এশিয়ান গেমসে দারুণ চমক নেপালের! ৫ উইকেটে আফগানিস্তানকে হারিয়ে ফের নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিল নেপাল।
গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নেপালের পারফরম্যান্স ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর কেড়েছিল। শক্তিশালী ইংল্যান্ডের মতো দলের বিরুদ্ধে ম্যাচে চাপ তৈরি করে দিয়েছিল হিমালয়ের দেশটি। সেই পারফরম্যান্স যে নিছক চমক ছিল না, এশিয়ান গেমসের ক্রিকেটে আরও এক বার তার প্রমাণ দিল নেপাল। গ্রুপ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আফগানিস্তানকে ৫ উইকেটে হারিয়ে বড় অঘটন ঘটাল তারা।
এশিয়ান গেমসের ২২ গজে আফগানিস্তানকে অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে ধরা হচ্ছিল। গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে আফগানিস্তান নিজেদের আলাদা জায়গা তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে সেমিফাইনালে উঠেছিল তারা। সেই দলেরই তরুণ ক্রিকেটারদের নিয়ে গড়া আফগানিস্তানকে হারিয়ে নেপাল বুঝিয়ে দিল, বড় দলের বিরুদ্ধে লড়াই করার সামর্থ্য তাদের রয়েছে।
তবে এশিয়ান গেমসে আফগানিস্তানের দলে একাধিক সিনিয়র ক্রিকেটার ছিলেন না। আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড মূলত তরুণ ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে অভিজ্ঞতা দেওয়ার লক্ষ্যেই দল পাঠিয়েছে। দারউইশ রাসুলির নেতৃত্বে খেলতে নামে আফগানিস্তান। অন্য দিকে, নেপাল নিজেদের পরিচিত আক্রমণাত্মক ক্রিকেটের উপর ভরসা করেই মাঠে নামে। ম্যাচের শুরু থেকেই অবশ্য আফগানিস্তানের ব্যাটিংয়ে সেই আত্মবিশ্বাস দেখা যায়নি।
টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় আফগানিস্তান। কিন্তু শুরু থেকেই নিয়মিত ব্যবধানে উইকেট হারাতে থাকে তারা। মাত্র ১৬ রানের মধ্যেই তিনটি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় আফগান শিবির। নেপালের বোলাররা নতুন বল হাতে শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রিত বোলিং করেন। আফগান ব্যাটারদের স্বাভাবিক শট খেলার সুযোগ খুব একটা দেননি তাঁরা।
আফগানিস্তানের হয়ে ফয়জাল খান আহমেদজ়াই কিছুটা লড়াই করেন। ৩৩ বলে ৩০ রান করেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল ধৈর্যের ছাপ। কিন্তু বড় শট খেলে ইনিংসের গতি বাড়ানোর সুযোগ পাননি। নাজিবুল্লাহ জ়াদরানও দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ৪০ বলে ৩০ রান করেন তিনি। তবে এই দুই ব্যাটারের ইনিংসও আফগানিস্তানকে বড় স্কোরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
শেষ দিকে নাঙ্গেয়ালিয়া খান ১৫ বলে অপরাজিত ১৭ রান করেন। তাঁর ছোট্ট ইনিংসের সুবাদে আফগানিস্তানের স্কোর কিছুটা বাড়ে। তবে দলের আর কোনও ব্যাটার দুই অঙ্কের রানও করতে পারেননি। ফলে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ১০২ রানেই থেমে যায় আফগানিস্তানের ইনিংস।
নেপালের বোলিং আক্রমণের মূল আকর্ষণ ছিলেন ললিত রাজবংশী এবং কুশল ভুরতেল। আফগান ব্যাটিং লাইনআপকে শুরু থেকেই চাপে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তাঁরা। ললিত ১৩ রান দিয়ে তিনটি উইকেট তুলে নেন। অন্য দিকে কুশল ভুরতেল ২১ রান খরচ করে চারটি উইকেট নেন। তাঁদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে আফগান ব্যাটাররা বড় শট খেলতে সমস্যায় পড়েন।
