Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

তারাপীঠের অদূরে প্রাচীন মল্লেশ্বর দেবালয় ও ২৩ শিবমন্দিরে ভরা অপূর্ব মন্দির গ্রাম

১২ থেকে ১৩ শতকের প্রাচীন ঐতিহ্য বহন করা এই মন্দির পল্লিতে রয়েছে মল্লেশ্বর শিব মন্দিরসহ একাধিক চারচালা শৈলীর ছোট ছোট শিবমন্দির যা আজও ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার অনন্য সাক্ষী।

গরমের ছুটি মানেই ব্যস্ত জীবন থেকে কয়েকটা দিনের ছোট্ট অবসর আর সেই অবসরে মন চায় শহরের কোলাহল ছেড়ে একটু শান্ত নিরিবিলি ইতিহাস আর প্রকৃতির টানে কোথাও ঘুরে আসতে। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলা এমনই এক জায়গা যেখানে ধর্ম ইতিহাস লোকসংস্কৃতি আর গ্রামবাংলার সৌন্দর্য একসঙ্গে মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য পরিবেশ। বীরভূম মানেই প্রথমে মনে আসে তারাপীঠ শান্তিনিকেতন কঙ্কালীতলা বা বক্রেশ্বরের নাম। কিন্তু এই জনপ্রিয় পর্যটনস্থানের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে এমন অনেক প্রাচীন ঐতিহ্য যা এখনও অনেক ভ্রমণপিপাসুর কাছে অজানা। ঠিক তেমনই এক অপূর্ব ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় স্থান হল মল্লারপুরের শিবগঞ্জ মন্দির পল্লি যেখানে একসঙ্গে রয়েছে প্রাচীন মল্লেশ্বর শিব মন্দির এবং আরও তেইশটি শিবমন্দির। ইতিহাস আধ্যাত্মিকতা স্থাপত্যশৈলী এবং গ্রামবাংলার শান্ত পরিবেশকে একসঙ্গে অনুভব করতে চাইলে এই স্থান হতে পারে আপনার পরবর্তী ভ্রমণের আদর্শ গন্তব্য।

বীরভূম জেলার রামপুরহাট এবং সাঁইথিয়ার মাঝামাঝি অবস্থিত মল্লারপুর এক সময় ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী অঞ্চল। বর্তমানেও সেই অতীত ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে এখানকার পুরনো মন্দির স্থাপত্যে। স্থানীয় মানুষের কাছে এই অঞ্চল শিবগঞ্জ নামেই বেশি পরিচিত। কারণ এখানে রয়েছে একের পর এক শিবমন্দির যা বহু শতাব্দী ধরে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মল্লেশ্বর নামে প্রাচীন এবং প্রসিদ্ধ শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করেই এই মন্দির পল্লির গড়ে ওঠা। মন্দিরগুলির চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে গ্রামবাংলার সহজ সরল জীবনযাপন সবুজ প্রকৃতি আর এক অদ্ভুত শান্তি যা শহুরে জীবনের ক্লান্ত মানুষকে মুহূর্তে অন্য এক অনুভূতির জগতে নিয়ে যায়।

তারাপীঠ থেকে খুব বেশি দূরে নয় এই মন্দির পল্লি। তাই অনেক ভ্রমণকারী তারাপীঠ দর্শনের পাশাপাশি মল্লারপুরের শিবগঞ্জ ঘুরে দেখতে পছন্দ করেন। যারা ধর্মীয় পর্যটনের পাশাপাশি ইতিহাস এবং স্থাপত্য ভালোবাসেন তাদের কাছে এই জায়গা সত্যিই অসাধারণ। এখানে এসে মনে হবে যেন সময় অনেকটা পিছিয়ে গেছে। চারদিকে নিস্তব্ধতা মাঝে মাঝে শঙ্খধ্বনি আর ঘণ্টার আওয়াজ মন্দিরের গায়ে শতাব্দী প্রাচীন অলঙ্করণ আর ভক্তদের প্রার্থনা সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম পরিবেশ।

মল্লারপুরে পৌঁছনোর পথও বেশ সহজ। রামপুরহাট থেকে বাসে সরাসরি এখানে আসা যায়। যারা ট্রেনে আসতে চান তারা সাহেবগঞ্জ লুপ লাইনের মল্লারপুর স্টেশনে নামতে পারেন। তবে স্টেশন থেকে মন্দির পল্লি কিছুটা দূরে হওয়ায় সেখান থেকে টোটো বা অটো ভাড়া করতে হয়। তাই অনেকেই বাসে আসাকেই বেশি সুবিধাজনক মনে করেন। রাস্তার দুই ধারে গ্রামবাংলার প্রকৃতি ধানক্ষেত তালগাছ মাটির বাড়ি আর ছোট ছোট পুকুর দেখতে দেখতে এখানে পৌঁছে যাওয়া যায়। এই পথ চলাটাও যেন ভ্রমণের একটা আলাদা আনন্দ হয়ে ওঠে।

ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায় এই মন্দির পল্লির নির্মাণ শুরু হয়েছিল আনুমানিক দ্বাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতকে। এত পুরনো ঐতিহ্য আজও এত সুন্দরভাবে টিকে রয়েছে সেটাই সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়। বিশাল প্রাচীরঘেরা এক বড় চত্বরের মধ্যে গড়ে উঠেছে এই মন্দিরসমূহ। মল্লেশ্বর শিব মন্দির ছাড়াও বাকি অধিকাংশ মন্দির আকারে ছোট এবং চারচালা স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত। বাংলার প্রাচীন মন্দির স্থাপত্যে চারচালা রীতির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এবং এই মন্দিরগুলি সেই ঐতিহ্যেরই উজ্জ্বল উদাহরণ। মন্দিরগুলির গায়ে সূক্ষ্ম কারুকাজ দেবদেবীর মূর্তি বিভিন্ন পৌরাণিক দৃশ্য এবং কীর্তনের চিত্র খোদাই করা রয়েছে যা সেই সময়ের শিল্পকলার পরিচয় বহন করে।

এই মন্দির পল্লির প্রধান প্রবেশদ্বারটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। উত্তর দিকে অবস্থিত এই দ্বিতল তোরণদ্বারের উপরে রয়েছে নহবতখানা। একসময় এখান থেকে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে পূজা এবং বিশেষ অনুষ্ঠানের সূচনা ঘোষণা করা হত বলে জানা যায়। পূর্ব দিকেও রয়েছে আরেকটি প্রবেশপথ। ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে একের পর এক প্রাচীন শিবমন্দির। প্রতিটি মন্দিরের গঠন আলাদা হলেও সবগুলির মধ্যেই রয়েছে এক অদ্ভুত ঐক্য যা এই পুরো চত্বরকে আরও সুন্দর করে তুলেছে।

মল্লেশ্বর শিব মন্দির এই পল্লির প্রধান আকর্ষণ। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস বহু যুগ ধরে এই শিবমন্দির অত্যন্ত জাগ্রত। দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা এখানে পূজা দিতে আসেন। বিশেষ করে মহাশিবরাত্রি এবং শ্রাবণ মাসে এখানে ভক্তদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। মন্দির চত্বরে তখন ভক্তিমূলক গান ধূপ ধুনোর গন্ধ আর প্রার্থনার পরিবেশ এক অন্য অনুভূতি তৈরি করে। শুধু ধর্মীয় গুরুত্ব নয় এই মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্বও অপরিসীম। বহু প্রাচীন এই শিবলিঙ্গকে ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা এবং কিংবদন্তি যা স্থানীয়দের মুখে মুখে আজও শোনা যায়।

মল্লেশ্বর মন্দিরের কাছেই রয়েছে সিদ্ধেশ্বরী দেবীর একটি প্রাচীন মন্দির। এখানে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে দেবীর একটি শিলামূর্তি। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস দেবী অত্যন্ত জাগ্রত এবং বহু মানুষের মানত পূরণ করেন। তাই প্রতিদিনই এখানে ভক্তদের আনাগোনা লেগে থাকে। মন্দিরের পরিবেশ অত্যন্ত শান্ত এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতিতে ভরা। অনেকেই এখানে এসে দীর্ঘ সময় বসে ধ্যান করেন অথবা মন্দিরের নীরবতা উপভোগ করেন।

news image
আরও খবর

এই মন্দির পল্লির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এখানকার পরিবেশ। আজকের আধুনিক জীবনে যেখানে চারদিকে শব্দ দূষণ ব্যস্ততা আর অস্থিরতা সেখানে শিবগঞ্জ যেন শান্তির এক আশ্রয়। সকালবেলার সূর্যের আলো যখন মন্দিরের গায়ে পড়ে তখন পুরো চত্বর যেন সোনালি আভায় ভরে ওঠে। আবার সন্ধ্যায় প্রদীপের আলো আর ঘণ্টাধ্বনিতে জায়গাটি হয়ে ওঠে আরও রহস্যময় এবং মনোমুগ্ধকর। ফটোগ্রাফি ভালোবাসেন এমন মানুষদের জন্যও এই স্থান অসাধারণ। প্রাচীন স্থাপত্য আর গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করার জন্য এটি এক আদর্শ জায়গা।

শুধু ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক গুরুত্ব নয় এই অঞ্চল স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। শিবরাত্রি এবং অন্যান্য উৎসবের সময় এখানে মেলা বসে। গ্রামের মানুষজন একসঙ্গে অংশ নেন নানা অনুষ্ঠানে। লোকসংগীত কীর্তন আর গ্রামীণ মেলার পরিবেশ সেই সময় পুরো এলাকাকে উৎসবমুখর করে তোলে। পর্যটকরাও তখন এই উৎসবের আনন্দে সামিল হতে পারেন।

যারা কলকাতা বা আশেপাশের শহর থেকে একদিন বা দুদিনের ছোট্ট ট্রিপের পরিকল্পনা করছেন তাদের জন্য মল্লারপুরের শিবগঞ্জ হতে পারে দারুণ একটি অপশন। খুব বেশি খরচ ছাড়াই এখানে ঘুরে আসা যায়। পাশাপাশি তারাপীঠ দর্শনের সঙ্গেও এই ভ্রমণ সহজেই মিলিয়ে নেওয়া সম্ভব। সকালে তারাপীঠ দর্শন করে দুপুর বা বিকেলে মল্লারপুরে এসে এই ঐতিহাসিক মন্দির পল্লি ঘুরে দেখা যেতে পারে।

বর্তমান সময়ে পর্যটনের ক্ষেত্রে অনেকেই অফবিট জায়গা খুঁজে থাকেন যেখানে ভিড় কম অথচ সৌন্দর্য এবং ইতিহাসে ভরপুর। মল্লারপুরের শিবগঞ্জ ঠিক তেমনই একটি জায়গা। এখনও খুব বেশি বাণিজ্যিক হয়ে ওঠেনি বলেই এখানকার প্রাকৃতিক এবং ঐতিহাসিক সৌন্দর্য অনেকটাই অক্ষত রয়েছে। যারা নিরিবিলি পরিবেশে কিছুটা সময় কাটাতে চান তাদের জন্য এটি একেবারেই উপযুক্ত।

এই মন্দির পল্লিকে ঘিরে ভবিষ্যতে পর্যটনের আরও সম্ভাবনা রয়েছে বলেই মনে করেন অনেক ইতিহাসবিদ এবং ভ্রমণপ্রেমী। যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ এবং প্রচার করা যায় তাহলে এটি পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। কারণ এখানে রয়েছে ইতিহাস ধর্ম স্থাপত্য প্রকৃতি এবং লোকসংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন।

সব মিলিয়ে বলা যায় বীরভূমের মল্লারপুরের শিবগঞ্জ শুধুমাত্র একটি মন্দির পল্লি নয় এটি বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্য এবং আধ্যাত্মিকতার এক জীবন্ত নিদর্শন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মন্দিরগুলি আজও অতীতের গল্প বলে চলে। তাই গরমের ছুটিতে যদি কোথাও একটু অন্যরকম অভিজ্ঞতার খোঁজ করেন তাহলে অবশ্যই ঘুরে আসতে পারেন এই প্রাচীন মন্দির গ্রামে। এখানে এলে শুধু মন্দির দর্শন নয় বরং অনুভব করতে পারবেন বাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের স্পর্শ শান্ত প্রকৃতির স্নিগ্ধতা আর এক অনাবিল মানসিক প্রশান্তি।

মল্লারপুরের এই প্রাচীন মন্দির পল্লিতে এসে শুধু ইতিহাস বা ধর্মীয় অনুভূতিই নয় বরং গ্রামের সহজ সরল জীবনযাত্রার এক অনন্য ছবি চোখে পড়ে। মন্দির চত্বরের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা সবুজ গাছপালা পাখির ডাক আর নিরিবিলি পরিবেশ পর্যটকদের মনে এক আলাদা প্রশান্তি এনে দেয়। অনেকেই এখানে এসে দীর্ঘ সময় ধরে মন্দিরের স্থাপত্য লক্ষ্য করেন কারণ প্রতিটি মন্দিরের গায়ে থাকা সূক্ষ্ম কারুকাজ সেই সময়কার শিল্পীদের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় বহন করে। কোথাও দেবদেবীর মূর্তি কোথাও পৌরাণিক কাহিনির দৃশ্য আবার কোথাও কীর্তনের ছবি ফুটে উঠেছে পোড়ামাটির অলঙ্করণে। এই শিল্পরীতির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বাংলার প্রাচীন সংস্কৃতির গভীর ছাপ।

শীতকাল এবং শ্রাবণ মাসে এই অঞ্চলের সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। ভোরের কুয়াশা সরিয়ে সূর্যের আলো যখন মন্দিরের চূড়ায় এসে পড়ে তখন পুরো পরিবেশ যেন অলৌকিক হয়ে ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দারাও অত্যন্ত আন্তরিক এবং অতিথিপরায়ণ। গ্রামের মানুষের মুখে শোনা যায় নানা পুরনো কাহিনি এবং বিশ্বাস যা এই জায়গার রহস্যময় আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে তোলে। তাই যারা ইতিহাস প্রকৃতি এবং আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধন একসঙ্গে অনুভব করতে চান তাদের জন্য মল্লারপুরের শিবগঞ্জ নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ ভ্রমণস্থল।

Preview image