চেনা গন্তব্যের ভিড় এড়িয়ে যদি শীতের ছুটিতে একটু অন্যরকম অভিজ্ঞতা খুঁজে থাকেন, তবে অচেনা পথেই পা বাড়ানোই সেরা সিদ্ধান্ত। পর্যটকদের ভিড় কম, প্রকৃতির ছোঁয়া অটুট—এমন জায়গাতেই লুকিয়ে থাকে সত্যিকারের ভ্রমণের আনন্দ। ঘরের কাছেই রয়েছে তেমনই তিনটি ঠিকানা, যেগুলি এখনও খুব বেশি আলোচনায় না এলেও মন ভরাবে নিশ্চিত। প্রথম গন্তব্য ঝালং। ডুয়ার্সের এই শান্ত পাহাড়ি গ্রামটি পাহাড়, জঙ্গল আর ঝরনার মেলবন্ধন। সকালে কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের আলো, রাতে নীরবতার মধ্যে জঙ্গলের শব্দ—সব মিলিয়ে ঝালং আদর্শ শীতভ্রমণের ঠিকানা। দ্বিতীয় ঠিকানা খয়রাবাড়ি–গজলডোবা অঞ্চল। তিস্তা নদীর পাড় ঘেঁষে বিস্তৃত এই এলাকা পাখিপ্রেমীদের স্বর্গ। শীতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পরিযায়ী পাখির ডাক আর নদীর শান্ত প্রবাহ মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দেয়। তৃতীয় গন্তব্য জয়ন্তী। ভূটানের সীমান্তে অবস্থিত এই ছোট্ট গ্রামটি পাহাড় ও নদীর যুগলবন্দিতে অনন্য। নীলচে পাহাড়ের সারি, জয়ন্তী নদীর স্বচ্ছ জল আর নির্জন পরিবেশ—সব মিলিয়ে ব্যস্ত জীবন থেকে কয়েক দিনের নিখুঁত মুক্তি। ভিড়ের বাইরে, তবু সৌন্দর্যে ভরপুর—এই তিন অচেনা ঠিকানাই হতে পারে আপনার শীতের ছুটির নতুন গল্প।
শীতের ছুটি মানেই কি দিঘা, পুরী বা মন্দারমণির চেনা সমুদ্রতট? বছরের পর বছর একই জায়গায় ফিরে যাওয়া, একই ভিড়, একই ছবি—একসময় তা আনন্দের বদলে অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়। সময় কম, খরচের রাশ টানাটানি—এই বাস্তবতার মাঝেও মন কিন্তু অন্য কিছুর খোঁজ করে। এমন এক জায়গা, যেখানে পৌঁছতে খুব বেশি পরিকল্পনার দরকার নেই, অথচ ফিরে এলে মনে হয়—কিছু আলাদা দেখা হয়ে গেল। ঠিক সেই জায়গাটির নাম হিজলি।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথি মহকুমার অন্তর্গত এই হিজলি আজও পর্যটন মানচিত্রে তেমন উজ্জ্বল নয়। কিন্তু সেই অনালোচিত থাকাটাই তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। এখানে নেই ঝলমলে হোটেল, নেই আলোঝলমলে প্রমোদতরী বা কোলাহলপূর্ণ বাজার। আছে প্রকৃতির নিজস্ব ছন্দ, ইতিহাসের নীরব উপস্থিতি আর এক গভীর আধ্যাত্মিক আবহ—যা ধীরে ধীরে মনকে গ্রাস করে।
হিজলির ভূগোলই তাকে আলাদা করে তোলে। এক দিকে উত্তাল বঙ্গোপসাগরের ঢেউ, অন্য দিকে শান্ত রসুলপুর নদীর মোহনা। এই দুই জলধারার মাঝখানে বিস্তৃত বালুচর, যেখানে প্রকৃতি নিজে হাতে আঁকে রঙিন ক্যানভাস। কোথাও নরম বালি, কোথাও কাদামাটির স্তর, আবার কোথাও ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের ঘন সবুজ দেয়াল। এই বৈচিত্র্য হিজলিকে শুধু একটি সৈকত নয়, বরং এক সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে।
হিজলি সৈকত প্রথম দর্শনেই চেনা সমুদ্রসৈকতের ধারণা ভেঙে দেয়। এখানে ঢেউ আছে, কিন্তু তার সঙ্গে লেগে নেই পর্যটনের হইচই। বিস্তীর্ণ বালির উপর দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দিকে তাকালে চোখে পড়ে না সারি সারি রিসর্ট বা দোকানপাট। বরং দূরে দেখা যায় ঝাউগাছের সারি, কোথাও পাতাবিহীন শুকনো গাছ—যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই দৃশ্য এক অদ্ভুত নির্জনতা তৈরি করে, যা শহরের কোলাহল থেকে আসা মানুষের কাছে এক ধরনের মুক্তি।
জোয়ার-ভাটার সময় হিজলি সৈকতের রূপ বদলে যায়। ভাটার সময় সমুদ্র সরে গেলে বালুচর পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাওয়া যায় নদী আর সমুদ্রের মিলনস্থলে। সেখানে দাঁড়িয়ে বোঝা যায় প্রকৃতির শক্তি কতখানি বিশাল। আবার জোয়ার এলে জল এগিয়ে আসে, ঢেউয়ের শব্দ ভরে ওঠে চারপাশ। তখন সমুদ্র যেন নিজেই কথা বলতে শুরু করে।
হিজলির আর এক অনন্য দিক তার ম্যানগ্রোভ জঙ্গল। নদী ও সমুদ্রের মাঝামাঝি এই সবুজ প্রাচীর শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ম্যানগ্রোভের ফাঁকে ফাঁকে পাখিদের আনাগোনা, বাতাসে নোনা গন্ধ আর পাতার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া সূর্যালোক—সব মিলিয়ে এক স্বপ্নময় পরিবেশ তৈরি হয়। শীতের সকালে বা বিকেলের নরম আলোয় এই অঞ্চল হয়ে ওঠে প্রকৃতিপ্রেমীদের স্বর্গ।
এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ঠিক পাশেই রয়েছে হিজলির আর এক গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়—হিজলি মসনদ-ই-আলা শরিফ। ঝাউবন পেরিয়ে এই ঐতিহাসিক দরগায় পৌঁছনো যায়। এটি কেবল একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং বহু মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাস আর সম্প্রীতির প্রতীক।
সারা বছরই এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ আসেন। কেউ মানত করতে, কেউ শান্তি খুঁজতে, কেউ আবার নিছকই এই জায়গার আধ্যাত্মিক আবহ অনুভব করতে। দরগার চত্বরে দাঁড়ালে এক ধরনের নীরবতা অনুভূত হয়—যা খুব কম জায়গাতেই পাওয়া যায়। এখানে ধর্মের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মানবিক অনুভূতি।
লোককথা অনুযায়ী, বহু বছর আগে এক সুফি সাধকের স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই এই মসনদের সূচনা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা এক গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষ উৎসবের সময়ে এখানে মানুষের ঢল নামে, বসে মেলা। কিন্তু সাধারণ দিনে দরগার পরিবেশ থাকে শান্ত, সংযত, ভাবগম্ভীর।
হিজলির আকর্ষণ এখানেই—এটি কোনও একমাত্রিক গন্তব্য নয়। এখানে একই দিনে প্রকৃতি, ইতিহাস আর আধ্যাত্মিকতার স্বাদ পাওয়া যায়। সকালে সমুদ্রতটে হাঁটা, দুপুরে ঝাউবনের ছায়ায় বসে বিশ্রাম, বিকেলে মসনদ-ই-আলা শরিফে কিছুটা সময় কাটানো—এই অভিজ্ঞতা একসঙ্গে খুব কম জায়গাই দিতে পারে।
ভ্রমণের খরচের দিক থেকেও হিজলি স্বস্তিদায়ক। কাছাকাছি কাঁথি, খেজুরি বা রসুলপুরে থাকা যায়। চাইলে দিনের ট্রিপ হিসেবেও ঘুরে আসা সম্ভব। বড়সড় পরিকল্পনা বা আগাম বুকিংয়ের ঝামেলা নেই। এই সরলতাই হিজলির সবচেয়ে বড় শক্তি।
হিজলি বিলাসিতা দেয় না, কিন্তু দেয় প্রশান্তি। এখানে ছবি তুলতে গিয়ে মনে হয় না কেউ পেছন থেকে ঠেলা দিচ্ছে। এখানে বসে থাকতে ইচ্ছে করে—কোনও তাড়া নেই, কোনও তালিকা নেই। শুধু আকাশ, জল, হাওয়া আর নিজের সঙ্গে কিছুটা সময়।
শীতের ছুটিতে যদি চেনা পথ ছেড়ে একটু অন্যদিকে পা বাড়াতে চান, যদি ভিড়ের বাইরে দাঁড়িয়ে প্রকৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করতে চান, তবে হিজলি নিঃশব্দে আপনাকে ডাকছে। হয়তো খুব জোরে নয়, কিন্তু গভীরভাবে—একবার গেলে, সেই ডাক মনে থেকে যাবে বহুদিন।
হিজলি নামটি ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে নতুন নয়। ব্রিটিশ আমলে হিজলি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক অঞ্চল। সমুদ্রঘেঁষা এই ভূখণ্ড দিয়ে এক সময় চলত নৌ-বাণিজ্য, গড়ে উঠেছিল বন্দরকেন্দ্রিক জনপদ। যদিও আজ সেই ব্যস্ততার চিহ্ন মুছে গিয়েছে, তবু ভূগোল আর ইতিহাস মিলিয়ে হিজলি আজও আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
কাঁথি মহকুমার খেজুরি থানার অন্তর্গত এই অঞ্চলটি প্রকৃত অর্থেই নদী ও সমুদ্রের যুগলবন্দিতে গড়া। রসুলপুর নদী এসে এখানে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। নদীর শান্ত জল আর সমুদ্রের অস্থির ঢেউ—এই দুইয়ের মিলনস্থলেই জন্ম নিয়েছে হিজলির বিশেষ চরিত্র।
হিজলি সৈকত প্রথম দেখাতেই আলাদা মনে হবে। এখানে নেই দিঘা বা মন্দারমণির মতো সারি সারি হোটেল, ঝলমলে রিসর্ট কিংবা চিৎকার করা পর্যটনের রং। বরং চোখে পড়বে—
এক দিকে ধু-ধু বালির বিস্তার
দূরে সারি সারি ঝাউগাছ
কোথাও কোথাও পাতাবিহীন শুকনো গাছ, যেন প্রকৃতির নিজস্ব ভাস্কর্য
আর সামনে অন্তহীন সমুদ্র
দিনের বেলায় পর্যটক আসেন ঠিকই, তবে ভিড় কখনও অসহ্য হয়ে ওঠে না। বিকিকিনিও হয়—চা, ঝালমুড়ি, ভাজাভুজি—কিন্তু তা প্রকৃতির সৌন্দর্যে ব্যাঘাত ঘটায় না।
জোয়ার-ভাটার খেলা
হিজলি সৈকতের আর এক বড় আকর্ষণ জোয়ার-ভাটার নাটকীয় পরিবর্তন। ভাটার সময় বালি আর কাদার উপর দিয়ে খানিকটা এগোলে চোখের সামনে খুলে যায় এক অন্য জগত—এক পাশে সমুদ্র, অন্য পাশে নদীর মোহনা। জোয়ার এলে আবার জল এগিয়ে আসে জনবসতির দিকে। তখন অনেক পর্যটক ঢেউয়ের সঙ্গে খেলতে নামেন, যদিও স্থানীয়দের পরামর্শ মেনে সতর্ক থাকাই শ্রেয়।
হিজলির আর এক বিশেষ দিক তার ম্যানগ্রোভ জঙ্গল। নদী আর সমুদ্রের মাঝামাঝি এই সবুজ প্রাচীর প্রকৃতিকে যেমন রক্ষা করে, তেমনই ভ্রমণকারীদের চোখ জুড়ায়। ম্যানগ্রোভের ফাঁকে ফাঁকে পাখির আনাগোনা, বাতাসে লবণাক্ত গন্ধ, আর পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো—সব মিলিয়ে জায়গাটির আবহ আলাদা।
ঝাউবনের মধ্য দিয়ে হাঁটলে মনে হয়, যেন শহরের কোলাহল বহু দূরে ফেলে রেখে একান্ত নিরিবিলি এক জগতে ঢুকে পড়েছেন। শীতের সকালে বা বিকেলের নরম আলোয় এই ঝাউবন হয়ে ওঠে ফটোগ্রাফারদের স্বর্গ।
সৈকত দেখা হলে অবশ্যই যেতে হবে হিজলি মসনদ-ই-আলা শরিফ। ঝাউবন পেরিয়ে পৌঁছনো যায় এই ঐতিহাসিক দরগায়। এটি কেবল একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জীবন্ত উদাহরণ।
সারা বছরই এখানে পুণ্যার্থীদের আনাগোনা লেগে থাকে। মুসলিম, হিন্দু—সব ধর্মের মানুষই মানত করতে আসেন। কারও বিশ্বাসে এখানে মনের ইচ্ছা পূরণ হয়, কারও কাছে এই স্থান শান্তির আশ্রয়।
ইতিহাস ও মাহাত্ম্য
লোকমুখে প্রচলিত, বহু বছর আগে এক সুফি সাধকের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এই মসনদ। ধীরে ধীরে তা পরিণত হয় এক আধ্যাত্মিক কেন্দ্রে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দরগার পরিসর বেড়েছে, তবে তার মূল আবহ আজও অটুট।
বিশেষ উৎসবের দিনে এখানে মেলা বসে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। তবে উৎসবের দিন ছাড়া সাধারণ সময়ে জায়গাটি অত্যন্ত শান্ত।
হিজলি ঘোরার আদর্শ সময় শীতকাল—নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি।
আবহাওয়া আরামদায়ক
সমুদ্র শান্ত থাকে
পাখির আনাগোনা বেশি
দিনের বেলায় হাঁটাহাঁটি বা সৈকতে সময় কাটানো সহজ
বর্ষায় এখানে প্রকৃতি অন্য রূপ নেয় ঠিকই, তবে নদীর জল বাড়লে কিছু এলাকায় যাতায়াত অসুবিধাজনক হতে পারে।
হিজলিতে বড় হোটেল নেই—এটাই তার সৌন্দর্য।
কাছাকাছি খেজুরি, কাঁথি বা দিঘায় থাকার ব্যবস্থা রয়েছে
চাইলে কাঁথি বা রসুলপুর এলাকায় সাধারণ লজ বা গেস্টহাউস পাওয়া যায়
দিনের ট্রিপ হিসেবেও হিজলি ঘুরে আসা যায়
যাঁরা একান্ত নির্জনতা চান, তাঁদের জন্য দিঘার ভিড় এড়িয়ে কাঁথি এলাকায় থাকা ভালো বিকল্প।
স্থানীয় খাবারই এখানে প্রধান আকর্ষণ।
তাজা মাছের ঝোল-ভাত
চিংড়ি, ভেটকি, পারশে
সৈকতের ধারে ভাজা মাছ, ঝালমুড়ি
চা—সমুদ্রের ধারে বসে এক কাপ চা যেন আলাদা স্বাদ দেয়
বাসে:
কলকাতা থেকে দীঘাগামী বাসে হেঁড়িয়ায় নামুন। সেখান থেকে শরিফ যাওয়ার লোকাল বাস পাওয়া যায়।
অথবা কলকাতা থেকে খেজুরির বাসে বোগা গিয়ে টোটোয় হিজলি।
ট্রেনে:
কাঁথি স্টেশনে নেমে রসুলপুর হয়ে হিজলি যাওয়া যায়।
গাড়িতে:
কলকাতা থেকে সরাসরি সড়কপথে কাঁথি–খেজুরি হয়ে হিজলি পৌঁছনো সম্ভব।
কারণ হিজলি আপনাকে দেয়—
ভিড়হীন সমুদ্র
প্রকৃতির অকৃত্রিম সৌন্দর্য
নদী-সমুদ্রের মিলনস্থলের বিরল দৃশ্য
আধ্যাত্মিক শান্তি
কম খরচে এক দিনের বা দু’দিনের ভ্রমণ
হিজলি কোনও বিলাসবহুল গন্তব্য নয়। এখানে নেই চকচকে পর্যটন অবকাঠামো। কিন্তু আছে এমন এক স্বাদ, যা আজকের ব্যস্ত জীবনে বিরল—নীরবতা, খোলা আকাশ, আর নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ।
শীতের ছুটিতে যদি চেনা পথে না হেঁটে একটু অন্যরকম ঠিকানা খুঁজে নিতে চান, তবে হিজলি শরিফ ও হিজলি সৈকত নিঃশব্দে আপনাকে ডাক দিচ্ছে।