Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

News Title ভারতে আসছেন বিটিএস ২০২৬ এর ওয়ার্ল্ড ট্যুরে কলকাতার নাম এবং টিকিটের জন্য হাহাকার সঙ্গে স্বপ্নপূরণের পার্পল ওশেন

ভারতীয় বিটিএস আর্মিদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। কোরিয়ান পপ সেনসেশন বিটিএস তাদের সামরিক পরিষেবা শেষ করে পুনর্মিলনের পর প্রথম ওয়ার্ল্ড ট্যুর ফরএভার ইং এর ঘোষণা করেছে। আর সেই তালিকায় জ্বলজ্বল করছে ভারতের দুটি শহরের নাম মুম্বাই এবং কলকাতা। কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে অনুষ্ঠিত হতে চলা এই কনসার্টের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বুকিং সাইট ক্র্যাশ করেছে। টিকিটের জন্য হাহাকার হোটেল বুকিং শেষ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগের সুনামি সব মিলিয়ে ভারতে এখন বিটিএস ম্যানিয়া।

আজকের দিনটি ভারতীয় মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসে এবং কোটি কোটি ভারতীয় কে পপ ভক্তদের জীবনে সম্ভবত সবচেয়ে স্মরণীয় দিন হতে চলেছে। দীর্ঘ এক দশকের জল্পনা হাজারো গুজব এবং অন্তহীন অপেক্ষার পর অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত। দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্বখ্যাত বয় ব্যান্ড বিটিএস বা বাংতান সোনিওনদান অবশেষে ভারতে আসছে। আজ সকালে বিটিএস এর এজেন্সি বিগহিট মিউজিক তাদের অফিশিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে ২০২৬ এর বহু প্রতীক্ষিত ওয়ার্ল্ড ট্যুর ফরএভার ইং এর এশিয়া লেগ এর তালিকা প্রকাশ করে। সেই তালিকার ৭ নম্বরে মুম্বাই এবং ৮ নম্বরে কলকাতা এর নাম দেখামাত্রই ইন্টারনেটে আক্ষরিক অর্থেই বিস্ফোরণ ঘটে।

২০২৫ সালে বিটিএস এর সাত সদস্য আরএম জিন সুগা জে হোপ জিমিন ভি এবং জংকুক তাদের বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা বা মিলিটারি সার্ভিস শেষ করে ফিরে এসেছেন। তারপর থেকেই বিশ্বজুড়ে জল্পনা ছিল যে তাদের রিইউনিয়ন বা পুনর্মিলন ট্যুর কবে হবে। সেই জল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ ঘোষিত হলো ট্যুরের দিনক্ষণ। জানা গেছে ২০২৬ এর নভেম্বরে মুম্বাইয়ের ডিওয়াই পাটিল স্টেডিয়ামে এবং ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়াম বা যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে পারফর্ম করবেন এই সাত মহাতারকা।

ফরএভার ইং এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা

ট্যুরের নাম রাখা হয়েছে ফরএভার ইং। এটি তাদের অন্যতম জনপ্রিয় একটি গানের নাম। এই নামের মাধ্যমে বিটিএস বোঝাতে চেয়েছে যে সময় পেরোলেও তাদের এবং তাদের ভক্তদের বা আর্মিদের সম্পর্ক চিরসবুজ। সামরিক বিরতির পর এটিই তাদের প্রথম মেগা ইভেন্ট। বিগহিট মিউজিক এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে এই ট্যুরটি কেবল গান গাওয়া নয় এটি আমাদের ভক্তদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর একটি মাধ্যম। ভারত থেকে আমরা সবসময় প্রচুর ভালোবাসা পেয়েছি কিন্তু আগে নানা কারণে সেখানে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। এবার আমরা সেই ঋণ শোধ করতে আসছি।

কলকাতায় কেন এবং যুবভারতীর হাতছানি

মুম্বাই ভারতের বিনোদন রাজধানী তাই সেখানে কনসার্ট হওয়াটা প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু কলকাতার নাম তালিকায় দেখে অনেকেই চমকে গেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরাই বলছেন এটি খুব একটা অবাক করার মতো বিষয় নয়। পূর্ব ভারত এবং উত্তর পূর্ব ভারতে কে পপ এর জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। কলকাতা হলো ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী এবং এখান থেকে বাংলাদেশ নেপাল এবং মায়ানমারের ভক্তরাও সহজে আসতে পারবেন।

সবচেয়ে বড় কারণ হলো ভেন্যু বা স্থান। কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন আসন সংখ্যার বিচারে এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম স্টেডিয়াম। প্রায় ৮৫ হাজার মানুষ এখানে একসঙ্গে বসে অনুষ্ঠান দেখতে পারেন। বিটিএস এর কনসার্টের জন্য যে বিশাল স্টেজ সেটআপ এবং পার্পল ওশেন বা ভক্তদের হাতে থাকা বেগুনি লাইটস্টিকের সমুদ্র তৈরি করা হয় তার জন্য যুবভারতীর চেয়ে ভালো জায়গা আর হতে পারে না।

