Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

অমিতাভ ও ঐশ্বর্যার সঙ্গে তুলনা ৫টি ছবিতে নীরবে অভিনেতা হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন অভিষেক

এখনও নিন্দকদের দাবি, অভিষেকের প্রথম পরিচয়, তিনি অমিতাভ-পুত্র। শুধু বাবা নয়। এমনকি, স্ত্রী ঐশ্বর্যা রাই বচ্চনের সঙ্গেও তুলনা করা হয়েছে তাঁকে।

অভিষেক বচ্চন: বাবার ছায়া, নিজের পরিচয়ের সংগ্রাম এবং অভিনয়ের ২৫ বছরের যাত্রা

বলিউডে তারকাসন্তান হওয়া যেমন আশীর্বাদ, তেমনই এক অভিশাপও বটে। জন্মসূত্রে পাওয়া খ্যাতি যেমন দরজা খুলে দেয়, তেমনই তুলনার ভারও বহন করতে হয় আজীবন। অভিষেক বচ্চনের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। অমিতাভ বচ্চনের মতো কিংবদন্তি অভিনেতার পুত্র, আবার বিশ্বসুন্দরী ঐশ্বর্যা রাই বচ্চনের স্বামী—এই দুই পরিচয়ের মাঝেই বহু বছর ধরে নিজের পরিচয় গড়ে তুলতে লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন তিনি।

২০২৬ সালে অভিষেক বচ্চনের বয়স পঞ্চাশ। অভিনয় জীবনেরও পূর্ণ হয়েছে ২৫ বছর। কিন্তু এই দীর্ঘ সফরে তিনি শুধু একজন তারকা-সন্তান বা সুপারস্টারের স্বামী হিসেবে নয়, বরং একজন পরিশ্রমী অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে গিয়েছেন বারবার।


তুলনার ভার: বাবার ছায়া এবং স্ত্রীর আলো

অভিষেক বচ্চনের জীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তুলনা। বাবার সঙ্গে তুলনা তো বলিউডে প্রায় নিয়মিত ঘটনা। অমিতাভ বচ্চন ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়—তার অভিনয়, ব্যক্তিত্ব, কণ্ঠ, স্ক্রিন প্রেজেন্স—সব মিলিয়ে তিনি এক কিংবদন্তি। সেই কিংবদন্তির পুত্র হওয়া যেমন গর্বের, তেমনই ভীষণ চাপেরও।

শুধু বাবা নন, স্ত্রী ঐশ্বর্যা রাই বচ্চনের সঙ্গেও তাঁকে তুলনার মুখে পড়তে হয়েছে বহুবার। ঐশ্বর্যা শুধু অভিনেত্রী নন, তিনি বিশ্বসুন্দরী, আন্তর্জাতিক আইকন এবং বিশ্বমঞ্চে ভারতের অন্যতম পরিচিত মুখ। ফলে স্বামী হিসেবে অভিষেকের জনপ্রিয়তা, সাফল্য, অভিনয় দক্ষতা—সব কিছুই বারবার তুলনার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে।

এই প্রসঙ্গে অভিষেক নিজেই একবার বলেছিলেন—

“এই সফর কখনওই সহজ নয়। তবে এখন আমার অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। বাবার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে মানে, সবচেয়ে সেরার সঙ্গেই আমাকে তুলনা করা হচ্ছে। আর সবচেয়ে সেরার সঙ্গে তুলনার অর্থ, আমি নিশ্চয়ই এই যোগ্য নামগুলির মধ্যে জায়গা তৈরি করতে পারছি। আমি বিষয়টিকে এই ভাবেই দেখি।”

এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয় তাঁর মানসিক দৃঢ়তা। তিনি তুলনাকে নেতিবাচক না দেখে বরং নিজের উন্নতির অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।


অভিনয়ের শুরু: ‘রিফিউজি’ থেকে পথচলা

অভিষেক বচ্চনের অভিনয় জীবন শুরু হয়েছিল ২০০০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রিফিউজি’ ছবির মাধ্যমে। এই ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন করিশ্মা কাপুর। জে. পি. দত্ত পরিচালিত এই ছবি দিয়ে বলিউডে তাঁর অভিষেক ঘটে।

‘রিফিউজি’ বক্স অফিসে বড় সাফল্য না পেলেও, অভিষেকের অভিনয়কে অনেকেই সম্ভাবনাময় বলে মনে করেছিলেন। তবে তারকাসন্তান হওয়ার কারণে প্রত্যাশার বোঝা ছিল অত্যন্ত বেশি। দর্শক এবং সমালোচকরা সবাই আশা করেছিলেন, তিনি বাবার মতোই অভিনয়ের জাদু দেখাবেন।

কিন্তু বলিউডে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা এত সহজ ছিল না। প্রথম কয়েক বছর তাঁর বেশ কিছু ছবি বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়। ফলে ‘স্টার কিড’ তকমা, বাবার নামের ছায়া এবং সমালোচকদের কটাক্ষ—সব মিলিয়ে অভিষেকের পথচলা ছিল কঠিন।


চড়াই-উতরাইয়ের সফর

অভিষেক বচ্চনের ক্যারিয়ার কখনওই সরল রেখায় এগোয়নি। প্রথম দিকে একের পর এক ব্যর্থ ছবি তাঁর আত্মবিশ্বাসে আঘাত হানে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন—তিনি কি আদৌ একজন ভালো অভিনেতা?

কিন্তু অভিষেক হার মানেননি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে বদলেছেন, চরিত্র বেছে নিয়েছেন আরও সচেতনভাবে, এবং অভিনয়ের প্রতি দায়বদ্ধতা বাড়িয়েছেন।


অভিষেক বচ্চনের প্রশংসিত অভিনয়: যে তিনটি ছবি অবশ্যই দেখা উচিত

চিত্রসমালোচক এবং অনুরাগীদের মতে, অভিষেক বচ্চনের অভিনয় দক্ষতা বুঝতে হলে তাঁর কিছু বিশেষ ছবি দেখা জরুরি। এই ছবিগুলি শুধু বক্স অফিসের সাফল্য নয়, বরং তাঁর অভিনয় জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ কাজ।


 ১) ‘যুবা’ (২০০৪): লল্লন সিংহের ভয়ঙ্কর রূপ

২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মণিরত্নম পরিচালিত ‘যুবা’ ছবিটি অভিষেক বচ্চনের ক্যারিয়ারের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। এই ছবিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন লল্লন সিংহ নামের এক ভয়ঙ্কর, হিংস্র চরিত্রে।

লল্লন সিংহ ছিল কলকাতার বস্তির এক দাঙ্গাবাজ, ক্ষমতার লোভে অন্ধ, নিষ্ঠুর এবং ঠোঁটকাটা একজন ব্যক্তি। এই চরিত্রের জন্য অভিষেক নিজেকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলেছিলেন। তাঁর স্বাভাবিক ইমেজের সঙ্গে লল্লনের কোনো মিল ছিল না।

এই ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন রানি মুখোপাধ্যায়। দু’জনের রসায়ন দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। লল্লন চরিত্রে অভিষেকের রুক্ষতা, আক্রমণাত্মক আচরণ এবং সংলাপ বলার ধরন দর্শকদের চমকে দিয়েছিল।

‘যুবা’ শুধু একটি রাজনৈতিক থ্রিলার নয়, বরং সমাজ ও রাজনীতির অন্ধকার দিকের এক শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি। এই ছবির মাধ্যমে অভিষেক প্রমাণ করেছিলেন, তিনি শুধু সুপারস্টারের ছেলে নন, বরং একজন দক্ষ অভিনেতা যিনি নিজেকে চরিত্র অনুযায়ী বদলাতে পারেন।

এই ছবির জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও পেয়েছিলেন, যা তাঁর ক্যারিয়ারে বড় স্বীকৃতি এনে দেয়।


২) ‘গুরু’ (২০০৭): গুরুকান্ত দেসাইয়ের স্বপ্নযাত্রা

২০০৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘গুরু’ অভিষেক বচ্চনের অভিনয় জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ছবি। এই ছবিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন গুরুকান্ত দেসাই ওরফে গুরু চরিত্রে।

গুরুকান্ত দেসাই ছিল এক সাধারণ মানুষের অসাধারণ সাফল্যের গল্প। বলা হয়, এই চরিত্রটি শিল্পপতি ধীরুভাই অম্বানীর জীবন থেকে অনুপ্রাণিত। গুরুর চরিত্র ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী, বুদ্ধিমান, ঝুঁকি নিতে সাহসী এবং স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাসম্পন্ন।

এই চরিত্রে অভিষেক একেবারে অন্যরকম ভাবে নিজেকে তুলে ধরেছিলেন। গ্রামের সাধারণ যুবক থেকে দেশের অন্যতম বড় শিল্পপতি হয়ে ওঠার যাত্রা—এই পরিবর্তন তিনি দারুণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

এই ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন ঐশ্বর্যা রাই বচ্চন। বাস্তব জীবনের স্বামী-স্ত্রীর রসায়ন পর্দাতেও দর্শকদের মন জয় করেছিল।

‘গুরু’ ছবিতে অভিষেকের অভিনয় অনেক সমালোচকের কাছেই প্রশংসিত হয়। সংলাপ, আবেগ, শরীরী ভাষা—সব মিলিয়ে এই চরিত্রে তিনি নিজের অভিনয় ক্ষমতার নতুন দিক দেখিয়েছিলেন।


৩) ‘দসবি’ (২০২২): গঙ্গারাম চৌধুরীর রাজনৈতিক রূপান্তর

দীর্ঘ সময় পরে অভিষেক বচ্চনের অভিনয়ের প্রশংসা আবার নতুন করে উঠে আসে ২০২২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দসবি’ ছবির মাধ্যমে। এই ছবিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন গঙ্গারাম চৌধুরী নামের এক জাট রাজনীতিবিদের চরিত্রে।

news image
আরও খবর

গঙ্গারাম চৌধুরী ছিল এক দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতা, যিনি শিক্ষাক্ষেত্রের দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন এবং বিচারবিভাগীয় হেফাজতে যান। এই চরিত্রে অভিষেক শুধুমাত্র অভিনয় নয়, শারীরিক পরিবর্তনও এনেছিলেন।

তিনি ওজন বাড়িয়েছিলেন, উচ্চারণ ও দেহভঙ্গি বদলেছিলেন, এবং একেবারে অন্যরকম রাজনৈতিক নেতার রূপ ধারণ করেছিলেন। অনেকেই মনে করেন, এই চরিত্রটি হরিয়ানার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমপ্রকাশ চৌটালার সঙ্গে মিল রয়েছে।

‘দসবি’ ছবিতে অভিষেকের অভিনয় দর্শকদের চমকে দিয়েছিল। এই ছবির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন, বয়স বাড়লেও তিনি অভিনয়ের ক্ষেত্রে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে ভয় পান না।


অভিষেক বচ্চনের অভিনয়ের বিশেষত্ব

অভিষেক বচ্চনের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর চরিত্র বেছে নেওয়ার সাহস। তিনি কখনওই শুধু নায়কসুলভ ইমেজে আটকে থাকেননি। বরং নেতিবাচক চরিত্র, রাজনৈতিক চরিত্র, গ্রে শেড চরিত্র—সব ধরনের ভূমিকায় নিজেকে পরীক্ষা করেছেন।

তিনি বাবার মতো ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’ ইমেজ তৈরি না করলেও, নিজের মতো করে বাস্তবধর্মী চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।


ব্যক্তিগত জীবন এবং ক্যারিয়ার

অভিষেক বচ্চনের ব্যক্তিগত জীবনও বলিউডের অন্যতম আলোচিত বিষয়। ঐশ্বর্যা রাই বচ্চনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে, তাঁদের কন্যা আরাধ্যা—সব মিলিয়ে বচ্চন পরিবার সবসময় সংবাদ শিরোনামে থেকেছে।

কিন্তু এই পারিবারিক পরিচয়ের মাঝেও তিনি নিজের কাজের মাধ্যমে আলাদা পরিচয় তৈরি করতে চেয়েছেন।


 নতুন প্রজন্মের কাছে অভিষেক

আজকের নতুন প্রজন্ম অভিষেক বচ্চনকে শুধুমাত্র বাবার পুত্র হিসেবে নয়, বরং ‘দসবি’, ‘ব্রেথ’, ‘লুডো’, ‘গুরু’, ‘যুবা’—এই ধরনের কাজের মাধ্যমে একজন দক্ষ অভিনেতা হিসেবে দেখছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও তাঁর উপস্থিতি নতুন দর্শকদের কাছে তাঁকে জনপ্রিয় করেছে।


 ২৫ বছরের সফর: ব্যর্থতা থেকে সাফল্য

অভিষেক বচ্চনের ২৫ বছরের অভিনয় জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ব্যর্থতা কখনওই শেষ কথা নয়। শুরুতে একের পর এক ব্যর্থতা, সমালোচকদের কটাক্ষ, তুলনার ভার—সবকিছু সত্ত্বেও তিনি নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলেছেন।

এই দীর্ঘ সফরে তিনি প্রমাণ করেছেন, ধৈর্য, পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে নিজের পরিচয় গড়া সম্ভব।


ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

৫০ বছরে পা রেখে অভিষেক বচ্চন এখন তাঁর ক্যারিয়ারের এক নতুন অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে। বয়স বাড়লেও চরিত্রের বৈচিত্র্য আরও বাড়ছে। চরিত্রাভিনেতা হিসেবে তাঁর ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল বলে মনে করছেন অনেক সমালোচক।

তিনি এখন এমন এক অভিনেতা, যিনি বড় তারকাদের ছায়া ছাড়িয়ে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। বাবার ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে নিজের আলোকবর্তিকা তৈরি করার এই লড়াই—বলিউডে খুব কম তারকাসন্তানই এত দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যেতে পেরেছেন।
 

উপসংহার: বাবার ছায়া পেরিয়ে নিজের আলো—অভিষেক বচ্চনের অসমাপ্ত যাত্রা

অভিষেক বচ্চনের জীবন ও ক্যারিয়ারের গল্প আসলে শুধু একজন অভিনেতার উত্থান-পতনের কাহিনি নয়। এটি বলিউডের তারকাসন্তানদের বাস্তবতার এক প্রতীকী প্রতিচ্ছবি। যে পরিবারে জন্ম মানেই খ্যাতি, আলো, ক্ষমতা—সেই পরিবারেই জন্ম মানে আবার তুলনার বোঝা, প্রত্যাশার চাপ এবং নিজের পরিচয় প্রমাণ করার এক অবিরাম যুদ্ধ।

অমিতাভ বচ্চনের পুত্র হওয়া মানে এমন এক উত্তরাধিকার, যার সঙ্গে তুলনা করা প্রায় অসম্ভব। অমিতাভ শুধুমাত্র একজন অভিনেতা নন—তিনি এক প্রতিষ্ঠান, এক যুগ, এক অনুভূতি। তাঁর ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব আলোকবর্তিকা তৈরি করা যে কতটা কঠিন, তা হয়তো সবচেয়ে ভালো জানেন অভিষেক নিজেই। তার উপর আবার ঐশ্বর্যা রাই বচ্চনের মতো আন্তর্জাতিক আইকন স্ত্রী হওয়ায় তুলনার তালিকা আরও দীর্ঘ হয়েছে।

তবুও অভিষেক কখনও নিজেকে এই তুলনার শিকার হিসেবে দেখেননি। বরং তিনি এই তুলনাকে নিজের জীবনের অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর কথায়, সেরার সঙ্গে তুলনা হওয়া মানেই নিজের নামও সেই যোগ্যতার তালিকায় উঠে আসা। এই মানসিক দৃঢ়তা এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই হয়তো তাঁকে আজও টিকিয়ে রেখেছে এই প্রতিযোগিতামূলক বিনোদন দুনিয়ায়।

‘রিফিউজি’ দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর অভিনয় যাত্রা সহজ ছিল না। প্রথম দিকে একের পর এক ব্যর্থ ছবি, সমালোচকদের কটাক্ষ, দর্শকদের সন্দেহ—সব মিলিয়ে তাঁর ক্যারিয়ার ছিল এক কঠিন পরীক্ষার নাম। অনেকেই তাঁকে “বিগ বি-র ছেলে” তকমা থেকে বেরোতে দেননি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিষেক প্রমাণ করেছেন, তিনি শুধু নামের জোরে নয়, নিজের পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং চরিত্র নির্বাচনের মাধ্যমে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন।

‘যুবা’ ছবির লল্লন সিংহ তাঁকে এনে দিয়েছিল এক নতুন পরিচয়—একজন শক্তিশালী অভিনেতা, যিনি নেতিবাচক চরিত্রেও নিজের ছাপ রাখতে পারেন। ‘গুরু’ ছবির গুরুকান্ত দেসাই দেখিয়েছিল তাঁর মধ্যে রয়েছে স্বপ্ন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং পরিণত অভিনয় ক্ষমতা। আর ‘দসবি’ ছবির গঙ্গারাম চৌধুরী প্রমাণ করেছে, বয়স বাড়লেও তাঁর অভিনয়ের ক্ষুধা কমেনি, বরং নতুন ধরনের চরিত্রে নিজেকে ভাঙার সাহস তিনি আজও রাখেন।

অভিষেকের অভিনয় জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাঁর অভিযোজন ক্ষমতা। তিনি কখনও বাবার মতো ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’ ইমেজ তৈরির চেষ্টা করেননি। বরং তিনি নিজের মতো করে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চরিত্র বেছে নিয়েছেন—কখনও গ্রে শেড চরিত্র, কখনও রাজনীতিবিদ, কখনও সাধারণ মানুষ, কখনও আবার ওটিটি সিরিজে বাস্তবধর্মী তদন্তকারী বা পারিবারিক চরিত্র।

আজকের নতুন প্রজন্মের কাছে অভিষেক শুধুমাত্র একটি বিখ্যাত পরিবারের সদস্য নন, বরং একজন পরিণত অভিনেতা, যিনি ধারাবাহিকভাবে নিজের কাজের মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করছেন। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে তাঁর কাজ নতুন দর্শকদের কাছে তাঁকে নতুনভাবে পরিচিত করেছে।

৫০ বছরে পা রেখে অভিষেক বচ্চন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে তিনি সুপারস্টার হওয়ার দৌড়ে নেই, বরং ভালো অভিনেতা হিসেবে নিজের কাজকে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা অর্জন করেছেন। এই বয়সে এসে অনেক অভিনেতাই নিরাপদ চরিত্রে সীমাবদ্ধ থাকেন, কিন্তু অভিষেক এখনও নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত।

তাঁর জীবনের গল্প আমাদের শেখায়—উত্তরাধিকার যেমন সুযোগ এনে দেয়, তেমনই দায়িত্বও দেয়। নিজের পরিচয় তৈরি করতে গেলে শুধুমাত্র নাম যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস এবং অবিরাম পরিশ্রম। অভিষেক বচ্চন সেই কঠিন পথেই হেঁটেছেন, যেখানে ব্যর্থতা ছিল, হতাশা ছিল, কিন্তু ছিল না থেমে যাওয়ার অজুহাত।

অতএব, অভিষেক বচ্চনের ২৫ বছরের অভিনয় সফর শুধু একজন অভিনেতার ক্যারিয়ারের হিসাব নয়—এটি নিজের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে নিজের আলো জ্বালানোর এক দীর্ঘ, ধীর কিন্তু দৃঢ় যাত্রার নাম। হয়তো তিনি বাবার মতো কিংবদন্তি নন, হয়তো তিনি স্ত্রীর মতো আন্তর্জাতিক আইকন নন, কিন্তু তিনি নিশ্চিতভাবেই অভিষেক বচ্চন—নিজের পরিচয়ে, নিজের শর্তে, নিজের পথে।

আর এই যাত্রা এখনও শেষ হয়নি। সামনে আরও চরিত্র, আরও গল্প, আরও পরীক্ষা তাঁর অপেক্ষায়। হয়তো ভবিষ্যতে তাঁর অভিনয় জীবনের সবচেয়ে সেরা কাজগুলো এখনও আসেনি। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—বলিউডের ইতিহাসে অভিষেক বচ্চনের নাম শুধুমাত্র “অমিতাভের ছেলে” হিসেবে নয়, বরং একজন সংগ্রামী, পরিশ্রমী এবং আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়া অভিনেতা হিসেবেই লেখা থাকবে।

Preview image