চলতি সপ্তাহে প্রেক্ষাগৃহে ছবিমুক্তির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। বাংলা ছবির অনুপস্থিতিতে বক্স অফিসে জায়গা করে নিয়েছে মাত্র দুটি ছবি রানি মুখোপাধ্যায় অভিনীত মর্দানি ৩ এবং অদিতি রাও হায়দরীর গান্ধী দুই ভিন্ন ঘরানার এই ছবি দর্শকদের কতটা আকর্ষণ করতে পারে সেটাই এখন বক্স অফিসের বড় প্রশ্ন।
জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ মানেই সাধারণত সিনেমা জগতে এক ধরনের স্থবিরতা। বছরের শুরুতে বড় বাজেটের ছবি মুক্তির পর এই সময়টা প্রায়ই অপেক্ষার সময় হয়ে দাঁড়ায়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। যদিও বছরের শুরুতেই হিন্দি ও বাংলা মিলিয়ে একগুচ্ছ ছবি মুক্তি পেয়েছিল, সেই ছবিগুলিই এখনও প্রেক্ষাগৃহে দাপটের সঙ্গে চলছে। নতুন ছবির সংখ্যা কম হওয়ায় দর্শকদের আগ্রহ এখনও মূলত পুরনো ছবিগুলির দিকেই কেন্দ্রীভূত।
গত সপ্তাহে মুক্তি পাওয়া ‘বর্ডার ২’ ইতিমধ্যেই বক্স অফিসে রেকর্ড গড়েছে। মুক্তির এক সপ্তাহ পেরোনোর আগেই ছবিটি প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ব্যবসা করে ফেলেছে। দেশাত্মবোধ, যুদ্ধের আবেগ এবং বড় তারকার উপস্থিতি—সব মিলিয়ে এই ছবি দর্শকদের প্রবলভাবে আকৃষ্ট করেছে। ফলে নতুন ছবির জন্য জায়গা তৈরি হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলা ছবির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি কিছুটা একই। বর্তমানে প্রেক্ষাগৃহে চলছে তিনটি বাংলা ছবি—প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় অভিনীত ‘বিজয়নগরের হীরে’, শিশুদের জন্য নির্মিত ‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’ এবং তরুণ প্রজন্মের গল্প নিয়ে তৈরি ‘হোক কলরব’। এর মধ্যে বিশেষ করে ‘বিজয়নগরের হীরে’ নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। ফেলুদা-অনুপ্রাণিত রহস্য কাহিনি, প্রসেনজিতের অভিনয় এবং নস্টালজিয়ার আবহ—সব মিলিয়ে ছবিটি দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, এই সপ্তাহে নতুন বাংলা ছবির মুক্তি নেই একটিও। বাংলা ছবির এই অনুপস্থিতি বক্স অফিসে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে। ফলে দর্শকদের সামনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মাত্র দু’টি ছবি—রানি মুখোপাধ্যায় অভিনীত ‘মর্দানি ৩’ এবং অদিতি রাও হায়দরী অভিনীত নির্বাক ছবি ‘গান্ধী টক্স’। দুটি ছবিই ভিন্ন ঘরানার, ভিন্ন দর্শকগোষ্ঠীর জন্য নির্মিত। একদিকে অ্যাকশন-থ্রিলার, অন্যদিকে পরীক্ষামূলক শিল্পধর্মী সিনেমা। এই দুই ছবির মাধ্যমে বক্স অফিসে তৈরি হয়েছে নতুন এক দ্বন্দ্ব—বাণিজ্যিক সাফল্য বনাম শিল্পীসত্তার পরীক্ষা।
রানি মুখোপাধ্যায়ের নাম মানেই বলিউডে শক্তিশালী নারী চরিত্রের প্রতীক। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, কিন্তু ‘মর্দানি’ ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি তাঁকে নতুন এক পরিচয় দিয়েছে। ২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মর্দানি’ ছবিতে তিনি প্রথমবার ইনস্পেক্টর শিবানী শিবাজি রায়ের চরিত্রে অভিনয় করেন। প্রয়াত বাঙালি পরিচালক প্রদীপ সরকারের পরিচালনায় তৈরি এই ছবিটি শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যই নয়, সামাজিক বার্তাও বহন করেছিল।
‘মর্দানি’-র মূল বিষয় ছিল নারী পাচার এবং শিশু পাচারের মতো ভয়াবহ অপরাধ। রানির অভিনয় দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। তাঁর বিপরীতে ছিলেন যিশু সেনগুপ্ত, যিনি খলচরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। এই ছবির সাফল্যের পরেই তৈরি হয় ‘মর্দানি ২’ (২০১৯)। যদিও দ্বিতীয় ছবিটি পরিচালনা করেন গোপী পুথরন, তবু মূল চরিত্রে রানি আবারও দর্শকদের মন জয় করেন। ‘মর্দানি ২’-তে বিশাল জেঠওয়ার খলচরিত্র দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
এবার ‘মর্দানি ৩’ নিয়ে প্রত্যাশা আরও বেশি। কারণ, এই ছবিতে রানির মুখোমুখি প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা যাবে একজন নারী চরিত্রকে। বলিউডে সাধারণত নারী বনাম পুরুষ সংঘর্ষই বেশি দেখা যায়। কিন্তু এখানে দুই শক্তিশালী নারী চরিত্রের দ্বন্দ্ব দর্শকদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা হতে চলেছে।
ছবির গল্পে আবারও উঠে এসেছে নারী পাচার চক্রের ভয়াবহতা। ইনস্পেক্টর শিবানী শিবাজি রায় এই অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন। সমাজের অন্ধকার দিক, অপরাধের জাল এবং নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বাস্তব চিত্র—সব মিলিয়ে ছবিটি শুধু অ্যাকশন নয়, সামাজিক বার্তাও বহন করছে।
রানি মুখোপাধ্যায় নিজেও এই ছবিকে নিয়ে বিশেষভাবে উৎসাহী। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে তিনি বেছে বেছে ছবি করছেন। ‘মর্দানি’ ফ্র্যাঞ্চাইজ়িই এমন একটি সিরিজ়, যার সঙ্গে তিনি নিয়মিত যুক্ত রয়েছেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের দিক থেকেও এই ছবির গুরুত্ব আলাদা। তাঁর মেয়ে আদিরা এখন বড় হয়েছে। রানি নিজেই বলেছেন, মেয়ের প্রতিক্রিয়া জানার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। একজন মা হিসেবে তাঁর কাছে এই অভিজ্ঞতা বিশেষ আবেগের।
বলিউডে নারীকেন্দ্রিক অ্যাকশন ছবির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। সেই জায়গায় ‘মর্দানি ৩’ নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। বক্স অফিসে ছবিটির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে দর্শকদের গ্রহণযোগ্যতার উপর। তবে প্রথম দুই ছবির সাফল্য দেখে বলা যায়, ‘মর্দানি ৩’ নিয়ে দর্শকদের প্রত্যাশা যথেষ্ট বেশি।
অন্যদিকে ‘গান্ধী টক্স’ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার ছবি। যেখানে ‘মর্দানি ৩’ বাণিজ্যিক অ্যাকশন থ্রিলার, সেখানে ‘গান্ধী টক্স’ একটি পরীক্ষামূলক শিল্পধর্মী সিনেমা। ছবিটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল—এতে কোনও সংলাপ নেই। পুরো ছবিটি নির্বাক।
অদিতি রাও হায়দরী, বিজয় সেতুপতি এবং অরবিন্দ স্বামী অভিনীত এই ছবিটি মূলত মানুষের লোভ, লালসা এবং প্রতিহিংসার গল্প। ছবির নাম শুনে অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন, এতে মহাত্মা গান্ধীর জীবনী বা ঐতিহাসিক উপাদান থাকবে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি একেবারেই আলাদা। ‘গান্ধী টক্স’ কোনও ঐতিহাসিক ছবি নয়, বরং এটি মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে নির্মিত একটি গল্প।
নির্বাক সিনেমা বলিউডে খুবই বিরল। আধুনিক দর্শক সাধারণত সংলাপনির্ভর সিনেমার দিকে বেশি আকৃষ্ট হন। সেই জায়গায় ‘গান্ধী টক্স’ এক ধরনের সাহসী পরীক্ষা। এখানে অভিনেতাদের মুখভঙ্গি, শরীরী ভাষা এবং আবেগ প্রকাশই গল্প বলার প্রধান মাধ্যম।
অদিতি রাও হায়দরী এই ছবিকে নিজের অভিনয় জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে করছেন। ‘হীরামান্ডি’ সিরিজ়ে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হলেও, নতুন কাজের প্রস্তাব কম পাওয়ার কথা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। সেই অর্থে ‘গান্ধী টক্স’ তাঁর কাছে এক নতুন সুযোগ। তিনি নিজেই বলেছেন, কথা না বলেও আবেগ প্রকাশ করা যায়—এই ছবির মাধ্যমে সেটাই তিনি প্রমাণ করতে চান।
এই ছবির মাধ্যমে প্রথমবার জুটি বাঁধলেন অদিতি রাও হায়দরী এবং বিজয় সেতুপতি। বিজয় সেতুপতি ইতিমধ্যেই ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে পরিচিত। তাঁর উপস্থিতি ছবিটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। অরবিন্দ স্বামীর অভিনয়ও ছবির অন্যতম শক্তিশালী দিক।
