Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

৪০ লক্ষ টাকার গোবিন্দভোগ চাল ভরা লরি হুগলিতে উদ্ধার, নদিয়ায় গ্রেফতার চালক!

বর্ধমান থেকে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া গোবিন্দভোগ চাল বোঝাই একটি লরি অবশেষে হুগলি জেলা থেকে উদ্ধার করল পুলিশ। তদন্তে উঠে আসে চাল চুরির ছক। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে নদিয়া থেকে লরির চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুরো ঘটনার পেছনে আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

বর্ধমান থেকে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া গোবিন্দভোগ চাল বোঝাই একটি লরি ঘিরে চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এল রাজ্য পুলিশের তদন্তে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর হুগলি জেলা থেকে ওই লরিটি উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে নদিয়া জেলা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে লরির চালককে। এই ঘটনার জেরে খাদ্য পরিবহণ, চালের কালোবাজারি ও আন্তঃজেলা অপরাধচক্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পুরো ঘটনাটি কোনও সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং পূর্বপরিকল্পিত চুরির ছক থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে। কয়েক দিনের অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ ও নানা জল্পনার পর অবশেষে হুগলি জেলা থেকে উদ্ধার হয় চাল বোঝাই সেই লরি। একই সঙ্গে নদিয়া জেলা থেকে গ্রেফতার করা হয় লরির চালককে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের খাদ্য পরিবহণ ব্যবস্থা, চালের কালোবাজারি এবং আন্তঃজেলা অপরাধচক্র নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত বর্ধমান থেকে। জেলার একটি চালকল থেকে বিপুল পরিমাণ গোবিন্দভোগ চাল বোঝাই একটি লরি নির্দিষ্ট গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেয়। সাধারণত এই ধরনের চাল পরিবহণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছনোর কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও লরিটির কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। চালকল কর্তৃপক্ষ প্রথমে বিষয়টিকে যোগাযোগ বিভ্রাট বা যান্ত্রিক সমস্যার ফল বলে মনে করলেও সময় যত গড়াতে থাকে, ততই সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত চালকল কর্তৃপক্ষ পুলিশের দ্বারস্থ হয় এবং নিখোঁজের অভিযোগ দায়ের করে।

অভিযোগ পাওয়ার পরেই বর্ধমান জেলা পুলিশ তদন্তে নামে। প্রথম ধাপে লরিটির গতিবিধি খতিয়ে দেখা হয়। মোবাইল টাওয়ার লোকেশন, জিপিএস ট্র্যাকিং ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখতে শুরু করে পুলিশ। তদন্তে উঠে আসে, বর্ধমান ছাড়ার পর লরিটি তার নির্ধারিত রুট থেকে বিচ্যুত হয়েছিল। এই তথ্য সামনে আসতেই পুলিশের সন্দেহ আরও গভীর হয়। সাধারণ দুর্ঘটনা হলে লরির অবস্থান সম্পর্কে অন্তত কোনও না কোনও সূত্র পাওয়া যেত, কিন্তু এখানে তা মিলছিল না। চালকল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্ধারিত নিয়ম মেনেই সমস্ত নথিপত্র প্রস্তুত করা হয়েছিল এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই গন্তব্যে পৌঁছনোর কথা ছিল লরিটির। কিন্তু সময় গড়িয়ে গেলেও লরিটি গন্তব্যে পৌঁছয়নি। প্রথমে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও চালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। এরপর থেকেই সন্দেহ ঘনীভূত হতে শুরু করে।

তদন্তের পরবর্তী পর্যায়ে জানা যায়, লরিটি শেষবার হুগলি জেলার দিকে যেতে দেখা গিয়েছিল। সেই সূত্র ধরে হুগলি জেলা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে যৌথভাবে অনুসন্ধান শুরু করা হয়। একাধিক এলাকায় তল্লাশি চালানোর পর অবশেষে হুগলি জেলার একটি নির্জন এলাকায় লরিটি উদ্ধার হয়। যদিও উদ্ধার হওয়ার সময় লরির অবস্থার মধ্যে একাধিক অসঙ্গতি নজরে আসে। চালের বস্তাগুলির অবস্থান, লরির নম্বর প্লেট এবং কিছু নথিপত্র দেখে পুলিশের অনুমান, চালের একটি বড় অংশ সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও যখন কোনও খোঁজ মেলেনি, তখন বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়। অবশেষে বর্ধমান থানায় নিখোঁজ সংক্রান্ত লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগ পাওয়ার পরেই পুলিশ দ্রুত তদন্তে নামে এবং বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে।

লরি উদ্ধারের পর পুলিশের নজর পড়ে চালকের দিকে। চালক ঘটনার পর থেকেই পলাতক ছিল। তদন্তে জানা যায়, সে নদিয়া জেলার বাসিন্দা। সেই সূত্র ধরে নদিয়া জেলায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ চালককে গ্রেফতার করে। জেরায় চালক প্রথমে অসঙ্গতিপূর্ণ বক্তব্য দিলেও পরে ধীরে ধীরে পুলিশের সন্দেহ আরও জোরালো হয়। পুলিশ সূত্রে খবর, চালকের বক্তব্যে একাধিক ফাঁকফোকর রয়েছে, যা থেকে বোঝা যাচ্ছে সে একা নয়, বরং একটি বড় চক্রের অংশ হতে পারে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোবিন্দভোগ চালের বাজার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গোবিন্দভোগ চাল পশ্চিমবঙ্গের একটি জনপ্রিয় ও মূল্যবান চাল। উৎসব, অনুষ্ঠান ও বিশেষ উপলক্ষে এই চালের চাহিদা ব্যাপক। ফলে বাজারমূল্যও তুলনামূলকভাবে বেশি। পুলিশের একাংশের অনুমান, এই চাল কালোবাজারে বিক্রি করার উদ্দেশ্যেই লরিটি গায়েব করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আন্তঃজেলা চক্রের মাধ্যমে চাল অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ছক কষা হয়েছিল বলে ধারণা। পাশাপাশি চালকের মোবাইল ফোনের কল ডিটেলস এবং শেষ লোকেশন ট্র্যাক করা শুরু হয়। তদন্তকারীরা লক্ষ্য করেন, লরিটি তার নির্ধারিত রুট ছেড়ে অন্য দিকে চলে গিয়েছিল। এই তথ্য থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা নয়।

