বছরের শেষ রবিবারেও স্বস্তি পেলেন না যাত্রীরা। ব্লু লাইনে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নেতাজি ও টালিগঞ্জ স্টেশনের মাঝখানে দীর্ঘক্ষণ থমকে থাকে মেট্রো পরিষেবা। ছুটির দিনেও হঠাৎ এই বিপর্যয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে চরম ভোগান্তির মুখে পড়েন বহু যাত্রী।
বছরের শেষ রবিবারেও স্বস্তি পেলেন না কলকাতার মেট্রোযাত্রীরা। সপ্তাহান্তের ছুটির দিনে যখন বহু মানুষ কেনাকাটা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা কিংবা পরিবার নিয়ে ঘোরাঘুরির উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন, ঠিক তখনই ব্লু লাইনে আচমকা বিপর্যয় নেমে আসে। নেতাজি ও টালিগঞ্জ স্টেশনের মাঝখানে থমকে যায় পাতালরেল পরিষেবা। মেট্রো সূত্রে জানা গিয়েছে, লাইনে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই এই সমস্যা তৈরি হয়, যার জেরে দীর্ঘক্ষণ ব্যাহত হয় ট্রেন চলাচল এবং চরম ভোগান্তির মুখে পড়েন যাত্রীরা।
রবিবার বেলায় দক্ষিণেশ্বরগামী একটি মেট্রো নেতাজি স্টেশনে ঢোকার আগেই হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। প্রথমদিকে যাত্রীরা মনে করেছিলেন, হয়তো সাময়িক কোনও সিগন্যাল সমস্যার কারণেই ট্রেনটি থেমে রয়েছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই আবার চলাচল শুরু হবে। কিন্তু মিনিটের পর মিনিট কেটে গেলেও ট্রেন আর এগোয়নি। ধীরে ধীরে যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। আধ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে মেট্রোটি। ভিড়ের মধ্যে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
মেট্রোর ভিতরে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার ফলে বাতাস চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। অনেক যাত্রী অস্বস্তি অনুভব করতে শুরু করেন। কেউ কেউ জল ও ওষুধের প্রয়োজনের কথাও জানান। বেশ কয়েকজন যাত্রী জানান, দীর্ঘক্ষণ বন্ধ অবস্থায় থাকার ফলে শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছিল। মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল থাকায় অনেকেই তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি, যা মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে মেট্রোর তরফে চালকের মাধ্যমে যাত্রীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করা হয়। ঘোষণা করে জানানো হয়, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই পরিষেবা সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং সমস্যা সমাধানের কাজ চলছে।
এর পর মেট্রো কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয়, আটকে থাকা রেক থেকে যাত্রীদের নিরাপদে নামিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। সমস্ত নিরাপত্তা বিধি মেনেই এই কাজ করা হচ্ছে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে রেক থেকে নামার সময় অনেক যাত্রী আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত মেট্রো যাতায়াত করেন না বা যাঁদের মধ্যে বদ্ধ জায়গার ভয় রয়েছে, তাঁদের উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে যায়। তবুও মেট্রো কর্মীদের সহায়তায় ধীরে ধীরে যাত্রীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এই ঘটনার প্রভাব শুধু ওই একটি রেকেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্লু লাইনের অন্যান্য অংশেও পরিষেবা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। একাধিক স্টেশনে ট্রেন চলাচল বিলম্বিত হয় বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। এর ফলে প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের ভিড় ক্রমশ বাড়তে থাকে। অনেক যাত্রী দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও ট্রেন না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ বিকল্প যানবাহনের খোঁজে স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যান। ছুটির দিনে এমন পরিস্থিতি যাত্রীদের মধ্যে বিরক্তি ও অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে তোলে।
অনেক যাত্রী অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতা মেট্রো পরিষেবায় বারবার যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা ঘটছে। কখনও সিগন্যাল সমস্যা, কখনও বিদ্যুৎ বিভ্রাট, আবার কখনও রেক সংক্রান্ত ত্রুটি—সব মিলিয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি যেন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠছে। রবিবারের এই ঘটনার পর আবারও একই প্রশ্ন উঠে এসেছে—আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত ব্যবস্থার দাবি করা মেট্রো পরিষেবায় কেন এত ঘনঘন এই ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে?
মেট্রো সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, যান্ত্রিক ত্রুটির প্রকৃতি খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞ দল কাজ শুরু করেছে। রেক এবং লাইনের বিস্তারিত পরীক্ষা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে যাত্রীদের একাংশের বক্তব্য, শুধু আশ্বাসে কাজ হবে না। বাস্তবিক উন্নয়ন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা আরও বাড়ানো জরুরি।
এই ঘটনার পর সমাজমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। বহু যাত্রী তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরেন। কেউ লিখেছেন, ছুটির দিনে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিকল্পনা থাকলেও মেট্রো বিপর্যয়ের কারণে সবকিছু ভেস্তে যায়। কেউ আবার জানান, আধ ঘণ্টারও বেশি সময় পাতালরেলে আটকে থাকার অভিজ্ঞতা মানসিকভাবে অত্যন্ত চাপের ছিল। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের কথা ভেবে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একাধিক পোস্টে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ছুটির দিন হোক বা কর্মদিবস—বারবার কেন এই ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের।
কয়েকজন যাত্রী সরাসরি মেট্রো কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে প্রশ্ন তুলেছেন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত নজরদারি থাকা সত্ত্বেও কী ভাবে একই ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি বারবার ঘটছে। অনেকেই লিখেছেন, কলকাতা মেট্রোকে শহরের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গণপরিবহণ ব্যবস্থা হিসেবে ধরা হয়, অথচ সাম্প্রতিক সময়ে পরিষেবার এই অনিশ্চয়তা যাত্রীদের আস্থা নড়িয়ে দিচ্ছে। তাঁদের মতে, শুধু সমস্যা মেটানোর ঘোষণা নয়, ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য স্থায়ী ও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
কলকাতা মেট্রো শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহণ ব্যবস্থা। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনের কাজে এই পরিষেবার উপর নির্ভর করেন। ব্যস্ত শহরের রাস্তাঘাট এড়িয়ে দ্রুত ও তুলনামূলক স্বস্তিতে যাতায়াতের অন্যতম ভরসা এই পাতালরেল। ফলে মেট্রোর কোনও একটি লাইনে পরিষেবা ব্যাহত হলেই তার প্রভাব পড়ে গোটা শহরের চলাচলে। বছরের শেষ রবিবারে ব্লু লাইনে যে বিপর্যয় দেখা গেল, তা ফের সেই বাস্তবতাকেই স্পষ্ট করে সামনে এনে দিল।
অনেক যাত্রীর বক্তব্য, এই ধরনের বিপর্যয়ের প্রভাব শুধু কয়েক ঘণ্টার ভোগান্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বহু ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কাজের সূচি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। কেউ অফিসে পৌঁছতে দেরি করেন, কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি বা পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছনোর সময় নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। আবার কারও চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা হাসপাতালের জরুরি ভিজিটও ব্যাহত হয়। ছুটির দিনে পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানেও এই ধরনের হঠাৎ পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়ে।
রবিবারের মতো ছুটির দিনে আচমকা মেট্রো পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প পরিবহণের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। সাধারণত ছুটির দিনে যাত্রীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম থাকে বলে অনেকে স্বস্তিতে যাতায়াতের আশা করেন। কিন্তু ব্লু লাইনে মেট্রো থমকে যাওয়ার ফলে সেই আশা মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ে। বাস, অটো, ট্যাক্সি এবং অ্যাপ-ক্যাবের চাহিদা হঠাৎ করে বেড়ে যায়। অনেক বাসস্টপ ও অটোস্ট্যান্ডে অস্বাভাবিক ভিড় লক্ষ্য করা যায়। এর ফলে রাস্তায় যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় যানজট তৈরি হয়।
অনেক যাত্রী অভিযোগ করেন, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু পরিবহণে অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে অটো ও অ্যাপ-ক্যাবের ক্ষেত্রে ভাড়া নিয়ে দরকষাকষির ঘটনা সামনে এসেছে। কেউ কেউ জানিয়েছেন, স্বাভাবিক ভাড়ার তুলনায় অনেক বেশি টাকা চাওয়া হয়েছে, যা যাত্রীদের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েই গন্তব্যে পৌঁছতে হয়েছে যাত্রীদের। ফলে একদিকে সময়ের তাড়া, অন্যদিকে বাড়তি খরচ—দু’দিক থেকেই সমস্যায় পড়েন সাধারণ মানুষ।
এই পরিস্থিতি শহরের সামগ্রিক যাতায়াত ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করে। গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকারী রাস্তাগুলিতে যানজটের কারণে ট্রাফিক পুলিশের কাজও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক জায়গায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত সময় লাগে, যার ফলে দেরিতে গন্তব্যে পৌঁছন বহু মানুষ। সাধারণত যাঁরা মেট্রোর উপর নির্ভর করে দ্রুত ও নিশ্চিত যাতায়াত করেন, তাঁদের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে হতাশাজনক হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে, নেতাজি ও টালিগঞ্জ স্টেশনের মাঝখানে মেট্রো থমকে যাওয়ার ঘটনা ফের প্রশ্ন তুলে দিল কলকাতা মেট্রোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে। আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত পরিকাঠামোর দাবি থাকলেও কেন বারবার এই ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে, তা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও সংশয় বাড়ছে। অনেকের মতে, সমস্যার পর শুধু পরিস্থিতি সামাল দেওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে আগাম পরিকল্পনা ও নিয়মিত প্রযুক্তিগত পরীক্ষা জরুরি।
যাত্রীরা এখন চাইছেন, প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করে যেন আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয়। পাশাপাশি জরুরি অবস্থায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও যাত্রীদের সঙ্গে স্পষ্ট যোগাযোগ বজায় রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তাঁরা। নিরাপত্তার পাশাপাশি পরিষেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই যে কলকাতা মেট্রোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, এই ঘটনা ফের সেই বাস্তবতাকেই স্পষ্ট করে সামনে এনে দিল। ছুটির দিনের এই বিপর্যয় যাত্রীদের মনে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষ ও হতাশাকে আরও একবার প্রকাশ্যে নিয়ে এল।