দিন কয়েক আগে মুম্বইয়ে ছবিটির বিশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে চলচ্চিত্র সমালোচক এবং শিল্পীমহলের সদস্যরা ছবিটি নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তবে বক্স অফিসের ক্ষেত্রে ছবিটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। কারণ, নির্বাক সিনেমা সাধারণ দর্শকদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
কলকাতায় এই ছবিটি মুক্তি পাচ্ছে মাত্র একটি প্রেক্ষাগৃহে। ফলে বক্স অফিসের আয় সীমিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে শিল্পীসত্তার দিক থেকে ছবিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বলে মনে করছেন অনেকেই।
এই সপ্তাহে নতুন বাংলা ছবির মুক্তি না থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এটি কি কোনও সংকেত, না কি শুধুই সাময়িক বিরতি—এই প্রশ্ন উঠছে।
একদিকে বাংলা ছবির নির্মাতারা এখন বড় বাজেটের ছবি তৈরি করতে আগ্রহী হচ্ছেন। অন্যদিকে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা বাড়ায় প্রেক্ষাগৃহের উপর নির্ভরতা কিছুটা কমেছে। ফলে অনেক নির্মাতা সিনেমা মুক্তির সময় বেছে নিতে আরও সতর্ক হচ্ছেন।
বর্তমানে যে তিনটি বাংলা ছবি প্রেক্ষাগৃহে চলছে, সেগুলির মধ্যে ‘বিজয়নগরের হীরে’ সবচেয়ে বেশি আলোচিত। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় বরাবরের মতোই দর্শকদের আকর্ষণ করেছে। ফেলুদা-অনুপ্রাণিত গল্প, রহস্য এবং নস্টালজিয়া—সব মিলিয়ে ছবিটি বাংলা দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’ মূলত শিশুদের জন্য নির্মিত ছবি। পরিবারসহ দর্শকরা এই ছবিটি দেখতে আগ্রহী। অন্যদিকে ‘হোক কলরব’ তরুণ প্রজন্মের গল্প নিয়ে তৈরি, যা নতুন দর্শকগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করছে।
তবে নতুন বাংলা ছবির অনুপস্থিতি বক্স অফিসে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে। ফলে হিন্দি ছবিগুলিই মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
এই সপ্তাহের বক্স অফিসে মূল দ্বন্দ্ব দুটি ছবির মধ্যে—‘মর্দানি ৩’ এবং ‘গান্ধী টক্স’। একটি বাণিজ্যিক অ্যাকশন থ্রিলার, অন্যটি পরীক্ষামূলক শিল্পধর্মী সিনেমা।
‘মর্দানি ৩’ দর্শকদের জন্য পরিচিত ঘরানার ছবি। অ্যাকশন, থ্রিল, সামাজিক বার্তা এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী—সব মিলিয়ে ছবিটি বক্স অফিসে ভালো ব্যবসা করার সম্ভাবনা রাখে।
অন্যদিকে ‘গান্ধী টক্স’ মূলত নির্দিষ্ট দর্শকগোষ্ঠীর জন্য তৈরি। যারা শিল্পধর্মী সিনেমা ভালোবাসেন, তাদের কাছে এই ছবি বিশেষ আকর্ষণীয় হতে পারে। তবে সাধারণ দর্শকদের কাছে ছবিটি কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এই দুই ছবির মাধ্যমে বক্স অফিসে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ভারসাম্য। একদিকে বড় বাজেটের বাণিজ্যিক ছবি, অন্যদিকে ছোট বাজেটের পরীক্ষামূলক ছবি। এই ভারসাম্যই ভারতীয় সিনেমার বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে সিনেমা জগতের পরিস্থিতি কিছুটা ব্যতিক্রমী। নতুন ছবির সংখ্যা কম, বাংলা ছবির অনুপস্থিতি এবং বলিউডের দুই বিপরীত ধারার ছবির উপস্থিতি—সব মিলিয়ে বক্স অফিসে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ।
‘মর্দানি ৩’ যদি বক্স অফিসে সফল হয়, তবে নারীকেন্দ্রিক অ্যাকশন ছবির জনপ্রিয়তা আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে ‘গান্ধী টক্স’ যদি সমালোচকদের প্রশংসা পায়, তবে নির্বাক সিনেমার প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি হতে পারে।
বাংলা ছবির ক্ষেত্রে নির্মাতারা হয়তো আগামী সপ্তাহগুলোতে নতুন ছবি নিয়ে আসবেন। তখন বক্স অফিসের চিত্র আবারও বদলে যেতে পারে।
তবে আপাতত দর্শকদের সামনে মূল প্রশ্ন একটাই—রানি মুখোপাধ্যায়ের অ্যাকশন-থ্রিলার না অদিতি রাও হায়দরীর নির্বাক সিনেমা, কোন ছবি জয় করবে বক্স অফিস?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উত্তরই দেবে দর্শক এবং বক্স অফিস।