Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

একাকী অবস্থায় হার্ট অ্যাটাক ভুল নয়, সঠিক সিদ্ধান্তই পারে জীবন বাঁচাতে

সচেতন থাকলে বিপদের মুহূর্তেও আপনি অসহায় নন। হার্ট অ্যাটাক পুরোপুরি ঠেকানো না গেলেও, সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত ও কিছু জরুরি পদক্ষেপ তার ভয়াবহতা কমাতে পারে এবং প্রাণরক্ষার সম্ভাবনা অনেকটাই বাড়িয়ে দিতে পারে।

বাড়িতে একা থাকাকালীন হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক—এই আশঙ্কা কি সত্যিই উড়িয়ে দেওয়া যায়? চিকিৎসকদের মতে, বয়স, জীবনযাপন ও শারীরিক সমস্যার উপর নির্ভর করে এই ঝুঁকি একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, ধূমপানের অভ্যাস বা পারিবারিক হৃদ্‌রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা আরও বেশি প্রয়োজন। অনেক সময়ই হার্ট অ্যাটাক কোনও পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই ঘটে যায়। তখন যদি আশপাশে কেউ না থাকেন, পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।

তবে চিকিৎসকেরা একবাক্যে বলছেন, সচেতন থাকলে বিপদের মুহূর্তেও আপনি সম্পূর্ণ অসহায় নন। হার্ট অ্যাটাক পুরোপুরি রোধ করা সব সময় সম্ভব না হলেও, সঠিক সময়ে নেওয়া কয়েকটি সিদ্ধান্ত তার ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে এবং জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দিতে পারে। সমস্যা হল, আতঙ্কের মুহূর্তে বেশিরভাগ মানুষই কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না। বুক ধড়ফড় করা, শ্বাসকষ্ট, ঘাম, মাথা ঘোরা বা বুকের মাঝখানে তীব্র চাপ—এই উপসর্গগুলির সঙ্গে সঙ্গে ভয় ও উৎকণ্ঠা আরও বাড়িয়ে তোলে পরিস্থিতিকে।

হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, হার্ট অ্যাটাকের সময় প্রথম কয়েক মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়টুকুতে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তার উপরই অনেকটা নির্ভর করে রোগীর ভবিষ্যৎ। তাই আগে থেকেই কিছু বিষয় জেনে রাখা ও মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকা অত্যন্ত জরুরি।

সবচেয়ে আগে যেটা করতে হবে, তা হল সাহায্যের জন্য খবর দেওয়া। অনেকেই ভাবেন, “একটু পরে ফোন করব”, “হয়তো ঠিক হয়ে যাবে”—এই ভেবে সময় নষ্ট করেন। কিন্তু এটিই সবচেয়ে বড় ভুল। বুকের ব্যথা বা অস্বস্তি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরিবারের কোনও সদস্য, কাছের আত্মীয় বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে ফোন করে জানাতে হবে। সবচেয়ে ভাল হয়, যদি পাশের প্রতিবেশীদের ডাকতে পারেন। কারণ তাঁরাই সবচেয়ে দ্রুত আপনার কাছে পৌঁছোতে পারবেন। ফোনে কথা বলার সময় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে জানান, দরজা খোলার ব্যবস্থা করছেন কি না সেটাও বলুন।

হৃদ্‌রোগ চিকিৎসকদের মতে, সাহায্যের জন্য খবর দেওয়ার পরেই বাড়ির দরজা খুলে রাখা অত্যন্ত জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোগী সাহায্য আসার আগেই অজ্ঞান হয়ে যান। তখন দরজা বন্ধ থাকলে উদ্ধারকাজে দেরি হয়ে যেতে পারে। দরজা খোলা থাকলে প্রতিবেশী, আত্মীয় বা অ্যাম্বুল্যান্স কর্মীরা দ্রুত ভিতরে ঢুকতে পারবেন। এই একটি ছোট সিদ্ধান্তই অনেক সময় জীবন ও মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দেয়।

