সোমবার রাজস্থান রয়্যালসের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামবে চেন্নাই সুপার কিংস। তার আগে পর পর চোটের খবর পাওয়া যাচ্ছে চেন্নাই শিবিরে।
মহেন্দ্র সিংহ ধোনির পর ডেওয়াল্ড ব্রেভিসের চোট—আইপিএলের শুরুতেই বড় ধাক্কা চেন্নাই সুপার কিংসের
আইপিএল শুরু হওয়ার আগেই বড় সমস্যার মুখে পড়েছে চেন্নাই সুপার কিংস। একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারের চোটে দলের পরিকল্পনা বড় ধাক্কা খেয়েছে। প্রথমে দলের অভিজ্ঞ অধিনায়ক মহেন্দ্র সিংহ ধোনির চোটের খবর সামনে আসে। তার কিছু দিনের মধ্যেই জানা গেল, তরুণ ব্যাটার ডেওয়াল্ড ব্রেভিসও চোট পেয়েছেন। ফলে আইপিএলের প্রথম কয়েকটি ম্যাচেই দলকে নামতে হবে তাদের দুই গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারকে ছাড়া। স্বাভাবিকভাবেই চেন্নাই শিবিরে উদ্বেগ বেড়েছে।
আইপিএল এমন একটি টুর্নামেন্ট যেখানে প্রতিটি ম্যাচই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছোট্ট ভুল বা একটি বড় খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতি পুরো টুর্নামেন্টের সমীকরণ বদলে দিতে পারে। চেন্নাই সুপার কিংস বরাবরই অভিজ্ঞতা, পরিকল্পনা এবং ঠান্ডা মাথার ক্রিকেটের জন্য পরিচিত। কিন্তু এবার টুর্নামেন্টের শুরুতেই দলের দুই বড় ভরসা মাঠের বাইরে থাকায় নতুন করে কৌশল সাজাতে হচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্টকে।
একটি ক্রীড়া সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেওয়াল্ড ব্রেভিস পেশিতে টান পেয়েছেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, পুরোপুরি সুস্থ হতে কিছুটা সময় লাগবে। ফলে চেন্নাইয়ের প্রথম দু’-তিনটি ম্যাচে তাঁকে পাওয়া যাবে না। যদিও তাঁর চোট গুরুতর নয়, তবু ঝুঁকি নিতে চাইছে না দল। কারণ আইপিএলের মতো দীর্ঘ টুর্নামেন্টে তাড়াহুড়ো করে খেলাতে গিয়ে বড় চোটের আশঙ্কা থাকে।
গত মরসুমে মরসুমের মাঝপথে ব্রেভিসকে দলে নিয়েছিল চেন্নাই সুপার কিংস। সেই সময় তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেছিলেন। তাঁর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং এবং বড় শট মারার ক্ষমতা দলের মিডল অর্ডারকে শক্তিশালী করেছিল। সেই পারফরম্যান্সের উপর ভরসা করেই এ বছর তাঁকে ধরে রেখেছিল চেন্নাই। টিম ম্যানেজমেন্ট আশা করেছিল, এবারের আইপিএলে ব্রেভিস দলের অন্যতম ম্যাচ-উইনার হয়ে উঠবেন। কিন্তু শুরুতেই তাঁর চোট পরিকল্পনায় ছেদ ফেলেছে।
বিশ্ব ক্রিকেটে ব্রেভিস ‘বেবি এবি’ নামে পরিচিত। তাঁর ব্যাটিং স্টাইল অনেকটাই দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাক্তন অধিনায়ক এবি ডিভিলিয়ার্সের মতো। মাঠের চারদিকে শট খেলার ক্ষমতা, অপ্রচলিত স্ট্রোক, দ্রুত রান তোলার দক্ষতা—সব মিলিয়ে তাঁকে ভবিষ্যতের বড় তারকা হিসেবে দেখা হয়। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তাঁর আগ্রাসী মনোভাব এবং আত্মবিশ্বাস চেন্নাইয়ের ব্যাটিং লাইনআপে নতুন মাত্রা যোগ করার কথা ছিল। কিন্তু আপাতত তাঁকে মাঠের বাইরে বসেই দলের খেলা দেখতে হবে।
ব্রেভিসের অনুপস্থিতি চেন্নাইয়ের মিডল অর্ডারে চাপ তৈরি করবে বলেই মনে করছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে প্রথম কয়েকটি ম্যাচে দলের ব্যাটিংয়ের ভার পড়বে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের উপর। তরুণ ক্রিকেটারদেরও বাড়তি দায়িত্ব নিতে হবে। টিম ম্যানেজমেন্ট সম্ভবত বিকল্প হিসেবে অন্য কোনও অলরাউন্ডার বা ব্যাটারকে সুযোগ দিতে পারে।
ব্রেভিসের আগে দলের সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল মহেন্দ্র সিংহ ধোনির চোট। কঠোর অনুশীলনের সময় তিনি পায়ের পেশিতে চোট পান বলে জানা গেছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, পুরো সুস্থ হয়ে মাঠে নামতে তাঁর প্রায় তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। সাধারণ পেশির চোটে সাধারণত দুই সপ্তাহে সুস্থ হওয়া যায়, কিন্তু ধোনির আগে থেকেই হাঁটুর সমস্যা ছিল। তাঁর হাঁটুতে অস্ত্রোপচার হয়েছে, ফলে সুস্থ হতে কিছুটা বেশি সময় লাগছে।
ধোনির অনুপস্থিতি চেন্নাই সুপার কিংসের জন্য শুধুমাত্র একজন ক্রিকেটারের অনুপস্থিতি নয়, বরং পুরো দলের মানসিক শক্তির উপর প্রভাব ফেলতে পারে। ধোনি শুধু একজন ব্যাটার বা উইকেটকিপার নন, তিনি দলের মস্তিষ্ক। ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, বোলারদের ব্যবহার, ফিল্ড সেট করা, তরুণ ক্রিকেটারদের গাইড করা—এই সব ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা অমূল্য।
চেন্নাই শিবিরের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, ধোনির না থাকা দলের কাছে বড় ধাক্কা। তবে দলকে পরিস্থিতি মেনে নিয়ে এগোতে হবে। আইপিএলের মতো বড় টুর্নামেন্টে সব সময় সেরা একাদশ পাওয়া যায় না। তাই বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি রাখা খুবই জরুরি। ধোনি এখন বিশ্রামে রয়েছেন এবং তাঁকে দ্রুত সুস্থ করে তোলাই দলের প্রধান লক্ষ্য।
৩০ মার্চ চেন্নাই সুপার কিংসের প্রথম ম্যাচ রাজস্থান রয়্যালসের বিরুদ্ধে। এই ম্যাচের জন্য দল ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি শুরু করেছে। তবে ধোনি গুয়াহাটি যায়নি বলে জানা গেছে। তিনি আপাতত বিশ্রাম নিচ্ছেন এবং চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। টিম ম্যানেজমেন্ট কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
চেন্নাইয়ের পরবর্তী ম্যাচগুলিও যথেষ্ট কঠিন। ৩ এপ্রিল পঞ্জাব কিংসের বিরুদ্ধে ম্যাচ, ৫ এপ্রিল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই, ১১ এপ্রিল দিল্লি ক্যাপিটালসের বিরুদ্ধে ম্যাচ, ১৪ এপ্রিল কলকাতা নাইট রাইডার্স এবং ১৮ এপ্রিল সানরাইজ়ার্স হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে ম্যাচ—এই সব ম্যাচে ধোনিকে পাওয়া যাবে না বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে দলের উপর চাপ বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ছয়টি ম্যাচই চেন্নাইয়ের জন্য টুর্নামেন্টের ভিত্তি তৈরি করবে। শুরুটা ভালো না হলে পরবর্তী ম্যাচগুলিতে চাপ বাড়বে। তাই ধোনি এবং ব্রেভিস ছাড়াই দলকে শক্তিশালী পারফরম্যান্স দেখাতে হবে। ব্যাটিং, বোলিং এবং ফিল্ডিং—সব বিভাগেই নিখুঁত ক্রিকেট খেলতে হবে।
২৩ এপ্রিল মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে ধোনি সুস্থ হয়ে উঠবেন বলে আশা করছেন চিকিৎসকেরা। যদি তিনি সেই ম্যাচে ফিরতে পারেন, তাহলে দলের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়বে। কারণ ধোনির উপস্থিতি মানেই মাঠে একটি অতিরিক্ত কৌশলগত শক্তি।
চেন্নাই সুপার কিংস বরাবরই কঠিন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য পরিচিত। অতীতেও বহুবার গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারদের অনুপস্থিতিতে দল ভালো ফল করেছে। ধোনির নেতৃত্বে বা ধোনির প্রভাবেই দল সব সময় শান্ত মাথায় পরিকল্পনা করে। তাই এবারও সমর্থকেরা আশা করছেন, দল এই চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পারবে।
সমর্থকদের মধ্যেও এই খবর নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ চিন্তিত, আবার কেউ বিশ্বাস করছেন যে চেন্নাইয়ের শক্তিশালী দল এই পরিস্থিতি সামলে নিতে পারবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই ধোনি ও ব্রেভিসের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আইপিএলের শুরুতেই চেন্নাই সুপার কিংস বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারের চোট টিম ম্যানেজমেন্টকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। তবে ক্রিকেট অনিশ্চয়তার খেলা। সঠিক পরিকল্পনা, দলগত প্রচেষ্টা এবং তরুণদের পারফরম্যান্সই নির্ধারণ করবে চেন্নাইয়ের ভবিষ্যৎ।
