Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ফকিরের গানেই সঙ্গীতজীবনের শুরু কেন নিজেকে পাপী ভাবতেন মহম্মদ রফি

সঙ্গীতের প্রথাগত প্রশিক্ষণের আগেই গ্রামে গ্রামে ফকিরদের গান মহম্মদ রফিকে মুগ্ধ করত। রক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে ওঠা রফির বাবা সঙ্গীতকে জীবিকা হিসেবে নেওয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন তবু সেই বাধা পেরিয়েই শুরু হয় তাঁর সঙ্গীতযাত্রা।

এক ফকিরের কণ্ঠে ভেসে আসা সুরই বদলে দিয়েছিল ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস। অমৃতসরের এক সাধারণ গ্রাম থেকে যে সঙ্গীতসফরের শুরু, তা শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল মুম্বই নগরীর চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতজগতের শিখরে। সেই মানুষটি মহম্মদ রফি—যাঁর কণ্ঠ আজও সমানভাবে জীবন্ত, আবেগময় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের প্রেম, বেদনা ও বিশ্বাসের সঙ্গী। ২৪ ডিসেম্বর তাঁর ১০১তম জন্মবার্ষিকীতে ফিরে দেখা যাক সেই অসামান্য জীবনের দীর্ঘ পথচলা, যেখানে ছিল অনুপ্রেরণা, সংগ্রাম, আত্মসংঘাত এবং অশেষ সৃষ্টির গল্প।

ফকিরের গানেই প্রথম মুগ্ধতা

মহম্মদ রফির সঙ্গীতজীবনের শুরু কোনও প্রথাগত গুরুগৃহে নয়। ছোটবেলায় গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানো ফকিরদের গানই প্রথম তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। সেই গান ছিল সহজ, কিন্তু গভীর আবেগে ভরা। ছিল ভক্তি, ছিল জীবনবোধ, ছিল এক অদ্ভুত টান—যা শিশুমন রফিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। ফকিরদের হাতে থাকা একটি বিশেষ বাদ্যযন্ত্র তাঁর কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দেয়। সুর আর শব্দের এই মিলন তাঁকে এমনভাবে আকর্ষণ করেছিল যে মাত্র আট-নয় বছর বয়স থেকেই তিনি নিজে নিজে গান গাওয়া শুরু করেন।

ফকিরদের গান শুনতে শুনতে তাঁদের নীরবে অনুসরণ করতেন রফি। কখনও সামনে গিয়ে কথা বলার সাহস হয়নি। কিন্তু একদিন এক ফকির লক্ষ্য করেন, এই কিশোরটি নীরবে তাঁদের পিছনে পিছনে আসছে। প্রশ্ন করেন কেন। লাজুক রফি তখন বলেন, তিনি ফকিরের কণ্ঠের প্রেমে পড়ে গিয়েছেন এবং যে গানটি তিনি গাইছিলেন, সেটিও মুখস্থ করে ফেলেছেন। ফকির তাঁকে গাইতে বলেন। শিশুকণ্ঠে রফির গান শুনে সেই ফকিরও বিস্মিত হন, আশীর্বাদ করেন দু’হাত ভরে। সেই আশীর্বাদ যেন ভবিষ্যতের ইঙ্গিতই ছিল।

রক্ষণশীল পরিবার ও অন্তর্দ্বন্দ্ব

রফির বেড়ে ওঠা ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে। পরিবারে সঙ্গীতকে পেশা হিসেবে নেওয়ার কথা কেউই ভাবতে চাইত না। বিশেষ করে তাঁর বাবা ছিলেন ঘোর বিরোধী। তাঁর চোখে গান ছিল জীবিকা নয়, বরং এক ধরনের নিষিদ্ধ পথ। এই পরিবেশেই রফির মনে তৈরি হয় এক গভীর দ্বন্দ্ব। একদিকে সুরের প্রতি অদম্য টান, অন্যদিকে পারিবারিক মূল্যবোধ ও ভয়।

