Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি সার! ১৫ নয়, ১০ শতাংশ আমদানি শুল্কই ধার্য করল মার্কিন সরকারি এজেন্সি, মঙ্গলবার থেকেই হল কার্যকর

মঙ্গলবার রাত ১২টা ১ মিনিট (ওয়াশিংটনের সময়) থেকে আমেরিকায় নতুন শুল্ক কার্যকর করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের রফতানি করা পণ্যের উপরে ১০ শতাংশই শুল্ক নিচ্ছে আমেরিকা। আপাতত বিভিন্ন দেশের থেকে ১০ শতাংশ হারেই আমদানি শুল্ক নেবে আমেরিকা। জানাল সে দেশের শুল্ক এবং সীমান্ত রক্ষা (ইউনাইটেড স্টেটস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন) এজেন্সি। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, বিভিন্ন দেশের উপর ১৫ শতাংশ শুল্ক চাপানো হবে। আমেরিকার বৃহত্তম আইন প্রয়োগ সংস্থা যদিও সেই পথে হাঁটেনি।

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি সার! ১৫ নয়, ১০ শতাংশ আমদানি শুল্কই ধার্য করল মার্কিন সরকারি এজেন্সি, মঙ্গলবার থেকেই হল কার্যকর
International News

মঙ্গলবার রাত ১২টা ১ মিনিট (ওয়াশিংটনের সময়) থেকে আমেরিকায় নতুন শুল্ক কার্যকর করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের রফতানি করা পণ্যের উপরে ১০ শতাংশই শুল্ক নিচ্ছে আমেরিকা। তবে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন বলছে, এই শুল্ক বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করতে সরকারি নির্দেশিকা নিয়ে কাজ করছেন হোয়াইট হাউসের আধিকারিকেরা।

গত শুক্রবার আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টে ধাক্কা খেয়েছেন ট্রাম্প। সে দেশের সর্বোচ্চ আদালত জানিয়ে দেয়, জাতীয় জরুরি অবস্থার জন্য ব্যবহৃত আইন প্রয়োগ করে বিভিন্ন দেশের উপর ট্রাম্প যে আমদানি শুল্ক চাপিয়েছিলেন, তা বেআইনি। মার্কিন কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া একক ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে এই শুল্ক চাপিয়েছেন ট্রাম্প। এর ফলে ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলে জানায় সুপ্রিম কোর্ট।মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ওই নির্দেশের পরই হোয়াইট হাউস থেকে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়, ‘‘সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষিতে আইইইপিএ অনুসারে আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক আর কার্যকর হবে না। যত দ্রুত সম্ভব তা আদায় করা বন্ধ হবে।’’ এরই মধ্যে আবার ট্রাম্প পৃথক ভাবে বিভিন্ন দেশের উপরে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্দেশে স্বাক্ষর করেন। পরে তা বৃদ্ধি করে ১৫ শতাংশ করারও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। তবে এই শুল্ক ‘সাময়িক’। কারণ, ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের ১২২ নম্বর ধারা উল্লেখ করে নতুন এই শুল্ক চাপিয়েছেন ট্রাম্প। আইন বলছে, এতেও মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনই শেষ কথা। প্রাথমিক ভাবে অনুমোদন ছাড়া ১৫০ দিনের বেশি এই ধরনের শুল্ক কার্যকর করা যায় না।