তদন্তকারীরা মনে করছেন, শুধুমাত্র চালক গ্রেফতার হওয়ায় পুরো ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন শেষ হয়ে যায়নি। চালকল থেকে লরি বেরোনোর পর কোন কোন জায়গায় থেমেছিল, কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, কার নির্দেশে রুট পরিবর্তন করা হয়েছিল—এই সব প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। পুলিশের একটি বিশেষ দল এই বিষয়গুলি খতিয়ে দেখছে। মোবাইল কল ডিটেলস, আর্থিক লেনদেন এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের খোঁজে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

লরি উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দারাও বিষয়টি নিয়ে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। পুলিশ লরিটি আটক করে বিস্তারিত পরীক্ষা শুরু করে। নম্বর প্লেট, কাগজপত্র এবং চালের পরিমাণ যাচাই করা হয়। একই সঙ্গে শুরু হয় চালকের খোঁজ। কারণ, লরি উদ্ধারের সময় চালক সেখানে উপস্থিত ছিল না।

news image
আরও খবর

তদন্তে জানা যায়, চালক নদিয়া জেলার বাসিন্দা। সেই সূত্র ধরেই নদিয়া জেলায় অভিযান চালানো হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর অবশেষে চালককে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারের পর তাকে বর্ধমানে এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। প্রাথমিক জেরায় চালক নানা অসঙ্গতিপূর্ণ বক্তব্য দেয়। কখনও সে দাবি করে লরি যান্ত্রিক সমস্যায় পড়েছিল, আবার কখনও বলে সে অন্যত্র গিয়েছিল সাহায্য আনতে।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, চালকের বক্তব্যে একাধিক গরমিল রয়েছে। তার মোবাইল ফোনের কল ডিটেলস বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, নিখোঁজ হওয়ার সময় সে একাধিক সন্দেহজনক নম্বরে ফোন করেছিল। তদন্তকারীরা মনে করছেন, চালক একা এই কাজ করেনি। বরং এর পিছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় থাকতে পারে, যারা গোবিন্দভোগ চাল কালোবাজারে বিক্রি করার পরিকল্পনা করেছিল।

এই ঘটনার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলেও। চালকল মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে চাল পরিবহণ নিয়ে একাধিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কখনও চুরি, কখনও প্রতারণা—সব মিলিয়ে পরিবহণ ব্যবস্থা আরও নিরাপদ করার দাবি উঠছে। অনেক চালকল মালিকই চাইছেন, বাধ্যতামূলক জিপিএস ট্র্যাকিং এবং নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থা আরও কঠোর করা হোক।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এই ঘটনাকে ঘিরে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এ ধরনের অপরাধ রুখতে হলে শুধু পুলিশি তৎপরতা নয়, প্রশাসনিক নজরদারিও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে খাদ্যশস্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে পরিবহণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

পুলিশ সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, উদ্ধার হওয়া চালের পরিমাণ ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা হচ্ছে। চালের মান পরীক্ষা করে দেখা হবে কোনওভাবে ভেজাল বা অন্য চালের সঙ্গে মেশানো হয়েছে কি না। যদি প্রমাণ মেলে যে চালের একটি অংশ ইতিমধ্যেই বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে, তাহলে সেই সূত্র ধরে আরও অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হতে পারে।

আইনগত দিক থেকেও এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। চুরি, প্রতারণা এবং বিশ্বাসভঙ্গের একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। প্রয়োজনে অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির উপর ভিত্তি করে মামলায় আরও ধারার সংযোজন হতে পারে।

সামগ্রিকভাবে এই ঘটনা রাজ্যের খাদ্য পরিবহণ ব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলিকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। একদিকে যেমন পুলিশের তৎপরতায় লরি উদ্ধার ও চালক গ্রেফতার সম্ভব হয়েছে, তেমনই অন্যদিকে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই ধরনের ঘটনা বারবার কেন ঘটছে। প্রশাসনের একাংশ মনে করছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং পরিবহণ সংক্রান্ত নিয়ম আরও কড়া করলেই ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি কমানো সম্ভব।

বর্তমানে অভিযুক্ত চালক পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করে পুরো চক্রের পর্দাফাঁস করার চেষ্টা চলছে। পুলিশ আশাবাদী, আগামী দিনে এই তদন্তের মাধ্যমে শুধু এই একটি ঘটনাই নয়, বরং বৃহত্তর চাল চুরি ও কালোবাজারি চক্রের অনেক অজানা দিক সামনে আসবে। রাজ্য জুড়ে খাদ্যশস্য পরিবহণ ব্যবস্থার নিরাপত্তা জোরদার করার দিকেও নজর দেওয়া হবে বলে প্রশাসন সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।

Preview image