Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ফেলুদা থেকে একেনবাবু নতুন যাত্রার ইঙ্গিত অভিনেতার কথায়

বড়দিনে দর্শকদের জন্য মুঠোফোনের পর্দায় ফিরছে ফেলুদা পাহাড় পর্বত পেরিয়ে তিনমূর্তি জঙ্গলের রহস্যে নতুন পটভূমিকা নতুন পরিচালক ও চেনা ফেলুদার নতুন অভিযানের হাতছানি।

নিয়ম ভাঙা বড়দিন, রহস্যের নতুন ঠিকানা, আর তার মধ্যেই হালকা রসিকতা, স্মৃতিচারণ ও বন্ধুত্বের উষ্ণতা—এই সব মিলিয়েই আবার ফিরছে ‘ফেলুদা’। পুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই বাঙালির প্রিয় গোয়েন্দার নতুন অভিযানের খোঁজখবর শুরু হয়ে গিয়েছে। সামনে মাঘ মাস, বিয়ের লগ্ন—আর তার মাঝেই আলোচনায় উঠে এসেছে এক অদ্ভুত কিন্তু মজার প্রশ্ন: ফেলুদার কি বিয়ে হবে? হলে পাত্রী কেমন? সেই প্রসঙ্গেই খোলামেলা আড্ডায় মুখোমুখি ‘ফেলু মিত্তির’ টোটা রায়চৌধুরী ও ‘জটায়ু’ অনির্বাণ চক্রবর্তী।

এ বছরের বড়দিনে ফেলুদা কোথায় কেক কাটবেন—সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে, না কি কলকাতার চেনা ছাদেই? এই প্রশ্নে টোটার হাসিখুশি উত্তর, “হলে মন্দ হত না।” কিন্তু অনির্বাণ বাস্তববাদী—“না, কলকাতাতেই হবে মনে হচ্ছে।” এই ছোট্ট কথোপকথনেই ধরা পড়ে দুই অভিনেতার স্বভাবগত পার্থক্য। একজন স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন, অন্যজন মাটিতে পা রেখেই রসিকতা করেন। আর সেই রসায়নেই আজকের ‘ফেলুদা অ্যান্ড কোং’ এতটা আপন।

আড্ডার মাঝেই উঠে এল বাস্তব জীবনের এক গুরুতর ঘটনা। সদ্য একটি বড়সড় দুর্ঘটনা কাটিয়ে উঠেছেন অনির্বাণ চক্রবর্তী। সেই সময় ফেলুদা—অর্থাৎ টোটা—খবর পেয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে টোটা জানান, সকাল সকাল ফোন করেছিলেন। অনির্বাণের কণ্ঠে তখন আশ্বাস—চিন্তার কারণ নেই, সব ঠিক আছে। কীভাবে ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামলেছেন, সেই বর্ণনায় যেন বাস্তবের জটায়ু আর একেনবাবু একাকার হয়ে যায়। বিপদের মুখেও উপস্থিত বুদ্ধি, দ্রুত সিদ্ধান্ত—এই তো জটায়ুর চিরচেনা বৈশিষ্ট্য।

দুর্ঘটনার পর মনে পড়েছিল কি না ফেলুদার কথা—যদি থাকতেন, ঠিকই বের করে দিতেন, মগনলাল মেঘরাজের কারসাজি কি না? প্রশ্নটা শুনে অনির্বাণের হাসি—ঘাতক বাসটাই যেন মগনলাল! কিন্তু রসিকতার আড়ালে একটা গম্ভীর সত্যও আছে। তিনি জানান, ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামলানোর মতো মানুষ হিসেবেই তিনি নিজেকে তৈরি করেছেন। আর ঝড়ের গতিতে খবর ছড়াতেই প্রথম ফোন এসেছিল ফেলুবাবুর কাছ থেকেই। এই বন্ধুত্ব শুধু পর্দায় নয়, বাস্তবেও অটুট।

