Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ওড়ার ২৪ মিনিটের মাথায় সঙ্কেত বন্ধ! দুর্ঘটনার মুহূর্তে গতি কত ছিল অজিতের বিমানের, কত উঁচু থেকে ভেঙে পড়ল নীচে

নিজের শহর বারামতীতে বুধবার রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল বর্ষীয়ান এনসিপি নেতা অজিত পওয়ারের। বুধবার সকাল ৮টা ১০ মিনিট নাগাদ মুম্বই বিমানবন্দর থেকে তাঁর বিমান বারামতীর উদ্দেশে রওনা দেয়।বুধবার সকাল ৮টা ১০ মিনিট নাগাদ মুম্বই বিমানবন্দর থেকে রওনা দিয়েছিল মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পওয়ারের বিমান। লিয়ারজেট-৪৫ সংস্থার ছোট আকারের ব্যক্তিগত ওই বিমানে (প্রাইভেট জেট) আট থেকে ন’জনের বসার জায়গা রয়েছে। বিমানটি ভেঙে পড়ে ৮টা ৪৩ মিনিট নাগাদ, ওড়ার ঠিক ৩৩ মিনিট পর। দুর্ঘটনায় অজিত-সহ বিমানে থাকা পাঁচ জনেরই মৃত্যু হয়েছে। বিমানের গতিবিধিতে নজরদারি চালায় এমন কিছু সংস্থার তথ্য বলছে, ওড়ার ২৪ মিনিটের মাথায় অজিতের বিমানটি আচমকা সঙ্কেত পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিল।

নিজের শহর বারামতীতে বুধবার রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল বর্ষীয়ান এনসিপি নেতা তথা শরদ পওয়ারের ভাইপো অজিতের। একাধিক রিপোর্টে দাবি, তাঁর বিমানটি ৮টা ৩৪ মিনিট থেকে নজরদারি সঙ্কেত পাঠানো বন্ধ করে দেয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে অবশ্য ফের সঙ্কেত পাঠানো শুরু হয়েছিল ওই বিমান থেকে। অজিতের বিমানটি প্রথম বারের চেষ্টায় বারামতীর রানওয়েতে নামতে পারেনি। এর পর এক বার চক্কর কেটে ফের অবতরণের চেষ্টা করেছিল। ৮টা ৪৩ মিনিট থেকে ওই বিমান পুরোপুরি নিশ্চুপ হয়ে যায়। আর কোনও সঙ্কেত সেখান থেকে আসেনি। এই সময়েই বিমানটি ভেঙে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। জানা গিয়েছে, যেখান থেকে বিমানটি এডিএস-বি সঙ্কেট পাঠানো বন্ধ করেছিল, সেই জায়গাটি মূল অবতরণস্থল বারামতী বিমানবন্দর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে।প্রাথমিক ভাবে বিমানের উড়ানে কোনও গোলমাল শনাক্ত করা যায়নি। পরিসংখ্যান বলছে, ওড়ার ১০ মিনিটের মাথায় অজিতের বিমান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ছ’কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল। তখন তার গতি ছিল ১০৩৬ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। এই গতিবেগেই উড়েছে বিমান। ভেঙে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে বিমানটির উচ্চতা কমে এসেছিল ১০১৬ মিটারে। গতিবেগ ছিল ২৩৭ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক জানিয়েছে, ভেঙে পড়ার আগের মুহূর্তে এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের (এটিসি) সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন পাইলট। জানিয়েছিলেন, রানওয়ে তিনি দেখতেই পাচ্ছেন না। তার পর বিমানটিকে এক বার চক্কর খাইয়ে ফের অবতরণের চেষ্টা করেন। এই সময় পাইলট জানিয়েছিলেন তিনি রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু তার পরেই বিমানটি ভেঙে পড়ে।

প্রাথমিক তদন্তে বিমানের উড়ানপথ বা যান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনও স্পষ্ট ত্রুটি ধরা না পড়লেও, যে পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, তা এই দুর্ঘটনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ সংখ্যাগুলি বলছে—উড্ডয়নের পর প্রথম দশ মিনিটে বিমানটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবেই দ্রুত উচ্চতা অর্জন করেছিল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ছ’কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল বিমানটি, যা একটি বাণিজ্যিক বিমানের ক্ষেত্রে একেবারেই স্বাভাবিক। সেই সময় বিমানের গতি ছিল ঘণ্টায় ১০৩৬ কিলোমিটার—ক্রুজিং স্পিডের কাছাকাছি। অর্থাৎ, উড়ানের এই পর্যায়ে কোনও অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ার কথা নয়।