এই দ্বন্দ্ব রফিকে আজীবন তাড়া করে বেড়িয়েছে। এমনকি সঙ্গীতজগতে খ্যাতি অর্জনের পরেও তিনি ভেবেছেন—তিনি কি সত্যিই কোনও ‘পাপ’ করেছেন? গান গেয়ে কি তিনি ধর্মীয় বা পারিবারিক দৃষ্টিতে ভুল পথে হাঁটছেন? এই আত্মসংঘাত এতটাই গভীর ছিল যে তিনি চাননি, তাঁর সন্তানরা তাঁর পথ অনুসরণ করুক। তাই পড়াশোনার জন্য সন্তানদের লন্ডনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন, তাঁরা যেন বিনোদনজগত থেকে দূরে থাকেন।

মায়ের সমর্থন, বাবার বিরোধিতা

যেখানে বাবা ছিলেন কঠোর, সেখানে মা ছিলেন নীরব আশ্রয়। রফির গান গাওয়ার ইচ্ছার বিরোধিতা যখন চরমে, তখন মা-ই পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি ছেলেকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, “চিন্তা করিস না, আমি সবটা সামলে নেব।” এই একটি বাক্যই রফির জীবনে সাহসের জোগান দিয়েছিল। মায়ের সেই বিশ্বাসই হয়তো তাঁকে সমস্ত বাধা পেরোনোর শক্তি দিয়েছিল।

অমৃতসর থেকে লাহৌর

রফি ছোট থাকতেই পরিবার অমৃতসর ছেড়ে লাহৌরে চলে আসে। লাহৌর তখন সাংস্কৃতিক দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ শহর। এখানেই রফির সঙ্গীতচর্চা আরও গভীর হয়। তিনি বিভিন্ন জায়গায় গান গাইতে শুরু করেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বন্ধুর বাড়িতে গান গাইতে যেতেন তিনি। সেই সময়েই ভাগ্য বদলের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে।

একদিন প্রযোজক ও অভিনেতা নাসির খান তাঁর গান শোনেন। রফির কণ্ঠে এমন কিছু ছিল, যা আলাদা করে নজর কেড়েছিল। নাসির খান তাঁকে মুম্বই নিয়ে গিয়ে গান গাওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু এখানেও বাধা—বাবার অনুমতি নেই। শেষ পর্যন্ত রফির ভাই বাবাকে রাজি করান। সেই অনুমতির সঙ্গেই শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।

প্রথাগত প্রশিক্ষণ ও মুম্বই যাত্রা

মুম্বইয়ে এসে রফি উস্তাদ আবদুল ওয়াহিদ খানের কাছে প্রথাগত সঙ্গীতের প্রশিক্ষণ নেন। এখানেই তাঁর কণ্ঠ আরও শাণিত হয়। শাস্ত্রীয় ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই তিনি পরে গড়ে তুলেছিলেন সেই বহুমুখী গায়কী, যা তাঁকে অতুলনীয় করে তুলেছে।

মুম্বইয়ের সঙ্গীতদুনিয়া তখন প্রতিযোগিতায় ভরা। কিন্তু রফির কণ্ঠের বিশুদ্ধতা, আবেগ এবং নমনীয়তা খুব দ্রুতই তাঁকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান কণ্ঠ।

সুরের বৈচিত্র্য ও অনন্যতা

মহম্মদ রফির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর কণ্ঠের বৈচিত্র্য। ভক্তিগীতি থেকে প্রেমের গান, করুণ বিরহ থেকে উদ্দাম উৎসব—সব রকম আবেগেই তিনি সমান দক্ষ ছিলেন। কখনও তিনি ভক্তের কণ্ঠ, কখনও প্রেমিকের, কখনও আবার বিদ্রোহীর। তাঁর গলায় কোনও ছাঁচ ছিল না। সেই কারণেই তিনি এত বছর পরেও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

news image
আরও খবর

আজও প্রেয়সীকে প্রেম নিবেদন করতে বহু মানুষ রফির গান বেছে নেন। তাঁর কণ্ঠে প্রেম ছিল পবিত্র, গভীর এবং চিরন্তন। আবার তাঁর ভক্তিগীতিতে ছিল আত্মসমর্পণ ও বিশ্বাসের এক অনন্য মেলবন্ধন।

