Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

‘ক্যান্ডি শপ’ মুক্তির পর বিতর্কে নেহা কক্কর, নাচ ও চেহারা নিয়ে তীব্র সমালোচনা

নেহা কক্করের নতুন গান ক্যান্ডি শপ মুক্তির পর নাচ, উপস্থাপনা ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা।

নেহা কক্করের নতুন গান ‘ক্যান্ডি শপ’ প্রকাশের পর যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা কার্যত চাপা পড়ে গেছে একের পর এক বিতর্কে। বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় গায়িকা হওয়া সত্ত্বেও, কিংবা বলা ভালো—এই জনপ্রিয়তার কারণেই—নেহা কক্করকে আবারও পড়তে হয়েছে তীব্র সমালোচনার মুখে। গানটির নাচ, পোশাক, উপস্থাপনা, এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও শারীরিক চেহারা পর্যন্ত টেনে এনে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি নেটিজেনদের একাংশ। নতুন গান প্রকাশের আনন্দের বদলে যেন প্রশ্নের পাহাড়—শিল্পী হিসেবে তাঁর স্বাধীনতা কোথায় শেষ, আর সমাজের প্রত্যাশাই বা কোথায় শুরু?


নতুন গানের ঝলক ও প্রত্যাশা

‘ক্যান্ডি শপ’ মুক্তির আগেই গানটি নিয়ে কৌতূহল ছিল তুঙ্গে। নেহা কক্করের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, প্রোমো ভিডিও এবং রঙিন পোস্টার দেখে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, এটি হতে চলেছে একটি সম্পূর্ণ ডান্স নাম্বার—ঝাঁ চকচকে সেট, আধুনিক বিট আর গ্ল্যামারাস উপস্থাপনার মেলবন্ধন। নেহা নিজেও আগের বেশ কিছু গানে এমন ঘরানায় সফল হয়েছেন। তাই অনুরাগীদের প্রত্যাশাও ছিল আকাশছোঁয়া। মুক্তির পর প্রথম কয়েক ঘণ্টায় ইউটিউব ভিউ দ্রুত বাড়তে থাকে, যা প্রমাণ করে গানটি ঘিরে আগ্রহের অভাব ছিল না।


প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনার শুরু

তবে এই আগ্রহ খুব দ্রুতই দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়ায় রূপ নেয়। একদিকে নেহার ভক্তরা তাঁর আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি, এনার্জেটিক পারফরম্যান্স এবং আধুনিক স্টাইলের প্রশংসা করেন। অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ার একটি বড় অংশ গানটির কিছু দৃশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। বিশেষ করে নাচের কিছু স্টেপ ও ভঙ্গি নিয়ে অভিযোগ ওঠে যে, সেগুলি ‘অশালীন’ এবং ‘অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্ররোচনামূলক’। এই অভিযোগের সুরে সুর মিলিয়ে অনেকেই মন্তব্য করেন, জনপ্রিয় একজন শিল্পীর কাছ থেকে আরও সংযত উপস্থাপনা প্রত্যাশিত।


নাচের স্টেপ: শিল্প না অশ্লীলতা?

নাচ বরাবরই ভারতীয় সিনেমা ও সংগীতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু ‘ক্যান্ডি শপ’-এর ক্ষেত্রে নাচের স্টেপ নিয়ে বিতর্ক নতুন করে সেই পুরনো প্রশ্নই সামনে এনেছে—শিল্পের সীমা কোথায়? সমালোচকদের মতে, কিছু ভঙ্গি শুধুমাত্র দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, যার সঙ্গে গানের সুর বা কথার গভীর সম্পর্ক নেই। তাঁদের দাবি, এ ধরনের স্টেপ তরুণ প্রজন্মের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, সমর্থকদের বক্তব্য একেবারেই ভিন্ন। তাঁদের মতে, গানটি মূলত একটি আধুনিক পপ-ডান্স ট্র্যাক, যেখানে আন্তর্জাতিক স্টাইল অনুসরণ করাই স্বাভাবিক। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন—একই ধরনের নাচ যদি বিদেশি শিল্পীরা করেন, তখন তা ‘ফ্যাশনেবল’, আর দেশীয় শিল্পী করলে তা কেন ‘অশালীন’?