এখন দেখার বিষয়, ধোনি ও ব্রেভিস ছাড়াই প্রথম কয়েকটি ম্যাচে চেন্নাই সুপার কিংস কতটা সফল হতে পারে এবং তারা কি এই কঠিন পরিস্থিতি কাটিয়ে আবারও আইপিএলের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে পারে।
সব মিলিয়ে আইপিএলের শুরুতেই চেন্নাই সুপার কিংসের উপর যেন একের পর এক সমস্যার পাহাড় নেমে এসেছে। মহেন্দ্র সিংহ ধোনির মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের চোট যেমন দলের কৌশল ও নেতৃত্বে বড় শূন্যতা তৈরি করেছে, তেমনই ডেওয়াল্ড ব্রেভিসের অনুপস্থিতি ব্যাটিং লাইনআপে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি তৈরি করেছে। টুর্নামেন্টের শুরুতেই এই ধরনের ধাক্কা যে কোনও দলের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ, আর চেন্নাইও তার ব্যতিক্রম নয়।
তবে চেন্নাই সুপার কিংসের ইতিহাস বলছে, তারা কঠিন পরিস্থিতি থেকে বারবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। দলের শক্তি শুধু তারকা ক্রিকেটারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো দলগত সমন্বয়, অভিজ্ঞ কোচিং স্টাফ, ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনা এবং তরুণ ক্রিকেটারদের আত্মবিশ্বাসই চেন্নাইকে আলাদা করে তোলে। ধোনি না থাকলেও তাঁর তৈরি করা দলীয় সংস্কৃতি এখনও দলের মধ্যে কাজ করে। মাঠে যাঁরাই নামবেন, তাঁরা জানেন কীভাবে চাপের মধ্যে নিজের সেরাটা দিতে হয়।
ডেওয়াল্ড ব্রেভিসের চোট সাময়িক হলেও তাঁর মতো আক্রমণাত্মক ব্যাটারকে না পাওয়া অবশ্যই দলের জন্য ক্ষতির। কিন্তু আইপিএলের মতো বড় মঞ্চে অনেক সময়ই নতুন ক্রিকেটাররা সুযোগ পেয়ে নিজেদের প্রমাণ করে দেন। ব্রেভিসের অনুপস্থিতিতে হয়তো কোনও তরুণ ক্রিকেটার নিজের প্রতিভা দেখানোর সুযোগ পাবে এবং সেটাই ভবিষ্যতে দলের শক্তি হয়ে উঠতে পারে। এই ধরনের পরিস্থিতিই অনেক সময় নতুন তারকার জন্ম দেয়।
অন্যদিকে, ধোনির দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা এখন চেন্নাই সমর্থকদের সবচেয়ে বড় আশা। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে তিনি মাঠে ফিরতে পারলে দলের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বেড়ে যাবে। তাঁর উপস্থিতি শুধু কৌশলগত দিক থেকেই নয়, মানসিক দিক থেকেও দলের জন্য বড় শক্তি। ধোনি মাঠে থাকলে বোলাররা বেশি আত্মবিশ্বাসী থাকে, ব্যাটাররা পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে পারে এবং পুরো দল একটি নির্দিষ্ট ছন্দে এগোয়।
প্রথম ছয়টি ম্যাচ চেন্নাইয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। এই ম্যাচগুলোতে দল যদি ভালো পারফরম্যান্স করতে পারে, তাহলে ধোনি ফিরে আসার পর দল আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আর যদি শুরুটা একটু খারাপও হয়, তবুও আইপিএলের দীর্ঘ টুর্নামেন্টে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ সব সময় থাকে। তাই এখনই সব কিছু শেষ হয়ে গেছে, এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই।
সমর্থকেরাও জানেন, চেন্নাই সুপার কিংস মানেই লড়াইয়ের দল। শেষ বল পর্যন্ত লড়াই করা, চাপের মধ্যে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়া এবং অসম্ভবকে সম্ভব করা—এই গুণগুলিই দলকে বারবার সফল করেছে। তাই ধোনি ও ব্রেভিসের চোটের ধাক্কা সত্ত্বেও আশা করা যায়, চেন্নাই আবারও নিজেদের শক্তি ও অভিজ্ঞতার উপর ভর করে টুর্নামেন্টে ভালো পারফরম্যান্স করবে।
সবশেষে বলা যায়, আইপিএলের শুরুতে এই চোটের ধাক্কা চেন্নাই সুপার কিংসের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় দল কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে দলগত প্রচেষ্টা, সঠিক পরিকল্পনা এবং খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তার উপর। ধোনি ও ব্রেভিস দ্রুত সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরলে চেন্নাইয়ের লড়াই আরও শক্তিশালী হবে—এটাই এখন সমর্থকদের একমাত্র প্রত্যাশা।