নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন ছিল কিন্তু জীবনের লড়াই তাঁকে বানিয়েছে সত্যিকারের হিরোইন নবনীতার আত্মকথন।
জলপাইগুড়ির এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় মেয়ে নবনীতা মালাকার। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সুন্দরী, মেধাবী ও প্রতিভাবান—নাচ, গান, অভিনয় সবেতেই স্বচ্ছন্দ। বাবার আদরের মেয়ে, অল্পেই সন্তুষ্ট, স্বপ্ন ছিল একদিন পর্দার নায়িকা হবেন। সেই স্বপ্ন নিয়েই উত্তরবঙ্গ থেকে কলকাতায় পা রাখা। কিন্তু জীবন তাঁকে যে পথে নিয়ে যাবে, তা তিনি নিজেও কল্পনা করতে পারেননি।
বর্তমানে ধারাবাহিক ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’-এ ‘রোহিণী’ চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের নজর কেড়েছেন নবনীতা। খলনায়িকা হয়েও তাঁর সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়ের স্বতন্ত্র ভঙ্গি দর্শকদের বিভ্রান্ত করে দেয়। অনেকেই মজা করে প্রশ্ন করেন—“এত মিষ্টি মুখের একটি মেয়ে কী করে হাসতে হাসতে খুন করে?” নবনীতার নিজের কথায়, তিনি কখনও চরিত্রকে নিছক নেতিবাচক করে দেখেননি। বরং নেতিবাচকতার ভেতরেও মানবিকতার ছাপ রাখার চেষ্টা করেছেন। সেই কারণেই হয়তো দর্শক তাঁকে ঘৃণা না করে বরং কৌতূহল নিয়ে দেখেন।
শুরুটা সহজ ছিল না। কলকাতায় এসে অভিনয়ের জগতে পা রাখা মানেই ছিল সংগ্রাম। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা ছিল না। উত্তরবঙ্গের টানযুক্ত উচ্চারণ নিয়ে বহু সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ইন্ডাস্ট্রির কঠিন বাস্তব দ্রুত শিখিয়ে দিয়েছে—এখানে কেবল প্রতিভা নয়, মানসিক শক্তিও সমান জরুরি। বাংলা নিয়ে পড়াশোনা করা, ভদ্র আচরণ—সবকিছুই কখনও কখনও অমূল্য হয়ে ওঠে না এই প্রতিযোগিতার দুনিয়ায়। তবু থামেননি তিনি।
ধারাবাহিক ‘এই ছেলেটা ভেল ভেলেটা’-তে তাঁর চরিত্র প্রথমে ছিল ইতিবাচক। পরে তা হঠাৎ নেতিবাচক হয়ে যায়। কিন্তু নবনীতা সিদ্ধান্ত নেন, চরিত্র বদলালেও তাঁর অভিনয়ের ভঙ্গি বদলাবেন না। তিনি নেতিবাচকতাকে ইতিবাচকতার মোড়কে মুড়ে উপস্থাপন করেন। দর্শকের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বুঝতে পারেন—এই ভিন্ন স্বাদই তাঁদের ভালো লাগছে। সেখান থেকেই শুরু খলনায়িকা হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা।
এর আগেও তিনি ইতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কালার্স বাংলার ‘মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য’ ধারাবাহিকে ‘লক্ষ্মীপ্রিয়া’ চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের প্রশংসা পেয়েছিলেন। অনেকেই তাঁকে “জ্যান্ত লক্ষ্মীপ্রতিমা” বলে অভিহিত করেছিলেন। তবু অভিনয়জগৎ তাঁকে বেশি করে ডাকতে থাকে নেতিবাচক চরিত্রের জন্যই। একসময় তিনি কেবল নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করবেন বলে একাধিক কাজ ছেড়েও দেন। কিন্তু বাস্তবের চাপে সেই সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়।
পারিবারিক দায়িত্ব তাঁর জীবনে বড় বাঁক এনে দেয়। মা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। ছোট বোনের ভবিষ্যৎ, বাবার পাশে দাঁড়ানো—সব দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। সেই সময় মা-বাবাই তাঁকে বোঝান—পিছু হটা চলবে না। লড়াই করতে হবে, নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। জলপাইগুড়িতে ফিরে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন হয়তো, কিন্তু থেমে যাননি। ধীরে ধীরে নিজেকে বোঝান—পর্দায় থাকতেই হবে, যে চরিত্রই হোক।
এই লড়াইয়ের মাঝেই তিনি অভিনয় করেছেন ‘নিমফুলের মধু’ ধারাবাহিকে এবং বড় পর্দায় পা রেখেছেন অঙ্কুশ হাজরা ও ঐন্দ্রিলা সেন অভিনীত ‘নারী চরিত্র বেজায় জটিল’ ছবিতে। ছোট পর্দা থেকে বড় পর্দা—দুই জায়গাতেই নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। আদালতের দৃশ্যে আইনজীবী রূপে তাঁর সংলাপ ও অভিব্যক্তি বিশেষ প্রশংসিত হয়েছে।
তবে ব্যক্তিগত জীবনও ছিল ঝড়ে ভরা। নবনীতার কথায়, “দুষ্টু লোকেরা আমায় ছাড়েনি। প্রচণ্ড কষ্ট দিয়েছে। অনেক অত্যাচার সয়েছি। চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছে। পাথর হয়েছি।” ১১ বছরের সংগ্রাম তাঁকে কঠিন করেছে, কিন্তু নিষ্ঠুর নয়। বরং এই কঠিন অভিজ্ঞতাই তাঁকে শিখিয়েছে, বাস্তবের আঘাতকে শক্তিতে বদলে নিতে হয়। তিনি উপলব্ধি করেছেন—জীবন যেমনই হোক, নিজের আত্মসম্মান ও স্বপ্নকে ধরে রাখতে হয়।
কলেজজীবনে নবনীতা মালাকারের জীবন ছিল স্বপ্নে ভরা। সুন্দরী, মেধাবী, আত্মবিশ্বাসী—স্বাভাবিক ভাবেই তিনি পেয়েছেন একাধিক প্রেমপ্রস্তাব। অভিনয়ের জগতে পা রাখার আগেই এসেছিল বিয়ের সম্বন্ধও। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শিখেছেন, সম্পর্কের উষ্ণতা আর জীবনের বাস্তবতা এক জিনিস নয়। সবাই কাছে আসে, কিন্তু সবাই আপন হয়ে ওঠে না। বিশ্বাস, ভরসা আর নির্ভরতার মানে তিনি বুঝেছেন বহু অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।
আজ তিনি কলকাতায় নিজের ফ্ল্যাটে একাই থাকেন। আলো নিভে গেলে, কাজের ব্যস্ততা শেষ হলে, সেই ফ্ল্যাটে নীরবতা নেমে আসে। সেই নীরবতার মধ্যেই তিনি নিজের সঙ্গে কথা বলেন, ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলেন। নিজেই সংসারের সব কাজ সামলান—ঝাঁট দেওয়া, রান্না, ঘর গোছানো। সন্ধ্যাবাতি দেন নিয়ম করে। তাঁর কথায়, “নিজের বলতে মা-বাবা-বোন। তাঁরা অনেক দূরে। একা ফ্ল্যাটে তুমি আর আমি—তুমিই আমার আপন।” এই বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর একাকিত্ব, আবার অদম্য বিশ্বাসও।
নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়েই তিনি অভিনয়ের দুনিয়ায় এসেছিলেন। ভেবেছিলেন, রূপোলি পর্দায় একদিন তিনি হবেন কেন্দ্রীয় চরিত্রের মুখ। কিন্তু জীবন সবসময় পরিকল্পনা মেনে চলে না। চরিত্র বদলেছে, পরিস্থিতি বদলেছে, মানুষের আচরণ বদলেছে। কখনও অপমান, কখনও অবহেলা, কখনও কঠিন সমালোচনা—সবকিছুর মধ্যে দিয়েই তাঁকে এগোতে হয়েছে। একসময় হয়তো মনে হয়েছিল, পথটা ভুল ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি উপলব্ধি করেছেন—এই পথই তাঁকে গড়ে তুলছে।
পর্দায় তিনি এখন খলনায়িকা ‘রোহিণী’। তাঁর হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে চক্রান্ত, সংলাপে থাকে তীক্ষ্ণতা। অথচ বাস্তবে তিনি একেবারেই আলাদা মানুষ। বাস্তবের লড়াই তাঁকে কঠিন করেছে, কিন্তু নিষ্ঠুর নয়। বরং এই কঠিন সময়ই তাঁকে শিখিয়েছে নিজের শক্তিকে চিনতে। তিনি বুঝেছেন, নায়িকা হওয়া মানে শুধু ক্যামেরার সামনে কেন্দ্রবিন্দু হওয়া নয়; নায়িকা হওয়া মানে নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া, হার না মানা, প্রতিকূলতার সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো।
নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করেও তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন অভিনেত্রীর আসল ক্ষমতা তাঁর অভিনয়ে। চরিত্র ভালো না খারাপ—তা বড় কথা নয়; চরিত্রকে কতটা বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যায়, সেটাই আসল চ্যালেঞ্জ। নবনীতা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন। খলনায়িকা হয়েও দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। অনেকে তাঁকে ঘৃণা করতে পারেন না, কারণ তাঁর অভিনয়ের ভেতরে থাকে এক ধরনের মানবিকতা, এক ধরনের আবেগের সত্যতা।
নবনীতা মালাকারের গল্প শুধুই সাফল্যের গল্প নয়। এটি সংগ্রামের, আত্মবিশ্বাসের, দায়িত্ববোধের গল্প। উত্তরবঙ্গের এক ছোট শহর থেকে উঠে এসে তিনি প্রমাণ করেছেন—স্বপ্ন যদি সত্যিই নিজের হয়, তবে তাকে বাঁচিয়ে রাখার সাহসও থাকতে হয়। পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক, পরিশ্রম আর মানসিক শক্তি থাকলে নিজের পরিচয় তৈরি করা যায়।
আজ তিনি হয়তো পর্দায় ‘রোহিণী’—একজন খলনায়িকা। কিন্তু জীবনের মঞ্চে তিনি এক যোদ্ধা, এক দৃঢ়চেতা নারী, এক বাস্তবের ‘হিরোইন’। তাঁর পথ সহজ ছিল না, ভবিষ্যতও নিশ্চয়ই একেবারে মসৃণ হবে না। তবু তিনি জানেন, তিনি আর ভাঙবেন না। কারণ তিনি শিখেছেন—নিজেকে হারালে সব হারাতে হয়, আর নিজেকে জিতলে সবকিছু নতুন করে শুরু করা যায়।
নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করা সহজ নয়। কারণ সেখানে দর্শকের ভালোবাসা নয়, বরং রাগ, ক্ষোভ আর বিরক্তিই সাধারণত শিল্পীর প্রাপ্তি হয়। তবু নবনীতা মালাকার প্রমাণ করেছেন, একজন অভিনেত্রীর আসল শক্তি চরিত্রের রঙে নয়—তার অভিনয়ের গভীরতায়। চরিত্র নায়িকা না খলনায়িকা, তা বড় বিষয় নয়; বড় বিষয় হলো, সেই চরিত্রকে কতটা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারছেন তিনি। দর্শক যদি চরিত্রটিকে সত্যি বলে মেনে নেন, তবে সেই অভিনয় সফল। নবনীতা ঠিক সেটাই করেছেন।
