Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কিরগিজস্তানে স্ন্যাপ সংসদীয় নির্বাচন: বিরোধী‑দল দমন এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ

২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর, কিরগিজস্তানে “স্ন্যাপ সংসদীয় নির্বাচন” অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা এক অস্বাভাবিক ঘটনা। এই নির্বাচনটি নির্ধারিত সময়ের এক বছর আগে অনুষ্ঠিত হয়েছে, কারণ কিরগিজ সংসদ নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সংসদ ভেঙে নতুন নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। এ নির্বাচনটি কিরগিজ প্রজাতন্ত্রের বর্তমান সাদির জাপারভ সরকারের ক্ষমতার আরও দৃঢ়ীকরণের লক্ষ্য ছিল বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

কিরগিজস্তানে তীব্র বিরোধী‑দমন এবং 'স্ন্যাপ' সংসদীয় নির্বাচন: রাজনৈতিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপট

২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর, কিরগিজস্তানে একটি “স্ন্যাপ” সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, যা কিরগিজ প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিশেষ মুহূর্ত। এই নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল আগের নির্ধারিত সময়ের এক বছর আগে, যেহেতু কিরগিজ সংসদ নিজেই নিজেদের কার্যক্রম শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে, এর পেছনে রয়েছে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এবং বিরোধী দলের উপর চলা দমন‑পীড়ন, যা একটি গভীর আলোচনার বিষয়।

এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তা কিরগিজস্তানের ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সংকেত হতে পারে। বিরোধী দলের চাপিয়ে দেওয়া নির্বাচন, মিডিয়ার স্বাধীনতার হ্রাস, এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের বিষয়গুলি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির গণতন্ত্রের জন্য একটি বিপদ সংকেত। চলুন, বিস্তারিতভাবে জানি কিরগিজস্তানে নির্বাচনের পেছনে কী ধরনের কারণ রয়েছে এবং এই পরিস্থিতির প্রভাব কতটুকু হতে পারে।


কিরগিজস্তানে স্ন্যাপ নির্বাচন: হঠাৎ নির্বাচন এবং এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

কিরগিজস্তান, যা এক সময় কেন্দ্রীয় এশিয়ার একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে এক চাঞ্চল্যকর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনটি তড়িঘড়ি ঘোষণা করা হয়, যাকে “স্ন্যাপ নির্বাচন” বলা হচ্ছে। স্ন্যাপ নির্বাচন বলতে এমন এক নির্বাচনকে বোঝানো হয়, যা কোনও পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা বা সময়সীমার বাইরে আঘাত হানে। এটি তখন অনুষ্ঠিত হয় যখন পার্লামেন্টের সদস্যরা নিজেদের আত্মসমর্পণ করে, এবং নির্বাচনকে আগের থেকে আগেই আয়োজন করতে হয়।

এই স্ন্যাপ নির্বাচনটি ২০২৬ সালের জন্য পূর্ব নির্ধারিত সংসদ নির্বাচনের এক বছর আগে অনুষ্ঠিত হয়। কিরগিজ প্রজাতন্ত্রের বর্তমান সংসদ নিজে সিদ্ধান্ত নেয় যে তাদের কার্যক্রম শেষ করার জন্য এবং নতুন সদস্য নির্বাচনের জন্য সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে।

তবে, এই নির্বাচনের পেছনে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিরোধী‑দলের উপর চলা দমন‑পীড়ন রয়েছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর একটি গভীর প্রভাব ফেলছে। কিরগিজস্তানে বর্তমানে ক্ষমতাসীন সরকার, বিশেষত President Sadyr Japarov ও তার শাসন, বিরোধী দলের শক্তিশালী উপস্থিতি বন্ধ করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।


 বিরোধী‑দলের ওপর দমন‑পীড়ন: গ্রেপ্তার ও মিডিয়ার স্বাধীনতা সংকুচিত

সাম্প্রতিক কিরগিজ নির্বাচনের আগে, বিরোধী‑দল এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিল। নির্বাচন শুরুর আগে, কিরগিজ নিরাপত্তা বাহিনী বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার করে, তাদের বিরোধী কার্যক্রমে দমনমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।

এছাড়া, দেশীয় মিডিয়া এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম–এর উপরও চাপ দেওয়া হয়েছে। দেশের বেশ কয়েকটি বড় মিডিয়া চ্যানেলকে “উগ্রবাদী” হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার ফলে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বলা হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং বিরোধী নেতাদের ওপর এই চাপ নির্বাচনকে স্বাধীন বা স্বচ্ছ করে তোলার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়, কিন্তু সেসব প্রতিবাদ দমন করতে সরকার বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আইনগত পদক্ষেপ নেয়। দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে এই দমন‑পীড়নের ফলে, বিরোধী‑দল এখনও দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য হচ্ছে, যারা নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছে।


 কিরগিজস্তানে নির্বাচনী সংস্কার: নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তন

২০২৫ সালের কিরগিজ স্ন্যাপ নির্বাচনের আগে, নির্বাচনী পদ্ধতিরও বড় পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। পুরনো মিক্সড সিস্টেম (যেখানে পার্টি-লিস্ট এবং একক সদস্যের আসন ছিল) বাতিল করে নতুন মেজরিটারিয়ান সিস্টেম (majoritarian system) কার্যকর করা হয়েছে। এর মাধ্যমে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনটি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবে, যা মোট ৯০টি আসন পূর্ণ করবে।

