আশাব আল কাহফ সহ ইরানপন্থী একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত পিএমএফ পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস ইরাকে একটি শক্তিশালী যৌথ মঞ্চ হিসেবে কাজ করে। স্থানীয়ভাবে আরবি ভাষায় তাদের আশাব আল শাবি নামেও পরিচিত।
ইরানের পড়শি দেশ ইরাকে আবারও সামরিক উত্তেজনার আগুন জ্বালাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার ভোরে মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে চালানো একাধিক বিমান হামলায় কেঁপে ওঠে ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চল। তবে এই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল না বাগদাদের ক্ষমতাসীন সরকার, বরং নিশানায় ছিল ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস’ বা পিএমএফ। এই হামলায় অন্তত ১৫ জন যোদ্ধার মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে, যাঁদের মধ্যে একজন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডারও রয়েছেন। পাশাপাশি আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন।
এই ঘটনার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক মহলেও শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া।
কেন এই হামলা? পেছনের কারণ কী
বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা ছিল সরাসরি প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ। গত ২১ মার্চ, ইরাকের রাজধানী বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন কূটনৈতিক কেন্দ্রে ড্রোন হামলা চালায় ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী আশাব আল-কাহ্ফ। যদিও সেই হামলায় বড়সড় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তবুও মার্কিন প্রশাসন এটিকে অত্যন্ত গুরুতর নিরাপত্তা লঙ্ঘন হিসেবে দেখেছিল।
এরই প্রেক্ষিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এবং তার ফলেই মঙ্গলবার ভোরে এই বিমান হামলা চালানো হয় বলে মনে করা হচ্ছে।
নিশানায় পিএমএফ—কারা এরা?
পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) ইরাকের একটি শক্তিশালী আধাসামরিক জোট, যা মূলত ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির সমন্বয়ে গঠিত। এই জোটের মধ্যে আশাব আল-কাহ্ফ-সহ একাধিক গোষ্ঠী রয়েছে।
পিএমএফ-কে আরবি ভাষায় স্থানীয়ভাবে ‘আশাব আল-শাবি’ নামেও ডাকা হয়। ২০১৪ সালে আইএসআইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় এই জোট গঠিত হয় এবং ধীরে ধীরে এটি ইরাকের নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই এই গোষ্ঠীগুলিকে ইরানের প্রক্সি বাহিনী হিসেবে দেখে আসছে।
হামলার ক্ষয়ক্ষতি
মঙ্গলবার ভোরের এই বিমান হামলায় পিএমএফের আনবর প্রদেশের কমান্ডার সাদ আল-বাইজি নিহত হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে আরও ১৪ জন যোদ্ধার মৃত্যু হয়েছে বলে পিএমএফ নিজেই এক বিবৃতিতে স্বীকার করেছে।
আহতের সংখ্যা অন্তত ৩০, যাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
এছাড়া, ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় শহর মোসুলেও হামলার খবর পাওয়া গিয়েছে। সেখানে পিএমএফের শীর্ষ নেতা ফালিহ আল-ফাইয়াধের বাসভবন লক্ষ্য করে আকাশপথে হামলা চালানো হয়। যদিও তিনি সেই সময় বাড়িতে ছিলেন না, ফলে বড়সড় ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো গিয়েছে।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: ইরান-আমেরিকা সংঘাত
এই হামলাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। বরং এটি ইরান ও আমেরিকার মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনারই একটি নতুন অধ্যায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যৌথ বাহিনী ইরানের উপর সরাসরি আক্রমণ চালায়। সেই হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। এই ঘটনার পর থেকেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ইরান এরপর সরাসরি যুদ্ধের পথে না গিয়ে তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে ব্যবহার করে প্রতিশোধ নিতে শুরু করে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ।
কারা কারা জড়িত এই সংঘাতে?
এই সংঘাতে শুধু ইরান ও আমেরিকাই নয়, বরং একাধিক আঞ্চলিক শক্তিও জড়িয়ে পড়েছে।
লেবাননের হিজ়বুল্লা
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী
ইরাকের ইরানপন্থী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলি
এই সমস্ত গোষ্ঠী একত্রে মার্কিন ও ইজ়রায়েলি স্বার্থের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে অস্থিরতা
এই ধারাবাহিক হামলা ও পাল্টা হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন—প্রায় প্রতিটি দেশেই উত্তেজনা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তাহলে তা বৃহত্তর যুদ্ধের রূপ নিতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এই হামলার পর আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন দেশ সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
জাতিসংঘ ইতিমধ্যেই পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে এবং দুই পক্ষকেই সংঘাত এড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাব
ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই হামলার প্রভাব পড়তে পারে। কারণ পিএমএফ শুধু সামরিক শক্তি নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তাদের প্রভাব যথেষ্ট।
এই হামলার ফলে ইরাক সরকার চাপে পড়তে পারে, বিশেষ করে মার্কিন সম্পর্ক বজায় রাখা ও ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
ভবিষ্যৎ কী?
বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। যে কোনও সময় আরও বড় সংঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন:
আরও পাল্টা হামলা হতে পারে
আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে
কূটনৈতিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তা তীব্র
মার্কিন কৌশল ও সামরিক বার্তা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই বিমান হামলা শুধু একটি প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপই নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত বার্তাও বহন করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হামলার মাধ্যমে ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে দিতে চেয়েছে যে, তাদের স্বার্থ বা কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলা হলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
পেন্টাগনের সামরিক নীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই “ডিটারেন্স” বা প্রতিরোধমূলক কৌশলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ, শত্রুপক্ষকে আগেই বুঝিয়ে দেওয়া যে আক্রমণ করলে তার ফল ভয়াবহ হতে পারে। এই হামলা সেই নীতিরই একটি বাস্তব প্রয়োগ বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা উপস্থিতি এখনও গুরুত্বপূর্ণ—এই বার্তাও দিতে চেয়েছে আমেরিকা।
ইরানের ‘প্রক্সি ওয়ার’ কৌশল
ইরান সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে বরাবরই “প্রক্সি ওয়ার” বা পরোক্ষ যুদ্ধের কৌশল ব্যবহার করে আসছে। এর অর্থ, তারা নিজেদের সেনাবাহিনী সরাসরি না নামিয়ে, মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির মাধ্যমে শত্রুপক্ষের উপর চাপ সৃষ্টি করে।
এই কৌশলের সুবিধা হল:
সরাসরি যুদ্ধের দায় এড়ানো যায়
আন্তর্জাতিক চাপ কম থাকে
বিভিন্ন দেশে প্রভাব বিস্তার করা যায়
ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে এই কৌশল বহু বছর ধরেই কার্যকরভাবে ব্যবহার করছে তেহরান
পিএমএফ, হিজ়বুল্লা, হুথি—এই সব গোষ্ঠী মূলত সেই বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ।
ইরাকের জটিল অবস্থান
এই সংঘাতে সবচেয়ে কঠিন অবস্থানে রয়েছে ইরাক নিজেই। একদিকে, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। অন্যদিকে, দেশের ভেতরে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলির প্রভাবও যথেষ্ট শক্তিশালী।
ফলে, ইরাক সরকার প্রায়শই “ব্যালান্সিং অ্যাক্ট” করতে বাধ্য হয়।
এই ধরনের হামলা ইরাকের সার্বভৌমত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলে। কারণ, বিদেশি শক্তি তাদের মাটিতে এসে হামলা চালাচ্ছে—যা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও।
বিশেষ করে:
তেলের দাম বাড়তে পারে
জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে
আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে
ইরাক ও ইরান—দুই দেশই তেল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এই অঞ্চলে অশান্তি মানেই বিশ্ববাজারে প্রভাব পড়া প্রায় নিশ্চিত।
সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব
এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ। বিমান হামলা, বিস্ফোরণ, পাল্টা আক্রমণ—এই সবকিছুর মধ্যে পড়ে সাধারণ নাগরিকদের জীবন হয়ে ওঠে অনিশ্চিত।
ঘরবাড়ি ধ্বংস
প্রাণহানি
চিকিৎসা ও খাদ্যের সংকট
নিরাপত্তাহীনতা
এই সমস্ত সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে ইরাকের সাধারণ মানুষকে।
মিডিয়া ও তথ্যযুদ্ধ
বর্তমান সময়ে যুদ্ধ শুধু ময়দানে নয়, তথ্যের ক্ষেত্রেও লড়াই চলছে। বিভিন্ন দেশ ও গোষ্ঠী নিজেদের মতামত প্রতিষ্ঠা করতে মিডিয়া ব্যবহার করছে।
এক পক্ষ নিজেদের হামলাকে “আত্মরক্ষা” বলছে
অন্য পক্ষ সেটিকে “আগ্রাসন” হিসেবে তুলে ধরছে
ফলে, সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য জানা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা
যদিও পরিস্থিতি উত্তপ্ত, তবুও কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও শক্তিশালী দেশগুলি চেষ্টা করছে:
আলোচনা শুরু করাতে
উত্তেজনা কমাতে
যুদ্ধ এড়াতে
তবে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ।
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য চিত্র
বর্তমান পরিস্থিতির ভিত্তিতে কয়েকটি সম্ভাব্য চিত্র উঠে আসছে:
১. সংঘাত আরও বাড়তে পারে
যদি পাল্টা হামলা চলতেই থাকে, তাহলে তা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
২. সীমিত সংঘর্ষে থেমে যেতে পারে
কিছু সময় পর দুই পক্ষই সংযম দেখাতে পারে এবং সংঘাত সীমিত পর্যায়ে থেমে যেতে পারে।
৩. আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ
জাতিসংঘ বা অন্যান্য শক্তিধর দেশ সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই পরিস্থিতি “টিকিং টাইম বম্ব”-এর মতো। অর্থাৎ, আপাতত নিয়ন্ত্রণে থাকলেও যে কোনও সময় বড় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
তাঁদের মতে:
দ্রুত কূটনৈতিক পদক্ষেপ জরুরি
উভয় পক্ষের সংযম প্রয়োজন
আঞ্চলিক শক্তিগুলির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
বর্ধিত উপসংহার
ইরাকে মার্কিন বিমান হামলা একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক দাবা খেলায় নতুন চাল। এখানে প্রত্যেকটি পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
ইরান, আমেরিকা, ইজ়রায়েল এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে এই টানাপোড়েন কেবল সামরিক নয়—এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হল, এই সংঘাত যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাসীর নজর এখন একটাই প্রশ্নে—
এই সংঘাত কি থামবে, নাকি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে?