Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

দিল্লির আকাশে বিষাক্ত ধোঁয়া: জনজীবন ও বিমান চলাচল বিপর্যস্ত

দিল্লির আকাশে আবারও নেমে এসেছে ঘন ধোঁয়াশার ভয়াবহ ছায়া। রাজধানীর বাতাসে দূষণের মাত্রা বিপজ্জনক সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত। চারদিকে ধোঁয়ার পুরু আস্তরণে ঢেকে গিয়েছে শহর, যার ফলে দৃশ্যমানতা অনেক জায়গাতেই প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। সকাল কিংবা রাত দিনের কোনও সময়েই স্বস্তি নেই। এই দূষণের সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যের উপর। শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা, কাশি ও হাঁপানির সমস্যা বাড়ছে দ্রুত। একই সঙ্গে চরম সমস্যায় পড়েছে পরিবহণ ব্যবস্থা, বিশেষ করে বিমান পরিষেবা। দৃশ্যমানতা কম থাকায় বহু ফ্লাইট বাতিল বা দেরিতে চলেছে। যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্প দূষণ, নির্মাণকাজের ধুলো এবং খড় পোড়ানোর ধোঁয়া মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। পরিবেশবিদদের মতে, জরুরি নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

দিল্লির আকাশে বিষাক্ত ধোঁয়া: জনজীবন ও বিমান চলাচল বিপর্যস্ত
Environment Pollution Health Weather Public Safety

দিল্লির আকাশে আবারও নেমে এসেছে ঘন ধোঁয়াশার অভিশাপ। রাজধানীর বাতাসে ভয়ানক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে দূষণের ‘বিষ’, যা ক্রমশ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। চারদিক ঢেকে ফেলেছে ধোঁয়ার পুরু আস্তরণ, যার ফলে দৃশ্যমানতা অনেক জায়গাতেই কমতে কমতে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। সকাল হোক বা রাত, দিল্লির আকাশ যেন আর নীল নেই, সর্বত্র কেবল ধূসর ও হলদেটে কুয়াশার চাদর। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে জনজীবন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, পরিবহণ পরিষেবা এবং বিশেষ করে বিমান চলাচলের উপর। একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ শ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছেন, অন্যদিকে প্রশাসন ও পরিবেশবিদেরা গভীর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। শীতের শুরুতেই দিল্লি ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বায়ুদূষণ নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই এই সময় রাজধানী কার্যত একটি গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়। তবে এবছর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। বাতাসে ক্ষতিকর কণা পিএম ২.৫ এবং পিএম ১০-এর মাত্রা বিপজ্জনক সীমা বহু গুণ ছাড়িয়ে গিয়েছে। এই অতি সূক্ষ্ম কণাগুলি মানুষের ফুসফুসে ঢুকে রক্তপ্রবাহের সঙ্গে মিশে গিয়ে মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এমন বাতাসে শ্বাস নিলে হৃদরোগ, ফুসফুসের অসুখ, হাঁপানি, চোখের জ্বালা, ত্বকের সমস্যা এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। শিশু, বয়স্ক এবং আগে থেকেই অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। দিল্লির রাস্তাঘাটে বেরোলেই দূষণের ভয়াবহতা চোখে পড়ছে। দূরের কোনও কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে শুরু করে উঁচু অট্টালিকা সবই যেন ধোঁয়ার আড়ালে মিলিয়ে যাচ্ছে। সকালবেলা সূর্যের আলো পর্যন্ত ম্লান হয়ে যাচ্ছে এই ঘন ধোঁয়াশার কারণে। অনেক জায়গায় কয়েক মিটার দূরের যানবাহনও চোখে পড়ছে না, ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে গিয়েছে। ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে সতর্কতা জারি করা হয়েছে, ধীরে গাড়ি চালানোর অনুরোধ জানানো হচ্ছে, তবুও ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। বহু মানুষ বাধ্য হয়ে মাস্ক পরে রাস্তায় বেরোচ্ছেন, কিন্তু সাধারণ কাপড়ের মাস্ক এই মারাত্মক দূষণের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এই ভয়াবহ বায়ুদূষণের অন্যতম বড় প্রভাব পড়েছে বিমান পরিষেবার উপর। দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কার্যত চরম চাপে রয়েছে। দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ার কারণে একের পর এক বিমান ওঠানামা করতে সমস্যায় পড়ছে। বহু বিমান দেরিতে ছাড়ছে, অনেক বিমান ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে অন্য শহরে, আবার কিছু ফ্লাইট বাতিলও করতে হচ্ছে। যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে বিমানবন্দরে, সৃষ্টি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। বিশেষ করে ভোর এবং গভীর রাতের দিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে উঠছে, যখন ধোঁয়াশার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে। বিমান কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের আগাম সতর্কতা দিচ্ছে, তবে যাঁদের জরুরি কাজে যাতায়াত প্রয়োজন, তাঁদের ভোগান্তির শেষ নেই। দিল্লির এই দূষণের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। শীতের শুরুতেই তাপমাত্রা কমে যাওয়ার ফলে বাতাস ভারী হয়ে যায় এবং উপরের দিকে উঠতে পারে না। এর ফলে দূষিত কণাগুলি নিচের স্তরেই আটকে থাকে। পাশাপাশি বাতাসের গতিও কম থাকায় দূষণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায় না। এই প্রাকৃতিক কারণগুলির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবসৃষ্ট নানা সমস্যা। দিল্লিতে বিপুল সংখ্যক যানবাহন প্রতিদিন রাস্তায় চলে, যেগুলি থেকে নির্গত ধোঁয়া বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস। এছাড়াও শিল্প কারখানার ধোঁয়া, নির্মাণ কাজ থেকে উড়ে আসা ধুলো, ডিজেল জেনারেটরের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।এর সঙ্গে প্রতি বছর শীতের মরশুমে উত্তর ভারতের কৃষিজমিতে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর ঘটনা দিল্লির দূষণকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং পশ্চিম উত্তর প্রদেশের বহু কৃষক জমি পরিষ্কারের জন্য খড় পোড়ান, যার ধোঁয়া বাতাসে ভেসে এসে দিল্লিতে জমা হয়। যদিও সরকার বিকল্প পদ্ধতির কথা বলছে এবং খড় পোড়ানো বন্ধে নানা নিয়ম-কানুন জারি করেছে, তবুও বাস্তবে এই সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ফলে দিল্লির মানুষকে প্রতি বছরই এই দূষণের মূল্য দিতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দিল্লির হাসপাতালগুলিতে রোগীর চাপও বাড়ছে। শ্বাসকষ্ট, কাশি, বুকে চাপ, চোখ জ্বালা, মাথাব্যথা নিয়ে বহু মানুষ চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে হাঁপানি ও শ্বাসজনিত সমস্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিচ্ছেন, যতটা সম্ভব ঘরের ভিতরে থাকতে, অপ্রয়োজনীয় বাইরে যাতায়াত এড়িয়ে চলতে এবং শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ যত্ন নিতে। তবে কর্মজীবী মানুষের পক্ষে সবসময় ঘরের ভিতরে থাকা সম্ভব নয়, ফলে ঝুঁকি নিয়েই তাঁদের বাইরে বেরোতে হচ্ছে। বিদ্যালয় ও কলেজগুলিও এই দূষণের প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না। অনেক অভিভাবকই সন্তানদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে উদ্বিগ্ন। অতীতে এমন পরিস্থিতিতে দিল্লিতে স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এবছরও পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অনলাইন ক্লাসের কথা ভাবা হলেও, তা সব ছাত্রছাত্রীর পক্ষে সমানভাবে কার্যকর হয় না। খেলাধুলা, শরীরচর্চা সবকিছুই কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবেশবিদেরা বারবার সতর্ক করে আসছেন যে দিল্লির এই বায়ুদূষণ কোনও সাময়িক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকট। শুধু জরুরি ভিত্তিতে কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গণপরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি, শিল্প দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণ কাজের নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলা এবং কৃষকদের জন্য বাস্তবসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি। যতদিন না সমাজের সব স্তর একসঙ্গে এই সমস্যার মোকাবিলা করবে, ততদিন দিল্লির আকাশ থেকে এই বিষাক্ত ধোঁয়া সরবে না। সরকারি স্তরে নানা পদক্ষেপের কথা বলা হলেও, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কখনও গ্র্যাপের মতো জরুরি ব্যবস্থা জারি করা হচ্ছে, কখনও কিছু শিল্প কারখানা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, কখনও যানবাহন নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এই পদক্ষেপগুলি অনেক সময় দেরিতে নেওয়া হয় অথবা পর্যাপ্ত কঠোরতা থাকে না। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে, কারণ প্রতি বছর একই সমস্যা ফিরে আসে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান দেখা যায় না। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে দিল্লির মানুষ কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছেন। একদিকে জীবিকার তাগিদ, অন্যদিকে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। অনেকেই শহর ছাড়ার কথা ভাবছেন, বিশেষ করে যাঁদের শিশু সন্তান আছে বা যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসজনিত রোগে ভুগছেন। তবে সবার পক্ষে শহর ছেড়ে চলে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে দূষণের সঙ্গে সহাবস্থান করাই যেন রাজধানীর মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে দিল্লির বাতাসে এই ভয়ানক ‘বিষ’ শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, এটি একটি মানবিক বিপর্যয়। প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে মানুষ যেন অদৃশ্য বিষ গ্রহণ করছে, যার প্রভাব হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য দিতে হবে গোটা প্রজন্মকে। আজ যে শিশুটি এই ধোঁয়াশার মধ্যে বড় হচ্ছে, তার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের উপর এর প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। দিল্লির আকাশ কবে আবার পরিষ্কার হবে, কবে মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা। তবে একটাই সত্য, যদি এখনই কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে এই ‘বিষাক্ত’ বাতাস আরও বহু বছর ধরে রাজধানীর মানুষকে বন্দি করে রাখবে।দিল্লির আকাশে আবারও নেমে এসেছে ঘন ধোঁয়াশার ভয়াবহ ছায়া। রাজধানীর বাতাসে দূষণের মাত্রা বিপজ্জনক সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত। চারদিকে ধোঁয়ার পুরু আস্তরণে ঢেকে গিয়েছে শহর, যার ফলে দৃশ্যমানতা অনেক জায়গাতেই প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। সকাল কিংবা রাত দিনের কোনও সময়েই স্বস্তি নেই। এই দূষণের সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যের উপর। শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা, কাশি ও হাঁপানির সমস্যা বাড়ছে দ্রুত। একই সঙ্গে চরম সমস্যায় পড়েছে পরিবহণ ব্যবস্থা, বিশেষ করে বিমান পরিষেবা। দৃশ্যমানতা কম থাকায় বহু ফ্লাইট বাতিল বা দেরিতে চলেছে। যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্প দূষণ, নির্মাণকাজের ধুলো এবং খড় পোড়ানোর ধোঁয়া মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। পরিবেশবিদদের মতে, জরুরি নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

news image
আরও খবর
Preview image