খলনায়িকা হয়েও তিনি দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। অনেকেই বলেন, তাঁকে দেখে ঠিক রাগ করতে পারেন না। কারণ তাঁর অভিনয়ের ভেতরে থাকে এক অদ্ভুত মানবিকতা। সংলাপ যতই তীক্ষ্ণ হোক, চোখের অভিব্যক্তিতে যেন কোথাও এক চিলতে আবেগ থেকে যায়। হাসির আড়ালেও যেন লুকিয়ে থাকে যন্ত্রণা। ফলে তাঁর চরিত্র একমাত্রিক হয়ে ওঠে না; বরং তা হয়ে ওঠে বহুস্তরীয়, জীবন্ত। এই জটিলতাই তাঁকে আলাদা করে দেয়।
একজন শিল্পী হিসেবে তিনি বুঝেছেন, নেতিবাচক চরিত্রও সমাজেরই প্রতিফলন। সেই চরিত্রের ভেতরেও থাকে ক্ষত, অপূর্ণতা, অভিমান। তাই তিনি কখনও নিছক ‘খারাপ’ হয়ে ওঠেন না; বরং চরিত্রের পেছনের মানসিক অবস্থাকে ফুটিয়ে তুলতে চান। দর্শক হয়তো তাঁর চরিত্রকে সমর্থন করেন না, কিন্তু বুঝতে চেষ্টা করেন। আর সেখানেই তাঁর সাফল্য।
তবে নবনীতা মালাকারের গল্প কেবল পর্দার সাফল্যের গল্প নয়। এটি এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। উত্তরবঙ্গের ছোট শহর থেকে উঠে এসে স্বপ্ন নিয়ে কলকাতায় পা রাখা—এই পথ সহজ ছিল না। নতুন শহর, নতুন মানুষ, নতুন লড়াই। সমালোচনা এসেছে, অবহেলাও এসেছে। কখনও নিজের উচ্চারণ নিয়ে, কখনও অভিনয়ের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু তিনি থামেননি। বরং প্রতিটি সমালোচনাকে নিজের উন্নতির সোপান বানিয়েছেন।
সংগ্রামের পাশাপাশি ছিল পারিবারিক দায়িত্ব। জীবনের বাস্তব চাপ তাঁকে দ্রুত পরিণত করেছে। তিনি বুঝেছেন, স্বপ্ন দেখতে হলে তার দায়ও নিতে হয়। কেবল নিজের জন্য নয়, পরিবারের জন্যও শক্ত হতে হয়। এই দায়িত্ববোধই তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে। আত্মবিশ্বাস তাঁর সবচেয়ে বড় সঙ্গী হয়ে উঠেছে।
তিনি প্রমাণ করেছেন—স্বপ্ন যদি সত্যিই নিজের হয়, তবে তাকে বাঁচিয়ে রাখার সাহসও থাকতে হয়। মাঝপথে হাল ছেড়ে দিলে হয়তো সহজ হতো, কিন্তু তিনি কঠিন পথই বেছে নিয়েছেন। কারণ তিনি জানতেন, সাফল্য কেবল গন্তব্য নয়; সাফল্য হলো সেই পথ চলার অভিজ্ঞতা, যা মানুষকে ভিতর থেকে বদলে দেয়।
আজ তিনি পর্দায় ‘রোহিণী’—একজন খলনায়িকা, যাঁকে দেখে নায়ক-নায়িকারাও ভয় পায়। কিন্তু বাস্তব জীবনে তিনি এক যোদ্ধা। যিনি আঘাতে ভেঙে পড়েননি, বরং আরও শক্ত হয়েছেন। তাঁর পথ সহজ ছিল না, ভবিষ্যতও নিশ্চয়ই চ্যালেঞ্জে ভরা থাকবে। তবু তিনি জানেন, তিনি আর আগের মতো ভাঙবেন না। কারণ তিনি শিখেছেন—নিজেকে হারালে সব হারাতে হয়, আর নিজেকে জিতলে প্রতিটি নতুন সকাল নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসে।
নবনীতা মালাকার তাই শুধু একজন অভিনেত্রী নন। তিনি এক প্রতীক—সংগ্রামের, আত্মসম্মানের, আর অবিচল বিশ্বাসের। পর্দায় তিনি যতই খলনায়িকা হন, জীবনের মঞ্চে তিনি নিঃসন্দেহে এক বাস্তবের ‘হিরোইন’।