একসময় মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হিমশিম খেয়েছিলেন কাজল টানা তিন বছর নিসার সঙ্গে ঠিকমতো কথা হত না অভিনেত্রীর।
বলিউড অভিনেত্রী কাজল বরাবরই পরিবারকেন্দ্রিক মানুষ হিসেবে পরিচিত। স্বামী অজয় দেবগন এবং দুই সন্তান নিসা ও যুগকে ঘিরেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বড় অংশ আবর্তিত হয়। যদিও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রায়ই থাকেন তাঁর মেয়ে নিসা দেবগন। সমাজমাধ্যমে নানা কারণে বারবার ট্রোলিং, সমালোচনা ও কটাক্ষের শিকার হতে হয় নিসাকে। তবে মা হিসেবে কাজল সব সময় মেয়ের পাশে থেকেছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে গিয়ে কাজল জানান, একটা সময় এমন গিয়েছে যখন নিসার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়েছিল।
অভিনেত্রীর কথায়, তাঁর চোখে নিসা ও যুগ এই পৃথিবীর সেরা সন্তান। কিন্তু মা-মেয়ের সম্পর্ক সব সময় যে মসৃণ ছিল, তা নয়। কাজল জানান, নিসা যখন ১২ বছরে পা দেয়, তখন থেকেই শুরু হয় মতের অমিল। কিশোর বয়সে পা রাখার পর নিসার ভাবনা, জীবনযাপন ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরনে পরিবর্তন আসে। অন্যদিকে কাজল একজন অভিভাবক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে মেয়েকে বোঝাতে চাইতেন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় দূরত্ব।
কাজল বলেন, নিসা ‘জেন জ়ি’ প্রজন্মের মেয়ে। ফলে মা ও মেয়ের চিন্তাভাবনায় পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ব্যবধান কখনও কখনও বড় আকার নেয়। কথায় কথায় মতবিরোধ, তর্ক, ঝগড়া—সব মিলিয়ে প্রায় তিন বছর সময় কেটেছে টানাপোড়েনের মধ্যে। অভিনেত্রী স্বীকার করেন, সেই সময় তিনি মেয়েকে ঠিকভাবে বুঝতে পারতেন না। অন্যদিকে নিসাও হয়তো নিজের মতামত প্রতিষ্ঠা করতে চাইত।
তবে পরিস্থিতি যখন জটিল হতে থাকে, তখন একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হিসেবে নিজেই বদলানোর সিদ্ধান্ত নেন কাজল। তিনি বুঝতে পারেন, সব সময় অভিভাবকের মতো উপদেশ দিলে সম্পর্কের দূরত্ব আরও বাড়তে পারে। তাই ঝগড়া না করে, ধৈর্য ধরে কথা বলার পথ বেছে নেন অভিনেত্রী। কাজলের কথায়, তিনি ঠিক করেন যত দিন না নিসা তাঁর কথা শুনতে রাজি হচ্ছে, তত দিন তিনিই চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
এই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় মা-মেয়ের সম্পর্কের সমীকরণ। সময়ের সঙ্গে ঝগড়ার জায়গা নেয় আলোচনা। মতবিরোধের জায়গা নেয় বোঝাপড়া। কাজল জানান, তিনি মেয়ের পাশে বসে তার কথা শুনতেন, নিজের মত চাপিয়ে না দিয়ে নিসার অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতেন। আর সেই ছোট পরিবর্তনই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
অভিনেত্রীর মতে, সন্তানকে শুধু শেখানো নয়, তার কথা মন দিয়ে শোনাও সমান জরুরি। সন্তান যখন বড় হয়, তখন তার নিজস্ব মতামত, অনুভূতি ও স্বাধীনতা তৈরি হয়। সেই জায়গাকে সম্মান জানানোই একজন অভিভাবকের দায়িত্ব। কাজল বলেন, এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলির একটি।
বর্তমানে নিসা দেবগন ও কাজলের সম্পর্ক অনেকটাই স্বাভাবিক এবং বন্ধুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন অনুষ্ঠান, পারিবারিক মুহূর্ত ও সামাজিক মাধ্যমে মা-মেয়ের সুন্দর বোঝাপড়ার ছবি ধরা পড়ে। কাজলের এই স্বীকারোক্তি অনেক অভিভাবকের কাছেই শিক্ষণীয়, কারণ কিশোর বয়সে সন্তানদের সঙ্গে মতের অমিল হওয়া খুবই সাধারণ বিষয়। তবে ধৈর্য, বোঝাপড়া এবং কথোপকথনের মাধ্যমে সেই সম্পর্ক আরও গভীর করা সম্ভব।
তারকা পরিবারের সদস্য হওয়ায় নিসা দেবগন ছোটবেলা থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছেন। বলিউড তারকা Kajol ও Ajay Devgn-এর মেয়ে হওয়ায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও বরাবর কৌতূহল বেশি। সাধারণ তারকাসন্তানদের মতো নিসাকেও প্রায়ই সমাজমাধ্যমে সমালোচনা, কটাক্ষ এবং নানা ধরনের মন্তব্যের মুখে পড়তে হয়েছে। কখনও তাঁর পোশাক নিয়ে আলোচনা হয়েছে, কখনও বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আবার কখনও জীবনযাপনের ধরন নিয়েও ট্রোল করা হয়েছে। আলোচনার এই চাপ অনেক সময় একজন তরুণীর জন্য মানসিকভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে মা হিসেবে Kajol সব সময় মেয়ের পাশে থেকেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বাইরের মানুষের মতামত বা সমাজমাধ্যমের নেতিবাচক মন্তব্য তাঁর কাছে বিশেষ গুরুত্ব পায় না। তাঁর কাছে নিসা শুধুমাত্র একজন তারকা পরিবারের সদস্য নন, বরং একজন সংবেদনশীল, বুদ্ধিমান এবং ভালো মনের মানুষ। একজন মা হিসেবে মেয়ের ব্যক্তিত্ব, অনুভূতি এবং মূল্যবোধকেই তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। কাজলের এই বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি নিসাকে তারকা পরিচয়ের চেয়ে একজন মানুষ হিসেবে দেখেন।
নিসার বেড়ে ওঠার সময়টা সহজ ছিল না। আলোচনার কেন্দ্রে থাকা মানে প্রতিটি পদক্ষেপ নজরে আসা। সাধারণ তরুণ-তরুণীরা যেখানে নিজের মতো করে ভুল-শুদ্ধ শিখে বড় হওয়ার সুযোগ পায়, সেখানে তারকা পরিবারের সন্তানদের অনেক সময় সেই স্বাধীনতা থাকে না। কারণ তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে জনসমক্ষে বিচার শুরু হয়ে যায়। নিসার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু কাজল সব সময় চেষ্টা করেছেন মেয়েকে স্বাভাবিক পরিবেশে বড় করতে এবং আত্মবিশ্বাসী হতে শেখাতে।
কাজলের বক্তব্য শুধু তারকা পরিবারের অভিজ্ঞতার গল্প নয়, বরং আধুনিক সময়ের মা-মেয়ের সম্পর্কের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। বর্তমান সময়ে প্রজন্মের ফারাক একটি বড় বিষয়। বাবা-মায়ের ভাবনা, জীবনদর্শন ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের স্বাধীন চিন্তা, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন ও আত্মপ্রকাশের ধরনে অনেক পার্থক্য থাকে। ফলে মতের অমিল হওয়া খুবই স্বাভাবিক। অনেক পরিবারেই দেখা যায়, ছোটখাটো বিষয় থেকে বড় তর্কের সৃষ্টি হয়। কিন্তু সম্পর্ক টিকে থাকে তখনই, যখন উভয় পক্ষ একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করে।
মা-মেয়ের সম্পর্ক বিশেষভাবে আবেগঘন। কখনও বন্ধুর মতো, কখনও অভিভাবকের মতো, আবার কখনও পরামর্শদাতার মতো এই সম্পর্ক বদলে যায় সময়ের সঙ্গে। কিশোর বয়সে সন্তানরা যখন নিজের পরিচয় গড়তে শুরু করে, তখন স্বাধীনতার চাহিদা বাড়ে। অন্যদিকে মা-বাবা সন্তানকে নিরাপদ রাখতে চান। এই দুই মানসিকতার সংঘাত থেকেই অনেক সময় দূরত্ব তৈরি হয়। কাজল ও নিসার সম্পর্কেও এমন পরিস্থিতি এসেছিল বলে তিনি স্বীকার করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বোঝাপড়া, ধৈর্য এবং ভালোবাসাই সেই দূরত্ব কমিয়েছে।
আজকের সময়ে সন্তানদের শুধু নির্দেশ দিলেই চলে না, তাদের কথা শোনাও সমান জরুরি। কাজলের অভিজ্ঞতা সেই কথাই সামনে আনে। তিনি বুঝেছেন, সব সময় উপদেশ দেওয়ার বদলে সন্তানের অনুভূতি বোঝা প্রয়োজন। নিসার পাশে বসে তাঁর কথা শোনা, মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দেওয়া—এই ছোট ছোট পদক্ষেপই মা-মেয়ের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছে।
সমাজমাধ্যমের যুগে সম্পর্কের ওপর বাইরের প্রভাবও অনেক বেশি। মানুষ খুব সহজেই মন্তব্য করে ফেলেন, কিন্তু সেই মন্তব্য একজন তরুণ-তরুণীর মনে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা সব সময় ভাবেন না। কাজল এই জায়গায় একজন সুরক্ষাকবচের মতো মেয়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাইরের সমালোচনার চেয়ে পরিবারের সমর্থন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কাজলের এই বক্তব্য বহু পরিবারের জন্য শিক্ষণীয়। সন্তানদের সঙ্গে মতবিরোধ হওয়া অস্বাভাবিক নয়, বরং সেটাই বেড়ে ওঠার অংশ। কিন্তু সেই মতবিরোধকে সংঘাতে না নিয়ে গিয়ে কথোপকথনে বদলে দিতে পারলে সম্পর্ক আরও গভীর হয়। মা-মেয়ের সম্পর্ক হোক বা যে কোনও পারিবারিক বন্ধন, শেষ পর্যন্ত শ্রদ্ধা, ধৈর্য এবং ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
নিসা দেবগনকে ঘিরে যতই আলোচনা, সমালোচনা বা কৌতূহল তৈরি হোক না কেন, মা Kajol-এর কাছে তিনি এখনও স্নেহের মেয়ে। বাইরের পৃথিবী যেখানে কখনও তাঁর পোশাক, কখনও জীবনযাপন, কখনও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো নিয়ে নানা মন্তব্য করে, সেখানে কাজল মেয়েকে দেখেন সম্পূর্ণ অন্য চোখে। তাঁর কাছে নিসার পরিচয় কোনও তারকা পরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, বরং একজন সংবেদনশীল, মমতাময়ী ও বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে।
একজন মা সব সময় সন্তানের এমন দিকগুলোই সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারেন, যা বাইরের মানুষ সহজে দেখতে পান না। সমাজমাধ্যমে যাঁকে ঘিরে নানা আলোচনা চলে, সেই নিসার মধ্যেই কাজল দেখেন মানবিকতা, আন্তরিকতা এবং ভালো মনের পরিচয়। এটাই মা ও সন্তানের সম্পর্কের সবচেয়ে গভীর দিক—যেখানে বিচার নয়, থাকে নিঃশর্ত ভালোবাসা।
তারকা পরিবারের সন্তান হওয়ায় নিসাকে ছোটবেলা থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হয়েছে। সাধারণ তরুণীদের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও তাঁকে নিয়ে তৈরি হয়েছে অতিরিক্ত কৌতূহল। অনেক সময় অযথা সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে। কিন্তু কাজল স্পষ্ট করে দিয়েছেন, বাইরের মতামত তাঁর কাছে বড় নয়। একজন মা হিসেবে তিনি জানেন, তাঁর মেয়ে কেমন মানুষ, কী মূল্যবোধ নিয়ে বড় হয়েছে এবং জীবনে কীভাবে এগোচ্ছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আসলে সব অভিভাবকের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। সন্তানের পরিচয় শুধু সমাজ যা দেখে, তা নয়। তার ভেতরের মানুষটি কেমন, সেটাই আসল পরিচয়। নম্রতা, সহানুভূতি, সততা ও মানবিকতা—এই গুণগুলিই একজন মানুষকে বড় করে তোলে। কাজল সেই জায়গাতেই মেয়েকে মূল্যায়ন করেছেন।
বর্তমান সময়ে সমাজমাধ্যমের প্রভাব এতটাই বেশি যে অনেক সময় মানুষ বাইরের মন্তব্যকেই সত্যি বলে ধরে নেয়। কিন্তু পরিবারের সমর্থন, বিশেষ করে মা-বাবার আস্থা, একজন তরুণ-তরুণীর আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে। কাজল মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে সেই দায়িত্বই পালন করেছেন।
তাঁর এই বক্তব্য প্রমাণ করে, একজন মায়ের কাছে সন্তানের মূল্য কখনও জনপ্রিয়তা, বাহ্যিক চেহারা বা জনমতের উপর নির্ভর করে না। সন্তানের ভেতরের ভালো মানুষটিই তাঁর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান। আর এই নিঃশর্ত ভালোবাসাই মা-মেয়ের সম্পর্ককে এত দৃঢ় ও সুন্দর করে তোলে।