ভারতের অর্থনীতি ২০২৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর অর্থাৎ দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে আবারও শক্তিশালী গতিতে ফিরে এসেছে। সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই সময় দেশের GDP বৃদ্ধি হয়েছে ৮২ শতাংশ যা গত ছটি ত্রৈমাসিকের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক চাপ, আমদানি-রপ্তানির চ্যালেঞ্জ এবং জ্বালানির দামের ওঠানামার মধ্যেও ভারতের এই পারফরম্যান্স বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
ভারতের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে যে পরিসংখ্যানটি—২০২৫ অর্থবর্ষের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে দেশের GDP অথবা মোট দেশজ উৎপাদন বেড়েছে ৮.২ শতাংশ। অর্থনীতির ভাষায় এটি শুধু এক সংখ্যার উন্নতি নয়, বরং এই বৃদ্ধি ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামোর শক্তি, বাজারের স্থিতি এবং জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার প্রত্যাবর্তনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। গত ছয় ত্রৈমাসিকের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ বৃদ্ধি, যা দেশকে আবারও উচ্চ গতির অর্থনীতির পথে ফিরিয়ে এনেছে।
গত কয়েক মাস ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্য সংকট, আমদানি-রপ্তানিতে চাপ, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি—এসবের পরও ভারতের এই পারফরম্যান্স অত্যন্ত ইতিবাচক। ভারতের শিল্প উৎপাদন, সেবা খাতের সম্প্রসারণ, সরকারি মূলধনী ব্যয় এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোক্তা চাহিদার পুনর্জাগরণ এই বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির পূর্বাভাসেও ভারতের এই বৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিল্প ক্ষেত্রে সর্বাধিক উন্নতি হয়েছে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে। গাড়ি, ইলেকট্রনিক্স, স্টিল, সিমেন্ট এবং ভোক্তাপণ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। সরকারের ‘Make in India’ ও ‘PLI Scheme’ শিল্পক্ষেত্রে নতুন উদ্যম এনে দিয়েছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বাজারে চীন নির্ভরতা কমানোর প্রবণতার ফলে অনেক বহুজাতিক সংস্থা ভারতমুখী হয়েছে। এ কারণে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে নতুন কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগ উভয়ই বেড়েছে।
সেবা খাত—যা ভারতের GDP-র সবচেয়ে বড় ভিত্তি—এই ত্রৈমাসিকেও শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। আইটি সেবা, ফিনটেক, ব্যাংকিং, পরিবহন, হোটেল, পর্যটন—সব খাতেই চাহিদা ও লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে দেশে অভ্যন্তরীণ পর্যটনের উল্লেখযোগ্য সক্রিয়তা সেবা খাতে শক্তিশালী গতি প্রদান করেছে। ডিজিটাল লেনদেন ও ই-কমার্সে নতুন গ্রাহক বৃদ্ধি ভোক্তা চাহিদাকে আরও উৎসাহিত করেছে।
এই বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সরকারের পরিকাঠামোগত বিনিয়োগ। সড়ক-নির্মাণ, রেল-উন্নয়ন, এয়ারপোর্ট ও পোর্ট আধুনিকীকরণ, মেট্রো-পরিকল্পনা—এসব প্রকল্পে উচ্চ পরিমাণ ক্যাপেক্স খরচ দেশের অর্থনীতিতে ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ তৈরি করেছে। এর ফলে নির্মাণ খাত, স্টিল-সিমেন্ট শিল্প এবং পরিবহন খাতও উন্নত হয়েছে।
কৃষি খাতের বৃদ্ধি তুলনামূলক কম হলেও খাদ্যশস্য উৎপাদন ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। বর্ষার অনিয়মিত বন্টন কৃষিকে কিছুটা প্রভাবিত করলেও সামগ্রিক উৎপাদন উদ্বেগজনক নয়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই ৮.২% GDP বৃদ্ধি ভারতের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা আরও বাড়াবে। বিদেশি বিনিয়োগ (FDI ও FPI) বৃদ্ধি পাবে, নতুন শিল্প স্থাপিত হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রবণতা আরও বাড়বে। তবে বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে ভবিষ্যতে রপ্তানি বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে—এ কথাও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে জানিয়েছেন।
তবুও এই ত্রৈমাসিকের ফলাফল স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ভারতের বাজার শক্তিশালী, দেশীয় চাহিদা স্থিতিশীল, এবং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো আগের তুলনায় আরও শক্তপোক্ত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) ও বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে যে আগামী বছরগুলোতেও ভারত বিশ্বের দ্রুততম বিকাশমান বড় অর্থনীতি হিসেবে অবস্থান করবে। তাই দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের এই ৮.২ শতাংশ বৃদ্ধিকে শুধু একটি সংখ্যা হিসেবে দেখা যাবে না; এটি দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যতের প্রতি আশা, আস্থা ও স্থিতিশীলতার প্রতীক।
অর্থনীতির প্রতিটি খাতের সক্রিয়তা মিলে একটি দেশের GDP নির্ধারিত হয়। সেই জায়গা থেকেই বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতের বিভিন্ন সেক্টর মিলেই এই অভাবনীয় ৮.২ শতাংশ বৃদ্ধির ভিত গড়ে দিয়েছে।
দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর এই বৃদ্ধির অন্যতম বড় চালিকা শক্তি। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে—
গাড়ি, ইলেকট্রনিক্স, ইস্পাত, সিমেন্ট, টেক্সটাইল, ভোক্তা সামগ্রী—সব ক্ষেত্রেই উৎপাদন বেড়েছে।
সরকারি প্রণোদনা যেমন ‘Make in India’, ‘PLI Scheme’, রপ্তানিমুখী নীতি, শিল্প বিনিয়োগে সুবিধা—এসবের ফলে দেশীয় উৎপাদন খাতে নতুন উদ্যম এসেছে।
অনেক আন্তর্জাতিক কোম্পানি ভারতের বাজারে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে আগ্রহ দেখাচ্ছে, কারণ চীন নির্ভরতা কমানোর আন্তর্জাতিক চাপের ফলে ভারত নতুন বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে।
শিল্প খাতের এই উন্নতি GDP-কে শক্তিশালী বুস্ট দিয়েছে।
ভারতের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সেবা খাত। IT-ITeS, ফিনটেক, ব্যাংকিং-ফিনান্স, হসপিটালিটি, পর্যটন, ই-কমার্স—সব মিলিয়ে সেবা খাত GDP-তে ব্যাপক অবদান রেখেছে।
আইটি ক্ষেত্রে নতুন প্রকল্প, ক্লাউড, AI-ভিত্তিক কাজ, গ্লোবাল আউটসোর্সিং বৃদ্ধি
ফিনটেক ও ডিজিটাল ট্রানজ্যাকশনের বিস্ময়কর প্রসার
পর্যটনে ‘ডোমেস্টিক ট্যুরিজম বুম’
সব মিলিয়ে সেবা খাত দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে শক্ত অবস্থানে থেকেছে।
ভারতের বাজার বিশাল। কোভিডের ধাক্কা কাটিয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ফের বেড়েছে।
গাড়ি বিক্রি
গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি
মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক্স
পোশাক, FMCG পণ্য
সব ক্ষেত্রেই চাহিদা ছিল বিশেষভাবে স্থিতিশীল।
অনেক অর্থনীতিবিদ বলছেন—ভারত এখন ‘Demand-Driven Economy’ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যা GDP বৃদ্ধিকে আরো টেকসই করে।
সরকার গত দুই বছরে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে পরিকাঠামো উন্নয়নে—
জাতীয় সড়ক নির্মাণ
সেতু
রেল উন্নয়ন
পোর্ট-এয়ারপোর্ট আপগ্রেডেশন
মেট্রো
এই ‘ক্যাপেক্স পুশ’ অর্থনীতিতে বহুগুণী প্রভাব (Multiplier Effect) তৈরি করেছে, অর্থাৎ সরকারের ১ টাকার বিনিয়োগ বাজারে ৪-৫ টাকার আর্থিক ক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
যদিও কৃষি খাতে বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম, তবে খাদ্য উৎপাদন, শস্য সংগ্রহ, কৃষিযন্ত্র ব্যবহার, এবং কৃষি-প্রযুক্তির প্রসারের কারণে কৃষি খাতও GDP-কে স্থিতিশীলতার ভিত্তি দিয়েছে।
বর্ষার অনিয়মিত বন্টন কৃষিক্ষেত্রে সামান্য প্রভাব ফেললেও সামগ্রিক উৎপাদনে তেমন নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি।
এনএসও-র তথ্য বলছে—দেশে ভোক্তা আস্থা আবার উন্নতি হচ্ছে। মানুষ টাকা খরচে আগ্রহী, বিনিয়োগ করতে আগ্রহী, EMI নিতে আগ্রহী, এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে ঝুঁকি নিতে তৈরি।
ব্যাংকে জমার পরিমাণ বেড়ে নতুন উচ্চতা ছুঁয়েছে।
ঋণ বিতরণে ব্যাংক ও NBFC গুলি অত্যন্ত দ্রুত।
স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে ফের বিনিয়োগ বাড়ছে।
এর ফলে পুরো বাজারে ‘Positive Sentiment’ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতি গত দুটি বছর ধরে অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে—
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি
ইউরোপে প্রবৃদ্ধির চাপ
চীনে রিয়েল এস্টেট সংকট
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ
পশ্চিম এশিয়ার সংঘর্ষ
তেলের দাম ওঠানামা
এসবের মধ্যে ভারত যে ৮.২ শতাংশ বৃদ্ধির জায়গায় পৌঁছাল, তা বিশ্বের কাছে অত্যন্ত শক্তিশালী বার্তা দেয়—
ভারত এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বৃদ্ধির ইঞ্জিন।
IMF, World Bank, ADB—সব আন্তর্জাতিক সংস্থাই বলেছে, আগামী দুই বছর ধরে ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতি হবে।
এটি বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
সড়ক, রেল, রিয়েল এস্টেট—সব ক্ষেত্রেই চাহিদা তুঙ্গে।
দেশিয় পর্যটন ২০২৫ সালে রেকর্ড স্পর্শ করেছে।
ডিজিটাল পেমেন্টের সম্ভাবনা GDP-তে বড় অবদান।
দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হলে বিদেশি বিনিয়োগকারী (FDI, FPI) বেশি আগ্রহী হয়।
ভারত এখন বিশ্বে টেক ও ম্যানুফ্যাকচারিং-এর অন্যতম হাব হতে পারে।
ম্যানুফ্যাকচারিং, কনস্ট্রাকশন, ট্যুরিজম—সব খাতেই নতুন চাকরি তৈরি হবে।
বৈশ্বিক বাজারে ভারতের প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে।
অর্থনীতির বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধি, আয় বৃদ্ধি ও ব্যয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা।
এখনও গ্রামীণ বাজার শহরের মতো শক্তিশালী নয়।
বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকায় চাহিদা কম।
যদিও উন্নতি হচ্ছে, তবে বড় সংখ্যায় চাকরি সৃষ্টি জরুরি।
অর্থনীতিবিদদের মতে—
ভারত আগামী ৫ বছরে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি
আগামী ১০ বছরে বিশ্বের তৃতীয় অর্থনীতি
শিল্প, সেবা, ডিজিটাল, পরিকাঠামো—এই চার স্তম্ভ ভারতের ভবিষ্যৎ
ভারতের জনসংখ্যাগত সুবিধা (Demographic Dividend), প্রযুক্তিখাতের অগ্রগতি, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম, এবং সরকারের নীতি—এসব মিলে দীর্ঘমেয়াদে ভারতের GDP-কে উচ্চ গতিতে রাখবে।
২০২৫ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের এই ঐতিহাসিক ৮.২ শতাংশ GDP বৃদ্ধি শুধু সরকারের সাফল্য বা শিল্পক্ষেত্রের উত্থান নয়—এটি পুরো ভারতের সম্ভাবনার প্রতীক।
এটি দেখায়—
ভারতীয় বাজার শক্তিশালী,
ভোক্তা আস্থা ফিরে এসেছে,
শিল্প পুনর্জাগরণ হয়েছে,
দেশের অর্থনৈতিক ভিত আগের চেয়ে আরও সুসংহত হয়েছে।
বিশ্ব যখন ধীরগতির অর্থনীতিতে ভুগছে, তখন ভারত তার উন্নয়নের চাকা ধরে রেখেছে আগের মতোই, বরং আরও দ্রুত।
এই বৃদ্ধিই আগামী দিনের ভারতের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে।