একসময় যমশেরপুরের বাগচী বাড়ির দুর্গাপুজোয় দেবীর গায়ে সাজানো হত প্রায় ৪০০ ভরি সোনার গয়না। বিপুল সোনার অলঙ্কারের কারণে পুজোয় থাকত কড়া পুলিশি পাহারা। সময় বদলেছে, কমেছে জৌলুস, নেই থিমের চাকচিক্য। তবুও চার দিনের পুজোয় আজও বাগচী বাড়ির ঠাকুরদালানে ভিড় উপচে পড়ে।
দুর্গাপুজো শুধু উৎসব নয়, বাংলার বহু বনেদি পরিবারের কাছে এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা ঐতিহ্য। কোথাও পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কয়েকশো বছরের ইতিহাস, কোথাও রয়েছে জমিদারি আমলের স্মৃতি, আবার কোথাও দেবীর অলঙ্কার, পুজোর নিয়মকানুন এবং পারিবারিক রীতিই হয়ে উঠেছে মূল আকর্ষণ। এমনই এক ঐতিহ্যবাহী পুজো হয়ে উঠেছে যমশেরপুরের বাগচী বাড়ির দুর্গাপুজো।
আজকের দিনে সেই পুজোয় নেই আগের মতো জাঁকজমক। নেই চোখ ধাঁধানো থিমের মণ্ডপ, নেই আলোর ঝলকানি, নেই বাহারি সাজসজ্জার প্রতিযোগিতা। কিন্তু তাতে বাগচী বাড়ির পুজোর আকর্ষণ এতটুকুও কমেনি। বরং জৌলুস কমলেও নিষ্ঠা, ভক্তি এবং পারিবারিক ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে এখনও একইভাবে পুজো হয়ে চলেছে। পুজোর চার দিন যমশেরপুরের বাগচী বাড়ির ঠাকুরদালানে তাই ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ভিড় উপচে পড়ে।
এই পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক সময়ের বিপুল ঐশ্বর্যের গল্প। কথিত আছে, বাগচী বাড়ির দুর্গাপুজোয় একসময় দেবী দুর্গাকে প্রায় ৪০০ ভরি সোনার গয়নায় সাজানো হত। এত বিপুল পরিমাণ সোনার অলঙ্কার একসঙ্গে দেবীর গায়ে থাকত যে পুজোর দিনগুলিতে বাড়িতে থাকত কড়া পুলিশি নিরাপত্তা। শুধু পরিবারের সদস্য বা পুজোর আয়োজকরাই নন, নিরাপত্তার বিষয়টিও হয়ে উঠত সেই সময়ের পুজোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভাবা যায়, একদিকে ঠাকুরদালানে দেবীর অপরূপ সাজ, অন্যদিকে বাড়ির চারপাশে নিরাপত্তার দায়িত্বে পুলিশ! সেই সময়ের বাগচী বাড়ির দুর্গাপুজোর জৌলুস যে কতটা ছিল, তারই যেন সাক্ষ্য বহন করে এই ইতিহাস।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে পরিস্থিতি। বদলেছে পারিবারিক আর্থিক অবস্থাও। আগের মতো বিপুল সোনার গয়না দিয়ে দেবীকে সাজানোর রীতি হয়তো আর নেই। সেই সঙ্গে কমেছে বাহ্যিক চাকচিক্য। কিন্তু পুজো বন্ধ হয়নি। বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবারের সদস্যরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
বাগচী বাড়ির পুজোর সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলির একটি হল দেবীর সোনার সাজ। প্রায় ৪০০ ভরি সোনা দিয়ে দেবীকে সাজানো হত—এই তথ্যই এই পুজোর অতীতের ঐশ্বর্যের একটা ছবি তুলে ধরে।
সোনার হার, গয়না, অলঙ্কার এবং বিভিন্ন ধরনের সাজে দেবীকে সাজানো হত। পুজোর সময় সেই বিপুল পরিমাণ অলঙ্কার দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন। স্থানীয় মানুষের কাছেও এটি ছিল এক বিশেষ আকর্ষণ।
সেই সময়ে সোনার গয়না শুধু পারিবারিক সম্পদের পরিচয় ছিল না; দেবীর প্রতি পরিবারের শ্রদ্ধা ও ভক্তিরও একটি প্রকাশ ছিল। বনেদি পরিবারগুলির পুজোয় দেবীকে মূল্যবান অলঙ্কারে সাজানোর রীতি বাংলার বহু জায়গাতেই দেখা যায়। বাগচী বাড়ির ক্ষেত্রেও সেই ঐতিহ্য একসময় পৌঁছেছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ পর্যায়ে।