ফেলুদা প্রসঙ্গে এলেই তুলনা অনিবার্য। সব্যসাচী চক্রবর্তী বহুবার ফেলুদা হয়েছেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মাত্র দু’বার—কিন্তু সেই দু’টি ছবিই কালজয়ী। টোটাকে প্রশ্ন করা হল, তিনি কি সৌমিত্রকে ছাপিয়ে গিয়েছেন? উত্তরে টোটার স্পষ্টতা ও বিনয়—“সৌমিত্রবাবুর সঙ্গে ‘ছাপিয়ে যাওয়া’ শব্দবন্ধকে দয়া করে এক পঙ্‌ক্তিতে বসাবেন না।” তাঁর কাছে সৌমিত্রর ফেলুদা এক স্বপ্নের মতো। পাঁচবার ফেলুদা হলেও, সৌমিত্রর সেই দুই ছবির উচ্চতা আলাদা। প্রত্যেক বাঙালি অভিনেতার মতো টোটারও স্বপ্ন ছিল ফেলুদা হওয়ার, আর সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের সৌজন্যেই সেই স্বপ্নপূরণ।

জটায়ু চরিত্রেও তুলনা কম হয়নি। এক সময় সন্তোষ দত্তের সঙ্গে অনির্বাণ চক্রবর্তীর তুলনা ছিল প্রায় অবধারিত। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। অনির্বাণ নিজেই বলছেন, সিংহভাগ দর্শক তাঁকে এই চরিত্রে মেনে নিয়েছেন। তবু তুলনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তাঁর মতে, এই তুলনা ছোট করার জন্য নয়। ‘জটায়ু’ মানেই সন্তোষ দত্ত—এই ধারণা বাঙালির মনে গেঁথে আছে। সেই জায়গা থেকে তুলনার মধ্যে দিয়েই সন্তোষ দত্তের সঙ্গে এক পঙ্‌ক্তিতে জায়গা করে নেওয়াটাই সম্মানের।

পাঁচবার ফেলুদা সিরিজ়ে অভিনয়ের পরেও কি নতুন করে প্রস্তুতি নিতে হয়? টোটার জবাবের মধ্যেই অনির্বাণের প্রতি অকুণ্ঠ প্রশংসা—“অনির্বাণের কোনও প্রস্তুতিরই প্রয়োজন নেই।” মুহূর্তে মুড বদলে ফেলা, হাসি থেকে গম্ভীরতায় যাওয়া—এই ম্যাজিকটাই অনির্বাণের। নিজের ক্ষেত্রে টোটা বলেন, তিনি খুঁটিয়ে চিত্রনাট্য পড়েন, পরিচালকের সঙ্গে দৃশ্য নিয়ে আলোচনা করেন, শটের আগে নিজেকে ঝালিয়ে নেন। কিন্তু অনির্বাণ পাল্টা রসিকতায় জানান, টোটারও কোনও কিছুর প্রয়োজন নেই—অভিনয় তো দূরের কথা, ফিটনেসের ক্ষেত্রেও তিনি অনন্য।

এবারের অভিযানে দর্শকের পাশাপাশি অভিনেতাদেরও স্বাদবদল—না কি জায়গাবদল? ট্রেলারে জঙ্গলের দৃশ্যে জটায়ুর চকচকে মুখ দেখে প্রশ্ন উঠেছে। টোটার উত্তর—ওটা সাফল্যের জৌলুস। লালমোহন গাঙ্গুলিই আসলে দলের সবচেয়ে সফল সদস্য—সব বই হিট, গাড়ি চড়ে ঘোরেন, আমন্ত্রণও পান তিনিই। ফেলুদা আর তোপসে নাকি শুধু সঙ্গী। এই আত্মরসিকতা ফেলুদা সিরিজ়ের প্রাণ।

পরিবর্তন এসেছে পরিচালনাতেও। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের জায়গায় এবার দায়িত্বে কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। জায়গা বদল হয়েছে, স্বাদ নয়—এই কথাতেই স্পষ্ট, মূল আত্মা অটুট। ‘রয়্যাল বেঙ্গল রহস্য’-এ প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। বাঘ, সাপ—সবই প্রযুক্তির সাহায্যে। কারণ, আজকের দিনে বন্যপ্রাণী নিয়ে শুট করা আইনত দণ্ডনীয়। তাই বাস্তব আর কল্পনার মেলবন্ধনে প্রযুক্তিই ভরসা।

একই অভিনেতা, দুই গোয়েন্দা—জটায়ু ও একেনবাবু। টোটার চোখে অনির্বাণের অভিনয়গুণেই দুই চরিত্র আলাদা হয়ে ওঠে। জটায়ু সরল, সাদাসিধে; একেনবাবু বুদ্ধিমান, অথচ বাহ্যত উদাসীন। মুখচোখের সূক্ষ্ম পরিবর্তনেই অনির্বাণ এই তফাত গড়ে তুলেছেন। বাহ্যিক মিল থাকলেও চরিত্রগত পার্থক্য স্পষ্ট—এটাই জাত অভিনেতার কৃতিত্ব।

এরপর এল আরও এক মজার প্রশ্ন—অনির্বাণ আর কোন গোয়েন্দা চরিত্রে টোটাকে দেখতে চান? উত্তর অকপট—ফেলুদা ছাড়া আর কোনও গোয়েন্দা চরিত্রে নয়। তবে যদি বলতেই হয়, ব্যোমকেশ। এই কথোপকথন থেকেই ফের ঘুরে আসে বিয়ের প্রসঙ্গ। ধরুন, ব্যোমকেশের মতো ফেলুদাও প্রেমে পড়লেন, তাঁর বিয়ে হল—কেমন পাত্রী পছন্দ? অনির্বাণের রসিকতায় স্পষ্ট, বিয়ের পরেও ফেলুদা-তোপসে-জটায়ুর বন্ধুত্ব ভাঙা চলবে না। ফেলুদা চাইলে দলের চতুর্থ সদস্য আনতেই পারেন, কিন্তু “ওগো, তুমি শুধুই আমার”—এই দাবি মানা হবে না!

news image
আরও খবর

শেষমেশ ‘ফেলুদি’ কেমন হবেন? টোটার হাসিমাখা উত্তর—ফেলুদা চিরকুমার। তোপসে আর জটায়ুর সঙ্গেই সে খুশি। স্বাধীন, ভবঘুরে মন—বাঁধা পড়ার মানুষ নয়। তবু যদি বিয়ের মুহূর্ত আসে, তবে তাঁর পছন্দ ইনোলা হোমস। এই উত্তরের মধ্যেই ফেলুদার চরিত্রভাবনার সারাংশ।

পুজোর দু’মাস পরেই আবার ফেলুদা—ঘন ঘন আগমনে দর্শক প্রতিক্রিয়া কী? টোটার বাস্তববাদী উত্তর—যাঁরা দেখবেন, তাঁরা দেখবেন; যাঁরা নিন্দা করবেন, তাঁরা করবেন। ইতিহাসে একসঙ্গে দু’টি ব্যোমকেশ মুক্তি পেয়েও হিট হয়েছে—এই উদাহরণই যথেষ্ট।

পুরোনো কোন ফেলুদা ছবির নতুন সংস্করণে অভিনয় করতে চান? টোটার পছন্দ ‘টিনটোরেটোর যিশু’। ২০২৭-এ ছবির ২০ বছর পূর্তিতে এই ছবির মাধ্যমেই তিনি সন্দীপ রায়কে শ্রদ্ধা জানাতে চান। কারণ, এই ছবিই তাঁর মধ্যে গোয়েন্দা চরিত্রে অভিনয়ের আগুন জ্বালিয়েছিল। সেখান থেকেই সৃজিতের প্রতিশ্রুতি, আর আজকের ফেলুদা।

সবশেষে সেই বহুচর্চিত প্রশ্ন—জটায়ু কি কখনও ফেলুদা হতে চান? কিংবা ফেলুদা কি একদিন একেনবাবুর সহকারী হবেন? টোটার উত্তরেই যেন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত—“একটা সময়ের পর আমায় ‘ফেলুদা’ চরিত্রের থেকে সরতেই হবে। সে দিন আমি ‘একেনবাবু’র সহকারী হব।” প্রিয় অভিনেতা আর প্রিয় চরিত্র—দু’জনকেই কাছে পাওয়ার স্বপ্ন। অনির্বাণ অবশ্য এই ভাবনাতেই আপত্তি জানান—কেউ মানবে না, তিনি নিজেও না। কারণ, একেন চরিত্রের ভাবনাতেই বলা হয়েছিল—জটায়ু ফেলুদা হলে যা হবে, সেটাই একেন। কী জটিল, কী সুন্দর এই অভিনয়জগতের অঙ্ক!

এই আড্ডা শুধু একটি ছবির প্রচার নয়—এ এক বন্ধুত্বের গল্প, অভিনয়ের প্রতি দায়বদ্ধতা, আর বাঙালির চিরকালীন গোয়েন্দা-ভালবাসার প্রতিচ্ছবি। ফেলুদা থাকবেন, জটায়ু থাকবেন, তোপসেও থাকবে—রূপ বদলাতে পারে, জায়গা বদলাতে পারে, কিন্তু রহস্যের আকর্ষণ আর বন্ধুত্বের উষ্ণতা ঠিকই অটুট থাকবে।

এই বন্ধুত্বের গল্প আসলে বহু প্রজন্মের বাঙালি দর্শকের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ফেলুদা, জটায়ু আর তোপসে—এই তিন নাম একসঙ্গে এলেই মনে পড়ে যায় শৈশবের বই পড়া, রেডিও নাটক শোনা বা টিভির সামনে বসে রহস্যের জট খুলতে থাকা। সময় বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, বড়পর্দা থেকে ওটিটি—সবই এসেছে, কিন্তু এই তিন চরিত্রের রসায়ন আজও অটুট। টোটা রায়চৌধুরী আর অনির্বাণ চক্রবর্তীর কথোপকথনে সেই উত্তরাধিকারই নতুন করে ধরা পড়ে।

এই আড্ডায় কোনও প্রতিযোগিতা নেই, আছে পারস্পরিক সম্মান। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সব্যসাচী চক্রবর্তীর নাম এলেও কোথাও ঈর্ষা বা তুলনার তিক্ততা নেই। বরং আছে পূর্বসূরিদের প্রতি শ্রদ্ধা আর নিজেদের জায়গা বোঝার পরিণত মনোভাব। এই পরিণতিবোধই হয়তো আজকের ফেলুদাকে আলাদা করে চিহ্নিত করে। চরিত্রের ভার বইতে গিয়ে ব্যক্তিগত অহংকে দূরে রাখার যে মানসিকতা, তা অভিনয়ের ক্ষেত্রেও বিরল।

একই সঙ্গে এই আড্ডা মনে করিয়ে দেয়, ফেলুদা কেবল একজন গোয়েন্দা চরিত্র নয়, সে এক জীবনদর্শন। যুক্তিবাদী মন, স্বাধীন চিন্তা, বন্ধুত্বের প্রতি দায়—এই সবই তাকে আজও প্রাসঙ্গিক করে তোলে। তাই তার বিয়ে হবে কি না, কোথায় কেক কাটবে—এই সব প্রশ্নে দর্শকের কৌতূহল শেষ হয় না। কারণ ফেলুদার জীবনের প্রতিটি সম্ভাবনাই বাঙালির কল্পনায় জায়গা করে নেয়।

জটায়ু আর তোপসের ভূমিকাও তেমনই অপরিহার্য। এক জনের হাস্যরস, অন্য জনের কৌতূহল আর পর্যবেক্ষণ—এই দুইয়ের সংযোগেই ফেলুদার যুক্তি পূর্ণতা পায়। তাই এই চরিত্রগুলো আলাদা করে ভাবাই যায় না। সময়ের সঙ্গে নতুন পরিচালক আসবেন, প্রযুক্তি বদলাবে, গল্পের প্রেক্ষাপট বদলাবে—তবু এই ত্রয়ীর বন্ধনই সিরিজ়ের প্রাণশক্তি।

এই কারণেই প্রতিটি নতুন ফেলুদা শুধু নতুন রহস্য নয়, বরং পুরনো স্মৃতির সঙ্গে নতুন অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন। আর সেই মেলবন্ধন যত দিন বাঙালির মনে জায়গা করে থাকবে, তত দিন ফেলুদা অ্যান্ড কোং ফিরেই আসবে—নতুন রূপে, নতুন পথে, কিন্তু চেনা উষ্ণতায়।

Preview image