টিকিট যুদ্ধ সার্ভার ক্র্যাশ এবং কালোবাজারির আশঙ্কা

আজ সকাল ১০টায় বুকমাইশো এবং উইভার্স এর মাধ্যমে প্রি সেল বা অগ্রিম টিকিট বুকিং শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সকাল ৯টা থেকেই কোটি কোটি ভক্ত লগ ইন করে বসেছিলেন। ১০টা বাজার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বুকিং সাইটের সার্ভার সম্পূর্ণ বসে যায়। প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে সাইট ডাউন ছিল। যখন সাইট ঠিক হয় তখন দেখা যায় ভিআইপি এবং গোল্ড ক্যাটাগরির সব টিকিট শেষ।

টিকিটের দাম রাখা হয়েছে ৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যেই অভিযোগ উঠছে যে টিকিট কালোবাজারি বা স্ক্যাল্পিং শুরু হয়ে গেছে। ১ লাখ টাকার টিকিট অন্য সাইটে ৫ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

দিল্লির এক কলেজ ছাত্রী রিয়া শর্মা টুইটারে লিখেছেন আমি গত ৫ বছর ধরে প্রতি মাসে টাকা জমিয়েছি শুধু এই দিনটার জন্য। কিন্তু সাইট ক্র্যাশ করায় আমি টিকিট পাইনি। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। অন্যদিকে কলকাতার এক ভাগ্যবান ভক্ত সায়ন্তনী ঘোষ টিকিট পাওয়ার পর কেঁদে ফেলে ভিডিও পোস্ট করেছেন যা এখন ভাইরাল।

দেশি আর্মিদের আবেগ

ভারতের বিটিএস ভক্তরা নিজেদের গর্ব করে দেশি আর্মি বলে পরিচয় দেন। তাদের কাছে বিটিএস কেবল একটি ব্যান্ড নয় একটি আবেগ একটি থেরাপি। বিটিএস এর গান মানসিক স্বাস্থ্য নিজেকে ভালোবাসা এবং কঠিন সময়ে ভেঙে না পড়ার বার্তা দেয়।

বেঙ্গালুরুর এক আইটি কর্মী অনিকেত বলেন ২০২০ সালে লকডাউনের সময় আমি ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিলাম। তখন বিটিএস এর গান লাইফ গোজ অন আমাকে বাঁচিয়েছিল। আজ ওরা ভারতে আসছে এটা আমার কাছে তীর্থযাত্রার মতো।

সোশ্যাল মিডিয়ায় আজ সকাল থেকেই বিটিএস ইন ইন্ডিয়া নমস্তে বিটিএস এবং ওয়েলকাম টু কলকাতা ট্রেন্ডিংয়ে শীর্ষে রয়েছে। ভক্তরা ইতিমধ্যেই পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছেন যে বিমানবন্দের বিটিএস কে কীভাবে স্বাগত জানানো হবে। কেউ কেউ বলছেন বেগুনি শাড়ি পরে যাবেন আবার কেউ বাংলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি খাওয়ানোর পরিকল্পনা করছেন।

অর্থনৈতিক প্রভাব এবং কলকাতার পোয়াবারো

news image
আরও খবর

বিটিএস এর আগমনে কলকাতার অর্থনীতিতে এক বিশাল জোয়ার আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। হোটেল ও হসপিটালিটি সেক্টরে ইতিমধ্যেই তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে শহরের সব ফাইভ স্টার এবং থ্রি স্টার হোটেল বুক হয়ে গেছে। এয়ারলাইন্সগুলোর টিকিটের দাম কলকাতা রুটে তিনগুণ বেড়ে গেছে।

সল্টলেক এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও দারুণ খুশি। রাস্তার ধারে বিটিএস এর মার্চেন্ডাইজ টি শার্ট এবং কোরিয়ান খাবারের স্টল বসানোর প্রস্তুতি চলছে। অর্থনীতিবিদদের মতে মাত্র দুদিনের এই কনসার্ট থেকে কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কয়েকশো কোটি টাকা আয় হতে পারে। দেশি বিদেশি পর্যটকদের সমাগমে শহরটি আন্তর্জাতিক মানচিত্রে ফের উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ

বিটিএস সদস্যদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধানদের মতো হয়। তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা টিমের সাথে কলকাতা পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীকে কাজ করতে হবে। দমদম বিমানবন্দর থেকে হোটেল এবং হোটেল থেকে স্টেডিয়াম পুরো রাস্তাটি গ্রিন করিডর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কলকাতা পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন আমরা বিশ্বকাপের সময় ভিড় সামলেছি কিন্তু বিটিএস আর্মিদের উন্মাদনা সম্পূর্ণ আলাদা স্তরের। আমাদের কাছে খবর আছে স্টেডিয়ামের বাইরেও লক্ষাধিক মানুষ ভিড় করতে পারে শুধু এক ঝলক দেখার জন্য। তাই আমাদের এখন থেকেই ব্লু প্রিন্ট তৈরি করতে হচ্ছে। আমরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না।

স্টেজ এবং পারফরম্যান্স কী আশা করা যাচ্ছে

সূত্রের খবর বিটিএস এর এই ট্যুরে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। হোলোগ্রাফিক ইমেজ ড্রোন শো এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটি বা এআর প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা যাবে স্টেজে। ডায়নামাইট বাটার স্প্রিং ডে এবং মাইক ড্রপ এর মতো হিট গানগুলোর পাশাপাশি তাদের নতুন অ্যালবামের গানও পরিবেশন করবেন তারা।

এছাড়া ভারতের ভক্তদের জন্য বিশেষ কোনো চমক থাকতে পারে বলেও শোনা যাচ্ছে। হয়তো তারা হিন্দিতে দু এক লাইন কথা বলবেন বা নাটু নাটু এর মতো কোনো ভারতীয় গানের হুক স্টেপ করবেন। জংকুক এবং ভি এর সোলো পারফরম্যান্স নিয়েও উত্তেজনা তুঙ্গে।

সাংস্কৃতিক আদান প্রদান

বিটিএস এর ভারত সফর কেবল বিনোদন নয় এটি ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাংস্কৃতিক সম্পর্কের এক নতুন মাইলফলক। কোরিয়ান কালচারাল সেন্টার ইন্ডিয়া বা কেসিসিআই এর ডিরেক্টর বলেন বিটিএস এর মাধ্যমে ভারতের ঘরে ঘরে কোরিয়ান সংস্কৃতি পৌঁছে গেছে। মানুষ এখন কিমচি খেতে চায় কোরিয়ান ভাষা শিখতে চায়। এই কনসার্ট দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরও গাঢ় করবে।

অন্যদিকে বিটিএস সদস্যরাও একাধিক সাক্ষাৎকারে ভারতীয় খাবার যেমন নাল এবং কারি বা নান ও তরকারি এবং বলিউড সিনেমার প্রতি তাদের ভালোবাসার কথা জানিয়েছেন। এবার তারা সরাসরি সেই সংস্কৃতির স্বাদ নিতে পারবেন।

সমালোচকদের ভ্রুকুটি ও ভক্তদের জবাব

কিছু মানুষ অবশ্য এই উন্মাদনাকে বাড়াবাড়ি বলে কটাক্ষ করছেন। তাদের মতে বিদেশি ব্যান্ডের জন্য এত টাকা খরচ করা বা পড়াশোনা ক্ষতি করে লাইনে দাঁড়ানো অর্থহীন। তবে ভক্তরা তার কড়া জবাব দিয়েছেন। তারা বলছেন ক্রিকেট বা ফুটবলের জন্য যদি উন্মাদনা থাকতে পারে তবে মিউজিকের জন্য কেন নয়। বিটিএস তাদের শিখিয়েছে চ্যারিটি করতে মানুষের পাশে দাঁড়াতে। ভারতের বিটিএস আর্মিরা বন্যা বা করোনার সময় লক্ষ লক্ষ টাকা অনুদান দিয়েছে। তাই এই ভালোবাসা অহেতুক নয়।

উপসংহার এবং ইতিহাসের অপেক্ষায়

২০২৬ এর শীতকালটা ভারতের জন্য একটু বেশিই উষ্ণ হতে চলেছে। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের গ্যালারি যখন হাজার হাজার আর্মি বম্ব এর বা বিটিএস লাইটস্টিক বেগুনি আলোয় আলোকিত হবে আর সমস্বরে হাজার হাজার কণ্ঠে গাওয়া হবে ইউ কান্ট স্টপ মি লাভিং মাইসেলফ তখন সেই দৃশ্য হবে মহাজাগতিক।

বিটিএস সদস্যরা তাদের গানে বলেন কোনো শীতকালই চিরস্থায়ী নয় বসন্ত আসবেই। ভারতীয় আর্মিদের জন্য সেই দীর্ঘ শীতকাল শেষ। বসন্ত এসেছে। এখন শুধু দিন গোনার পালা। আরএম জিন সুগা জে হোপ জিমিন ভি এবং জংকুক এই সাতজন জাদুকরকে নিজেদের মাটিতে দেখার স্বপ্ন সত্যি হওয়ার পথে। কলকাতা তুমি কি প্রস্তুত বেগুনি সমুদ্রে ভাসতে। কারণ বিটিএস আসছে আর তারা পৃথিবী কাঁপাতে আসছে।

Preview image