এই তথ্যগুলি থেকেই স্পষ্ট হয়, উড্ডয়নের প্রাথমিক ধাপে পাইলট বা বিমানের যন্ত্রাংশ কোনও সমস্যায় পড়েনি। ইঞ্জিনের ক্ষমতা, ফুয়েল সাপ্লাই, ন্যাভিগেশন সিস্টেম—সবই তখন পর্যন্ত কার্যকর ছিল। সাধারণত, যদি উড্ডয়নের প্রথম দিকেই কোনও বড় যান্ত্রিক গোলমাল দেখা দেয়, তবে তা উচ্চতা বা গতিবেগের অস্বাভাবিক ওঠানামায় ধরা পড়ে। কিন্তু এখানে তা হয়নি।

সমস্যার সূত্রপাত হয় অবতরণের শেষ পর্যায়ে এসে।

ভেঙে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে বিমানটির উচ্চতা নেমে এসেছিল মাত্র ১০১৬ মিটারে এবং গতিবেগ কমে দাঁড়িয়েছিল ঘণ্টায় ২৩৭ কিলোমিটার। এই গতি অবতরণের সময় সাধারণত গ্রহণযোগ্য হলেও, উচ্চতা ও দৃশ্যমানতা—এই দুই বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, ওই সময় পাইলট এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান যে তিনি রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন না।

এই একটি বাক্যই গোটা দুর্ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

বিমান অবতরণের ক্ষেত্রে ‘ভিজুয়াল কনট্যাক্ট’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক বিমানে উন্নত যন্ত্রনির্ভর অবতরণ ব্যবস্থা থাকলেও, শেষ পর্যায়ে পাইলটের চোখে রানওয়ে দেখা জরুরি—বিশেষ করে যদি ‘ইন্সট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম’ (ILS) পুরোপুরি কার্যকর না থাকে বা আবহাওয়া দ্রুত বদলে যায়। পাইলট যখন জানান যে তিনি রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন না, তখন এটিসি সাধারণত দুটি বিকল্প দেয়—একটি হল ‘গো-অ্যারাউন্ড’, অর্থাৎ আবার উচ্চতা নিয়ে চক্কর কেটে নতুন করে অবতরণের চেষ্টা, অথবা বিকল্প বিমানবন্দরে ডাইভার্ট করা।

এই ক্ষেত্রে পাইলট প্রথম বিকল্পটিই বেছে নেন।

এটিসি-র সঙ্গে কথোপকথনের পর বিমানটিকে একবার চক্কর খাইয়ে ফের অবতরণের চেষ্টা করা হয়। কিছুক্ষণ পর পাইলট আবার জানান, তিনি রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন। অর্থাৎ দৃশ্যমানতা সাময়িকভাবে হলেও ফিরেছিল। এই মুহূর্তটি অত্যন্ত সংবেদনশীল—কারণ তখন পাইলটকে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়: অবতরণ চালিয়ে যাবেন, না কি আবার অবতরণ বাতিল করবেন।

ঠিক এই সিদ্ধান্তের পরপরই বিমানটি ভেঙে পড়ে।

প্রশ্ন উঠছে—যদি পাইলট রানওয়ে দেখতে পাচ্ছিলেন, তা হলে হঠাৎ করে কী ঘটল? তদন্তকারীদের মতে, এখানে একাধিক সম্ভাবনা কাজ করতে পারে। প্রথমত, আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তন। উপকূলবর্তী বা সমুদ্রসংলগ্ন বিমানবন্দরে আচমকা কুয়াশা, বৃষ্টি বা নিম্নমেঘ তৈরি হওয়া নতুন নয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দৃশ্যমানতা শূন্যের কাছাকাছি নেমে যেতে পারে। পাইলট হয়তো এক মুহূর্ত রানওয়ে দেখতে পেয়েছিলেন, কিন্তু পরের মুহূর্তেই তা আবার অদৃশ্য হয়ে যায়।

news image
আরও খবর

দ্বিতীয়ত, অপটিক্যাল ইলিউশন বা দৃষ্টিভ্রম। বিশেষ করে সন্ধ্যা বা রাতের দিকে, সমুদ্রের ওপর দিয়ে আসা বিমানের ক্ষেত্রে রানওয়ের আলো ও আশপাশের আলোর মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। পাইলট মনে করতে পারেন তিনি সঠিক উচ্চতায় আছেন, কিন্তু বাস্তবে বিমানটি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি নিচে নেমে গিয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে ‘হার্ড ল্যান্ডিং’ বা রানওয়ে ছুঁয়ে যাওয়ার আগেই মাটিতে বা জলে আছড়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

তৃতীয়ত, যান্ত্রিক ত্রুটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া গেলেও, সেন্সর বা অল্টিমিটারের পাঠে সামান্য ভুল থাকাও মারাত্মক হতে পারে। যদি বিমানের প্রকৃত উচ্চতা আর যন্ত্রে দেখানো উচ্চতার মধ্যে ফারাক থাকে, তবে পাইলট ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তদন্তে বিমানের ‘ব্ল্যাক বক্স’—ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার ও ককপিট ভয়েস রেকর্ডার—এই দিকটি স্পষ্ট করবে।

এখানে মানবিক দিকটিও উপেক্ষা করা যায় না। দীর্ঘ উড়ানের পর পাইলটের ক্লান্তি, মানসিক চাপ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বাধ্যবাধকতা—সব মিলিয়ে ভুলের সম্ভাবনা তৈরি হয়। পাইলট জানতেন, একবার রানওয়ে দেখা যাচ্ছে—এই তথ্য এটিসি-কে দেওয়ার পর আবার অবতরণ বাতিল করলে জ্বালানি, সময় এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা—সবকিছুর ভারসাম্য রাখতে হবে। অনেক সময় এই মানসিক চাপই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

এছাড়াও প্রশ্ন উঠছে, কেন বিকল্প বিমানবন্দরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। সাধারণত, যদি আবহাওয়া অনিশ্চিত হয় এবং প্রথম অবতরণ ব্যর্থ হয়, তবে পাইলটের কাছে ডাইভার্ট করার বিকল্প থাকে। তবে এটি নির্ভর করে বিমানে থাকা জ্বালানির পরিমাণ, নিকটবর্তী বিমানবন্দরের দূরত্ব এবং আবহাওয়ার উপর। হয়তো সেই মুহূর্তে পাইলটের কাছে মনে হয়েছিল, নিরাপদে অবতরণ সম্ভব।

এই দুর্ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—আধুনিক প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও বিমান চলাচল কতটা সূক্ষ্ম ভারসাম্যের উপর দাঁড়িয়ে। একটি ছোট সিদ্ধান্ত, কয়েক সেকেন্ডের দেরি বা ভুল মূল্যায়ন কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। প্রাথমিক ভাবে কোনও গোলমাল ধরা না পড়লেও, তদন্ত যত এগোবে, ততই এই ঘটনার স্তরগুলো উন্মোচিত হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে অবতরণ প্রোটোকল আরও কড়া করা হতে পারে। বিশেষ করে দৃশ্যমানতা কম থাকলে দ্বিতীয়বার অবতরণের আগে বাধ্যতামূলক ডাইভার্টের মতো নিয়মও আলোচনায় আসতে পারে। পাশাপাশি পাইলটদের প্রশিক্ষণে বাস্তবসম্মত সিমুলেশন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও আবার সামনে এসেছে।

সব মিলিয়ে, এই দুর্ঘটনা শুধুই একটি যান্ত্রিক ব্যর্থতার গল্প নয়—এটি প্রযুক্তি, প্রকৃতি ও মানুষের সিদ্ধান্তের এক জটিল সংঘাতের ফল। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন হলেও, এটুকু স্পষ্ট যে আকাশপথ যতই নিরাপদ হোক না কেন, প্রতিটি উড়ান শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের উপর—যেখানে একটি সঠিক বা ভুল সিদ্ধান্ত জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

এই প্রসঙ্গেই উঠে আসছে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের ভূমিকা ও তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। যদিও এটিসি মূলত তথ্য সরবরাহ ও নির্দেশ দেওয়ার দায়িত্বে থাকে, শেষ সিদ্ধান্তটি পাইলটের হলেও, আবহাওয়া সংক্রান্ত আপডেট, দৃশ্যমানতার মাত্রা ও রানওয়ের অবস্থা সম্পর্কে আরও কড়া সতর্কতা দেওয়া যেত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এটিসি-র রাডার ও গ্রাউন্ড সেন্সর পাইলটের চোখে ধরা না পড়া তথ্য আগে থেকেই শনাক্ত করতে পারে। তদন্তে এই তথ্য আদান–প্রদানের সময় ও ভাষা বিশ্লেষণ করা হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এছাড়া, রানওয়ের আলোকব্যবস্থা ও অবতরণ সহায়ক প্রযুক্তি কতটা কার্যকর ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। নিম্ন দৃশ্যমানতায় রানওয়ের লাইটিং সিস্টেম, প্যাপি লাইট বা অ্যাপ্রোচ লাইট ঠিকমতো কাজ না করলে পাইলটের বিভ্রান্তি আরও বাড়তে পারে। সামান্য প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং তার সঙ্গে মানবিক সিদ্ধান্ত মিলেই অনেক সময় বড় দুর্ঘটনার জন্ম দেয়।

এই ঘটনার পর যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগও স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। যদিও পরিসংখ্যান বলছে বিমান এখনও সবচেয়ে নিরাপদ পরিবহণ মাধ্যমগুলির একটি, তবু এই ধরনের দুর্ঘটনা মনে করিয়ে দেয়—নিরাপত্তা কোনও স্থির ধারণা নয়, বরং একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিটি দুর্ঘটনা থেকেই নতুন নিয়ম, নতুন সতর্কতা এবং নতুন প্রশিক্ষণের পথ তৈরি হয়।

তাই এই তদন্তের ফল শুধু একটি দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতের উড়ানকে আরও নিরাপদ করতে, পাইলট, এটিসি এবং প্রযুক্তির মধ্যে সমন্বয় কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়—সেই দিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে এই ঘটনার শিক্ষা।

Preview image