Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কোনও শিল্পীকে গণ্ডিতে বাঁধা উচিত নয়’, অরিজিতের ‘প্লেব্যাক’ গানে অবসরের সিদ্ধান্তে আর কী বললেন শ্রেয়া?

শ্রেয়া এবং অরিজিৎ দু’জনেই এ দেশের অন্যতম আলোচিত ‘প্লেব্যাক’ সঙ্গীতশিল্পী। একসঙ্গেও অনেক কাজ করেছেন তাঁরা। এ বার গায়কের এই সিদ্ধান্তে মুখ খুললেন গায়িকা।গত ২৪ ঘণ্টায় তোলপাড় সমাজমাধ্যম। সঙ্গীতশিল্পী অরিজিৎ সিংহের সিদ্ধান্ত জানার পরে অনেকেরই মনখারাপ। বড়পর্দায় আর গাইবেন না, এটাই ঠিক করেছেন তিনি। গায়কের এই সিদ্ধান্তে নানা জনের নানা মত। এই বিষয়ে কী মন্তব্য করলেন গায়িকা শ্রেয়া ঘোষাল?

শ্রেয়া এবং অরিজিৎ দু’জনেই এ দেশের অন্যতম আলোচিত ‘প্লেব্যাক’ সঙ্গীতশিল্পী। একসঙ্গেও অনেক কাজ করেছেন তাঁরা। এ বার গায়কের এই সিদ্ধান্তে মুখ খুললেন গায়িকা। শ্রেয়া লেখেন, “এটা একটা নতুন শুরু অরিজিৎ। আমি সত্যিই উত্তেজিত তোমাকে নতুন ভাবে দেখার জন্য। কখনও বলব না, এটা কোনও অধ্যায়ের শেষ। এই মাপের একজন শিল্পীকে কখনও কোনও গণ্ডিতে বাঁধা উচিত নয়। প্রিয় অরিজিৎ, এটাই সময় আরও গর্জে ওঠার।”কী কারণে, এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন গায়ক? অরিজিৎ নিজের এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘‘এমন একটা সিদ্ধান্ত নেব, অনেক দিন ধরেই ভেবেছিলাম। অবশেষে সাহস জোগাড় করতে পেরে ঘোষণা করলাম। সোজা ভাবে বলতে গেলে, আমার খুব সহজেই একঘেয়েমি চলে আসে। যে কারণে আমি আমার গানের অ্যারেঞ্জমেন্ট প্রায়ই বদলে বদলে মঞ্চে পারফর্ম করি। সেই কারণে আমি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি, নতুন ধরনের সঙ্গীতের খোঁজে নামছি।’’ এই সিদ্ধান্ত কি আগামী দিনে বদলাতে পারে গায়কের? সেই উত্তর অধরা।

ভারতীয় সঙ্গীতজগতের অন্যতম জনপ্রিয়, সফল এবং আবেগঘন কণ্ঠ—অরিজিৎ সিং। তাঁর গান মানেই প্রেম, বেদনা, নস্টালজিয়া আর গভীর অনুভূতির এক অনন্য মেলবন্ধন। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বলিউড থেকে স্বাধীন সঙ্গীত—প্রায় সর্বত্রই তাঁর কণ্ঠের আধিপত্য। ঠিক সেই সময়েই যখন শ্রোতারা তাঁকে আরও বেশি করে চাইছেন, তখনই এক্স (পূর্বতন টুইটার)-এ একটি পোস্ট করে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন ফেলে দিলেন এই গায়ক।

অরিজিতের কথায়,

“এমন একটা সিদ্ধান্ত নেব, অনেক দিন ধরেই ভেবেছিলাম। অবশেষে সাহস জোগাড় করতে পেরে ঘোষণা করলাম। সোজা ভাবে বলতে গেলে, আমার খুব সহজেই একঘেয়েমি চলে আসে।”

এই কয়েকটি লাইনেই যেন ধরা পড়ে একজন শিল্পীর অন্তর্দ্বন্দ্ব, ক্লান্তি এবং নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের তাগিদ।


একঘেয়েমি: সাফল্যের উল্টো পিঠ

সাধারণ মানুষের কাছে সাফল্য মানেই সুখ, তৃপ্তি ও নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ। কিন্তু একজন সৃজনশীল মানুষের ক্ষেত্রে সাফল্য অনেক সময়েই হয়ে ওঠে দ্বিমুখী তলোয়ার। অরিজিতের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে বলে মনে করছেন সঙ্গীত বিশ্লেষকদের একাংশ।

গত কয়েক বছরে এমন খুব কম হিট গান রয়েছে, যেখানে অরিজিতের কণ্ঠ শোনা যায়নি। রোম্যান্টিক ব্যালাড, বিচ্ছেদের গান, আধ্যাত্মিক সুর—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি এতটাই সর্বব্যাপী যে এক সময় সেই সাফল্যই শিল্পীকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়—
আমি কি একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছি?

