বন্ধুদের সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য 'রিল ভিডিও' (Reel) বানানোর সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর মাকে নিয়ে কু-রুচিকর মন্তব্য করার অভিযোগে একাদশ শ্রেণীর এক ছাত্রকে আটক করেছে পুলিশ। শিলিগুড়ি পুরনিগমের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সূর্য সেন কলোনি এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটেছে
বন্ধুদের সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য রিল ভিডিও বানাতে গিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর মাকে নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্য করার অভিযোগে শিলিগুড়িতে একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রকে আটক করল পুলিশ। ঘটনাটি ঘটেছে শিলিগুড়ি পুরনিগমের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সূর্য সেন কলোনি এলাকায়। অভিযোগ, বন্ধুদের সঙ্গে মজার ছলে একটি রিল ভিডিও তৈরি করার সময় ওই ছাত্র অশালীন ও আপত্তিকর মন্তব্য করে। পরে সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়। বিষয়টি নজরে আসার পর পুলিশ আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত ছাত্রটি একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। নাবালক হওয়ায় তার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। এরপর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ওই ছাত্রকে আটক করে এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ শুরু করে। যেহেতু অভিযুক্ত নাবালক, তাই সম্পূর্ণ বিষয়টি শিশু আইন ও জুভেনাইল জাস্টিস সংক্রান্ত নিয়ম মেনে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘মজা’ করার সীমা কোথায়? রিল, শর্ট ভিডিও, মিম বা ভাইরাল কনটেন্ট তৈরির সময় তরুণ প্রজন্মের অনেকেই বুঝতে পারে না, কোন মন্তব্য আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষত কোনও সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তি, তাঁর পরিবার, কোনও সম্প্রদায় বা কোনও ব্যক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে এমন মন্তব্য করলে তা শুধুমাত্র সামাজিক নিন্দার বিষয় থাকে না; অনেক সময় তা আইনগত পদক্ষেপের কারণও হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া তরুণ প্রজন্মের জীবনের একটি বড় অংশ। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব শর্টস বা অন্য প্ল্যাটফর্মে কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু সেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুবিধাই অনেক সময় বিপদের কারণ হয়। যে কথা বন্ধুমহলে বলা হয়েছে বলে কেউ ভাবতে পারে, সেটি যদি ক্যামেরায় রেকর্ড হয়ে প্রকাশ্যে চলে আসে, তাহলে তার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত গড়াতে পারে। শিলিগুড়ির এই ঘটনাও সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, রিল তৈরির সময় ওই ছাত্র রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর মাকে উদ্দেশ্য করে কুরুচিকর মন্তব্য করে। এই ধরনের মন্তব্য সামাজিক সৌজন্য, রাজনৈতিক শালীনতা এবং আইনি সীমারেখা—তিন দিক থেকেই গুরুতর হিসেবে দেখা হয়। রাজনীতিতে মতভেদ থাকতে পারে, সমালোচনা করার অধিকারও গণতন্ত্রে স্বীকৃত। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ, পরিবারের সদস্যকে টেনে কুরুচিকর ভাষা ব্যবহার বা অশালীন মন্তব্য কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনওই অন্যের সম্মানহানি বা অশালীন অপমানের স্বাধীনতা নয়।
ঘটনার পর স্থানীয় এলাকাতেও আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, স্কুলপড়ুয়া ছাত্রদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার নিয়ে সচেতনতা কতটা আছে। অভিভাবক, শিক্ষক এবং সমাজের দায়িত্ব নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, আজকের দিনে একটি মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং একটি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থাকলেই যে কেউ কনটেন্ট তৈরি করতে পারে। কিন্তু কনটেন্ট তৈরির সঙ্গে যে দায়িত্ববোধও জড়িত, তা অনেক সময় কিশোর-কিশোরীরা বুঝতে পারে না।
এই ঘটনা শুধু একটি পুলিশি পদক্ষেপের খবর নয়, বরং একটি সামাজিক সতর্কবার্তাও। স্কুলপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের বোঝানো দরকার, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা কোনও বিষয় ‘প্রাইভেট’ থাকে না। ভিডিও একবার আপলোড হলে তা ডাউনলোড, শেয়ার, স্ক্রিন রেকর্ড বা ফরোয়ার্ড হয়ে বহু মানুষের হাতে পৌঁছে যেতে পারে। পরে পোস্ট মুছে ফেললেও তার ডিজিটাল ছাপ থেকে যায়। সেই কারণেই কোনও ভিডিও, মন্তব্য বা পোস্ট প্রকাশ করার আগে ভাবা জরুরি—এতে কারও সম্মানহানি হচ্ছে কি না, কোনও আইন ভাঙা হচ্ছে কি না, বা ভবিষ্যতে নিজের জীবনে সমস্যা তৈরি হতে পারে কি না।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নাবালক হলেও কেউ যদি আপত্তিকর বা মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে নাবালকের ক্ষেত্রে বিষয়টি সংশোধন, কাউন্সেলিং এবং আইন অনুযায়ী পুনর্বাসনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হয়। তাই এই ধরনের ঘটনায় শুধু শাস্তির কথা ভাবলেই হবে না, পাশাপাশি কেন একজন কিশোর এমন কনটেন্ট তৈরি করল, তার পেছনে সামাজিক প্রভাব, বন্ধুদের চাপ, ভাইরাল হওয়ার ইচ্ছা বা অনলাইন সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব আছে কি না, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষকদের একাংশের মতে, স্কুলস্তর থেকেই ডিজিটাল নাগরিকত্ব বা ‘ডিজিটাল সিটিজেনশিপ’ শেখানো প্রয়োজন। ছাত্রছাত্রীদের বোঝাতে হবে, সোশ্যাল মিডিয়া শুধুমাত্র বিনোদনের জায়গা নয়, এটি একটি প্রকাশ্য মঞ্চ। সেখানে বলা প্রতিটি কথা, লেখা প্রতিটি মন্তব্য এবং আপলোড করা প্রতিটি ভিডিওর জন্য ব্যবহারকারীকে দায়িত্ব নিতে হয়। যেমন বাস্তব জীবনে কাউকে অপমান করলে সমস্যা হতে পারে, তেমনই অনলাইনেও কুরুচিকর মন্তব্য বা মানহানিকর কনটেন্টের জন্য আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অভিভাবকদের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় বাবা-মা সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেন, কিন্তু তারা অনলাইনে কী দেখছে, কী পোস্ট করছে বা কার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে—সেদিকে নজর থাকে না। কিশোর বয়সে জনপ্রিয়তা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রবল থাকে। লাইক, শেয়ার, কমেন্ট বা ফলোয়ার বাড়ানোর জন্য অনেকেই সীমা লঙ্ঘন করে ফেলে। তাই সন্তানকে শুধু নিষেধ করলেই হবে না, কেন কোনও ভাষা বা আচরণ ভুল, তার ব্যাখ্যাও দিতে হবে।
এই ঘটনার রাজনৈতিক দিকও রয়েছে। কারণ অভিযোগটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর মাকে নিয়ে মন্তব্য ঘিরে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে সমালোচনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক সমালোচনা এবং ব্যক্তিগত কুরুচিকর আক্রমণের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। সরকার, প্রশাসন, নীতি বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা যায়। কিন্তু কারও পরিবারকে লক্ষ্য করে অশালীন মন্তব্য করা রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও অবনতি ঘটায়। সমাজে রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও ভাষার শালীনতা বজায় রাখা জরুরি।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল কনটেন্টের সংস্কৃতি অনেক সময় তরুণদের ভুল পথে ঠেলে দেয়। কিছু মানুষ মনে করে, বিতর্কিত কথা বললেই বেশি ভিউ পাওয়া যায়। কিন্তু এই ভিউ বা ভাইরাল হওয়ার নেশা কখনও কখনও আইনি বিপদ ডেকে আনতে পারে। কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও একজন ছাত্রের শিক্ষাজীবন, পরিবার এবং ভবিষ্যৎকে জটিল পরিস্থিতির মুখে ফেলতে পারে। তাই রিল বানানোর আগে শুধু ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল বা ডায়লগ নয়, কনটেন্টের প্রভাব নিয়েও ভাবা উচিত।
শিলিগুড়ির সূর্য সেন কলোনির এই ঘটনায় পুলিশ আইনানুগ পদক্ষেপ করেছে। তবে সমাজের বড় দায়িত্ব হল, এমন ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া। শুধু একজন ছাত্রকে আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সচেতনতা, পারিবারিক নজরদারি, স্কুলে সঠিক শিক্ষা এবং সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা। কারণ আগামী দিনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার আরও বাড়বে। তাই আজ থেকেই তরুণ প্রজন্মকে দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণ শেখানো জরুরি।
এই ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, অল্প বয়সে ছেলেমেয়েরা অনেক সময় না বুঝেই এমন মন্তব্য করে বসে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে সেটি ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি বড় আকার নেয়। তাই আইন যেমন নিজের পথে চলবে, তেমনই পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও দায়িত্ব নিতে হবে। বিশেষ করে স্কুলে মোবাইল ব্যবহার, ক্লাসরুমে ভিডিও বানানো, অশালীন ভাষা ব্যবহার—এসব বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশিকা থাকা দরকার।
বর্তমান সময়ে ‘রিল কালচার’ একটি বড় সামাজিক বাস্তবতা। কেউ নাচ, গান, অভিনয় বা তথ্যভিত্তিক ভিডিও বানাচ্ছেন, কেউ আবার মজার ভিডিও তৈরি করছেন। কিন্তু বিনোদনের নামে যদি গালিগালাজ, ব্যক্তিগত অপমান, রাজনৈতিক বিদ্বেষ বা অশালীন মন্তব্য ছড়ানো হয়, তাহলে তা সমাজের জন্য ক্ষতিকর। শিশু-কিশোরদের কাছে ভুল বার্তা যায় যে, কুরুচিকর ভাষা ব্যবহার করলেই জনপ্রিয় হওয়া যায়। এই প্রবণতা রুখতে সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও বারবার বলা হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও আপত্তিকর পোস্ট দেখলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয়। অভিযোগ থাকলে তা পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট সাইবার সেলে জানানো উচিত। কারণ উত্তেজনার বশে পাল্টা আক্রমণ, হুমকি বা ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। শালীন ও আইনসম্মত পথে অভিযোগ জানানোই নাগরিক দায়িত্ব।