এই পরিবর্তনটির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা, তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি ক্ষমতাসীন শাসকের জন্য আরও সুবিধাজনক হয়ে উঠতে পারে।

নতুন নির্বাচনী পদ্ধতিতে, লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করার জন্য কমপক্ষে একটি মহিলা সদস্য নির্বাচিত হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে এই পরিবর্তন এবং সংশোধন আসলে কিরগিজস্তানের গণতান্ত্রিক চিত্র–এ খুব একটা পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়নি। বরং, এটি আরও ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে, যা বিরোধী‑দল এবং জনমতকে একত্রিত হওয়ার সুযোগ দেয়নি।
 

নতুন ভোটব্যবস্থা ও নির্বাচন প্রক্রিয়া: কী পরিবর্তন?

  • ২০২৫‑এর মাঝেই কিরগিজস্তানে নির্বাচনী নিয়মে বড় পরিবর্তন এসেছে: পুরনো মিক্সড সিস্টেম (party‑list + single-member constituencies) বাতিল করে, নতুন মেজরিটেরিয়ান (majoritarian) পদ্ধতি নিয়োগ করা হয়েছে। 

  • নতুন নির্বাচনী পদ্ধতিতে, দেশকে ৩০টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে; প্রতিটি অঞ্চলে ৩ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবে। অর্থাৎ মোট ৯০ আসন।

  • প্রতি অঞ্চলে অন্তত‌ একটি মহিলা সংসদ সদস্য থাকা বাধ্যতামূলক — লিঙ্গ‑অনুপাত বজায় রাখার জন্য।


 রাষ্ট্রপতি সাদির জাপারভের শাসন: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বা শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন?

Sadyr Japarov কিরগিজস্তানে ২০২০ সালের গণআন্দোলন–এর পর থেকে ক্ষমতায় রয়েছেন। তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই অনেকগুলি সংবিধান সংশোধন এবং অধিকারবোধী রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা দেশটির রাজনীতি এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে মধ্যপন্থী একাধিকীকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যদিও তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে স্থিতিশীলতা আনতে কাজ করছেন, তবুও তার শাসন ব্যবস্থা কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অত্যধিক ক্ষমতাকেন্দ্রিক।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচনের পিছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল শক্তিশালী শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে শক্তিশালী করা। বিরোধী‑দলগুলি এই নির্বাচনে প্রার্থী না হলেও, নির্বাচনের আগে তাদের উপর এক ধরনের দমন‑পীড়ন চলতে থাকে, যা তাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত করেছে।

কারা প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন কি আশা, কি বিশ্লেষকরা বলছেন

  • জনসংখ্যার প্রায় ৭ মিলিয়ন মানুষ নিয়ে ছোট একটি দেশ হলেও, এবর ৪৬৭ জন প্রার্থী রয়েছে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য। 

  • তবে দেশটির পুরনো গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য এবং স্বাধীন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রায় বিলোপিত — কারণ ক্ষমতায় রয়েছে Sadyr Japarov‑র শাসন, যিনি ২০২০ সালের গণআন্দোলনের পরে ক্ষমতায় আসেন। 

  • বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচন আসলে Japarov এবং তার নিকটতর গোষ্ঠীর জন্য একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে দেওয়া — কারণ বিরোধী‑দল প্রায় গৌণ বা চুপচাপ।


 কিরগিজস্তানের ভবিষ্যৎ: গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা?

বর্তমানে, কিরগিজস্তানের রাজনৈতিক দৃশ্যে বেশ কিছু নতুন প্রতিযোগিতা এবং চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। যদিও প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারভ সরকার শক্তিশালী হওয়ার চেষ্টা করছেন, তবুও কিছু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং দেশীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা চিন্তা করছেন যে এই পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ক্ষতি করতে পারে।

ভবিষ্যতে, কিরগিজস্তান যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং মানবাধিকার রক্ষা করতে চায়, তাহলে বিরোধী দল, মিডিয়া, এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। নির্বাচনের আগের দমন‑পীড়ন এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ কিরগিজস্তানের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশকে দুর্বল করে দিতে পারে, যা কেবল ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক উন্নতি এবং স্থিতিশীলতার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও উদ্বেগ

  • দেশটি একসময় কেন্দ্রস্থ এশিয়ার সবচেয়ে মুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০২৫ সালের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত, কিরগিজস্তানে সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক প্লুরালিজম ছিল তুলনামূলক উন্মুক্ত। 

  • কিন্তু সম্প্রতি মিডিয়া বন্ধ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন এবং নতুন নিয়মের মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ — এসব দেখেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং বিদেশি পর্যবেক্ষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।


 সারাংশ

কিরগিজস্তানের ২০২৫ সালের স্ন্যাপ নির্বাচন এবং তার পিছনে থাকা রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেশটির গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। স্ন্যাপ নির্বাচন এবং বিরোধী‑দলের প্রতি দমন‑পীড়ন কিরগিজস্তানের রাজনৈতিক চিত্রকে আরও কঠিন করে তুলেছে। তবে, যদি কিরগিজ সরকার রাজনৈতিক বহুত্ববাদ এবং মিডিয়া স্বাধীনতা রক্ষা করে, তবে দেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো শক্তিশালী হতে পারে।

Preview image