নিজের পোস্টেই অরিজিত লিখেছেন, তিনি মঞ্চে গান গাওয়ার সময় প্রায়ই অ্যারেঞ্জমেন্ট বদলে ফেলেন। একই গানকে নতুন করে পরিবেশন করার এই চেষ্টা আসলে তাঁর একঘেয়েমি কাটানোর পথ। কিন্তু সেই পথও যে আর যথেষ্ট নয়, সেটাই ইঙ্গিত করছে তাঁর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত।


সৃজনশীল ক্লান্তি: নাম না জানা এক রোগ

এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে আর একটি বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে creative fatigue বা সৃজনশীল ক্লান্তির বিষয়টি। এটি কোনও আনুষ্ঠানিক রোগ না হলেও, শিল্পী ও সৃষ্টিশীল মানুষের মধ্যে অত্যন্ত পরিচিত একটি মানসিক অবস্থা।

বারবার একই ধরনের গান গাওয়া, একই আবেগ প্রকাশ, একই প্রত্যাশা পূরণের চাপ—এই সব মিলিয়ে একজন শিল্পী ধীরে ধীরে নিজের কাজের সঙ্গেই সংযোগ হারাতে শুরু করেন। অরিজিতের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও বেশি, কারণ শ্রোতাদের একটি বড় অংশ তাঁর কাছ থেকে ঠিক কেমন গান চায়, সেটি প্রায় স্থির হয়ে গিয়েছে।

অনেক সঙ্গীতবোদ্ধার মতে,
“অরিজিৎ নিজেই তাঁর কণ্ঠস্বরের বন্দি হয়ে পড়েছেন।”

এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে নতুন ধরনের সঙ্গীতের খোঁজে নামা আসলে নিজের শিল্পীসত্তাকে বাঁচিয়ে রাখারই একটি প্রয়াস।


নতুন ধরনের সঙ্গীত মানে কী?

অরিজিৎ ঠিক কী ধরনের পরিবর্তনের কথা বলছেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তিনি নিজেও তাঁর পোস্টে কোনও নির্দিষ্ট ঘরানা বা পরিকল্পনার কথা বলেননি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—
নতুন সঙ্গীত বলতে কী বোঝাচ্ছেন তিনি?

সম্ভাব্য কয়েকটি দিক নিয়ে আলোচনা চলছে—

  1. কমার্শিয়াল বলিউড থেকে সরে আসা
    বহুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল, অরিজিৎ মূলধারার ছবির গান নিয়ে কিছুটা ক্লান্ত। হয়তো তিনি আরও বেশি করে স্বাধীন সঙ্গীত বা এক্সপেরিমেন্টাল প্রজেক্টে মন দিতে চাইছেন।

  2. ভাষা ও অঞ্চলের পরিসর বাড়ানো
    বাংলা, হিন্দির বাইরে অন্য ভারতীয় ভাষা বা আন্তর্জাতিক প্রজেক্টে কাজ করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

  3. কম গাওয়া, বেশি সৃষ্টি করা
    গায়ক থেকে সুরকার বা প্রযোজকের ভূমিকায় নিজেকে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করার চিন্তাও থাকতে পারে।

    news image
    আরও খবর

সিদ্ধান্ত কি চূড়ান্ত?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই সিদ্ধান্ত কি স্থায়ী? নাকি এটি একটি সাময়িক বিরতি, এক ধরনের আত্মঅনুসন্ধানের সময়?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা। অরিজিত নিজেও তাঁর পোস্টে ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি দেননি। তিনি শুধু বলেছেন, তিনি নতুন সঙ্গীতের খোঁজে বেরোচ্ছেন।

সঙ্গীতজগতের অনেকেই মনে করছেন,
এটি কোনও বিদায় নয়, বরং একটি রিসেট বাটন চাপা।

অতীতেও বহু শিল্পী এমন পর্যায়ে এসে সাময়িক বিরতি নিয়েছেন—এ আর রহমান, কৈলাশ খের, এমনকি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অ্যাডেল বা এড শিরানের মতো তারকারাও। অনেক সময় এই বিরতিই তাঁদের আরও শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের রাস্তা তৈরি করে দেয়।


শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া: উদ্বেগ ও সমর্থন পাশাপাশি

