ডবল ইঞ্জিন সরকারের পথচলার শুরুতেই বড় ঘোষণা। জুন মাস থেকেই পশ্চিমবঙ্গে চালু হচ্ছে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্প, সঙ্গে আশ্বাস রাজ্যের কোনও সামাজিক প্রকল্পই বন্ধ হবে না।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটিয়ে ডবল ইঞ্জিন সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হতেই রাজ্যের সাধারণ মানুষের উদ্দেশে একাধিক বড় ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী Suvendu Adhikari। সোমবার নবান্নে অনুষ্ঠিত বিজেপি সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি জানান, আগামী ১ জুন থেকেই পশ্চিমবঙ্গে চালু হতে চলেছে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ প্রকল্প। পাশাপাশি স্পষ্ট ভাষায় তিনি আশ্বাস দেন যে পূর্বতন সরকারের কোনও জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বন্ধ করা হবে না। বরং কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির সুফল যাতে বাংলার প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছায়, তার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল ছিল, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে কোন পথে হাঁটবে এবং নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি কত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে। সোমবার সেই সমস্ত জল্পনার অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায়। নবান্নে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার “For the People, Of the People, By the People” নীতিতেই চলবে। অর্থাৎ জনগণের স্বার্থই হবে সরকারের মূল লক্ষ্য।
এই প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে মোট ছ’টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চর্চায় উঠে এসেছে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ প্রকল্প। নির্বাচনের সময় বিজেপির তরফে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাংলার মহিলাদের আর্থিকভাবে আরও শক্তিশালী করতে প্রতি মাসে তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৩ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষ্যে সরকার ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে জানা গিয়েছে। ১ জুন থেকেই প্রকল্পটি চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারি সূত্রের খবর, প্রকল্পটির আওতায় মূলত রাজ্যের মহিলাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হবে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মহিলাদের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছে দিলে সংসারের খরচ সামলাতে সুবিধা হবে বলেই মনে করছে সরকার। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্র এই ঘোষণাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই চর্চা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, মহিলাদের আর্থিক স্বাধীনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
শুধু অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারই নয়, একই সঙ্গে আরও একটি বড় ঘোষণা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী ১ জুন থেকেই রাজ্যের সমস্ত মহিলার জন্য সরকারি বাসযাত্রা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হবে। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মহিলা কর্মসূত্রে, পড়াশোনার জন্য কিংবা বিভিন্ন প্রয়োজনে বাসে যাতায়াত করেন। তাঁদের যাতায়াতের খরচ কমাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনের দাবি। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার ছাত্রী, কর্মজীবী মহিলা এবং নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য এই উদ্যোগ বড় স্বস্তি এনে দিতে পারে।
এই ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে তুলনা শুরু হয়েছে পূর্বতন সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে। ২০২১ সালে চালু হওয়া ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্প বাংলার মহিলাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সেই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি মাসে দেড় হাজার থেকে ১৭০০ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সাহায্য পেতেন মহিলারা। এখন প্রশ্ন উঠছে, নতুন ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ প্রকল্প চালু হলে পুরনো প্রকল্পগুলির ভবিষ্যৎ কী হবে?
এই প্রসঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, “জনকল্যাণমূলক কোনও প্রকল্প বন্ধ হবে না।” অর্থাৎ স্বাস্থ্যসাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথী-সহ সাধারণ মানুষের জন্য চালু বিভিন্ন পরিষেবা আপাতত বহাল থাকছে। তবে প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, ভবিষ্যতে কিছু প্রকল্পের কাঠামোগত পরিবর্তন হতে পারে। যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পরিবর্তে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার এবং যুবসাথীর বদলে নতুন বেকার ভাতা প্রকল্প আনার ইঙ্গিত মিলেছে।
বেকার যুবক-যুবতীদের জন্যও নতুন সরকার আলাদা পরিকল্পনা করছে বলে সূত্রের খবর। নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি বারবার কর্মসংস্থান ও বেকার ভাতার বিষয়টি তুলে ধরেছিল। ফলে আগামী দিনে যুব সমাজের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্রকল্প ঘোষণা করা হতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এদিনের বৈঠকে প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জনগণনার সার্কুলার অবিলম্বে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। দীর্ঘদিন ধরে জনগণনা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা চলছিল, তা কাটিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রশাসনকে। পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফের জন্য নির্ধারিত জমি হস্তান্তরের বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কেন্দ্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে প্রশাসনিক সমন্বয় বাড়ানোর দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে এই পদক্ষেপ। ডবল ইঞ্জিন সরকারের মূল বার্তাই হল কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ উদ্যোগে উন্নয়নকে আরও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগও করেন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক কারণেই বাংলার বহু মানুষ কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বিশেষ করে ‘বিশ্বকর্মা যোজনা’-র প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বাংলার কামার, কুমোর, তাঁতি, মালাকার, স্বর্ণকার, নাপিত-সহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পেশার প্রায় ৮ লক্ষ ৬৫ হাজার মানুষ আবেদন করেও সুবিধা পাননি। কারণ আগের সরকার সেই আবেদনগুলি কেন্দ্রীয় এমএসএমই দপ্তরে পাঠায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “বাংলার বহু মানুষ কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তাঁদের আবেদন আটকে রাখা হয়েছিল। আমরা দ্রুত সেই সমস্ত আবেদন নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করছি।”
একইভাবে ‘উজ্জ্বলা যোজনা’ নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন তিনি। তাঁর দাবি, বহু গরিব পরিবারের আবেদন গ্রাহক বিতরণ কেন্দ্রগুলিতে জমা পড়ে থাকলেও তা কেন্দ্রের কাছে পাঠানো হয়নি। ফলে বহু পরিবার গ্যাস সংযোগের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। নতুন সরকার সেই সমস্যার দ্রুত সমাধান করবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
প্রশাসনিক মহলের মতে, নতুন সরকার শুরু থেকেই জনমুখী ভাবমূর্তি তুলে ধরতে চাইছে। বিশেষ করে মহিলা, যুব সমাজ, শ্রমজীবী মানুষ এবং গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্ককে গুরুত্ব দিয়েই একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকেই সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে সরকার।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এই ঘোষণাগুলিকে ঘিরে ইতিমধ্যেই চর্চা শুরু হয়েছে। কেউ একে “পরিবর্তনের নতুন দিশা” বলছেন, আবার বিরোধী শিবিরের দাবি, এই প্রতিশ্রুতিগুলির বাস্তবায়নই হবে আসল পরীক্ষা। কারণ প্রকল্প ঘোষণা করা যতটা সহজ, তা সঠিকভাবে কার্যকর করা ততটাই কঠিন। বিশেষ করে প্রতি মাসে বিপুল সংখ্যক মহিলার অ্যাকাউন্টে আর্থিক সাহায্য পৌঁছে দিতে গেলে প্রশাসনিক পরিকাঠামো এবং বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে।
অর্থনৈতিক মহলের একাংশের মতে, কেন্দ্রীয় সহযোগিতা এবং রাজ্যের আর্থিক পরিকল্পনার উপরই অনেকটাই নির্ভর করবে এই প্রকল্পগুলির ভবিষ্যৎ। তবে সরকারের দাবি, জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হবে এবং কোনও প্রকল্প মাঝপথে থামিয়ে রাখা হবে না।
এখন নজর থাকবে আগামী কয়েক সপ্তাহের দিকে। কারণ ১ জুন থেকে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার এবং মহিলাদের বিনামূল্যে বাসযাত্রা বাস্তবে চালু হলে তা রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলি দ্রুত কার্যকর করার উদ্যোগও নতুন সরকারের প্রশাসনিক দক্ষতার বড় পরীক্ষা হতে চলেছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, নতুন সরকারের প্রথম দিনের সিদ্ধান্তগুলির মধ্যে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে জনসংযোগ বাড়ানোর কৌশল। বিশেষ করে মহিলাদের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং বিনামূল্যে বাসযাত্রার ঘোষণা সরাসরি সাধারণ পরিবারের উপর প্রভাব ফেলবে। গ্রামীণ বাংলার বহু পরিবারে মহিলারাই সংসারের মূল ভরসা। তাঁদের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছলে সংসারের দৈনন্দিন খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত খরচ সামলাতে সুবিধা হবে বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদদের একাংশ।
অন্যদিকে, প্রশাসনিক মহলেও এখন তৎপরতা শুরু হয়েছে। সূত্রের খবর, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের সম্ভাব্য উপভোক্তাদের তথ্য সংগ্রহ, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট যাচাই এবং অনলাইন পোর্টাল তৈরির কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। একইসঙ্গে পরিবহণ দপ্তরও মহিলাদের বিনামূল্যে বাসযাত্রা কার্যকর করার জন্য আলাদা নির্দেশিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে। কীভাবে পরিচয় যাচাই হবে, কোন কোন রুটে এই সুবিধা মিলবে এবং বেসরকারি বাস এই প্রকল্পের আওতায় আসবে কি না—তা নিয়ে আগামী দিনে বিস্তারিত জানানো হতে পারে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও ইতিমধ্যেই সরকারের ঘোষণাগুলির দিকে নজর রাখতে শুরু করেছে। তাদের দাবি, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সক্ষমতাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয়ে উন্নয়নের নতুন মডেল গড়ে তোলা হবে এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যেও আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে চাকরিপ্রার্থী যুবক-যুবতী এবং নিম্নআয়ের পরিবারগুলি নতুন সরকারের ঘোষণাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে। অনেকের মতে, যদি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রকল্পগুলি সঠিকভাবে কার্যকর হয়, তাহলে রাজ্যের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। এখন দেখার, আগামী ১ জুনের মধ্যে প্রশাসন কত দ্রুত সমস্ত প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করতে পারে এবং নতুন সরকারের এই ঘোষণাগুলি বাস্তবে কতটা সফলভাবে কার্যকর হয়।