বিপাশা ও জন আব্রাহামের ছবি ‘জিস্‌ম’। ছবিতে ‘জাদু হ্যায় নেশা হ্যায়’ ও ‘চলো তুমকো লে কর চলে’ এই দু’টি গান গেয়েছিলেন শ্রেয়া। গানের দৃশ্যায়নে সাহসী অবতারে দেখা গিয়েছিল বিপাশাকে।সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর ছবি ‘দেবদাস’ থেকে বলিউড সফর শুরু হয়েছিল শ্রেয়া ঘোষালের। প্রথম ছবিতেই তাঁর গান সাড়া ফেলেছিল। নতুন কণ্ঠকে স্বাগত জানিয়েছিলেন বলিউড সঙ্গীতের শ্রোতারা। এর পরে বিপাশা বসুর ছবিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন শ্রেয়া। সেই গানও সফল। কিন্তু বিপাশার জন্য তাঁর কণ্ঠ বেমানান বলে মনে করেছিলেন গায়িকা।
বিপাশা ও জন আব্রাহামের ‘জিস্ম’ ছবিতে ‘জাদু হ্যায় নেশা হ্যায়’ ও ‘চলো তুমকো লে কর চলে’ এই দু’টি গান গেয়েছিলেন শ্রেয়া। গানের দৃশ্যায়নে সাহসী অবতারে দেখা গিয়েছিল বিপাশাকে। ২০০৩ সালের সেই ছবি নিয়ে বিতর্কও হয়েছিল সাহসী দৃশ্যের জন্য। তখন শ্রেয়ার বয়স মাত্র ১৮।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে শ্রেয়া বলেছেন, “আমার মনে হয়েছিল আমি বিপাশার জন্য মানানসই নই। কিন্তু সুরকার এমএম কীরাবানি খুব সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর ঠিক এই কণ্ঠটাই দরকার ছিল। আমি জোর করে গানে সংবেদনশীলতা আনতে চাইনি। আমার মনে হয়, গানটিতে তারুণ্যের কাঁচা আবেগটাই দরকার ছিল। তখন আমার বয়স ১৮। আমি ঠিক ভাবে পরিস্থিতিকে গানের মাধ্যমে তুলে ধরতে পারছিলাম না। যখন পরিস্থিতিটা আমাকে বোঝানো হয়, তখন ভাবলাম, যদি আশা ভোঁসলেজি থাকতেন, তিনি কী করতেন। শেষ পর্যন্ত আমি আমার নিজের মতো করেই গানটি গেয়েছিলাম।”
শ্রেয়া এও জানান, প্রথম ছবি অর্থাৎ ‘দেবদাস’-এ গান গাওয়ার পরে দ্বিতীয় কাজ পেতে তাঁর বেশ সময়ও লেগেছিল। ‘জিস্ম’ ছবিতে গাওয়ার পরে অবশ্য আর থেমে থাকতে হয়নি তাঁকে। অসংখ্য জনপ্রিয় গান রয়েছে শ্রেয়া ঘোষালের।
ভারতীয় সঙ্গীত জগতের অন্যতম উজ্জ্বল নাম Shreya Ghoshal। তাঁর কণ্ঠ শুধু একটি গানকে জনপ্রিয় করে না, বরং শ্রোতার অনুভূতির গভীরে পৌঁছে যায়। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ভারতীয় প্লেব্যাক সঙ্গীতের অন্যতম প্রধান মুখ। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন, যা শুধু তাঁর শিল্পীজীবনের নয়, বরং একজন শিল্পীর মানসিক বিকাশের গল্পও তুলে ধরে।
এই সাক্ষাৎকারে তিনি বিশেষভাবে আলোচনা করেন জিস্ম ছবির গান নিয়ে, যেখানে তিনি অভিনেত্রী Bipasha Basu-র জন্য গান গেয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা, আত্মসন্দেহ, সুরকারের সাহসী সিদ্ধান্ত এবং একজন তরুণ শিল্পীর আবেগ—সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে ভারতীয় সঙ্গীত ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
শ্রেয়া ঘোষালের সঙ্গীতযাত্রা শুরু হয় খুব অল্প বয়সেই। ছোটবেলা থেকেই তাঁর সঙ্গীতের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। বিভিন্ন সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে তিনি নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় আসে যখন তিনি Devdas ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ পান।
এই ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন Ismail Darbar এবং পরিচালনা করেছিলেন Sanjay Leela Bhansali। ছবির গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয় হয় এবং শ্রেয়া রাতারাতি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর কণ্ঠে “বৈরি পিয়া”, “ডোলা রে ডোলা” সহ একাধিক গান শ্রোতাদের মন জয় করে।
কিন্তু অনেকেই মনে করেন প্রথম সফলতার পরই শিল্পীর জীবন সহজ হয়ে যায়। বাস্তবে তা হয়নি। শ্রেয়া নিজেই জানিয়েছেন, দেবদাস-এর সাফল্যের পর দ্বিতীয় বড় সুযোগ পেতে তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
একজন নতুন শিল্পীর জন্য সবচেয়ে কঠিন সময় হলো প্রথম সাফল্যের পরে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। শ্রেয়ার ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল। তিনি জনপ্রিয় হলেও ধারাবাহিক কাজ পাচ্ছিলেন না।
এই সময়টা তাঁর জন্য মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জিং ছিল। অনেকেই ভাবেন যে একবার বলিউডে প্রবেশ করলেই কাজের অভাব হয় না, কিন্তু বাস্তবে শিল্পীদের প্রতিনিয়ত নিজেদের প্রমাণ করতে হয়।
এই অপেক্ষার সময়ই তাঁকে আরও পরিণত করে। তিনি কণ্ঠচর্চা চালিয়ে যান, বিভিন্ন ভাষায় গান শেখেন এবং নিজের গায়কির বৈচিত্র্য বাড়ান।
পরবর্তীতে আসে Jism — যা তাঁর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বড় মোড়। এই ছবির সুরকার ছিলেন M. M. Keeravani (এমএম কীরাবানি)। তিনি শ্রেয়াকে এমন একটি গানের জন্য নির্বাচন করেন, যা অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত।
ছবির চরিত্র ও পরিবেশ ছিল পরিণত, সংবেদনশীল এবং আবেগঘন। অভিনেত্রী বিপাশা বসুর পর্দার ব্যক্তিত্ব ছিল সাহসী ও গ্ল্যামারাস। শ্রেয়ার নিজেরই মনে হয়েছিল তাঁর কণ্ঠ হয়তো এই চরিত্রের সঙ্গে মানানসই নয়।
কিন্তু সুরকার কীরাবানি ভিন্ন কিছু দেখেছিলেন।
তিনি বুঝেছিলেন যে গানটির জন্য অতিরিক্ত পরিণত বা ভারী কণ্ঠ নয়, বরং দরকার ছিল কাঁচা আবেগ—এক ধরনের অপ্রস্তুত, তরুণ অনুভূতি।
সাক্ষাৎকারে শ্রেয়া বলেন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৮। এত জটিল আবেগপূর্ণ পরিস্থিতি তিনি পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছিলেন না। একজন তরুণ শিল্পীর জন্য এটি স্বাভাবিক।
তিনি জোর করে সংবেদনশীলতা আনতে চাননি। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, আবেগ জোর করে সৃষ্টি করা যায় না; তা স্বতঃস্ফূর্ত হতে হয়।
এই উপলব্ধিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
তিনি ভাবেন, যদি কিংবদন্তি Asha Bhosle এই গানটি গাইতেন, তাহলে কীভাবে গাইতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি অন্য কারও অনুকরণ না করে নিজের স্বাভাবিক গায়কির উপর ভরসা করেন।
এটাই একজন প্রকৃত শিল্পীর পরিচয়—প্রভাব গ্রহণ করা, কিন্তু নিজের স্বর হারিয়ে না ফেলা।
গানটিতে যে আবেগ ধরা পড়ে, তা নিখুঁত অভিনয়ের মতো নয়; বরং বাস্তব অনুভূতির মতো। শ্রেয়া নিজেই বলেন, গানটিতে তারুণ্যের কাঁচা আবেগটাই দরকার ছিল।
এই ‘অসম্পূর্ণতা’ই গানটিকে বাস্তব করে তোলে।