ভারতীয় সংস্কৃতি বনাম গ্লোবাল পপ কালচার

এই বিতর্কে সংস্কৃতির প্রশ্নও জড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, পাশ্চাত্য পপ কালচারের অন্ধ অনুকরণে ভারতীয় সংগীতের নিজস্বতা হারিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের মতে, ভারতীয় শিল্পীদের উচিত দেশীয় সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করা, না যে কোনও মূল্যে আন্তর্জাতিক ট্রেন্ড অনুসরণ করা।
তবে এই যুক্তির বিপরীতে অন্য একটি শক্তিশালী মতও উঠে এসেছে। সংস্কৃতি কোনও স্থির বা অপরিবর্তনীয় ধারণা নয়—সময়, প্রজন্ম ও প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলায়। আজকের তরুণ প্রজন্ম আন্তর্জাতিক কনটেন্টের সঙ্গে বড় হচ্ছে, ফলে তাদের রুচিও বদলাচ্ছে। নেহা কক্করের মতো শিল্পীরা যদি এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল না মেলান, তবে তাঁরা কীভাবে প্রাসঙ্গিক থাকবেন—এই প্রশ্নও উঠছে।


‘নকল’-এর অভিযোগ ও তার প্রভাব

‘ক্যান্ডি শপ’ মুক্তির পর বিতর্কের আরেকটি বড় দিক ছিল ‘নকল’ করার অভিযোগ। সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু ব্যবহারকারী দাবি করেন, গানটির ভিডিওতে কোরিয়ান পপ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক মিউজিক ভিডিওর ছায়া দেখা যায়। বিশেষ করে সেট ডিজাইন, আলো ব্যবহার এবং কোরিওগ্রাফির কিছু অংশকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
যদিও এই অভিযোগের পক্ষে কোনও নির্দিষ্ট বা আইনি প্রমাণ সামনে আসেনি, তবু বিতর্ক থামেনি। অনেকেই আবার বলছেন, আজকের দিনে মিউজিক ভিডিওর ভাষা অনেকটাই গ্লোবাল হয়ে গেছে। রঙিন সেট, দ্রুত কাট, এনার্জেটিক নাচ—এসবই আধুনিক মিউজিক ভিডিওর সাধারণ বৈশিষ্ট্য। তাই একে সরাসরি নকল বলা ঠিক নয়।


চেহারা নিয়ে কটূক্তি ও বডি শেমিং

গান নিয়ে আলোচনা যখন চেহারা নিয়ে কটাক্ষে গিয়ে পৌঁছাল, তখন পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। কিছু মন্তব্যে নেহা কক্করের বয়স ও শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কেউ কেউ কটাক্ষ করে জানতে চান, নিজেকে কম বয়সি দেখানোর জন্য তিনি কোনও অস্ত্রোপচার করিয়েছেন কি না।
এই ধরনের মন্তব্যকে অনেকেই স্পষ্টভাবে বডি শেমিং বলে আখ্যা দেন। বিনোদন জগতে কাজ করা নারীরা প্রায়শই এই ধরনের আক্রমণের শিকার হন, যেখানে তাঁদের কাজের চেয়ে চেহারা বেশি আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। এই বিতর্ক নতুন করে দেখিয়ে দিয়েছে, সমাজে নারীদের শরীর ও বয়স নিয়ে কতটা অস্বাস্থ্যকর কৌতূহল এখনও বিদ্যমান।


ব্যক্তিগত জীবন টেনে আনা: বিবাহিত নারীর ‘উচিত-অনুচিত’

সমালোচনার আরেকটি দিক ছিল নেহার বৈবাহিক অবস্থা। কিছু নেটিজেন মন্তব্য করেন, বিবাহিত মহিলাদের এ ধরনের গানে নাচ বা গ্ল্যামারাস উপস্থাপনা করা উচিত নয়। এই মন্তব্য ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
অনেকে প্রশ্ন তোলেন—একজন পুরুষ শিল্পী বিয়ে করার পরও কি একই ধরনের সমালোচনার মুখে পড়েন? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর ‘না’। এই দ্বৈত মানসিকতা সমাজে এখনও কতটা গভীরে প্রোথিত, ‘ক্যান্ডি শপ’ ঘিরে বিতর্ক তা আবারও সামনে এনে দিয়েছে।

news image
আরও খবর

নেহা কক্করের উত্থান: সংগ্রাম থেকে সাফল্য

এই সমস্ত সমালোচনার মাঝেই মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, নেহা কক্করের পথচলা সহজ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই মঞ্চে গান গেয়ে বেড়ে ওঠা, পারিবারিক আর্থিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই, রিয়্যালিটি শো-তে অংশগ্রহণ—এই সবকিছু পেরিয়েই তিনি আজকের জায়গায় পৌঁছেছেন।
তাঁর কণ্ঠে গাওয়া একাধিক গান শুধু চার্টবাস্টারই হয়নি, বরং পার্টি ও উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এই সাফল্যের কারণেই তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন—ভাল বা মন্দ, দুটোই সমানভাবে।


