বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা হেরে গেলেও দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সুবাদে মেসির সোনার বল জয়ের আশা করেছিলেন সমর্থকেরা। কিন্তু পুরস্কার উঠল রদ্রির হাতে, আর সেই সিদ্ধান্ত ঘিরেই শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।
বিশ্বকাপের শেষ বাঁশি বেজে গিয়েছে। স্পেনের হাতে উঠেছে বিশ্বজয়ের ট্রফি। ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে আরও এক বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অধরা থেকে গিয়েছে আর্জেন্টিনার। কিন্তু মাঠের লড়াই শেষ হয়ে গেলেও ফুটবলবিশ্বে আলোচনা ও বিতর্ক থামার কোনও লক্ষণ নেই। এ বারের সবচেয়ে বড় বিতর্ক শুরু হয়েছে বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলারের পুরস্কার, অর্থাৎ ‘গোল্ডেন বল’ বা ‘সোনার বল’ নিয়ে।
পুরো প্রতিযোগিতায় দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেও সোনার বল জিততে পারেননি আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিয়োনেল মেসি। তাঁর পরিবর্তে বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দলের অধিনায়ক রদ্রির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে প্রতিযোগিতার সেরা ফুটবলারের পুরস্কার। ফিফার এই সিদ্ধান্ত সামনে আসার পরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার নির্বাচনের ক্ষেত্রে কি ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের থেকে দলের সাফল্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে? নাকি রদ্রিই সত্যিই মেসির থেকে বেশি যোগ্য ছিলেন?
চলতি বিশ্বকাপে লিয়োনেল মেসির পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। প্রতিযোগিতায় মোট আটটি গোল করেছেন তিনি। পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও চারটি গোল। অর্থাৎ আর্জেন্টিনার মোট ১২টি গোলে সরাসরি অবদান ছিল দলের অধিনায়কের। আটটি ম্যাচের মধ্যে পাঁচটিতে ম্যাচের সেরা ফুটবলার নির্বাচিত হয়েছেন মেসি।
একটি বিশ্বকাপের মতো বড় প্রতিযোগিতায় এই পরিসংখ্যান যে কোনও ফুটবলারের জন্যই অবিশ্বাস্য। বিশেষ করে ৩৯ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে মেসি যে ভাবে আর্জেন্টিনা দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছে। শুধু গোল বা অ্যাসিস্ট নয়, মাঠের মধ্যে তাঁর উপস্থিতি, বল নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণ তৈরি, সতীর্থদের সুযোগ করে দেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলকে পথ দেখানোর ক্ষমতা গোটা প্রতিযোগিতাতেই চোখে পড়েছে।
ফাইনালে আর্জেন্টিনা স্পেনের কাছে হেরে গেলেও অনেকেই মনে করেছিলেন, প্রতিযোগিতার সেরা ফুটবলারের পুরস্কার মেসির হাতেই উঠবে। কারণ বিশ্বকাপের সোনার বল জেতার জন্য সব সময় বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। অতীতেও ফাইনালে পরাজিত দলের ফুটবলার প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়েছেন। ফলে মেসিকে নিয়ে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের প্রত্যাশা অস্বাভাবিক ছিল না।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বিশ্বকাপের সোনার বলের জন্য রদ্রির নাম ঘোষণা হতেই পরিস্থিতি বদলে যায়। গ্যালারিতে উপস্থিত আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা একসঙ্গে মেসির নামে জয়ধ্বনি দিতে শুরু করেন। সেই আওয়াজ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে গোটা স্টেডিয়ামে।
সমর্থকদের সেই জয়ধ্বনি শুধুমাত্র প্রিয় ফুটবলারের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ ছিল না। তার মধ্যে ফিফার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুরও স্পষ্ট ছিল। মেসির পরিবর্তে রদ্রিকে সেরা ফুটবলার নির্বাচিত করার সিদ্ধান্ত তাঁরা মেনে নিতে পারেননি। পুরস্কার মঞ্চে দাঁড়িয়ে সমর্থকদের মুখে নিজের নাম শুনে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মেসি। তাঁর চোখে জল দেখা যায়।
এই দৃশ্য ফুটবলপ্রেমীদের আরও আবেগপ্রবণ করে তোলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে মেসির সেই ছবি ও ভিডিয়ো। অনেকেই দাবি করেন, নিজের শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে এমন একটি প্রতিযোগিতায় অসাধারণ পারফরম্যান্স করেও প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হয়েছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।
মেসির সমর্থকেরা মূলত তাঁর গোল, অ্যাসিস্ট এবং ম্যাচসেরার পুরস্কারের পরিসংখ্যান সামনে আনছেন। আটটি গোল করে তিনি প্রতিযোগিতার অন্যতম সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। চারটি অ্যাসিস্ট প্রমাণ করে, তিনি শুধু নিজে গোল করেননি, দলের অন্য ফুটবলারদেরও গোল করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন।
আটটি ম্যাচের মধ্যে পাঁচটিতে ম্যাচসেরা হওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ প্রতিযোগিতার অধিকাংশ ম্যাচেই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবলার ছিলেন তিনি। গ্রুপ পর্ব থেকে নকআউট—প্রতিটি পর্যায়ে দলের আক্রমণের মূল কেন্দ্র ছিলেন মেসি।
২০২২ সালের বিশ্বকাপেও পাঁচটি ম্যাচে সেরা ফুটবলারের পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। সেই প্রতিযোগিতায় সাতটি গোল করেছিলেন। এ বার আগের বিশ্বকাপের তুলনায় একটি গোল বেশি করেছেন। বয়স চার বছর বাড়লেও তাঁর পারফরম্যান্সে যে বড় কোনও পতন হয়নি, পরিসংখ্যান তারই প্রমাণ দিচ্ছে।
৩৯ বছর বয়সে এসে একটি দলকে বিশ্বকাপ ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সহজ কাজ নয়। তরুণ ফুটবলারদের সঙ্গে সমান তালে খেলে মেসি দেখিয়েছেন, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং মানসিক শক্তির কোনও বিকল্প নেই। তাই তাঁর সমর্থকদের প্রশ্ন—এত কিছুর পরেও তিনি যদি বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার না হন, তা হলে সোনার বল জেতার জন্য আর কী করতে হত?
অন্যদিকে, রদ্রির পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হল স্পেনের বিশ্বকাপ জয়। দলের অধিনায়ক হিসেবে তিনি স্পেনকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মাঝমাঠে তাঁর উপস্থিতি স্পেনের খেলার ভারসাম্য বজায় রেখেছে। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দেওয়া, বলের দখল ধরে রাখা, রক্ষণ ও আক্রমণের মধ্যে সংযোগ তৈরি এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ফুটবলে সব অবদান গোল বা অ্যাসিস্টের মাধ্যমে বিচার করা সম্ভব নয়। একজন ডিফেন্সিভ বা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের কাজ অনেক সময় পরিসংখ্যানে সঠিক ভাবে ধরা পড়ে না। রদ্রি হয়তো মেসির মতো আটটি গোল করেননি, কিন্তু স্পেনের খেলার পরিকল্পনা কার্যকর করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার।
বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক হওয়াও তাঁর পক্ষে কাজ করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। ফাইনালে জয় এবং ট্রফি হাতে তোলার বিষয়টি ভোটদাতাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। বড় প্রতিযোগিতায় অনেক সময় ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি দলের সাফল্যও সেরা খেলোয়াড় নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ফিফার নির্বাচকমণ্ডলী হয়তো মনে করেছে, রদ্রির নেতৃত্ব, ধারাবাহিকতা এবং স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ে তাঁর সামগ্রিক অবদান তাঁকে সোনার বলের যোগ্য করে তুলেছে। তবে এই যুক্তি মেসির সমর্থকদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
এই বিতর্কের মূল প্রশ্ন হল—বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ, না দলের সাফল্য? ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানকে গুরুত্ব দেওয়া হলে মেসি অবশ্যই শক্তিশালী দাবিদার। অন্যদিকে বিশ্বকাপজয়ী দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে পুরস্কৃত করার যুক্তিতে রদ্রি এগিয়ে থাকবেন।
ফুটবল একটি দলগত খেলা। কোনও ফুটবলার একা বিশ্বকাপ জিততে পারেন না। একই ভাবে কোনও দলের বিশ্বকাপ জয়েও একজন ফুটবলারের অবদান আলাদা করে বিচার করা কঠিন। মেসি আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছেন, কিন্তু শেষ ম্যাচে দলকে জয় এনে দিতে পারেননি। রদ্রি হয়তো মেসির মতো নজরকাড়া পরিসংখ্যান তৈরি করেননি, কিন্তু তাঁর দল শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতেছে।
এই দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। মেসির সমর্থকেরা বলছেন, সোনার বল বিশ্বকাপের সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি। তাই দলের ফলাফল দিয়ে মেসির অবদানকে ছোট করা উচিত নয়। রদ্রির সমর্থকেরা পাল্টা বলছেন, বিশ্বকাপ জয়ের পথে দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার হিসেবে তাঁর অবদানও কোনও অংশে কম নয়।
২০২২ সালের বিশ্বকাপে মেসি সাতটি গোল করে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছিলেন। পাঁচটি ম্যাচে ম্যাচসেরা হওয়ার পাশাপাশি সোনার বলও জিতেছিলেন। সেই বিশ্বকাপে তাঁর পারফরম্যান্স এবং দলের সাফল্য একসঙ্গে এসেছিল। ফলে পুরস্কার নিয়ে খুব বেশি প্রশ্ন ওঠেনি।
এ বারের বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত ভাবে আরও বেশি গোল করেছেন মেসি। আবারও পাঁচটি ম্যাচে সেরা হয়েছেন। কিন্তু পার্থক্য একটাই—আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। এই জায়গাতেই রদ্রির সঙ্গে তাঁর লড়াইয়ে দলের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখানে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসছে। আর্জেন্টিনা যদি ফাইনালে স্পেনকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতত, তা হলে কি সোনার বলের জন্য মেসির নামই ঘোষণা করা হত? অধিকাংশ ফুটবলপ্রেমী হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচকভাবেই দেবেন। অর্থাৎ ফাইনালের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত পুরস্কারের ভাগ্য বদলে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
৩৯ বছর বয়সী মেসির এটি শেষ বিশ্বকাপ কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। যদিও তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে অবসরের কোনও ঘোষণা করেননি, তবু বয়সের কারণে অনেকেই মনে করছেন, বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁকে হয়তো আর দেখা যাবে না।
এই আবেগও মেসির প্রতি সমর্থকদের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাঁরা চেয়েছিলেন, বিশ্বকাপ ট্রফি না পেলেও অন্তত প্রতিযোগিতার সেরা ফুটবলারের সম্মান নিয়ে মাঠ ছাড়ুন মেসি। কিন্তু পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে আবেগ নয়, মাঠের পারফরম্যান্স এবং নির্দিষ্ট নির্বাচনী মানদণ্ডই বিবেচনা করা উচিত।
তবে প্রশ্ন হল, সেই মানদণ্ড কতটা স্বচ্ছ? ভোটদাতারা কোন বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন? গোল, অ্যাসিস্ট, নেতৃত্ব, ম্যাচের উপর প্রভাব, নাকি দলের বিশ্বকাপ জয়—কোন মানদণ্ডে রদ্রি মেসিকে পিছনে ফেলেছেন, তা পরিষ্কার ভাবে জানানো না হলে বিতর্ক সহজে থামবে না।
রদ্রির নাম ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেসির সমর্থকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কেউ মেসির আট গোল ও চার অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন। কেউ আবার পাঁচটি ম্যাচসেরার পুরস্কারের ছবি প্রকাশ করে ফিফার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
অনেকের দাবি, রদ্রি অবশ্যই দুর্দান্ত ফুটবলার এবং স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম নায়ক। কিন্তু ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের বিচারে মেসি এগিয়ে ছিলেন। আবার স্পেন সমর্থকদের মতে, শুধু গোলের সংখ্যা দিয়ে একজন মিডফিল্ডারের অবদান বিচার করা উচিত নয়।
এই বিতর্কে দুই পক্ষেরই যুক্তি রয়েছে। তবে মেসির জনপ্রিয়তা এবং বিশ্ব ফুটবলে তাঁর বিপুল সমর্থকসংখ্যার কারণে বিতর্কটি আরও বড় আকার নিয়েছে। অন্য কোনও ফুটবলারের ক্ষেত্রে হয়তো এতটা আলোচনা হত না।