ইছাপুরের বি এন পাল স্ট্রিট এলাকায় পারিবারিক বিবাদের জেরে ভাইপো সৈকত প্রামাণিক ওরফে জয় আচমকাই চড়াও হয়ে নিজের কাকা কানাই প্রামাণিক (৪৮) কে হত্যা করেছেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ঘটনার সময় বাড়িতে তীব্র ভোর্ত্তি চলছিল। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করেছে।
ইছাপুরের বি এন পাল স্ট্রিটে পারিবারিক বিবাদের পর কাকা খুন: নেশাগ্রস্ত ভাইপোর বর্বরতা
নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাকপুর: ইছাপুরের বি এন পাল স্ট্রিট এলাকায় সোমবার রাতে ঘটে এক মর্মান্তিক ঘটনা। পারিবারিক বিবাদের জেরে নিজের কাকা কানাই প্রামাণিক (৪৮) কে হত্যা করেছে ভাইপো সৈকত প্রামাণিক ওরফে জয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মদ্যপ অবস্থায় আচমকাই কাকার উপর চড়াও হয় জয়, যার ফলে গুরুতর জখম হন কানাইবাবু। তাকে বারাকপুরের বি এন বসু হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও মঙ্গলবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে নেশাগ্রস্ত জয় বাড়িতে প্রবেশ করলে নিয়মিত অত্যাচার চালাতেন। সোমবার রাতেও সে মদ্যপ অবস্থায় বাড়িতে আসে এবং কাকিমা ও খুড়তুতো ভাইকে মারধর করে। কানাইবাবু তখন বাড়িতে ছিলেন না। পরে ফেরার পর তিনি প্রতিবাদ করলে জয় আচমকা কাকার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ভারী কিছু দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। ফলে কানাইবাবু রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন।
এই প্রথমবার নয়, পূর্বেও সৈকত প্রামাণিক কাকে খুন করার চেষ্টা করেছিল। সেই সময়ও পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করেছিল এবং পরে জামিনে মুক্তি পেয়েছিল। বর্তমানে অভিযুক্তের স্ত্রী এবং তিন বছরের একটি মেয়ে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনা অনুযায়ী, জয় মদ্যপ ও গাঁজার নেশায় প্রায় প্রতিদিনই বাড়ি ফিরে রুদ্রমূর্তি ধারণ করতেন। তাঁর আচরণে পরিবার ও প্রতিবেশীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে কাকার উপর হামলা একটি মর্মান্তিক পরিণতি হিসেবে সামনে এসেছে।
স্থানীয় কাউন্সিলার এবং উত্তর বারাকপুর পুরসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান শ্রীপর্ণা রায় বলেন, “বছর তিনেক আগে সৈকত প্রামাণিকের বিরুদ্ধে আরেক কাকার হত্যার অভিযোগ উঠেছিল। সে তখনও কাকাদের উপর সহিংস আচরণ করত। এবার আরও এক কাকা খুন হলেন তার হাতে। আমরা চাই, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
বারাকপুর ডিসি নর্থ গণেশ বিশ্বাস জানিয়েছেন, “প্রাথমিক তদন্তে দেখা যাচ্ছে, পারিবারিক বিবাদেই হত্যাকাণ্ডের সূচনা। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।”
জয়ের দূর সম্পর্কের এক বোন বুল্টি সাধুখাঁর দাবি, “মদ্যপ অবস্থায় সে বাড়িতে প্রবেশ করলে রীতিমতো এক রুদ্রমূর্তি ধারণ করত। পরিবারের সদস্যরা তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ। এমনকি আগেও একবার সে কাকে মারধরের চেষ্টা করেছিল।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কাকার হত্যার রাতটি ছিল চরম ভয়ঙ্কর। চিৎকার চেঁচামেচিতে আশেপাশের বাড়ির মানুষরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরিবারের অন্য সদস্যরাও হামলার শিকার হন।
মদ্যপ ও গাঁজার নেশার কারণে সৈকত প্রামাণিকের আচরণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে তার নেশার ফলে বাড়িতে সহিংসতা ও আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করছিল। পরিবারের সদস্যরা আর সহ্য করতে না পেরে একাধিকবার পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছিলেন।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, মদ্যপ ভাইপোর কারণে পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ও শারীরিকভাবে অত্যন্ত চাপের মধ্যে আছে। প্রতিবেশীরাও উদ্বিগ্ন। “এ ধরনের আচরণ সমাজের জন্যও হুমকিস্বরূপ,” স্থানীয় এক বাসিন্দা জানিয়েছেন।
নোয়াপাড়া থানার পুলিশ রাতেই অভিযান চালিয়ে সৈকত প্রামাণিককে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যার সঠিক কারণ ও ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আইনি বিশ্লেষকরা বলছেন, যেহেতু অভিযুক্ত ইতিমধ্যেই পূর্বে গ্রেপ্তার হয়েছিল এবং আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছিল, তাই এই হত্যাকাণ্ডে আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ন্যায়বিচারের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য।
স্থানীয় কাউন্সিলার ও সমাজকর্মীরা কঠোরতম শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, নেশাগ্রস্ত ও সহিংস ব্যক্তির কারণে পরিবার এবং প্রতিবেশীদের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয়রা চায়, পুলিশ অভিযুক্তকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতে হাজির করে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করুক। সমাজে যাতে এ ধরনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
ইছাপুরের এই হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে, মদ্যপ ও নেশাজাতীয় পদার্থের সঠিক নিয়ন্ত্রণ না থাকলে পরিবারের মধ্যে অশান্তি, সহিংসতা এবং প্রাণঘাতী পরিণতি ঘটতে পারে। কাকা কানাই প্রামাণিকের মৃত্যু শুধুমাত্র একটি পরিবারকে নয়, পুরো এলাকার মানুষের জন্য শোক ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ, ন্যায়বিচার এবং সমাজের সচেতনতার মাধ্যমে এ ধরনের ঘটনা রোধ করা সম্ভব।
ইছাপুরের এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি পারিবারিক বিবাদের ফলাফলের ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজে নেশাজাতীয় পদার্থের প্রভাব, পারিবারিক সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলার গুরুত্বের ওপর গভীর মনন করতে বাধ্য করছে। পারিবারিক বিবাদ যেকোনো পরিবারে হতে পারে, তবে নেশাজাতীয় পদার্থের সঠিক নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এই ধরনের বিবাদ সহজেই প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে। কানাই প্রামাণিকের মৃত্যু এমন একটি চরম উদাহরণ, যেখানে পারিবারিক সম্পর্ক, নেশার অভ্যাস এবং সহিংস মনোভাব মিলিত হয়ে একটি ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি বাড়িতে প্রবেশ করলে পরিবার এবং প্রতিবেশী উভয়ই মানসিকভাবে ভীষণ চাপের মধ্যে থাকেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যরা শারীরিকভাবে সুরক্ষাহীন হয়ে পড়েন, এবং যে কোনো ছোটখাটো তর্ক বা অসন্তোষও বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও নারী সদস্যদের ক্ষেত্রে এ ধরনের হুমকি আরও ভীতিকর। সৈকত প্রামাণিকের আচরণ এই সত্যকে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নেশা শুধুমাত্র ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং তার পারিপার্শ্বিকদের জীবনেও বিপর্যয় আনতে পারে।
আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে এই হত্যাকাণ্ড আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অপরাধীকে সময়মতো দমন না করলে পুনরাবৃত্তি ঘটার সম্ভাবনা থাকে। পূর্বেও সৈকত প্রামাণিকের বিরুদ্ধে এক কাকার হত্যার চেষ্টা হয়েছিল, এবং সে আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছিল। এই তথ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অপরাধীকে যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ না করলে পুনরায় একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। আইনশৃঙ্খলার যথাযথ প্রয়োগ, বিচার ও সামাজিক সচেতনতা একসাথে না থাকলে, পরিবারের মধ্যে সহিংসতা ও মৃত্যুর মতো চরম পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।
এছাড়া এই হত্যাকাণ্ড আমাদের জন্য একটি সমাজিক সতর্কবার্তা। সমাজে মদ্যপ ও নেশাজাতীয় পদার্থের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। পরিবার, প্রতিবেশী এবং স্থানীয় প্রশাসনকে একসাথে কাজ করতে হবে, যাতে নেশার কারণে সৃষ্ট সহিংসতা রোধ করা যায়। স্কুল, কলেজ ও সমাজসেবী সংস্থাগুলোরও ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে মানুষকে নেশার ক্ষতিকর প্রভাব ও এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা যেতে পারে।
পরিবারের অভ্যন্তরে নেশার প্রভাব শুধুমাত্র পারিবারিক শান্তি নষ্ট করে না, বরং মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলে। নেশার কারণে মানুষ প্রায়শই তার স্বাভাবিক বিচার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যা চরম সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। কাকা কানাই প্রামাণিকের হত্যার ঘটনা প্রমাণ করে, একে কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত নয়; এটি সমাজে নেশার প্রভাব এবং সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য একটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ।
আইনের যথাযথ প্রয়োগ ছাড়া এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব নয়। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা, তার বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তির দাবি করা এবং বিচার প্রক্রিয়ার সঠিকভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। এছাড়া পরিবার ও সমাজকে নেশা থেকে দূরে রাখার জন্য সামাজিক ব্যবস্থা, Counselling, মাদক বিরোধী কর্মসূচি এবং স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
সর্বোপরি, কাকা কানাই প্রামাণিকের মৃত্যু শুধুমাত্র একটি পরিবারকে নয়, পুরো এলাকাকে শোকাহত ও আতঙ্কিত করেছে। পরিবারের সদস্যরা মানসিকভাবে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত, প্রতিবেশীরা আতঙ্কিত, এবং স্থানীয় প্রশাসনও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। এমন ঘটনায় সমাজকে সচেতন হওয়া, নেশার প্রভাব কমানো, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ করা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা ছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে না।
অতএব, ইছাপুর হত্যাকাণ্ড আমাদের শিক্ষা দেয়, যে পারিবারিক বিবাদ, নেশাজাতীয় পদার্থ এবং সহিংস মনোভাবের সংমিশ্রণ কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে। ন্যায়বিচার, সামাজিক সচেতনতা এবং পরিবারের নিরাপত্তার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণই একমাত্র পথ, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয়জনিত ঘটনা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। সমাজকে শক্তিশালী করার জন্য এই ধরনের হত্যাকাণ্ডকে শুধুমাত্র বিচারের মাধ্যমে সমাধান করা যথেষ্ট নয়; মানসিক শিক্ষা, নেশা বিরোধী সচেতনতা এবং পারিবারিক সমর্থন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।