Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেশে ৪৪% শিশু কিশোর পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নেমেছে

জ্ঞানই যে শক্তি—এই সত্যকে ভয় পেত হীরক রাজা। তাই বন্ধ করে দিয়েছিল উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালা। কিন্তু জ্ঞানের আলো নিভিয়ে দেওয়া যায়নি। খুদে পড়ুয়াদের অদম্য জানার আগ্রহই প্রমাণ করেছিল—শিক্ষাকে কোনো শক্তিই থামাতে পারে না।

শিক্ষার আলো বনাম বাস্তবের অন্ধকার

“ওরা যত বেশি জানে, তত কম মানে”—এই ভয়েই উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালার দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল হীরক রাজা। সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী ছবির এই সংলাপ আজ যেন ভারতের বাস্তব সমাজের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে। পার্থক্য শুধু একটাই—এবার পাঠশালা বন্ধ করছেন কোনো রাজা নয়, বরং কঠিন বাস্তবতা, দারিদ্র্য আর জীবিকার লড়াই।

একদিকে ডিজিটাল ইন্ডিয়া, স্মার্ট ইন্ডিয়া, উন্নয়নের ঢাকঢোল—অন্যদিকে দেশের লক্ষ লক্ষ শিশু-কিশোরের কাছে শিক্ষা হয়ে উঠছে বিলাসিতা। সংসার চালানোর দায়ে তারা স্কুল ছেড়ে নামছে কাজে। আর্থিক সমীক্ষার তথ্য বলছে, এই পরিস্থিতি শুধু সামাজিক নয়, জাতীয় ভবিষ্যতের জন্যও এক ভয়াবহ সংকেত।


ভয়াবহ পরিসংখ্যান: স্কুলছুটের বাস্তব চিত্র

২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের আর্থিক সমীক্ষা রিপোর্টে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। সেখানে বলা হয়েছে—

  • দেশের ৪৪ শতাংশ শিশু-কিশোর স্কুলছুট হচ্ছে সংসার চালানোর প্রয়োজনে।

  • ২৮ শতাংশ স্কুল ছাড়ছে পরিবারের কাজে সাহায্য করার জন্য।

  • ৮ শতাংশ শিশু-কিশোর মনে করছে, শিক্ষার আর প্রয়োজন নেই।

  • মাত্র ০.৯৭ শতাংশ পড়ুয়া পেয়েছে পেশামূলক বা দক্ষতা-বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ।

এই তথ্য এসেছে পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে (PLFS) ২০২৩-২৪-এর ইউনিট লেভেল ডেটা থেকে।

এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়, বরং লাখ লাখ স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার গল্প।


কেন শিক্ষার প্রয়োজন নেই মনে করছে শিশু-কিশোরেরা?

এক সময় শিক্ষা ছিল মুক্তির পথ। কিন্তু আজ বহু শিশু-কিশোরের কাছে শিক্ষা হয়ে উঠেছে অর্থহীন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পিছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে—

১) দারিদ্র্যের চাপ

ভারতের বহু পরিবার আজও ন্যূনতম জীবিকা সংগ্রামে ব্যস্ত।
যেখানে—

  • খাদ্য,

  • চিকিৎসা,

  • বাসস্থান,

  • বিদ্যুৎ,

  • ইন্টারনেট,

সবই ব্যয়বহুল—সেখানে শিক্ষা অনেক পরিবারের কাছে দ্বিতীয় বা তৃতীয় অগ্রাধিকার।

একজন ১৪ বছরের কিশোর যদি দিনে ২০০-৩০০ টাকা আয় করতে পারে, তাহলে পরিবার তাকে স্কুলে পাঠাবে না—এটাই বাস্তব।


২) মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব

গত কয়েক বছরে—

  • খাদ্যদ্রব্যের দাম,

  • জ্বালানির দাম,

  • পরিবহণ খরচ,

  • শিক্ষা সামগ্রীর দাম,

সবকিছুই বেড়েছে।

ফলাফল—
পরিবারের আয় বাড়েনি, কিন্তু খরচ বেড়েছে।
ফলে শিশুদের স্কুল ছাড়িয়ে কাজে নামানো হচ্ছে।


৩) শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের দূরত্ব

ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার বড় সমস্যা হল—

? পড়াশোনা আছে, কিন্তু চাকরি নেই।

অনেক তরুণ উচ্চশিক্ষিত হয়েও বেকার।
এই বাস্তবতা শিশু-কিশোরদের মনেও প্রভাব ফেলছে।

তারা ভাবছে—

“পড়াশোনা করেও যদি চাকরি না পাই, তাহলে পড়ব কেন?”


৪) পেশামূলক শিক্ষার অভাব

আর্থিক সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে—

? মাত্র ০.৯৭ শতাংশ পড়ুয়া পেশামূলক প্রশিক্ষণ পেয়েছে।

অর্থাৎ—

  • ইলেকট্রিশিয়ান,

  • মেকানিক,

  • কম্পিউটার,

  • ডিজিটাল স্কিল,

  • কারিগরি শিক্ষা,

এসব বিষয়ে স্কুলে পর্যাপ্ত সুযোগ নেই।

ফলে শিক্ষা বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছে না।


স্কুলছুটের সামাজিক প্রভাব

স্কুলছুট শিশু-কিশোরদের সংখ্যা বাড়ার অর্থ—

১) শিশুশ্রম বৃদ্ধি

স্কুল ছাড়লে শিশুদের বড় অংশই—

  • কারখানা,

  • দোকান,

  • নির্মাণ শ্রম,

  • কৃষিকাজ,

  • গৃহশ্রম,

এসব কাজে যুক্ত হয়।

এতে শিশুশ্রমের সমস্যা আরও বাড়বে।


২) অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি

শিক্ষা না থাকলে—

  • বেকারত্ব বাড়ে,

  • হতাশা বাড়ে,

  • অপরাধে জড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে।

অনেক সমাজবিজ্ঞানী মনে করছেন, স্কুলছুটের হার বাড়লে ভবিষ্যতে অপরাধের হারও বাড়তে পারে।


৩) অর্থনৈতিক ক্ষতি

একটি দেশ তখনই উন্নত হয়, যখন তার মানবসম্পদ উন্নত হয়।

news image
আরও খবর

কিন্তু যদি—

  • শিশুদের বড় অংশ অশিক্ষিত থাকে,

  • দক্ষতা না পায়,

তাহলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, শিক্ষিত জনশক্তি ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে উন্নত হতে পারে না।


রাজনৈতিক বিতর্ক: দায় কার?

এই রিপোর্ট সামনে আসতেই রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বিরোধীদের অভিযোগ

বিরোধী দলগুলির দাবি—

  • মোদি সরকারের অর্থনৈতিক নীতির ফলেই দারিদ্র্য বেড়েছে।

  • মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ।

  • শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ কমছে।

তাদের মতে—

? উন্নয়নের দাবি বাস্তবে সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে না।


সরকারের বক্তব্য

অন্যদিকে কেন্দ্রের দাবি—

  • সরকার শিক্ষা খাতে একাধিক প্রকল্প চালু করেছে।

  • স্কিল ইন্ডিয়া, নিউ এডুকেশন পলিসি (NEP) চালু হয়েছে।

  • ডিজিটাল লার্নিং বাড়ানো হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—

? তাহলে কেন এত শিশু স্কুল ছাড়ছে?


শিক্ষাবিদদের উদ্বেগ

শিক্ষাবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি দেশের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ।

তাদের বক্তব্য—

  • শিক্ষা শুধু চাকরির জন্য নয়, নাগরিক সচেতনতার জন্যও জরুরি।

  • শিক্ষাহীন সমাজ গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।

  • শিক্ষিত নাগরিক ছাড়া উন্নত রাষ্ট্র সম্ভব নয়।

একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের কথায়—

“যদি আজ শিশুরা স্কুল ছাড়ে, তাহলে আগামী দিনে দেশই পিছিয়ে পড়বে।”


সমাধানের পথ: কী করা উচিত?

আর্থিক সমীক্ষা রিপোর্টে কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে—

১) পেশামূলক শিক্ষা বাড়ানো

স্কুলে—

  • কারিগরি শিক্ষা,

  • ডিজিটাল স্কিল,

  • ট্রেনিং প্রোগ্রাম,

বাড়াতে হবে।


২) দরিদ্র পরিবারকে আর্থিক সহায়তা

  • স্কলারশিপ,

  • মিড-ডে মিল,

  • ফ্রি বই,

  • ইউনিফর্ম,

  • সরাসরি আর্থিক সহায়তা,

বাড়াতে হবে।


৩) শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের যোগসূত্র

শিক্ষা এমন হতে হবে, যা সরাসরি কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করে।


৪) সামাজিক সচেতনতা

শিক্ষাকে বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।


শেষ কথা: হীরক রাজা কি আবার ফিরে এসেছে?

এক সময় হীরক রাজা পাঠশালা বন্ধ করেছিল ক্ষমতার ভয় থেকে।
আজ পাঠশালা বন্ধ হচ্ছে দারিদ্র্যের ভয় থেকে।

কিন্তু প্রশ্ন একটাই—

? যদি শিশুরা শিক্ষা থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়াবে?

শিক্ষা ছাড়া উন্নয়ন শুধু কাগজে কলমে থাকে।
বাস্তবে তা কখনও সমাজে পৌঁছায় না।

আজ ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—

? শিশুদের হাতে আবার বই তুলে দেওয়া।

কারণ বই বন্ধ হলে, বন্ধ হয়ে যায় একটি জাতির ভবিষ্যৎ।


এক সময় হীরক রাজা পাঠশালা বন্ধ করেছিল ক্ষমতার ভয় থেকে।
আজ পাঠশালা বন্ধ হচ্ছে দারিদ্র্যের ভয় থেকে।

কিন্তু প্রশ্ন একটাই—
যদি শিশুরা শিক্ষা থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়াবে?

শিক্ষা ছাড়া উন্নয়ন শুধু কাগজে কলমে থাকে, পরিসংখ্যানের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবে তা কখনও সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছায় না। উন্নয়নের গল্প যতই বড় হোক, যদি সেই গল্পের কেন্দ্র থেকে শিশুদের বাদ দেওয়া হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়ে।

আজ ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকও। একদিকে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি, ডিজিটাল বিপ্লব, স্টার্টআপ সংস্কৃতি—অন্যদিকে গ্রামের প্রান্তিক পরিবারে শিশুদের হাতে বইয়ের বদলে কাজের ভার। এই বৈপরীত্যই আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় সংকেত।

শিশুরা যখন স্কুল ছাড়ে, তখন শুধু একটি ছাত্র হারিয়ে যায় না—হারিয়ে যায় একটি স্বপ্ন, একটি সম্ভাবনা, একটি ভবিষ্যৎ। যে শিশু আজ স্কুলে থাকার কথা, সে যদি নির্মাণ শ্রমিক, দোকানের কর্মচারী কিংবা গৃহকর্মীর ভূমিকায় নেমে আসে, তাহলে তার জীবন শুধু বদলায় না, বদলে যায় সমাজের সামগ্রিক চিত্রও।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষাবঞ্চিত প্রজন্ম কখনও একটি শক্তিশালী জাতি গড়ে তুলতে পারে না। কারণ শিক্ষা শুধু চাকরি পাওয়ার মাধ্যম নয়, এটি মানুষকে সচেতন নাগরিক করে তোলে, চিন্তাশীল করে তোলে, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। আর ঠিক এই কারণেই ইতিহাসে বহু স্বৈরশাসক শিক্ষাকে ভয় পেয়েছে। আজ সেই ভয় আর ক্ষমতার নয়, বরং দারিদ্র্যের।

একটি দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার প্রতিটি শিশুর কাছে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে যায়। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, আমাদের সমাজে সেই সুযোগ এখনও সমানভাবে পৌঁছায়নি। শহরের আধুনিক স্কুল আর গ্রামের জরাজীর্ণ বিদ্যালয়ের ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে। ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ যেখানে শহরে সহজলভ্য, সেখানে গ্রামে এখনও ইন্টারনেটই বিলাসিতা।

আজ যখন আমরা উন্নয়নের কথা বলি, তখন আমাদের মনে রাখা উচিত—শিশুদের হাতে যদি বই না থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। অর্থনীতি যতই শক্তিশালী হোক, যদি মানবসম্পদ দুর্বল হয়, তাহলে সেই শক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

আজ ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব—শিশুদের হাতে আবার বই তুলে দেওয়া। শুধু সরকারি প্রকল্প দিয়ে নয়, সামাজিক সচেতনতা দিয়েও। পরিবারকে বোঝাতে হবে, শিক্ষা কোনো বোঝা নয়, বরং ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, শিক্ষা খাতে ব্যয় কোনো খরচ নয়, বরং জাতি গঠনের ভিত্তি।

কারণ বই বন্ধ হলে, বন্ধ হয়ে যায় একটি জাতির ভবিষ্যৎ।
আর যদি ভবিষ্যৎ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে উন্নয়নের সব গল্পই একদিন প্রশ্নের মুখে দাঁড়াবে।

Preview image