-এর জন্য তিনি শুধু নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক নেননি, বরং ছবির লাভের একটি অংশও চুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করেছিলেন। এই মডেলই তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক এবং লাভের অংশ মিলিয়ে ‘পুষ্পা ২’ থেকে অল্লু অর্জুনের মোট আয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। যদি এই তথ্য সম্পূর্ণভাবে সঠিক হয়, তাহলে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে একক ছবির জন্য এটিই সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক। এই অঙ্ক শুধু ভারতের নয়, বিশ্বের বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকার পারিশ্রমিকের সঙ্গেও তুলনীয়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হল, এই পরিমাণ অর্থ ভারতের বহু সুপারহিট ছবির মোট বাজেটের থেকেও বেশি। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় ‘বাহুবলী ২’-কে। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সফল এই ছবির বাজেট ছিল প্রায় ২৫০ কোটির আশেপাশে। অথচ আজ এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে একজন অভিনেতার একক পারিশ্রমিকই সেই বাজেটকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। এটি ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের আর্থিক বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে পারিশ্রমিকের শীর্ষে থাকা বলিউড তারকারাও কম যান না। শাহরুখ খান ২০২৩ সালে ‘পাঠান’ এবং ‘জওয়ান’-এর মাধ্যমে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করেন। দুটি ছবিই বক্স অফিসে হাজার কোটির বেশি ব্যবসা করে। এই সাফল্যের ফলে শাহরুখের বাজারমূল্য আরও বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, তিনি বর্তমানে একটি ছবির জন্য ২০০ কোটিরও বেশি আয় করতে সক্ষম। একইভাবে সলমন খান, আমির খান এবং অন্যান্য শীর্ষ তারকারাও এখনও বিপুল পারিশ্রমিক পান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ ভারতের তারকারা যে দ্রুত এগিয়ে আসছেন, তা স্পষ্ট।
২০২৪ সালের আগে তামিল সুপারস্টার রজনীকান্তও পারিশ্রমিকের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছিলেন। তাঁর ব্লকবাস্টার ছবি ‘জেলার’-এর সাফল্যের পরে তিনি প্রায় ২৫০ কোটির বেশি আয় করেছেন বলে বিভিন্ন মহলে দাবি করা হয়েছিল। সেই সময় মনে করা হয়েছিল, ভারতীয় সিনেমায় পারিশ্রমিকের নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই অল্লু অর্জুন সেই রেকর্ড ভেঙে আরও এক ধাপ এগিয়ে যান।
অনেকের মতে, এই পরিবর্তন শুধু একজন অভিনেতার সাফল্যের গল্প নয়; বরং ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের বদলে যাওয়া শক্তির ভারসাম্যের প্রতিফলন। এক সময় যেখানে বলিউড ছিল দেশের বিনোদন জগতের একচ্ছত্র কেন্দ্র, এখন সেখানে দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্র শিল্পও সমান শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। প্যান-ইন্ডিয়া মুক্তি, বহুভাষিক ডাবিং, আন্তর্জাতিক বিপণন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রসারের ফলে ভাষার সীমা ভেঙে গেছে। ফলে কোনও ছবির সাফল্য এখন আর নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
অল্লু অর্জুনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও ইতিমধ্যেই দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছে। গত কয়েক বছরে তিনি মূলত ‘পুষ্পা’ ফ্র্যাঞ্চাইজিতেই মনোনিবেশ করেছিলেন। কিন্তু এখন তাঁর পরবর্তী বড় প্রকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। পরিচালক অ্যাটলির সঙ্গে তাঁর আসন্ন ছবি ‘রাকা’ নিয়ে ইতিমধ্যেই ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অ্যাকশন-অ্যাডভেঞ্চার ঘরানার এই ছবিতে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করবেন দীপিকা পাড়ুকোন। ছবিটি ২০২৭ সালের ডিসেম্বরে মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে। চলচ্চিত্র মহলের একাংশের মতে, ছবিটি যদি প্রত্যাশামতো সফল হয়, তবে অল্লু অর্জুনের পারিশ্রমিকের অঙ্ক আরও নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।
সব মিলিয়ে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে পারিশ্রমিকের বিবর্তন এক অসাধারণ যাত্রার গল্প। চিরঞ্জীবীর এক কোটি টাকার সাহসী দাবি থেকে শুরু করে অল্লু অর্জুনের সম্ভাব্য ৩০০ কোটির আয়— এই পথচলা শুধু তারকাদের ব্যক্তিগত সাফল্যের কাহিনি নয়, বরং ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তিরও প্রতীক। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে বলা যায়, পারিশ্রমিকের শীর্ষে উঠে অল্লু অর্জুন শুধু একটি রেকর্ডই গড়েননি, তিনি ভারতীয় সিনেমার নতুন যুগের মুখও হয়ে উঠেছেন।