রাজ্যে আবাস প্রকল্পে চালু হচ্ছে ‘সেল্‌ফ সার্ভে’ ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ নিজেরাই আবেদন করতে পারবেন। পরে প্রশাসনের ত্রিস্তরীয় যাচাইয়ের ভিত্তিতে প্রকৃত উপভোক্তাদের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হবে।
গ্রামীণ আবাস প্রকল্পে প্রকৃত উপভোক্তাদের চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অযোগ্য ব্যক্তির নাম তালিকাভুক্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে, আবার কোথাও প্রকৃত গৃহহীন বা দরিদ্র পরিবার তালিকার বাইরে থেকে যাওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে আবাস প্রকল্পের উপভোক্তা নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। অন্যান্য কয়েকটি রাজ্যে সফলভাবে চালু থাকা ‘সেল্ফ সার্ভে’ বা স্ব-সমীক্ষা পদ্ধতির আদলে এবার বাংলাতেও এই ব্যবস্থা চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, এই নতুন পদ্ধতি কার্যকর হলে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করা যেমন সহজ হবে, তেমনই উপভোক্তা তালিকা নিয়ে বিতর্ক বা অভিযোগও অনেকাংশে কমে আসবে।
নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, নতুন ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ নিজেরাই আবাস প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন জানাতে পারবেন। অর্থাৎ, কোনও মধ্যস্থতাকারী বা রাজনৈতিক সুপারিশের উপর নির্ভর না করে সরাসরি সরকারি পোর্টালে নিজেদের তথ্য জমা দেওয়ার সুযোগ পাবেন আবেদনকারীরা। এর ফলে আবেদন প্রক্রিয়া আরও গণতান্ত্রিক ও সহজলভ্য হবে বলে মনে করছে প্রশাসন। আবেদন জমা পড়ার পর তা বিভিন্ন স্তরে যাচাই করে চূড়ান্ত উপভোক্তা তালিকা তৈরি করা হবে।
গত ৩০ মে রাজ্যের সমস্ত জেলার জেলাশাসকদের উদ্দেশে একটি বিস্তারিত নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। সেই নির্দেশিকায় নতুন পদ্ধতি বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। নির্দেশ অনুযায়ী, যাঁরা নিজেরা আবেদন করতে ইচ্ছুক, তাঁদের মোবাইল ফোনে ‘আবাসপ্লাস ২০২৪’ এবং ‘আধারফেস আরডি’ নামের দুটি অ্যাপ ডাউনলোড করতে হবে। এই অ্যাপগুলির মাধ্যমে আবেদনকারীরা নিজেদের পরিচয় যাচাই করে সরাসরি আবেদন জমা দিতে পারবেন। আধার-ভিত্তিক ফেস অথেন্টিকেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে আবেদনকারীর পরিচয় নিশ্চিত করা হবে, যাতে ভুয়ো আবেদন বা জালিয়াতির সম্ভাবনা কমে।
প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ করলে আবেদনকারীর তথ্য সরাসরি সরকারি ডেটাবেসে সংরক্ষিত হবে এবং পরবর্তী পর্যায়ে তা সহজেই যাচাই করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আবেদনকারীর পরিচয়, পারিবারিক অবস্থা, বসবাসের পরিস্থিতি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যও দ্রুত সংগ্রহ করা যাবে। এর ফলে তথ্য গোপন করা বা ভুল তথ্য দেওয়ার সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে।
তবে রাজ্য সরকার এ-ও উপলব্ধি করেছে যে, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষ এখনও প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত নন। অনেকের কাছে স্মার্টফোন নেই, আবার অনেকের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগও সীমিত। তাই শুধুমাত্র অনলাইন আবেদন ব্যবস্থার উপর নির্ভর না করে বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যাঁরা নিজেরা আবেদন করতে পারবেন না, তাঁদের জন্য মাঠপর্যায়ে সমীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।
সেই অনুযায়ী নির্দিষ্ট সার্ভেয়ার বা সমীক্ষকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন। তাঁরা আবেদনকারীদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা, বাসস্থানের বর্তমান পরিস্থিতি এবং আবাস প্রকল্পের নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড অনুযায়ী তথ্য নথিভুক্ত করবেন। এর ফলে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে কোনও প্রকৃত উপভোক্তা যাতে তালিকার বাইরে না থেকে যান, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। প্রশাসনের দাবি, এই দ্বিমুখী ব্যবস্থা—অর্থাৎ স্ব-আবেদন এবং বাড়ি বাড়ি সমীক্ষা—দুটি মিলিয়ে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক উপভোক্তা নির্বাচন প্রক্রিয়া গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
আবাস প্রকল্পে স্বচ্ছতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে ত্রিস্তরীয় যাচাই ব্যবস্থা। অতীতে বিভিন্ন প্রকল্পে তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ত্রুটি বা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এবার বহুমাত্রিক যাচাই প্রক্রিয়া চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নবান্নের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রাথমিক সমীক্ষার পর তথ্য যাচাইয়ের জন্য আলাদা প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা হবে।
প্রথম ধাপে সমীক্ষকদের সংগৃহীত তথ্যের অন্তত ১০ শতাংশ পুনরায় যাচাই করবেন ব্লক বা মহকুমা স্তরের আধিকারিকরা। এই পুনঃযাচাইয়ের উদ্দেশ্য হল মাঠপর্যায়ে সংগৃহীত তথ্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল খুঁজে দেখা। যদি কোনও অসঙ্গতি ধরা পড়ে, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধনের ব্যবস্থা করা হবে।