আত্মসংযমী জীবন ও বিনয়

অসীম জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও রফি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও সংযমী মানুষ। খ্যাতি তাঁকে কখনও অহংকারী করে তোলেনি। বরং তিনি নিজেকে সব সময় একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই দেখতেন। তাঁর জীবনে ধর্মীয় অনুশাসন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই গান গাওয়াকে ঘিরে তাঁর মনে বারবার অপরাধবোধ ফিরে আসত।

এই আত্মসংযমই হয়তো তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল। তিনি জানতেন, সুর ঈশ্বরের দান। সেই দানকে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে বহন করেছেন।

শেষ অধ্যায়

১৯৮০ সালের ৩১ জুলাই মহম্মদ রফি প্রয়াত হন। কিন্তু তাঁর প্রস্থান মানে সুরের প্রস্থান নয়। আজও রেডিও, মঞ্চ, সিনেমা, ইউটিউব—সব জায়গায় তাঁর গান সমানভাবে বেঁচে আছে। নতুন প্রজন্মও তাঁর কণ্ঠে খুঁজে পায় আবেগের ভাষা।

রফির প্রয়াণের পরেও তাঁর উপস্থিতি কখনও ফুরোয়নি। বরং সময় যত এগিয়েছে, ততই আরও গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে তাঁর কণ্ঠ। সত্তর কিংবা আশির দশকের শ্রোতাদের মধ্যেই তিনি সীমাবদ্ধ নন—আজকের তরুণ প্রজন্মও তাঁর গান নতুন করে আবিষ্কার করছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রফির গান কোটি কোটি বার শোনা হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা তাঁর গান গেয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন, আবার অনেকেই তাঁর গানের মাধ্যমে শিখছেন আবেগের সূক্ষ্ম প্রকাশ।

মহম্মদ রফির গান আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ তাঁর কণ্ঠে কোনও নির্দিষ্ট সময়ের ছাপ নেই। প্রেমের গান হোক বা ভক্তিগীতি, দেশাত্মবোধক সুর কিংবা বেদনাবিধুর বিরহ—প্রতিটি গানে তিনি মানবমনের চিরন্তন অনুভূতিগুলিকেই স্পর্শ করেছেন। তাই প্রজন্ম বদলালেও আবেগ বদলায় না, আর সেই আবেগের ভাষা হয়ে ওঠে রফির গান।

তাঁর কণ্ঠ শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, ছিল আশ্রয়ও। জীবনের কঠিন সময়ে বহু মানুষ তাঁর গানে খুঁজে পেয়েছেন সান্ত্বনা, আবার আনন্দের মুহূর্তে তাঁর সুরই হয়ে উঠেছে অনুভূতির সঙ্গী। এই কারণেই রফি আজও প্রাসঙ্গিক, আজও অমলিন।

রফির উত্তরাধিকার শুধু অসংখ্য কালজয়ী গানে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর জীবনদর্শন, বিনয় এবং আত্মসংযমও শিল্পীদের কাছে এক আদর্শ। খ্যাতির শিখরে পৌঁছেও তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষ হিসেবেই দেখেছেন, কখনও অহংকারকে জায়গা দেননি। এই মানবিক গুণই তাঁকে আরও মহৎ করে তুলেছে।

তাই বলা যায়, মহম্মদ রফি কোনও নির্দিষ্ট সময়ের শিল্পী নন—তিনি এক চিরন্তন অনুভূতি। যতদিন মানুষের মনে প্রেম, বিশ্বাস আর আবেগ থাকবে, ততদিন রফির কণ্ঠও বেঁচে থাকবে, সুর হয়ে, স্মৃতি হয়ে, আর ভালোবাসার অনন্ত ভাষা হয়ে।

উত্তরাধিকার

১০১তম জন্মবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, মহম্মদ রফি শুধু একজন গায়ক নন, তিনি এক অনুভূতির নাম। এক ফকিরের কণ্ঠে শুরু হওয়া যে যাত্রা, তা আজও শেষ হয়নি। তাঁর গান আজও প্রেম শেখায়, বিশ্বাস জাগায়, বেদনায় সান্ত্বনা দেয়।

রফির জীবনের গল্প আমাদের শেখায়—প্রতিভা পথ খুঁজে নেয়, যত বাধাই থাকুক না কেন। আর সুর, যদি সত্যিই হৃদয় থেকে আসে, তবে তা কখনও থামে না। 

Preview image