অরিজিতের ঘোষণার পর সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে উদ্বেগ—
“তাঁকে আর আগের মতো পাব তো?”
অন্যদিকে সমর্থন—
“একজন শিল্পীর নিজের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে।”

অনেক ভক্তই লিখেছেন, তাঁরা অপেক্ষা করবেন, কিন্তু চান না অরিজিত নিজেকে জোর করে গানের মধ্যে আটকে রাখুন। কারণ, তাঁর কণ্ঠের আসল শক্তি ঠিক সেখানেই—যেখানে তিনি নিজে অনুভব করেন।


এই সিদ্ধান্তের বৃহত্তর তাৎপর্য

এই ঘটনা শুধু অরিজিত সিংয়ের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পীদের কাজের পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তোলে। আমরা কি শিল্পীদের মানুষ হিসেবে দেখছি, নাকি কেবল ‘হিট গান তৈরির যন্ত্র’ হিসেবে?

একজন শিল্পী যখন বলেন, তিনি ক্লান্ত—তখন সেটিকে দুর্বলতা নয়, বরং সততার নিদর্শন হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। অরিজিত সেই সাহসটাই দেখিয়েছেন।


উপসংহার

অরিজিত সিংয়ের এই সিদ্ধান্ত হয়তো আপাতদৃষ্টিতে অনিশ্চয়তায় ভরা। কিন্তু গভীরে তাকালে এটি এক ধরনের আত্মসচেতনতা, আত্মরক্ষা এবং সৃজনশীল সততার পরিচয়।

তিনি হয়তো কিছুদিনের জন্য কম শোনা যাবেন, হয়তো একেবারেই অন্য রূপে ফিরবেন। কিন্তু যেটা স্পষ্ট—তিনি আর নিজেকে একঘেয়েমির হাতে ছেড়ে দিতে রাজি নন।

আর সম্ভবত, একজন সত্যিকারের শিল্পীর কাছে এর চেয়ে বড় সিদ্ধান্ত আর কিছু হতে পারে না।

অরিজিৎ সিংয়ের এই ঘোষণার সঙ্গে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে—শিল্পীর উপর সমাজ ও ইন্ডাস্ট্রির ক্রমাগত প্রত্যাশার চাপ। গত এক দশকে বলিউডে এমন খুব কম সময় এসেছে, যখন কোনও বড় ছবিতে অরিজিতের গান নেই। এই সর্বব্যাপী উপস্থিতি একদিকে যেমন তাঁকে ‘নিরাপদ পছন্দ’ করে তুলেছে, তেমনই অন্যদিকে তাঁকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে বেঁধে ফেলেছে।

প্রযোজক ও সঙ্গীত পরিচালকদের একটি বড় অংশ অরিজিতের কণ্ঠকে ব্যবহার করেছেন আবেগ তৈরির শর্টকাট হিসেবে। ফলত, একই ধরনের সুর, একই রকম কথা, একই আবেগ—বারবার ফিরে এসেছে। একজন শিল্পী হিসেবে অরিজিত নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, এই পুনরাবৃত্তি তাঁকে ধীরে ধীরে সৃষ্টিশীলতার মূল স্রোত থেকে সরিয়ে দিচ্ছে।

এই জায়গাতেই তাঁর “নতুন ধরনের সঙ্গীতের খোঁজ”-এর কথা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি শুধু নতুন ঘরানা নয়, বরং নিজের শিল্পীসত্তাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা। হয়তো এমন সঙ্গীত, যা কম জনপ্রিয় হবে, কিন্তু বেশি সত্যি হবে। হয়তো এমন গান, যা চার্টবক্সে থাকবে না, কিন্তু শিল্পীর মনকে তৃপ্ত করবে।

এখানে আর একটি সম্ভাবনাও উঁকি দেয়—অরিজিত হয়তো এখন আর ‘সব জায়গায় থাকা’ গায়ক হতে চান না। বরং বেছে বেছে কাজ করতে চান, যেখানে তাঁর কণ্ঠ ও মন—দু’টিই একসঙ্গে সাড়া দেবে। এই বাছাইয়ের স্বাধীনতাই একজন পরিণত শিল্পীর সবচেয়ে বড় বিলাসিতা।

সবশেষে বলা যায়, অরিজিৎ সিংয়ের এই সিদ্ধান্ত আমাদের শ্রোতাদের কাছেও এক ধরনের বার্তা দেয়—প্রিয় শিল্পীকে ভালবাসা মানে শুধু তাঁর কাছ থেকে নিয়মিত গান চাওয়া নয়, বরং তাঁর নীরবতাকেও সম্মান করা। কারণ অনেক সময়, সেই নীরবতার মধ্যেই জন্ম নেয় পরবর্তী সুর।

Preview image