১০৩ রানের তুলনামূলক সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমেও নেপালের শুরুটা অবশ্য স্বস্তিদায়ক ছিল না। মাত্র ৩১ রানের মধ্যেই তিনটি উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল তারা। একটা সময় মনে হচ্ছিল, আফগানিস্তানের বোলাররা ম্যাচে ফিরে আসতে পারেন। কিন্তু সেই চাপ সামলে নেপালের ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে যান সন্দীপ জোরা এবং রোহিত পৌড়েল।
তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমে সন্দীপ জোরা দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন। ৩৫ বলে ৩৪ রান করে তিনি নেপালের রান তোলার গতি ধরে রাখেন। তাঁর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন পাঁচ নম্বরে নামা রোহিত পৌড়েল। প্রাক্তন অধিনায়ক রোহিত পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী ব্যাট করেন। ৩২ বলে অপরাজিত ৩৩ রান করে দলকে জয়ের কাছাকাছি পৌঁছে দেন তিনি।
অধিনায়ক দীপেন্দ্র সিংহ ঐরিও প্রয়োজনের সময় অবদান রাখেন। ১৮ বলে ১৫ রান করেন তিনি। ফলে শুরুতে তিন উইকেট হারানোর ধাক্কা সামলে ধীরে ধীরে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে নেপাল। শেষ পর্যন্ত ১৭.২ ওভারেই পাঁচ উইকেট হারিয়ে ১০৩ রান তুলে ম্যাচ জিতে নেয় তারা।
আফগানিস্তানের হয়ে ফারিডুন দাউদজ়াই ১০ রান দিয়ে একটি উইকেট নেন। আরব গুল ১৩ রান দিয়ে একটি এবং আবদুল্লা আহমদজ়াই ১৫ রান দিয়ে একটি উইকেট নেন। কিন্তু নেপালের ব্যাটিংয়ের মাঝের সারির প্রতিরোধ ভাঙতে পারেননি আফগান বোলাররা।
এই জয়ের ফলে নেপাল শুধু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টই পেল না, বরং এশিয়ান গেমসের ক্রিকেটে নিজেদের সম্ভাবনাও আরও স্পষ্ট করে দিল। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে নেপাল গত কয়েক বছরে যে ভাবে নিজেদের উন্নত করেছে, এই ম্যাচ তারই আর একটি উদাহরণ। বিশেষ করে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে চাপ সামলে ম্যাচ জেতার মানসিকতা তাদের ক্রিকেটে ক্রমশই দৃশ্যমান হচ্ছে।
এশিয়ান গেমসে ছেলেদের ক্রিকেটে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কা সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনালে খেলবে। গ্রুপ পর্ব থেকে আরও চারটি দল কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেবে। সেই লড়াইয়ে নেপালের কাছে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে জয় নিঃসন্দেহে বড় আত্মবিশ্বাসের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
আফগানিস্তানের জন্য অবশ্য এই হার কিছুটা হতাশার। তবে দলের অধিকাংশ সিনিয়র ক্রিকেটার এই প্রতিযোগিতায় না থাকায় তরুণদের জন্য ম্যাচটি অভিজ্ঞতা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ সামলে কী ভাবে ম্যাচের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, সেই শিক্ষা এই ম্যাচ থেকে আফগান তরুণেরা পেতে পারেন।
অন্য দিকে নেপালের কাছে এই জয় আরও একটি বার্তা বহন করছে। ক্রিকেটে বড় দলের বিরুদ্ধে জিততে শুধুমাত্র তারকা ক্রিকেটার প্রয়োজন হয় না; পরিকল্পনা, বোলিংয়ের নিয়ন্ত্রণ, চাপের মুহূর্তে ব্যাটিং এবং দলগত পারফরম্যান্সও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে নেপাল সেই দলগত পারফরম্যান্সই দেখিয়েছে।
বিশেষ করে নেপালের বোলিং বিভাগ ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ২০ ওভারে আফগানিস্তানকে ১০২ রানে আটকে রাখা ছিল জয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। পাওয়ারপ্লে থেকে শুরু করে মাঝের ওভার—প্রতিটি পর্যায়েই নেপালের বোলাররা আফগান ব্যাটারদের উপর চাপ বজায় রাখেন। একের পর এক উইকেট হারিয়ে আফগানিস্তান কখনও বড় জুটি গড়ার সুযোগ পায়নি।
ব্যাটিংয়ে অবশ্য নেপালের শুরুটা ছিল কিছুটা নড়বড়ে। ৩১ রানে তিন উইকেট হারানোর পর ম্যাচ যে কোনও দিকে যেতে পারত। কিন্তু সন্দীপ জোরা ও রোহিত পৌড়েলের দায়িত্বশীল ব্যাটিং সেই সম্ভাবনা বদলে দেয়। তাঁরা ঝুঁকি কমিয়ে প্রয়োজনীয় রান সংগ্রহ করেন এবং আফগানিস্তানকে আর ম্যাচে ফেরার সুযোগ দেননি।
এই ম্যাচে নেপালের আর একটি বড় শক্তি ছিল পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের পরিকল্পনা বদলে নেওয়া। শুরুতে উইকেট হারানোর পর বড় শটের বদলে সিঙ্গল-ডাবল নিয়ে ইনিংস গড়ে তোলেন ব্যাটাররা। সেই পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত কাজে আসে। মাত্র ১০৩ রানের লক্ষ্য হওয়ায় প্রয়োজন ছিল উইকেট হাতে রেখে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া। নেপাল সেটিই করেছে।
গ্রুপে আফগানিস্তান এবং নেপালের সঙ্গে রয়েছে এশিয়ান গেমসের আয়োজক জাপান। ফলে গ্রুপের লড়াইয়ে নেপালের এই জয় তাদের অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। পরের ম্যাচগুলিতে দলটি কেমন পারফর্ম করে, তার উপর নির্ভর করবে পরবর্তী পর্বের সমীকরণ।
সব মিলিয়ে এশিয়ান গেমসের ক্রিকেটে আফগানিস্তানকে হারিয়ে নেপাল আবারও প্রমাণ করল, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তাদের উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। গত বিশ্বকাপে শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে লড়াই করার পর এ বার এশিয়ান গেমসের মঞ্চে আফগানিস্তানকে হারিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের আরও একটি উদাহরণ তৈরি করল হিমালয়ের দেশটি। ৫ উইকেটের এই জয় নেপালের ক্রিকেটে নিঃসন্দেহে আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এবং পরের ম্যাচগুলিতে আরও ভালো পারফরম্যান্সের প্রত্যাশাও তৈরি করবে।
এশিয়ান গেমসের মতো বহুজাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় এমন জয় নেপালের ক্রিকেটের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এই ধরনের মঞ্চে ভালো পারফরম্যান্স শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়, বরং দেশের ক্রিকেটের উন্নতিরও প্রতিফলন। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে নেপালের বোলাররা যেমন নিয়ন্ত্রিত ক্রিকেট খেলেছেন, তেমনই ব্যাটাররাও চাপের মুহূর্তে দায়িত্ব নিয়ে ম্যাচ শেষ করেছেন। বিশেষ করে শুরুতেই তিন উইকেট হারানোর পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা নেপালের পরিণত মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে। সামনে আরও কঠিন প্রতিপক্ষ অপেক্ষা করছে। তবে এই জয় নেপালকে আত্মবিশ্বাস জোগাবে এবং এশিয়ান গেমসের পরবর্তী ম্যাচগুলিতে তাদের লড়াই আরও জমজমাট হয়ে উঠবে।