এর পরের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল ওষুধ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। চিকিৎসকেরা অনেক ক্ষেত্রেই পরামর্শ দেন, যদি অ্যাসপিরিনে অ্যালার্জি না থাকে এবং আগে থেকে কোনও নিষেধাজ্ঞা না দেওয়া হয়ে থাকে, তবে একটি অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়া যেতে পারে। এখানে মনে রাখা দরকার, গিলে খেলে হবে না—চিবিয়ে খেতে হবে, যাতে দ্রুত কাজ করে। অ্যাসপিরিন রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা কমাতে সাহায্য করে, ফলে হার্টের রক্তনালিতে বাধা কিছুটা হলেও কমতে পারে। তবে চিকিৎসকেরা বারবার সতর্ক করছেন, এটি কোনও ভাবেই চিকিৎসার বিকল্প নয়। এটি শুধুমাত্র জরুরি মুহূর্তে সাময়িক সাহায্য করতে পারে, তার বেশি কিছু নয়।

সাহায্য চাওয়া ও প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়ার পরেও যদি কেউ তৎক্ষণাৎ না পৌঁছোন, তা হলে একা একা চুপ করে বসে থাকা ঠিক নয়। কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলতে থাকুন। এতে মানসিক ভাবে কিছুটা স্থির থাকা যায়। ভয় ও উৎকণ্ঠা কমলে শরীরের উপর চাপও খানিকটা কমে। পাশাপাশি ফোনে থাকা মানুষটি প্রয়োজনে জরুরি পরিষেবা বা অন্য কারও সঙ্গে যোগাযোগ রেখে আপনাকে সাহায্য করতে পারেন।

এই সময় শরীরের অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দাঁড়িয়ে থাকা বা হাঁটাহাঁটি করা একেবারেই উচিত নয়। এতে হঠাৎ মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, ফলে মাথায় গুরুতর চোট লাগতে পারে। চিকিৎসকেরা সাধারণত বসে বা শুয়ে থাকার পরামর্শ দেন। এমন ভঙ্গিতে থাকুন, যাতে শরীরের উপর চাপ কম পড়ে এবং শ্বাস নিতে তুলনামূলক সুবিধা হয়। যদি মনে হয় জ্ঞান চলে যেতে পারে, তা হলে নিরাপদ জায়গায় শুয়ে পড়াই সবচেয়ে ভাল।

অনেকেই মনে করেন, হার্ট অ্যাটাক মানেই তীব্র বুকের ব্যথা। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, সব ক্ষেত্রে উপসর্গ এক রকম হয় না। কারও কারও ক্ষেত্রে বুকের মাঝখানে চাপ বা জ্বালাপোড়া হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে ব্যথা ছড়িয়ে যেতে পারে বাঁ হাত, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে। অনেক সময় শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বমি ভাব বা অস্বাভাবিক দুর্বলতাও হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে উপসর্গ অনেক সময় অস্পষ্ট হয়, ফলে তাঁরা বিষয়টিকে গ্যাস বা সাধারণ অসুস্থতা ভেবে অবহেলা করেন। এই অবহেলাই পরে মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

news image
আরও খবর

তাই চিকিৎসকদের স্পষ্ট পরামর্শ—নিজের শরীরের ভাষা বুঝতে শিখুন। আগে কখনও যে ধরনের অস্বস্তি হয়নি, হঠাৎ যদি তা শুরু হয়, তা হলে সেটিকে হালকা ভাবে নেবেন না। বাড়িতে একা থাকলে এই সতর্কতা আরও বেশি প্রয়োজন। আগেভাগে প্রয়োজনীয় ফোন নম্বরগুলো হাতের কাছে রাখা, মোবাইল চার্জ দেওয়া রাখা, প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা—এই সব ছোট প্রস্তুতি বিপদের সময় বড় কাজে আসতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতারও কোনও বিকল্প নেই। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়া, ধূমপান ও মদ্যপান এড়িয়ে চলা, সুষম খাদ্যাভ্যাস ও পর্যাপ্ত শরীরচর্চা—এই সব কিছুই হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। তবে বাস্তবতা হল, সব সতর্কতার পরেও ঝুঁকি একেবারে শূন্যে নামানো যায় না। সেই কারণেই বিপদের মুহূর্তে কী করতে হবে, তা আগে থেকেই জেনে রাখা জরুরি।