দ্বিতীয় ধাপে ব্লকস্তরের আধিকারিকদের মাধ্যমে আরও ৫ শতাংশ আবেদন পৃথকভাবে পর্যালোচনা করা হবে। এই পর্যায়ে আবেদনকারীর যোগ্যতা, পারিবারিক অবস্থা এবং প্রকল্পের নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণের বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হবে। এর মাধ্যমে তথ্যের নির্ভুলতা আরও বাড়বে বলে মনে করছে প্রশাসন।
তৃতীয় এবং সর্বোচ্চ স্তরে জেলাস্তরের আধিকারিকদের দ্বারা অন্তত ২ শতাংশ আবেদন সরাসরি যাচাই করা হবে। জেলা প্রশাসনের এই স্বাধীন যাচাই প্রক্রিয়ার ফলে পুরো ব্যবস্থার উপর একটি অতিরিক্ত নজরদারি তৈরি হবে। প্রশাসনের মতে, এই তিন স্তরের যাচাই পদ্ধতি কার্যকর হলে ভুয়ো তথ্য, পক্ষপাতিত্ব বা প্রশাসনিক ত্রুটির সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আবাস প্রকল্পের মতো বৃহৎ সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে তথ্যের নির্ভুলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন অযোগ্য ব্যক্তি যদি সুবিধা পেয়ে যান, তাহলে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। তাই বহুমাত্রিক যাচাই ব্যবস্থা প্রকল্পের কার্যকারিতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্পের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও বৃদ্ধি পাবে।
রাজ্য সরকারের দাবি, নতুন ব্যবস্থার ফলে রাজনৈতিক প্রভাব বা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও অনেকটাই কমে আসবে। অতীতে বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় স্তরে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সুবিধাভোগীর তালিকা তৈরির অভিযোগ উঠেছিল। এবার আবেদন এবং যাচাই প্রক্রিয়ার বড় অংশই ডিজিটাল এবং প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকায় সেই ধরনের অভিযোগের সুযোগ কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া নতুন পদ্ধতি তথ্য সংরক্ষণ এবং বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ডিজিটাল মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য ভবিষ্যতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে। কোন এলাকায় কত সংখ্যক গৃহহীন বা কাঁচা বাড়িতে বসবাসকারী পরিবার রয়েছে, সে সম্পর্কে একটি নির্ভুল ডেটাবেস তৈরি হবে। এর ফলে ভবিষ্যতের আবাসন নীতি নির্ধারণেও সুবিধা হবে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, সমগ্র সমীক্ষা এবং যাচাই প্রক্রিয়া আগামী ২০ জুলাইয়ের মধ্যে সম্পূর্ণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসন, ব্লক প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো প্রস্তুত করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি—সব দিকেই জোর দেওয়া হচ্ছে।
নবান্নের আশা, এই নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ আবাস প্রকল্পের প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করা আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বিশ্বাসযোগ্যতাও বৃদ্ধি পাবে। প্রশাসনের মতে, প্রযুক্তি ও মানবিক নজরদারির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই নতুন মডেল ভবিষ্যতে অন্যান্য সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পের ক্ষেত্রেও উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ আবাসন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও দুর্নীতিমুক্ত করার লক্ষ্যে এই ‘সেল্ফ সার্ভে’ ব্যবস্থা যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, তা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে যথেষ্ট আশাবাদ দেখা যাচ্ছে।
এদিকে প্রশাসনিক মহলের একাংশ মনে করছে, ‘সেল্ফ সার্ভে’ পদ্ধতি চালু হওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এতদিন অনেক ক্ষেত্রেই প্রকল্পের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় বহু যোগ্য পরিবার আবেদন করতে পারতেন না। নতুন ব্যবস্থায় আবেদনকারীরা নিজেরাই সরাসরি তথ্য জমা দিতে পারবেন, ফলে তাঁদের মধ্যে সচেতনতা এবং প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগও বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কাছে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
পাশাপাশি, সমীক্ষা চলাকালীন প্রতিটি পরিবারের আবাসন সংক্রান্ত বাস্তব পরিস্থিতির ছবি, অবস্থান এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হবে বলেও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে কোনও অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত যাচাই করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তথ্যের স্বচ্ছতা বজায় রাখতেও সুবিধা হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর এই ব্যবস্থা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জবাবদিহি আরও বাড়াবে।
রাজ্য সরকারের লক্ষ্য, কোনও যোগ্য পরিবার যেন শুধুমাত্র তথ্যের অভাব, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে আবাস প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়। সেই কারণেই অনলাইন আবেদন, বাড়ি বাড়ি সমীক্ষা এবং ত্রিস্তরীয় যাচাই—এই তিনটি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করেই নতুন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। প্রশাসনের আশা, এই পদ্ধতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ আবাস প্রকল্পে প্রকৃত উপভোক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে পশ্চিমবঙ্গ।