অনেক সময় প্রযুক্তিগতভাবে নিখুঁত গানের চেয়ে আবেগপূর্ণ গান মানুষের মনে বেশি দাগ কাটে। শ্রেয়ার কণ্ঠে সেই আন্তরিকতা ছিল, যা শ্রোতাদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করে।
জিস্ম-এর পর আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বলিউডসহ ভারতীয় বিভিন্ন ভাষার সিনেমায় তিনি ধারাবাহিকভাবে গান গাইতে শুরু করেন।
হিন্দি, বাংলা, তামিল, তেলুগু, মালয়ালম, কন্নড়—প্রায় সব বড় ভাষায় তিনি গান গেয়েছেন। তাঁর উচ্চারণের নিখুঁততা এবং ভাষা শেখার আগ্রহ তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
শ্রেয়া ঘোষালের অন্যতম বড় শক্তি হলো তাঁর বহুমুখিতা। তিনি একই দক্ষতায়—
শাস্ত্রীয়ধর্মী গান
রোমান্টিক গান
আধুনিক পপ
ভক্তিমূলক সংগীত
আইটেম নাম্বার
সবই গাইতে পারেন।
তাঁর কণ্ঠে কোমলতা যেমন আছে, তেমনি শক্তিশালী আবেগ প্রকাশের ক্ষমতাও রয়েছে।
বর্তমান সময়ে অটো-টিউন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে শ্রেয়া ঘোষাল প্রমাণ করেছেন যে প্রকৃত সঙ্গীতের ভিত্তি এখনও অনুভূতি এবং প্রশিক্ষণ।
তিনি লাইভ পারফরম্যান্সে একই মান বজায় রাখতে পারেন—যা অনেক গায়কের পক্ষে কঠিন।
শ্রেয়ার গান জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো তাঁর কণ্ঠের মানবিকতা। তাঁর গান শুনলে মনে হয় যেন ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে।
শ্রোতারা নিজেদের গল্প তাঁর গানে খুঁজে পান।
বলিউডে নারী প্লেব্যাক শিল্পীদের জন্য প্রতিযোগিতা সবসময়ই তীব্র। তবুও শ্রেয়া দীর্ঘ সময় ধরে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
তিনি কখনও ট্রেন্ড অনুসরণ করার জন্য নিজের স্টাইল বদলাননি। বরং নিজের স্বকীয়তাকে বজায় রেখেছেন।
আজকের প্রজন্মের বহু গায়ক তাঁকে অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখেন। রিয়েলিটি শো থেকে উঠে আসা অনেক শিল্পী তাঁর গান গেয়ে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করেন।
তিনি শুধু একজন গায়িকা নন—তিনি একটি মানদণ্ড।
শ্রেয়ার গল্প আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—
প্রথম সাফল্যই শেষ নয়।
আত্মসন্দেহ স্বাভাবিক।
সঠিক মেন্টর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
নিজের স্বকীয়তা সবচেয়ে বড় শক্তি।
১৮ বছরের এক তরুণী, যিনি মনে করেছিলেন তিনি হয়তো চরিত্রের জন্য উপযুক্ত নন—আজ তিনি ভারতীয় সঙ্গীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কণ্ঠ। দেবদাস তাঁকে পরিচিতি দিয়েছিল, কিন্তু জিস্ম তাঁকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল।
এমএম কীরাবানির সাহসী সিদ্ধান্ত, নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার সততা এবং স্বাভাবিক আবেগে গান গাওয়ার সাহস—এই তিনের মিলনেই জন্ম নিয়েছিল এক নতুন অধ্যায়।
আজ Shreya Ghoshal শুধু একজন সফল শিল্পী নন; তিনি প্রমাণ যে সত্যিকারের শিল্প আসে হৃদয় থেকে, প্রযুক্তি বা অভিনয় থেকে নয়।
তাঁর কণ্ঠ এখনও একইভাবে মানুষকে স্পর্শ করে—কারণ সেখানে রয়েছে সত্যিকারের অনুভূতি, সততা এবং সঙ্গীতের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা।