Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

বারাণসী হলো ভারতের প্রথম তারবিহীন বিদ্যুৎ শহর এবার আকাশ হবে তারমুক্ত এবং গঙ্গার ঘাট পাবে এক নতুন রূপ

ভারতের আধ্যাত্মিক রাজধানী বারাণসী বা কাশী আজ এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করল। বিশ্বের প্রথম হেরিটেজ সিটি হিসেবে বারাণসী সম্পূর্ণ তারবিহীন বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বা ওয়ারলেস ইলেকট্রিসিটি প্রযুক্তিতে উন্নীত হলো। আইআইটি বিএইচইউ এবং কেন্দ্রীয় শক্তি মন্ত্রকের যৌথ উদ্যোগে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এবার আর গঙ্গার ঘাটে বা অলিতে গলিতে ঝুলন্ত তারের জঞ্জাল দেখা যাবে না। নিকোলা টেসলার স্বপ্ন আজ ভারতের মাটিতে সত্যি হলো।

ভারতের প্রাচীনতম শহর বারাণসী বা কাশী যা হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের বিশ্বাস আর ভক্তির কেন্দ্র আজ সেই শহর প্রযুক্তির এক নতুন শিখরে পৌঁছাল। এতদিন আমরা জানতাম বিদ্যুৎ মানেই তার বা কেবিলের মাধ্যমে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া। কিন্তু আজ সেই ধারণা ভেঙে গেল। বারাণসীর আকাশে আজ আর কোনো কালো তারের জঞ্জাল নেই। শহরের প্রতিটি ল্যাম্পপোস্ট প্রতিটি বাড়ি এবং প্রতিটি মন্দির আজ জ্বলছে এক অদৃশ্য শক্তির দ্বারা। ভারতের প্রথম তারবিহীন বিদ্যুৎ শহর বা ওয়ারলেস ইলেকট্রিসিটি সিটি হিসেবে আজ বারাণসীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা হলো।

আজ সকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বারাণসীর বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি বা বিএইচইউ এর মাঠে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় রিমোটের বোতাম টিপে এই ঐতিহাসিক প্রকল্পের সূচনা করেন। মুহূর্তের মধ্যে পুরো শহরের আলো জ্বলে ওঠে কিন্তু কোথাও কোনো তারের সংযোগ ছিল না। এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত জনতা এবং দেশবিদেশের পর্যটকরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। প্রধানমন্ত্রী বলেন আজ কাশী বিশ্বনাথের কৃপায় এবং আমাদের বিজ্ঞানীদের মেধার জোরে ভারত বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছে। আমরা প্রমাণ করলাম যে ঐতিহ্য এবং প্রযুক্তি একসাথে চলতে পারে।

প্রযুক্তির নাম রেজোন্যান্ট ইনডাকটিভ কাপলিং

এই অসাধ্য সাধন করা হয়েছে আইআইটি বিএইচইউ এবং ভারতের বিদ্যুৎ গবেষণা কেন্দ্র বা সিপিআরআই এর বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে। তারা যে প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন তার নাম রেজোন্যান্ট ইনডাকটিভ কাপলিং। এটি অনেকটা আমাদের মোবাইল ফোন বা স্মার্ট ওয়াচ ওয়্যারলেস চার্জ করার মতো প্রযুক্তি কিন্তু অনেক বড় স্কেলে।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন শহরের চারটি প্রান্তে চারটি বিশাল ম্যাগনেটিক ট্রান্সমিটার টাওয়ার বসানো হয়েছে। এই টাওয়ারগুলো একটি বিশেষ কম্পাঙ্কে বা ফ্রিকোয়েন্সিতে চৌম্বকীয় তরঙ্গ বা ম্যাগনেটিক ওয়েভ তৈরি করে। শহরের প্রতিটি বাড়িতে এবং ল্যাম্পপোস্টে একটি করে ছোট রিসিভার বা গ্রাহক যন্ত্র বসানো হয়েছে। এই রিসিভারগুলো বাতাসের মধ্য দিয়ে আসা সেই চৌম্বকীয় তরঙ্গকে গ্রহণ করে এবং তাকে আবার বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে। এর ফলে তারের কোনো প্রয়োজন হয় না। এই বিদ্যুৎ সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং মানুষের শরীরের ওপর এর কোনো ক্ষতিকারক প্রভাব নেই বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন।

গঙ্গার ঘাটের নতুন রূপ

বারাণসীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো গঙ্গার ঘাট। কিন্তু এতদিন ঘাটের সৌন্দর্য নষ্ট করত হাজার হাজার ঝুলন্ত বিদ্যুতের তার এবং খুঁটি। আজ থেকে সেই দৃশ্য অতীত। দশাশ্বমেধ ঘাট থেকে শুরু করে অসি ঘাট পর্যন্ত পুরো এলাকা এখন তারমুক্ত। সন্ধ্যায় গঙ্গা আরতির সময় যখন হাজার হাজার প্রদীপ জ্বলে তখন তার সাথে বৈদ্যুতিক আলোগুলোও জ্বলবে কিন্তু কোনো তার দেখা যাবে না। পর্যটকরা বলছেন এখন ঘাটের ছবি তুললে মনে হচ্ছে যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য। আকাশ পরিষ্কার এবং খোলামেলা। বিদেশি পর্যটকরাও এই পরিবর্তন দেখে মুগ্ধ। তারা বলছেন ভেনিস বা প্যারিসেও এমন প্রযুক্তি নেই যা আজ ভারতে আছে।

নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ মোকাবিলা

বারাণসীর মতো ঘিঞ্জি শহরে অগ্নিকাণ্ড বা শর্ট সার্কিট একটি বড় সমস্যা ছিল। সরু গলির মধ্যে ঝুলে থাকা তারগুলো প্রায়ই বিপদের কারণ হতো। বিশেষ করে বর্ষাকালে বা ঝড়ের সময় তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটত। ওয়্যারলেস ইলেকট্রিসিটি চালু হওয়ার ফলে সেই ভয় আর থাকল না। তার নেই মানে শর্ট সার্কিটের কোনো সম্ভাবনা নেই। বন্যায় জল জমলেও বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে জলে পড়ার ভয় নেই। এটি শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এক বিশাল উন্নতি।

বিদ্যুৎ চুরি রোধ এবং সাশ্রয়

ভারতে বিদ্যুৎ চুরি বা হুকিং একটি বড় সমস্যা। তার কেটে বা হুক লাগিয়ে অনেকেই বিদ্যুৎ চুরি করেন। কিন্তু এই নতুন ব্যবস্থায় চুরি করা অসম্ভব। কারণ রিসিভার ছাড়া বাতাস থেকে বিদ্যুৎ ধরা যায় না। প্রতিটি রিসিভারের একটি নির্দিষ্ট ডিজিটাল কোড আছে যা বিদ্যুৎ দপ্তরের সার্ভারের সাথে যুক্ত। কেউ যদি অবৈধ রিসিভার ব্যবহার করার চেষ্টা করে তবে সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে যাবে। এর ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় হবে এবং লোডশেডিং এর সমস্যা কমবে।

খরচ এবং সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া

এই প্রযুক্তির জন্য গ্রাহকদের কেবল একটি ওয়ান টাইম বা এককালীন খরচ করতে হয়েছে রিসিভার কেনার জন্য। সরকার অবশ্য গরিব এবং বিপিএল পরিবারের জন্য বিনামূল্যে রিসিভার দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। মাসিক বিদ্যুতের বিল আগের মতোই আসবে বা কিছুটা কমও হতে পারে কারণ তার রক্ষণাবেক্ষণের খরচ আর নেই। স্থানীয় এক দোকানদার বলেন আগে ঝড়ে তার ছিঁড়ে গেলে তিন দিন কারেন্ট থাকত না। এখন আর সেই চিন্তা নেই। ঝড় জল যাই হোক আলো জ্বলবে। এটি আমাদের ব্যবসার জন্যও খুব ভালো।

news image
আরও খবর

পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ

তামার তার বা অ্যালুমিনিয়াম তার তৈরি করতে প্রচুর খনিজ সম্পদ এবং প্লাস্টিক লাগে। এই তারবিহীন প্রযুক্তি চালু হওয়ার ফলে সেই সম্পদের সাশ্রয় হবে। পুরনো তারগুলো গলিয়ে অন্য কাজে লাগানো যাবে। এছাড়াও তারের জঞ্জাল না থাকায় পাখিরাও নিরাপদে উড়তে পারবে। অনেক সময় তারে আটকে বা শক লেগে পাখির মৃত্যু হয় যা এখন আর হবে না। এটি বারাণসীর পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য এক বড় পাওনা।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং স্মার্ট সিটি