চিকিৎসকদের মতে, হার্ট অ্যাটাকের সময় শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক অবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই মুহূর্তে আতঙ্কই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় শত্রু। হঠাৎ বুকের ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অস্বস্তি শুরু হলেই অনেকেই ভয় পেয়ে যান, মাথায় নানা নেতিবাচক চিন্তা ভিড় করতে থাকে। এই ভয় ও উৎকণ্ঠার ফলেই হৃদ্‌স্পন্দন অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যায়, রক্তচাপ দ্রুত ওঠানামা শুরু করে এবং শরীরের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং হার্টের ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়তে থাকে।

এই কারণেই চিকিৎসকেরা বারবার জোর দিয়ে বলেন, হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা দেখা দিলে যতটা সম্ভব নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে। ভয় পাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ভয়কে নিয়ন্ত্রণে আনাটাই সবচেয়ে জরুরি। ধীরে, গভীর ভাবে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করলে শরীরের অক্সিজেন সরবরাহ কিছুটা হলেও স্বাভাবিক থাকে এবং স্নায়ুর উপর চাপ কমে। দ্রুত ও এলোমেলো শ্বাস-প্রশ্বাস পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলতে পারে।

এমন সময় কারও সঙ্গে কথা বলাও অত্যন্ত উপকারী। পরিবারের সদস্য, বন্ধু বা প্রতিবেশীর সঙ্গে ফোনে কথা বলতে থাকলে একা থাকার আতঙ্ক অনেকটাই কমে যায়। মানসিক ভাবে স্থির থাকা সহজ হয় এবং প্রয়োজনে সেই ব্যক্তি জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে আপনাকে সাহায্য করতে পারেন। চিকিৎসকদের মতে, মানসিক সমর্থন অনেক সময় ওষুধের মতোই কাজ করে—বিশেষ করে সংকটের মুহূর্তে।

শরীরের ভঙ্গিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দাঁড়িয়ে থাকা বা অস্থির ভাবে এদিক-ওদিক হাঁটাচলা করা বিপজ্জনক হতে পারে। এতে হঠাৎ মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যার ফলে গুরুতর চোট লাগতে পারে। তাই নিরাপদ জায়গায় বসে বা শুয়ে থাকা সবচেয়ে ভালো। এতে শরীরের উপর চাপ কম পড়ে এবং হৃদ্‌যন্ত্র কিছুটা স্বস্তি পায়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বাড়িতে একা থাকাকালীন হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি থাকলেও, সচেতনতা ও সঠিক সিদ্ধান্ত অনেকটাই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। কয়েক মিনিটের প্রস্তুতি, কিছু জরুরি জ্ঞান আর মাথা ঠান্ডা রেখে নেওয়া সিদ্ধান্ত—এই তিনের জোরেই বহু ক্ষেত্রে প্রাণরক্ষা সম্ভব হয়। আগেভাগে জানা থাকলে আতঙ্ক কম হয়, আর আতঙ্ক কম হলে বিপদও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

তাই ভয় নয়, সচেতনতা আর প্রস্তুতিই হোক আপনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। নিজের শরীরকে বোঝার অভ্যাস গড়ে তুলুন, বিপদের সময় কী করবেন তা আগেই জেনে রাখুন এবং মনে রাখুন—সঠিক সময়ে নেওয়া একটি সিদ্ধান্তই অনেক সময় অমূল্য জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে।

Preview image