আইপিএলের হতাশা পেছনে ফেলে এবার ওয়ানডে ক্রিকেটে নজর হার্দিক পান্ডিয়ার। চোট সারিয়ে ১০ ওভার বোলিং করে নিজের ফিটনেসের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। অলরাউন্ডার হিসেবে আবার জাতীয় দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে প্রস্তুত হার্দিক, যা ভারতীয় দলের জন্য স্বস্তির খবর।
সদ্যসমাপ্ত আইপিএল মরসুমে হার্দিক পাণ্ডিয়াকে ঘিরে বিতর্ক যেন থামতেই চাইছিল না। কখনও চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকা, কখনও দলের ব্যর্থতার দায়, আবার কখনও তাঁর নেতৃত্ব ও ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে আইপিএলের বড় অংশ জুড়েই আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন ভারতীয় অলরাউন্ডার। তবে সেই বিতর্কের আবহ কাটিয়ে এবার হার্দিকের জন্য এল স্বস্তির খবর। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, বোর্ডের ফিটনেস পরীক্ষায় পাশ করেছেন তিনি এবং ওয়ানডে ক্রিকেটে খুব দ্রুত তাঁর প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক রিপোর্টে জানা গিয়েছে, আইপিএল ২০২৬-এ মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে কয়েকটি ম্যাচে হার্দিক পাণ্ডিয়া পিঠের সমস্যার কারণে খেলতে পারেননি। মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের পক্ষ থেকেও তাঁর ব্যাক স্প্যাজ়মের কথা জানানো হয়েছিল।
হার্দিক পাণ্ডিয়া ভারতীয় ক্রিকেটে এমন এক নাম, যাঁকে শুধু ব্যাটার বা বোলার হিসেবে বিচার করলে ভুল হবে। তিনি দলের ভারসাম্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ। সিম বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবে তাঁর উপস্থিতি ভারতীয় একাদশকে অতিরিক্ত সুবিধা দেয়। তিনি থাকলে ভারত ছয় নম্বর বা সাত নম্বরে একজন আক্রমণাত্মক ব্যাটার পায়, আবার প্রয়োজন হলে মাঝের ওভার বা ডেথ ওভারে বল হাতেও ব্যবহার করা যায়। তাই হার্দিকের ফিট থাকা মানে শুধু একজন ক্রিকেটারের প্রত্যাবর্তন নয়, বরং গোটা দলের কম্বিনেশন আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠা।
আইপিএলের সময় হার্দিককে নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। কয়েকটি ম্যাচে তাঁর না খেলা নিয়ে গুঞ্জন ছড়ায়। কেউ কেউ দাবি করেন, চোট থাকলেও পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার করা উচিত ছিল। আবার অন্য একটি অংশের মতে, ক্রিকেটারদের চোটের বিষয় সবসময় বাইরের দুনিয়া থেকে বিচার করা যায় না। ব্যাক স্প্যাজ়ম বা পিঠের সমস্যা অনেক সময় এমন হয়, যেখানে বাইরে থেকে ক্রিকেটারকে স্বাভাবিক মনে হলেও ম্যাচের চাপ, ফিল্ডিং, বোলিং রান-আপ এবং ব্যাটিংয়ের সময় শরীরের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। তাই মেডিক্যাল টিমের অনুমতি ছাড়া মাঠে নামা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের জন্যও মরসুমটা সহজ ছিল না। দলের পারফরম্যান্স প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় অধিনায়ক হিসেবে হার্দিকের উপর চাপ আরও বেড়ে যায়। রিপোর্ট অনুযায়ী, দলের কোচ মাহেলা জয়বর্ধনে মরসুমে চোট-আঘাতকে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। সেই রিপোর্টে বলা হয়েছিল, হার্দিক পাণ্ডিয়া তিনটি ম্যাচে ব্যাক স্প্যাজ়মের কারণে বাইরে ছিলেন এবং মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারও চোট সমস্যায় পড়েছিলেন।
তবে বিতর্ক যতই হোক, ভারতীয় ক্রিকেটে হার্দিকের গুরুত্ব অস্বীকার করা কঠিন। ওয়ানডে ফরম্যাটে তাঁর প্রত্যাবর্তন ভারতের জন্য বড় খবর হতে পারে। গত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পর থেকে ভারতের জার্সিতে ওয়ানডে ম্যাচে নিয়মিত দেখা যায়নি তাঁকে। যদিও টি-২০ ফরম্যাটে তিনি নিয়মিত ছিলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলকে সাপোর্ট করেছেন। কিন্তু ওয়ানডে ক্রিকেটে ১০ ওভার বোলিং করার মতো ফিটনেস পাওয়া হার্দিকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ টি-২০ ফরম্যাটে চার ওভার বোলিংয়ের চাপ আর ওয়ানডেতে সম্পূর্ণ কোটার বোলিংয়ের চাপ এক নয়।
ওয়ানডে ক্রিকেটে হার্দিককে সফল হতে হলে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—ফিটনেস, বোলিং স্ট্যামিনা এবং ব্যাটিং ধারাবাহিকতা। তিনি যদি ১০ ওভার বোলিং করার মতো অবস্থায় থাকেন, তাহলে ভারতীয় দল একজন অতিরিক্ত ব্যাটার বা স্পিনার খেলানোর সুযোগ পেতে পারে। আবার তিনি যদি শুধুমাত্র ব্যাটার হিসেবে খেলেন, তাহলে দলের ভারসাম্য কিছুটা কমে যেতে পারে। তাই বোর্ডের ফিটনেস পরীক্ষা বা সেন্টার অফ এক্সিলেন্সের রিপোর্ট তাঁর কামব্যাকের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, হার্দিক পাণ্ডিয়া বিসিসিআইয়ের সেন্টার অফ এক্সিলেন্সে ফিটনেস সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন এবং আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ওয়ানডে সিরিজ়ের আগে তাঁর নাম নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিসিসিআই রোহিত শর্মা ও হার্দিক পাণ্ডিয়াকে ফিটনেস পরীক্ষার জন্য ডেকেছিল। অন্য একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, হার্দিক ফিটনেস পরীক্ষায় ইতিবাচক রিপোর্ট পেয়েছেন এবং ওয়ানডে প্রত্যাবর্তনের পথে এগোচ্ছেন।
ভারতীয় দলের দৃষ্টিকোণ থেকে এই খবর নিঃসন্দেহে স্বস্তির। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় ক্রিকেটে সিম বোলিং অলরাউন্ডারের অভাব বারবার অনুভূত হয়েছে। হার্দিক না থাকলে ভারতকে অনেক সময় ব্যাটিং বা বোলিংয়ের মধ্যে একটি দিক বেছে নিতে হয়। যদি বাড়তি ব্যাটার খেলানো হয়, তবে পঞ্চম বা ষষ্ঠ বোলিং বিকল্প দুর্বল হয়ে যায়। আবার বাড়তি বোলার খেলালে ব্যাটিং গভীরতা কমে যায়। হার্দিক থাকলে এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান হয়।
হার্দিকের ব্যাটিং ক্ষমতা নিয়েও আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। মাঝের ওভারে ইনিংস গড়া, শেষের দিকে দ্রুত রান তোলা, চাপের পরিস্থিতিতে বড় শট খেলা—এই তিন ক্ষেত্রেই তিনি পরীক্ষিত। ওয়ানডে ক্রিকেটে ছয় নম্বর পজিশনে এমন একজন ক্রিকেটার দরকার, যিনি পরিস্থিতি বুঝে খেলা বদলে দিতে পারেন। কখনও ৩০ বলে ২৫ রান করে ইনিংস ধরে রাখতে হয়, আবার কখনও ২০ বলে ৪০ রান করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে হয়। হার্দিক এই দুই ভূমিকাতেই নিজেকে প্রমাণ করেছেন।
তবে তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। আইপিএলের বিতর্ক সহজে পিছু ছাড়বে না। মাঠে ফিরেই তাঁকে পারফরম্যান্স দিয়ে জবাব দিতে হবে। শুধু ফিটনেস পরীক্ষায় পাশ করলেই হবে না, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ সামলাতে হবে ধারাবাহিকভাবে। একদিনের ক্রিকেটে তাঁকে দীর্ঘ সময় মাঠে থাকতে হবে, ৫০ ওভারের ম্যাচে ফিল্ডিং করতে হবে, ব্যাটিংয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে এবং প্রয়োজনে ১০ ওভার বোলিংও করতে হবে। এই সব কিছুর জন্য শরীরের পাশাপাশি মানসিক প্রস্তুতিও দরকার।
হার্দিকের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলি উঠেছিল, সেগুলির বেশিরভাগই ছিল গুঞ্জন বা ক্রিকেট মহলের আলোচনা। কেউ দাবি করেছিলেন, তিনি চোটের দোহাই দিয়ে কিছু ম্যাচে খেলেননি। আবার কেউ বলেছিলেন, তাঁকে ছাড়া দল চাপমুক্ত থাকে। কিন্তু এই ধরনের মন্তব্যকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে দেখার আগে সতর্ক থাকা দরকার। ক্রিকেটে পারফরম্যান্স খারাপ হলেই অধিনায়ক বা বড় তারকাদের ঘিরে সমালোচনা তৈরি হয়। বিশেষ করে হার্দিকের মতো আলোচিত ক্রিকেটারের ক্ষেত্রে সেই চাপ আরও বেশি।
হার্দিক পাণ্ডিয়ার কেরিয়ারে এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। এর আগেও চোট, সমালোচনা, দল থেকে বাইরে থাকা এবং প্রত্যাবর্তন—সবকিছুর মধ্য দিয়ে গিয়েছেন তিনি। প্রতিবারই তিনি মাঠে ফিরে নিজের গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। ২০২২ সালের পর তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল। ফিটনেস ফিরে পাওয়ার পর তিনি আবার ভারতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন। তাই এবারও তাঁর সামনে সুযোগ রয়েছে বিতর্কের জবাব মাঠে দেওয়ার।
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের দৃষ্টিকোণ থেকেও হার্দিককে তাড়াহুড়ো করে ফেরানো ঠিক হবে না। বড় টুর্নামেন্ট বা গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ়ের আগে তাঁকে ধাপে ধাপে ম্যাচ ফিটনেসে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। নেট বোলিং, ফিটনেস টেস্ট, প্র্যাকটিস ম্যাচ, সীমিত ওভারের লোড ম্যানেজমেন্ট—সবকিছু পর্যবেক্ষণ করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কারণ হার্দিকের শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে আবার চোট ফিরে আসার আশঙ্কা থাকে।
আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ওয়ানডে সিরিজ় হার্দিকের জন্য আদর্শ প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ হতে পারে। এই সিরিজ়ে ভারত চাইবে অভিজ্ঞতা ও নতুনত্বের মিশ্রণে দল সাজাতে। হার্দিক যদি ফিট থাকেন, তাহলে তিনি শুধু একাদশে জায়গা পাবেন না, বরং দলের কৌশলগত পরিকল্পনার কেন্দ্রেও থাকবেন। তাঁর বোলিং ব্যবহার করে ভারত মাঝের ওভারে গতি বৈচিত্র্য আনতে পারে। আবার ব্যাটিংয়ে তিনি ফিনিশারের ভূমিকায় বড় সম্পদ।
হার্দিকের কামব্যাক রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি বা অন্য সিনিয়র ক্রিকেটারদের উপস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওয়ানডে ফরম্যাটে ভারতীয় দল এখন ভবিষ্যতের পরিকল্পনা তৈরি করছে। অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের পাশাপাশি এমন খেলোয়াড় দরকার, যাঁরা দুই বিভাগে অবদান রাখতে পারেন। এই জায়গাতেই হার্দিকের মূল্য সবচেয়ে বেশি।
একই সঙ্গে নির্বাচকদেরও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হার্দিককে ফিরিয়ে আনা মানে দলের ব্যালান্স বদলে যাওয়া। তাঁর জন্য কোন ব্যাটার বা বোলার জায়গা ছাড়বেন, সেটা নির্ভর করবে পিচ, প্রতিপক্ষ এবং সিরিজ়ের কৌশলের উপর। যদি তিনি পূর্ণ ১০ ওভার বল করতে পারেন, তাহলে ভারত পাঁচ বোলারের বদলে ছয় নম্বর বোলিং বিকল্প নিয়ে খেলতে পারে। এতে অধিনায়কের হাতে আরও স্বাধীনতা থাকবে।