কোহলির দাপুটে ব্যাটিংয়ে ছন্নছাড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বোলিং! ছক্কায় অর্ধশতরান, শতরান—শেষে সেই ছক্কাতেই ম্যাচ জিতিয়ে নায়ক বিরাট।
তিরুঅনন্তপুরমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে প্রথম এক দিনের ম্যাচে দুর্দান্ত জয় পেয়েছে ভারত। এই জয়ের অন্যতম প্রধান কারিগর ভারতের দুই তারকা ব্যাটার বিরাট কোহলি ও শুভমন গিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের দেওয়া ২৯৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারতের শুরুটা ভালো হলেও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় দ্বিতীয় উইকেটে বিরাট কোহলি ও শুভমন গিলের দুর্দান্ত ব্যাটিং। দু’জনে মিলে ১৩২ বলে ১৫১ রানের জুটি গড়েন। তাঁদের এই জুটির উপর ভর করেই মাত্র ৪১.৪ ওভারে ম্যাচ জিতে নেয় ভারত।
ম্যাচে শুভমন গিলের ব্যাট থেকেও আসে দুর্দান্ত শতরান। ভারত অধিনায়ক ১১০ রান করে দলকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করান। তবে তাঁর আউট হওয়ার পরও ভারতের জয়ের পথে কোনও বড় বাধা তৈরি হতে দেননি বিরাট কোহলি। বরং নিজের অভিজ্ঞতা, আক্রমণাত্মক ব্যাটিং এবং ম্যাচ শেষ করার দক্ষতা দিয়ে দলকে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে দেন প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে কোহলির ইনিংস ছিল আক্রমণাত্মক এবং আত্মবিশ্বাসী। মাত্র ৮৮ বলে ১৩৯ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল ১০টি চার এবং ৯টি বিশাল ছক্কা। অর্ধশতরান থেকে শতরান—পুরো ইনিংসেই আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলেছেন কোহলি। শেষ পর্যন্ত ছক্কা মেরেই ভারতকে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে দেন তিনি। ম্যাচ শেষ করে মাঠ ছাড়ার সময় তাঁর ব্যাটিং নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয় ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস।
এই ম্যাচের পর আরও একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেটি হল বিরাট কোহলির সঙ্গে শুভমন গিলের সম্পর্ক এবং ভারতীয় দলের বর্তমান ব্যাটিং কম্বিনেশন। কোহলি ও শুভমনের ১৫১ রানের জুটি শুধু ভারতকে ম্যাচ জেতায়নি, বরং দু’জনের মধ্যে বোঝাপড়ার ছবিটিও সামনে এনেছে। একজন অভিজ্ঞতার প্রতীক, অন্যজন ভারতীয় ক্রিকেটের বর্তমান প্রজন্মের নেতৃত্বে থাকা ব্যাটার। দু’জনের ব্যাটিংয়ের সমন্বয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বোলারদের উপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর শুভমন গিল নিজের এক্স হ্যান্ডলে ম্যাচের কয়েকটি ছবি পোস্ট করেন। সেই ছবিগুলির মধ্যে বিরাট কোহলির সঙ্গে তাঁর একটি ছবিও ছিল। ছবির ক্যাপশনে ভারত অধিনায়ক লেখেন, “ফায়ারি ইনিংস হি কহদে।” বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, “আগুনে ইনিংস অন্তত বলে দিন।” শুভমনের এই চার শব্দের ক্যাপশনই ম্যাচের পর বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। কারণ কোহলির ইনিংস যে কতটা আক্রমণাত্মক ছিল, সেই বিষয়টিই সংক্ষেপে তুলে ধরেছে তাঁর এই মন্তব্য।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে কোহলি শুরু থেকেই নিজের পরিচিত ছন্দে ব্যাট করেন। পরিস্থিতি বুঝে প্রথমে ইনিংস তৈরি করলেও পরে বাউন্ডারি মেরে রান তোলার গতি বাড়িয়ে দেন। তাঁর ব্যাট থেকে একের পর এক চার ও ছক্কা আসে। অর্ধশতরান করার পরও থামেননি কোহলি। শতরানের পরও তাঁর আগ্রাসন একই রকম ছিল। শেষ পর্যন্ত ১৩৯ রানে অপরাজিত থেকে ভারতকে জয় এনে দেন তিনি।
অন্য দিকে শুভমন গিলও নিজের শতরান দিয়ে অধিনায়ক হিসেবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। ১১০ রানের ইনিংস খেলে তিনি বুঝিয়ে দেন যে নেতৃত্বের দায়িত্বের পাশাপাশি ব্যাট হাতেও দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত। কোহলি ও শুভমনের জুটি ভারতের রান তাড়ার ভিত্তি তৈরি করে দেয়। দু’জনের মধ্যে ১৫১ রানের পার্টনারশিপই ম্যাচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
ম্যাচ শেষে বিরাট কোহলির প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন শুভমন। ভারত অধিনায়ক বলেন, “বিরাট ভাই দুর্দান্ত ব্যাট করেছে। ও খেলা উপভোগ করছে। স্বাধীনতা নিয়ে খেলছে। যখনই ইচ্ছা করেছে বাউন্ডারি মেরেছে।” কোহলির ব্যাটিংয়ের ধরন নিয়ে শুভমনের এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, অভিজ্ঞ ব্যাটার বর্তমানে নিজের ক্রিকেটকে উপভোগ করে খেলছেন—এমনটাই তাঁর সতীর্থের পর্যবেক্ষণ।
শুভমন আরও বলেন, “ও ভারতকে কত ম্যাচ জিতিয়েছে।” বিরাট কোহলির দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে ভারতের হয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাঁর ম্যাচজেতানো ইনিংস রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরেছেন বর্তমান ভারত অধিনায়ক। তবে কোহলির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে শুভমন কোনও মন্তব্য করতে চাননি।
বিরাট কোহলি কবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেবেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁর নিজের—এমনটাই স্পষ্ট করে দিয়েছেন শুভমন গিল। তিনি বলেন, “বিরাট ভাই যত দিন চাইবে খেলবে। ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে বলার ধৃষ্টতা আমাদের নেই।” অর্থাৎ কোহলির কেরিয়ার কত দিন চলবে বা তিনি কবে ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়াবেন, সেই সিদ্ধান্ত একান্তই তাঁর নিজের বলে মনে করেন ভারত অধিনায়ক।
এই মন্তব্যটি ম্যাচের পর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ বিরাট কোহলির বয়স ও আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে মাঝেমধ্যেই আলোচনা হয়। কিন্তু মাঠে তাঁর পারফরম্যান্স যে এখনও ম্যাচের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে এই ইনিংস তারই আরেকটি উদাহরণ। ৮৮ বলে ১৩৯ রান করে অপরাজিত থাকা এবং ছক্কা মেরে ম্যাচ শেষ করা সেই বার্তাই দিয়েছে।
ভারতের রান তাড়ার সময় কোহলি ও শুভমন একে অপরকে দারুণভাবে সাহায্য করেন। এক দিকে শুভমন নিজের শতরান পূর্ণ করে ভারতকে জয়ের দিকে এগিয়ে দেন, অন্য দিকে কোহলি ক্রমশ আক্রমণ বাড়িয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বোলারদের উপর চাপ তৈরি করেন। ১৫১ রানের জুটি ভাঙার পর শুভমন ফিরে গেলেও কোহলি শেষ পর্যন্ত ক্রিজে থেকে যান এবং ম্যাচ শেষ করে ফেরেন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের ২৯৬ রানের লক্ষ্য ভারতের কাছে সহজ হয়ে যায় কোহলি ও শুভমনের ব্যাটিংয়ের কারণে। মাত্র ৪১.৪ ওভারে ভারত সেই রান তুলে নেয়। ফলে ভারতের জয় আসে ৫০ ওভারের অনেক আগেই। রান তাড়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় রান রেটের উপর নিয়ন্ত্রণ রেখে শেষ পর্যন্ত আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলেছে ভারতীয় দল।
কোহলির ১৩৯ রানের ইনিংসের অন্যতম আকর্ষণ ছিল তাঁর ছক্কার সংখ্যা। মোট ৯টি ছক্কা মেরে তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বোলিং আক্রমণকে চাপে ফেলে দেন। এর পাশাপাশি ১০টি চারও ছিল তাঁর ইনিংসে। অর্থাৎ তাঁর ১৩৯ রানের একটি বড় অংশই এসেছে বাউন্ডারি থেকে। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, ইনিংসটি কতটা আক্রমণাত্মক ছিল।
শুভমন গিলের ১১০ রানও ভারতের জয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অধিনায়ক হিসেবে মাঠে নেমে ব্যাট হাতে শতরান করা তাঁর পারফরম্যান্সকে আরও উল্লেখযোগ্য করে তুলেছে। তাঁর সঙ্গে কোহলির পার্টনারশিপ ভারতীয় দলের রান তাড়াকে অনেকটাই সহজ করে দেয়।
এই ম্যাচে ভারতীয় ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল অভিজ্ঞতা ও নতুন প্রজন্মের মেলবন্ধন। বিরাট কোহলি দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটার। অন্য দিকে শুভমন গিল বর্তমানে ভারতীয় দলের নেতৃত্বের দায়িত্বে রয়েছেন। দু’জনের একসঙ্গে বড় রান করা দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক।
ম্যাচের পর শুভমনের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টও তাই ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর কেড়েছে। কোহলির সঙ্গে ছবি দিয়ে মাত্র চার শব্দে তাঁর ইনিংসের প্রশংসা করেছেন ভারত অধিনায়ক। “ফায়ারি ইনিংস হি কহদে”—এই ক্যাপশন মুহূর্তের মধ্যে আলোচনায় আসে। কোহলির ইনিংসের আগ্রাসী চরিত্রকে সংক্ষেপে তুলে ধরার জন্য শুভমনের এই মন্তব্যকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আগ্রহ।
কোহলির ইনিংসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল ম্যাচ শেষ করার ধরন। তিনি শুধু শতরান করেই থেমে থাকেননি। দলকে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েই মাঠ ছাড়েন। শেষ পর্যন্ত তাঁর ব্যাটে ছিল ১৩৯ রান এবং তিনি অপরাজিত থাকেন। ফলে ভারতের রান তাড়ার শেষ মুহূর্তেও তাঁকে ক্রিজে দেখা যায়।
ক্রিকেটে একটি বড় রান তাড়া করার সময় সেটি শেষ করার দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ম্যাচে কোহলি সেই দায়িত্ব নিজের কাঁধে রাখেন। শুভমন আউট হওয়ার পরও তিনি চাপ বাড়তে দেননি। বরং বাউন্ডারি মেরে ম্যাচের সমাপ্তি দ্রুত এনে দেন।
শুভমনের মন্তব্য থেকে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি কোহলির ক্রিকেটের প্রতি বর্তমান মানসিকতা এবং মাঠের পারফরম্যান্সকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর মতে, কোহলি স্বাধীনভাবে খেলছেন এবং যখনই সুযোগ পাচ্ছেন বাউন্ডারি মারছেন। একজন সতীর্থ ও অধিনায়কের কাছ থেকে এমন প্রশংসা ম্যাচের পর স্বাভাবিকভাবেই আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে কোহলির ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত বা সময়সীমা ঘোষণা করেননি শুভমন। বরং তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কোহলির নিজের। ফলে অবসর নিয়ে কোনও জল্পনাকে তিনি নিজের মন্তব্য দিয়ে বাড়াতে চাননি।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে এই ম্যাচ তাই একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, ভারত ম্যাচ জিতেছে। দ্বিতীয়ত, শুভমন গিল শতরান করেছেন। তৃতীয়ত, বিরাট কোহলি ১৩৯ রানে অপরাজিত থেকেছেন। চতুর্থত, দু’জনে মিলে ১৫১ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েছেন। আর সবশেষে ম্যাচের পর শুভমনের চার শব্দের প্রশংসা কোহলির ইনিংসকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
ভারতীয় ক্রিকেটে বিরাট কোহলির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং শুভমন গিলের নেতৃত্ব—এই দুইয়ের সমন্বয় দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে প্রথম এক দিনের ম্যাচে তারই একটি ছবি দেখা গেল। কোহলি ও শুভমন দু’জনেই শতরান করলেন এবং ভারত সহজেই লক্ষ্য পার করে গেল।
সব মিলিয়ে তিরুঅনন্তপুরমের ম্যাচে ভারতের জয়ের গল্পে সবচেয়ে বড় জায়গা জুড়ে থাকল বিরাট কোহলির অপরাজিত ১৩৯ এবং শুভমন গিলের ১১০ রান। তাঁদের ১৫১ রানের জুটি ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। ম্যাচ শেষে শুভমনের “ফায়ারি ইনিংস হি কহদে” মন্তব্য আরও একবার বুঝিয়ে দিল, সতীর্থ কোহলির ব্যাটিং এখনও ভারতীয় দলের অন্দরমহলে কতটা প্রশংসিত। আর কোহলির ভবিষ্যৎ নিয়ে শুভমনের বক্তব্যও স্পষ্ট—তিনি যত দিন খেলতে চাইবেন, তত দিন তাঁর সিদ্ধান্তকে সম্মান করা হবে।