তবে বিপুল সোনা মানেই নিরাপত্তার প্রশ্ন। তাই পুজোর সময় পুলিশ পাহারার ব্যবস্থাও করা হত। দেবীর গায়ে এত মূল্যবান গয়না থাকায় বাড়িতে নিরাপত্তা জোরদার করা স্বাভাবিকই ছিল।
সময় সবকিছু বদলে দেয়। একসময় যে পরিবারে বিপুল ঐশ্বর্য ছিল, বহু পুরনো বনেদি বাড়ির মতোই বাগচী পরিবারেও সেই আর্থিক জৌলুস আজ আগের জায়গায় নেই। কিন্তু পুজোর ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তন বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
আজ আর ৪০০ ভরি সোনার গয়নায় দেবীকে সাজানোর সেই আয়োজন নেই। নেই পুলিশ পাহারার সেই দৃশ্যও। কিন্তু পুজোর নিয়মকানুন, পারিবারিক রীতি এবং ভক্তির জায়গায় কোনও পরিবর্তন হয়নি।
বরং বর্তমান প্রজন্মের কাছে পুজোর মূল গুরুত্ব হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যকে ধরে রাখা।
একটি বনেদি বাড়ির পুজো টিকিয়ে রাখা সহজ কাজ নয়। সময়ের সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন। বাড়ির পুরনো কাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ করাও কঠিন হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক পরিবর্তনও প্রভাব ফেলে। কিন্তু সেই সমস্ত বাধার মধ্যেও যদি পুজো নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে তার পেছনে থাকে পরিবারের গভীর টান এবং বিশ্বাস।
বাগচী বাড়ির পুজোও সেই ধারারই একটি উদাহরণ।
বর্তমান সময়ে দুর্গাপুজো মানেই থিমের প্রতিযোগিতা। বড় শহর থেকে মফস্বল—বিভিন্ন পুজো কমিটি দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করতে নানা ধরনের থিম তৈরি করে। কোথাও ঐতিহাসিক স্থাপত্য, কোথাও সামাজিক বার্তা, কোথাও শিল্পকর্ম—সব মিলিয়ে পুজোর মণ্ডপ এখন অনেক ক্ষেত্রেই বড় আকর্ষণ।
কিন্তু বাগচী বাড়ির পুজোর গল্প সম্পূর্ণ আলাদা।
এখানে নেই থিমের চাকচিক্য। নেই চোখ ধাঁধানো মণ্ডপ তৈরির প্রতিযোগিতা। নেই বাহারি আলোকসজ্জার আয়োজন। রয়েছে পুরনো ঠাকুরদালান, পরিবারের নিয়ম মেনে পুজো এবং দেবীর প্রতি ভক্তি।
তবুও পুজোর চার দিন এই বাড়িতে মানুষের ভিড় থাকে। কারণ দর্শনার্থীরা এখানে আসেন অন্যরকম এক অভিজ্ঞতার জন্য।
তাঁরা দেখতে চান একটি বনেদি পরিবারের ঐতিহ্যবাহী পুজো। দেখতে চান সেই ঠাকুরদালান, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দেবীর আরাধনা হয়ে আসছে। অনুভব করতে চান সেই পরিবেশ, যেখানে আধুনিকতার প্রতিযোগিতা নেই, আছে ইতিহাসের ছোঁয়া।
বাগচী বাড়ির পুজোর কেন্দ্রবিন্দু হল বাড়ির ঠাকুরদালান। বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হল এই ঠাকুরদালান। একসময় জমিদার ও বনেদি পরিবারগুলির বাড়িতে বিশেষভাবে তৈরি করা হত এমন স্থান, যেখানে পরিবারের দেবদেবীর পুজো এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হত।
বাগচী বাড়ির ঠাকুরদালানও সেই ঐতিহ্যের অংশ।
পুজোর দিনগুলিতে এই স্থানই হয়ে ওঠে পরিবারের সদস্য এবং দর্শনার্থীদের মিলনক্ষেত্র। সকাল থেকে শুরু হয় পুজোর বিভিন্ন আচার। দিনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। সন্ধ্যায় ধূপ, প্রদীপ, ঢাকের আওয়াজ এবং ভক্তদের উপস্থিতিতে ঠাকুরদালানের পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও আবেগঘন।
থিমের মণ্ডপের মতো এখানে হয়তো বিশাল সাজসজ্জা নেই। কিন্তু পুরনো স্থাপত্যের মধ্যেই রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য।
বাগচী বাড়ির দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এর ধারাবাহিকতা। প্রজন্ম বদলেছে, সময় বদলেছে, পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি বদলেছে—কিন্তু পুজোর নিয়ম বন্ধ হয়নি।
পরিবারের প্রবীণদের কাছ থেকে বর্তমান প্রজন্ম পুজোর বিভিন্ন রীতি সম্পর্কে জানতে পারে। কোন দিনে কী নিয়ম, কীভাবে পুজো হবে, কোন আচার কখন পালন করতে হবে—এসবই প্রজন্মান্তরে চলে আসে।
এই মৌখিক ইতিহাসই বনেদি বাড়ির পুজোর অন্যতম সম্পদ। অনেক সময় সবকিছু লিখিত নথিতে পাওয়া যায় না। পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের স্মৃতিই হয়ে ওঠে ইতিহাসের ধারক।
বাগচী বাড়ির পুজোর ক্ষেত্রেও অতীতের গল্পগুলি আজও পরিবারের সদস্যদের মুখে মুখে ফিরে আসে। সেই গল্পের অন্যতম আকর্ষণ অবশ্যই ৪০০ ভরি সোনায় সাজানো দেবীর কথা।
আজকের প্রজন্ম হয়তো সেই ৪০০ ভরি সোনার সাজ নিজের চোখে দেখেনি। কিন্তু পরিবারের প্রবীণদের স্মৃতিতে সেই সময়ের ছবি এখনও জীবন্ত।
দেবীর গায়ে একের পর এক সোনার অলঙ্কার, পুজোর সময় বাড়িতে মানুষের ভিড়, নিরাপত্তার জন্য পুলিশ মোতায়েন—সব মিলিয়ে সেই সময়ের পুজো ছিল একেবারেই অন্যরকম।
আজ সেই জৌলুস নেই। কিন্তু সেই স্মৃতি এখনও পুজোর ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
একটি পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে পুজোর বাহ্যিক রূপ বদলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ঐতিহ্য ধরে রাখার ইচ্ছাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, যখন থিম নেই, আলোর ঝলকানি নেই, বড় আয়োজন নেই, তখন কেন এত মানুষ বাগচী বাড়ির পুজোয় আসেন?
উত্তরটা সম্ভবত ঐতিহ্যের মধ্যেই রয়েছে।
আজকের দর্শনার্থীদের একটি বড় অংশ শুধু নতুনত্ব দেখতে চান না। তাঁরা পুরনো বাংলার পুজোর পরিবেশও দেখতে চান। বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালান, পুরনো রীতি, প্রতিমার বিশেষ ধরন, পারিবারিক পুজোর পরিবেশ—এসবের প্রতি মানুষের আগ্রহ এখনও যথেষ্ট।
বিশেষ করে যারা শহরের বড় থিমপুজোর ভিড় থেকে একটু আলাদা অভিজ্ঞতা খোঁজেন, তাঁদের কাছে বনেদি বাড়ির পুজো আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে।
বাগচী বাড়ির ক্ষেত্রেও সেই ঐতিহ্যই দর্শনার্থীদের টেনে আনে।
বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে আরেকটি বিষয় গভীরভাবে জড়িত—পরিবারের পুনর্মিলন।
বছরের অন্য সময়ে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় থাকলেও পুজোর সময় অনেকেই পুরনো বাড়িতে ফিরে আসেন। পুজো হয়ে ওঠে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হওয়ার উপলক্ষ। পুরনো স্মৃতি ফিরে আসে, নতুন প্রজন্ম পরিচিত হয় পরিবারের ঐতিহ্যের সঙ্গে।
বাগচী বাড়ির ক্ষেত্রেও পুজো পরিবারের সদস্যদের একত্রিত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। ঠাকুরদালানে পুজোর আচার যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে পাওয়া।
আধুনিক দুর্গাপুজোর সঙ্গে যখন ক্রমশ প্রতিযোগিতা, বাজেট এবং থিম জড়িয়ে যাচ্ছে, তখন বাগচী বাড়ির মতো পুজো মনে করিয়ে দেয়—দুর্গাপুজোর মূল শক্তি শুধু বাহ্যিক চাকচিক্যে নয়।
একটি পুজোকে বাঁচিয়ে রাখে মানুষের বিশ্বাস, নিয়ম মেনে আচার পালন এবং ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা।
বাগচী বাড়ির পুজোতে আজ হয়তো আগের মতো সোনার অলঙ্কার নেই। নেই বিপুল আয়োজন। কিন্তু প্রতিদিনের পুজোর নিয়মে কোনও ফাঁকি নেই। পরিবারের সদস্যরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পুজো চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই নিষ্ঠাই হয়তো এই পুজোর সবচেয়ে বড় সম্পদ।
বাগচী বাড়ির পুজোর ইতিহাস আসলে বাংলার বহু বনেদি পরিবারের ইতিহাসের মতোই। একসময় ছিল সম্পদ, প্রভাব এবং জৌলুস। বাড়িতে বড় আয়োজন হত। দেবীর সাজে থাকত বিপুল মূল্যবান অলঙ্কার। পুজোর সময় নিরাপত্তার জন্য পুলিশও থাকত।
তারপর সময় বদলেছে।
সম্পদের পরিমাণ কমেছে। জীবনযাত্রা বদলেছে। পুজোর আয়োজনও হয়েছে আরও সংযত।
কিন্তু ঐতিহ্যের ধারাটি ভাঙেনি।
এই পরিবর্তনকে শুধুমাত্র জৌলুস কমে যাওয়ার গল্প হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। বরং এটি একটি পরিবারের পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে নিজেদের ঐতিহ্যকে মানিয়ে নেওয়ার গল্পও।
আজকের দিনে দুর্গাপুজো মানেই নতুন কিছু দেখার আকাঙ্ক্ষা। প্রতিটি পুজো কমিটি চেষ্টা করে আগের বছরের চেয়ে আরও আকর্ষণীয় কিছু তৈরি করতে। দর্শনার্থীরাও এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে ঘুরে নতুন থিম দেখতে চান।
এই পরিস্থিতিতে একটি পুরনো বাড়ির পুজো তার ঐতিহ্য দিয়েই আলাদা হয়ে ওঠে।
বাগচী বাড়িতে নতুনত্ব দেখানোর চেষ্টা নেই। বরং পুরনো রীতিকে যতটা সম্ভব ধরে রাখাই লক্ষ্য।
এই সরলতাই হয়তো মানুষকে আকর্ষণ করে।
বাগচী বাড়ির পুজোর ইতিহাসে ৪০০ ভরি সোনার কথা এখন এক ধরনের কিংবদন্তির মতো। সেই সময়ের বাস্তবতা, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য এবং পুজোর ঐশ্বর্যের একটি ছবি এই গল্পের মধ্যে পাওয়া যায়।
সেই সঙ্গে পুলিশ পাহারার কথাও এই পুজোর অতীতকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
আজকের দিনে যখন বিপুল সোনার গয়না প্রকাশ্যে নিয়ে পুজো করা প্রায় অকল্পনীয়, তখন অতীতের সেই গল্প শুনে বর্তমান প্রজন্মের বিস্মিত হওয়াই স্বাভাবিক।
তবে সেই অতীতকে আঁকড়ে থাকার বদলে পরিবার এখন গুরুত্ব দিচ্ছে পুজো চালিয়ে যাওয়ার উপর।
জাঁকজমক কমেছে, কিন্তু দর্শনার্থীর সংখ্যা কমেনি—এই বিষয়টিই বাগচী বাড়ির পুজোর বিশেষত্ব।
পুজোর চার দিন ঠাকুরদালানে ভিড় উপচে পড়া প্রমাণ করে, মানুষের কাছে ঐতিহ্যের মূল্য এখনও অনেক।
কেউ আসেন পারিবারিক ইতিহাসের টানে, কেউ আসেন পুরনো বাড়ির পুজো দেখতে, কেউ আবার স্থানীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে এই পুজোয় অংশ নেন।
অনেকের কাছেই এই পুজো শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি যমশেরপুরের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ।
বাগচী বাড়ির ঠাকুরদালানে দাঁড়ালে শুধু প্রতিমা দেখা যায় না, দেখা যায় একটি পরিবারের দীর্ঘ যাত্রার ছাপ। বাড়ির স্থাপত্য, পুজোর নিয়ম, পারিবারিক স্মৃতি—সবকিছুর মধ্যে অতীতের উপস্থিতি অনুভব করা যায়।
সেই কারণেই বনেদি বাড়ির পুজো দেখতে আসা মানুষের অভিজ্ঞতা থিম পুজোর থেকে আলাদা।
এখানে দর্শক শুধু একটি সুন্দর মণ্ডপ দেখেন না। তিনি একটি পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে কয়েক মুহূর্তের জন্য যুক্ত হন।
বনেদি বাড়ির পুজো চালিয়ে যাওয়া সহজ নয়। পুরনো বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ, পুজোর খরচ, নিয়মকানুন মেনে আচার পালন—সবকিছুর জন্য সময় ও অর্থ প্রয়োজন।
তার উপর পরিবারের সদস্যরা ছড়িয়ে পড়লে সমন্বয় করাও কঠিন হয়।
তবুও যে পরিবারগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পুজো চালিয়ে যায়, তারা আসলে একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখে।
বাগচী বাড়ির পুজোও সেই বৃহত্তর ঐতিহ্যের একটি অংশ।
আজ বাগচী বাড়িতে হয়তো সেই আগের দিনের বিপুল জাঁকজমক নেই। দেবী আর ৪০০ ভরি সোনায় সেজে ওঠেন না। পুজোর সময় বাড়ির বাইরে পুলিশ পাহারার সেই দৃশ্যও নেই।
কিন্তু আছে ঠাকুরদালান।
আছে প্রতিমা।
আছে পরিবারের সদস্যদের ব্যস্ততা।
আছে পুরনো নিয়ম মেনে পুজো করার চেষ্টা।
আর আছে মানুষের ভালোবাসা।
এই কয়েকটি বিষয়ই একটি বনেদি বাড়ির পুজোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট।
মহালয়ার পর থেকেই বাড়িতে পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী—প্রতিটি দিনই আলাদা ব্যস্ততা। তবে মূল পুজোর দিনগুলিতে বাড়িতে মানুষের উপস্থিতি বাড়ে।
ঢাকের আওয়াজ, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি এবং মন্ত্রোচ্চারণে ঠাকুরদালান ভরে ওঠে।
বাইরের জগতের থিম বা প্রতিযোগিতা তখন এখানে অপ্রাসঙ্গিক। দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে ভক্তি আর পারিবারিক ঐতিহ্যই হয়ে ওঠে প্রধান বিষয়।
একসময় ৪০০ ভরি সোনা, পুলিশ পাহারা এবং বিপুল আয়োজনই ছিল বাগচী বাড়ির পুজোর জৌলুসের পরিচয়। আজ সেই জৌলুস নেই।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে জৌলুসের সংজ্ঞাও বদলে গেছে।
আজ হয়তো সবচেয়ে বড় সম্পদ হল পুজোটি এখনও চলছে। কয়েক প্রজন্ম পরেও একই বাড়িতে একই দেবীর আরাধনা হচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা এখনও একত্রিত হচ্ছেন। স্থানীয় মানুষ এখনও আসছেন।
এই ধারাবাহিকতাই হয়তো বর্তমান বাগচী বাড়ির সবচেয়ে বড় ঐশ্বর্য।
একটি বনেদি বাড়ির পুজো শুধু পরিবারের সম্পত্তি নয়। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পুজো ধীরে ধীরে এলাকার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়।
যমশেরপুরের ক্ষেত্রেও বাগচী বাড়ির পুজো তেমনই একটি পরিচিত ঐতিহ্য।
পুজোর সময় স্থানীয় মানুষ বাড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকেন। পুরনো দিনের গল্প নতুন প্রজন্মকে শোনানো হয়। শিশুরা জানতে পারে তাদের এলাকার ইতিহাস। আর প্রবীণরা ফিরে যান তাঁদের শৈশবের স্মৃতিতে।
এভাবেই একটি পারিবারিক পুজো একটি সামাজিক স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
বাগচী বাড়ির দুর্গাপুজোর গল্প তাই শুধুমাত্র ৪০০ ভরি সোনার গল্প নয়। এটি জৌলুস থেকে সরলতায় ফিরে আসার গল্প। এটি আর্থিক পরিবর্তনের মধ্যেও ঐতিহ্য ধরে রাখার গল্প। এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি পুজোকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প।
একসময় দেবীর গায়ে উঠত বিপুল সোনার গয়না। সেই গয়নার নিরাপত্তায় থাকত পুলিশ পাহারা। বাড়ির পুজো ছিল ঐশ্বর্যের অন্যতম পরিচয়।
আজ সেই সময় নেই।
নেই চোখ ধাঁধানো আলো, নেই থিমের প্রতিযোগিতা, নেই আগের দিনের বিপুল জাঁকজমক। কিন্তু পুজোর চার দিন ঠাকুরদালানে এখনও ভিড় জমে। ঢাক বাজে, শঙ্খধ্বনি ওঠে, দেবীর আরাধনা হয়।
আর সেখানেই হয়তো বাগচী বাড়ির পুজোর আসল শক্তি।
জৌলুস কমেছে, কিন্তু নিষ্ঠা কমেনি। সোনার গয়না কমেছে, কিন্তু ভক্তির আলো নিভে যায়নি। সময় বদলেছে, কিন্তু যমশেরপুরের বাগচী বাড়িতে দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য আজও একইভাবে বেঁচে আছে।