আগের বিতর্ক ও বর্তমান পরিস্থিতি

নেহা কক্করের ক্ষেত্রে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। মাসকয়েক আগে বিদেশের মাটিতে একটি কনসার্টে পারফরম্যান্স করতে গিয়ে তিনি সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ‘ক্যান্ডি শপ’ নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, পরপর এই ধরনের ঘটনা তাঁর মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে।


প্রতারণার মামলায় নাম জড়ানো ও সত্যতা

চলতি বছর নেহা কক্করের নাম জড়ায় একটি আর্থিক প্রতারণার ঘটনায়। একটি ট্রেডিং অ্যাপের প্রচারে তাঁর নাম ও ছবি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই অনেকে ধরে নেন, নেহা হয়তো সরাসরি জড়িত।
তবে পুলিশের তদন্তে স্পষ্ট হয়, তাঁর অনুমতি ছাড়াই ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল এবং এই প্রতারণার সঙ্গে তাঁর কোনও যোগ নেই। এই ঘটনার পর অনেক ভক্তই তাঁর পাশে দাঁড়ান এবং বলেন, জনপ্রিয়তার কারণেই তাঁর নাম এভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে।


সোশ্যাল মিডিয়া: আশীর্বাদ না অভিশাপ?

এই পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। একদিকে এটি শিল্পীদের কাজ দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়, অন্যদিকে সমালোচনা ও আক্রমণও একই গতিতে ছড়িয়ে দেয়। গঠনমূলক সমালোচনা আর ব্যক্তিগত আক্রমণের সীমারেখা অনেক সময়ই মুছে যায়।
নেহা কক্করের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, গান নিয়ে আলোচনা খুব সহজেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও শরীর নিয়ে কটাক্ষে রূপ নিয়েছে—যা যে কোনও শিল্পীর জন্যই মানসিকভাবে কঠিন।


সমর্থকদের কণ্ঠ

সমালোচনার পাশাপাশি নেহা কক্করের পক্ষে শক্ত সমর্থনও দেখা গেছে। বহু ভক্ত ও সহকর্মী মনে করছেন, একজন শিল্পীর পরীক্ষানিরীক্ষা করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তাঁদের মতে, সব গান সবার পছন্দ হবে না—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পছন্দ না হলে গালাগাল বা অপমান করা কোনও সমাধান নয়।


শিল্পীর স্বাধীনতা ও সামাজিক দায়

‘ক্যান্ডি শপ’ বিতর্ক নতুন করে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছে—একজন জনপ্রিয় শিল্পীর কতটা স্বাধীনতা থাকা উচিত? কেউ বলেন, তাঁদের কাজ সমাজে প্রভাব ফেলে, তাই দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি। আবার অন্যরা মনে করেন, শিল্পকে যদি অতিরিক্ত সামাজিক শর্তে বেঁধে ফেলা হয়, তবে সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হয়।
এই দ্বন্দ্বের কোনও সহজ উত্তর নেই। তবে এটুকু স্পষ্ট, আলোচনাটি শুধু একটি গানকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নেই—এটি সমাজের মানসিকতার প্রতিফলন।


ভবিষ্যতের পথে নেহা কক্কর

সব বিতর্কের মাঝেও নেহা কক্করের ক্যারিয়ার থেমে নেই। সামনে তাঁর আরও কাজ রয়েছে, আরও গান রয়েছে। অতীতেও তিনি সমালোচনার মুখে পড়েছেন, আবার নিজের কাজ দিয়েই সেই সমালোচনার জবাব দিয়েছেন। অনেকেই মনে করছেন, এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।


উপসংহার

‘ক্যান্ডি শপ’ হয়তো নেহা কক্করের সবচেয়ে বিতর্কিত গানগুলির একটি হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই বিতর্কের মধ্য দিয়েই আবারও স্পষ্ট হয়েছে—জনপ্রিয়তা যত বড়, সমালোচনার চাপও তত বেশি। নাচ, পোশাক, ব্যক্তিগত জীবন—সবকিছুই বিচার্যের তালিকায় পড়ে যায় একজন তারকার ক্ষেত্রে।
শেষ পর্যন্ত সময়ই ঠিক করবে, এই গানটি নেহা কক্করের ক্যারিয়ারে কী প্রভাব ফেলে। তবে এটুকু নিশ্চিত, বিতর্কের মাঝেও তিনি আলোচনার কেন্দ্রে আছেন—আর বিনোদন জগতে অনেক সময় সেটাই সাফল্যের আরেক রূপ।

Preview image