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত সাম্প্রতিক বিবৃতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আইইইপিএ (International Emergency Economic Powers Act) আইনের আওতায় আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক প্রত্যাহারের ঘোষণা এবং তার পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্পের পৃথক ভাবে বিভিন্ন দেশের উপর নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত—এই সমগ্র ঘটনাপ্রবাহ মার্কিন প্রশাসনিক ক্ষমতা, বিচারব্যবস্থা এবং কংগ্রেসের সাংবিধানিক ভূমিকার জটিল সম্পর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রথমেই আইইইপিএ প্রসঙ্গে আসা যাক। ১৯৭৭ সালে প্রণীত এই আইন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বিশেষ জরুরি পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষমতা দেয়। সাধারণত জাতীয় নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, বৈদেশিক হুমকি, বা বৈদেশিক আর্থিক প্রভাব মোকাবিলার ক্ষেত্রে এই আইন প্রয়োগ করা হয়। অতীতে ইরান, উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া সহ একাধিক দেশের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষেত্রে আইইইপিএ ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এই আইনের প্রয়োগ সব সময়ই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়, কারণ জরুরি অবস্থার ব্যাখ্যা অনেক সময় রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রভাবিত বলে সমালোচকরা মনে করেন।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট আইইইপিএ-র আওতায় আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল—জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপ করা কতটা সাংবিধানিকভাবে বৈধ, তা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। এই নির্দেশের পরই হোয়াইট হাউস বিবৃতি দিয়ে জানায় যে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আইইইপিএ অনুসারে আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক আর কার্যকর থাকবে না এবং যত দ্রুত সম্ভব সেই শুল্ক আদায় বন্ধ করা হবে। এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, কারণ অতিরিক্ত শুল্ক প্রত্যাহার মানে আমদানি-রপ্তানি ব্যয়ের পরিবর্তন, সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্গঠন, এবং বহুজাতিক সংস্থাগুলির জন্য নতুন হিসাবনিকাশ।

কিন্তু এখানেই ঘটনাপ্রবাহ থেমে থাকেনি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প পৃথক ভাবে বিভিন্ন দেশের উপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্দেশে স্বাক্ষর করেন। পরবর্তীতে তিনি তা ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর হুঁশিয়ারিও দেন। ফলে প্রশ্ন ওঠে—একদিকে আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী আইইইপিএ শুল্ক প্রত্যাহার, অন্যদিকে নতুন শুল্ক আরোপ—এ কি নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন, নাকি কৌশলগত পুনর্বিন্যাস?

এই নতুন শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে ট্রাম্প ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের ১২২ নম্বর ধারার উল্লেখ করেন। এই ধারা প্রেসিডেন্টকে সাময়িক ভিত্তিতে আমদানি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেয়, বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্রের পেমেন্ট ব্যালান্স বা বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতি চাপে পড়ে। অর্থাৎ, এটি জাতীয় জরুরি নিরাপত্তার চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার যুক্তিতে প্রয়োগযোগ্য। এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট সীমিত সময়ের জন্য শুল্ক বৃদ্ধি, কোটা আরোপ, বা অন্যান্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিতে পারেন।

তবে এই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। আইন স্পষ্টভাবে বলছে—কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এই ধরনের শুল্ক ১৫০ দিনের বেশি কার্যকর রাখা যায় না। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়নের জন্য আইনসভাকে পাশ কাটানো সম্ভব নয়। এখানেই মার্কিন গণতান্ত্রিক কাঠামোর “চেকস অ্যান্ড ব্যালান্সেস” নীতি কার্যকর হয়।

এই প্রেক্ষিতে ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে দুই ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

প্রথম ব্যাখ্যা: অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ
ট্রাম্প প্রশাসনের “America First” নীতির মূল লক্ষ্য ছিল দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, এবং বিদেশি উৎপাদনের উপর নির্ভরতা হ্রাস করা। বিশেষ করে চীন, মেক্সিকো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এবং কিছু উন্নয়নশীল দেশের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে মার্কিন উৎপাদকদের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। নতুন ১০–১৫ শতাংশ শুল্ক সেই বৃহত্তর নীতির ধারাবাহিকতা বলেই অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন।

দ্বিতীয় ব্যাখ্যা: রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল
শুল্ককে অনেক সময় কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। বাণিজ্য আলোচনা, মুদ্রানীতি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, বা সামরিক সহযোগিতার প্রশ্নে অন্য দেশকে আলোচনার টেবিলে আনতে শুল্ক বৃদ্ধির হুঁশিয়ারি কার্যকর কৌশল হতে পারে। ট্রাম্প পূর্বেও NAFTA পুনর্গঠন, চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধ, এবং ইইউ-র সঙ্গে শুল্ক বিরোধে এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।

তবে এই নীতির সমালোচনাও কম নয়।

news image
আরও খবর

১. ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি
শুল্ক বাড়লে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়ে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার উপর পড়ে। ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম—এসব ক্ষেত্র সরাসরি প্রভাবিত হয়।

২. প্রতিশোধমূলক শুল্ক
অন্য দেশও পাল্টা শুল্ক আরোপ করতে পারে। ফলে মার্কিন কৃষিপণ্য, প্রযুক্তিপণ্য, বা শিল্পপণ্যের রপ্তানি কমে যেতে পারে।

৩. সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্ন
আজকের বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে উৎপাদন বহু দেশে বিভক্ত। একটি দেশে শুল্ক বাড়লে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থাই ব্যাহত হতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আদালত সরাসরি অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করে না, কিন্তু প্রশাসনিক ক্ষমতার সাংবিধানিক সীমা নির্ধারণ করে। আইইইপিএ প্রয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আদালত কার্যত জানিয়ে দেয়—জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে বাণিজ্য নীতি নির্ধারণ করলে তার বিচারিক পর্যালোচনা সম্ভব।

হোয়াইট হাউসের বিবৃতি তাই একধরনের আইনি প্রতিক্রিয়া। আদালতের নির্দেশ অমান্য করলে সাংবিধানিক সঙ্কট তৈরি হতে পারত। ফলে আইইইপিএ শুল্ক প্রত্যাহার ছিল আইনি বাধ্যবাধকতা।

অন্যদিকে, ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ ধারা ব্যবহার করে নতুন শুল্ক আরোপ ছিল প্রশাসনের বিকল্প পথ খোঁজা। অর্থাৎ, আদালতের আপত্তিকৃত আইনি কাঠামো থেকে সরে এসে অন্য আইনি ভিত্তি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এখানেও কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন—যা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণের উপর নির্ভরশীল।

যদি কংগ্রেস অনুমোদন না দেয়, তাহলে ১৫০ দিনের মধ্যে এই শুল্ক প্রত্যাহার করতে হবে। কিন্তু যদি অনুমোদন মেলে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য নীতিতে রূপ নিতে পারে।

এই সমগ্র পরিস্থিতি কয়েকটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে—

১. প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক জরুরি ক্ষমতার সীমা কোথায়?
২. জাতীয় নিরাপত্তা বনাম অর্থনৈতিক সুরক্ষা—কোন যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?
৩. বিচারব্যবস্থা কি বাণিজ্যনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে?
৪. কংগ্রেস কি প্রশাসনের শুল্কনীতিকে সমর্থন করবে, নাকি বিরোধিতা করবে?

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। উন্নয়নশীল দেশগুলি, যারা মার্কিন বাজারের উপর নির্ভরশীল, তারা নতুন শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার কিছু দেশ বিকল্প বাজার খুঁজতে বাধ্য হবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO)-র নীতিগত কাঠামোর সঙ্গেও এই শুল্কবৃদ্ধির সংঘাত তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ, হোয়াইট হাউসের বিবৃতি, আইইইপিএ শুল্ক প্রত্যাহার, এবং ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ ধারায় নতুন শুল্ক আরোপ—এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলি শুধু একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি মার্কিন প্রশাসনিক ক্ষমতা, সাংবিধানিক ভারসাম্য, এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য রাজনীতির জটিল পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতিফলন।

আগামী দিনে কংগ্রেসের অবস্থান, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া, এবং বাজারের বাস্তব ফলাফলই নির্ধারণ করবে—এই ‘সাময়িক’ শুল্ক সত্যিই সাময়িক থাকে, নাকি তা দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য নীতির অংশ হয়ে ওঠে।

Preview image