বারাণসী হলো পাইলট প্রজেক্ট বা পরীক্ষামূলক প্রকল্প। সরকার জানিয়েছে আগামী ৫ বছরের মধ্যে ভারতের আরও ১০টি হেরিটেজ সিটি বা ঐতিহ্যবাহী শহরে এই প্রযুক্তি চালু করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে জয়পুর আগ্রা মাদুরাই এবং পুরী। অযোধ্যার রাম মন্দির চত্বরেও এই প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ভারত সরকার চাইছে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের প্রধান শহরগুলোকে তারমুক্ত করা।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

এই প্রকল্পের সাফল্য আন্তর্জাতিক মহলেও সাড়া ফেলেছে। টেসলা কোম্পানি এবং জাপানের একাধিক প্রযুক্তি সংস্থা ভারতের এই মডেলটি অধ্যয়ন করার আগ্রহ দেখিয়েছে। আজ বিশ্বজুড়ে খবরের শিরোনামে বারাণসী। টাইম ম্যাগাজিন বারাণসীকে ফিউচার সিটি বা ভবিষ্যৎ নগরী বলে অভিহিত করেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকেও এই টেকসই উন্নয়ন বা সাস্টেনেবল ডেভেলপমেন্টের প্রশংসা করা হয়েছে।

চ্যালেঞ্জ এবং সমাধান

অবশ্যই এত বড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল বিকিরণ বা রেডিয়েশন সংক্রান্ত ভয় দূর করা। অনেকেই ভেবেছিলেন এতে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে। কিন্তু আইআইটি এবং এইমস এর যৌথ গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে এই চৌম্বকীয় তরঙ্গ মোবাইল টাওয়ারের তরঙ্গের চেয়ে অনেক কম শক্তিশালী এবং সম্পূর্ণ নিরাপদ। সরকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার চালিয়ে এবং ডেমো দেখিয়ে মানুষের ভয় দূর করেছে। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ ছিল পুরনো ইনফ্রাসট্রাকচার বা পরিকাঠামো বদলানো। বারাণসীর মতো পুরনো শহরে খোঁড়াখুঁড়ি করা খুব কঠিন ছিল। কিন্তু তারবিহীন প্রযুক্তিতে খোঁড়াখুঁড়ির প্রয়োজনই হয়নি। কেবল টাওয়ার বসানো এবং রিসিভার লাগানোতেই কাজ শেষ হয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রভাব

এই প্রযুক্তির ফলে পর্যটন শিল্পে জোয়ার আসবে। তারমুক্ত বারাণসী দেখতে সারা বিশ্ব থেকে মানুষ আসবে। এর ফলে হোটেল রেস্তোরাঁ এবং হস্তশিল্পের ব্যবসা বাড়বে। স্থানীয় তাঁত শিল্পীরাও লাভবান হবেন কারণ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ তাদের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করবে। বারাণসীর শাড়ি বা বেনারসি শাড়ির কারিগররা এবার লোডশেডিং এর চিন্তা ছাড়াই কাজ করতে পারবেন।

উপসংহার

২০২৬ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি দিনটি প্রমাণ করল যে ভারত কেবল অতীতের গৌরব নিয়ে বেঁচে থাকে না ভারত ভবিষ্যৎ তৈরি করতেও জানে। বারাণসীর ঘাটে বসে আজ যখন আমরা গঙ্গার দিকে তাকাই তখন আর তারের জঞ্জাল আমাদের দৃষ্টি আটকাতে পারে না। এক অখণ্ড আকাশ এবং এক অনন্ত প্রবাহ আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বিজ্ঞান আজ ভক্তিকে এক নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করল। তারবিহীন বিদ্যুৎ কেবল আলো জ্বালায়নি তা জ্বালিয়েছে কোটি কোটি ভারতবাসীর মনে আশার প্রদীপ। আমরা গর্ব করে বলতে পারি যে বিশ্ব যা কাল ভাববে ভারত তা আজ করে দেখিয়েছে। হর হর মহাদেব এবং জয় বিজ্ঞান ধ্বনিতে আজ মুখরিত কাশী। এই আলো যেন আমাদের দেশকে অন্ধকার থেকে আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যায়।

Preview image