RBI-এর রুপির রক্ষা অভিযানের পর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ব্যাপক হারে ভারতীয় সরকারি বন্ড কিনেছেন। মাত্র এক সপ্তাহে বৈদেশিক তহবিলের বিনিয়োগ বেড়েছে ৪৬ গুণ, মোট ₹৫৫,৫১০ কোটি (US $৬৩১ মিলিয়ন)। রুপির স্থিতিশীলতা, উচ্চ বন্ড রিটার্ন ও JP Morgan Index-এ অন্তর্ভুক্তি বিদেশিদের আস্থা বাড়িয়েছে, যা ভারতের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত।
ভারতের আর্থিক বাজারে একটি বড় ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে — আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা দেশটির সরকারি বন্ড বাজারে ব্যাপকভাবে অর্থ ঢালছেন। রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI)-এর সক্রিয় হস্তক্ষেপে রুপির মান শক্তিশালী হওয়ার পর বিদেশি তহবিল সংস্থাগুলি ভারতীয় সরকারি বন্ড কেনার ক্ষেত্রে আস্থা ফিরে পেয়েছে। এই এক সপ্তাহেই বৈদেশিক ফান্ডগুলির বিনিয়োগ ৪৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ₹৫৫,৫১০ কোটি (US $৬৩১ মিলিয়ন)।
গত কয়েক সপ্তাহে রুপির মানে চাপ তৈরি হয়েছিল ডলারের উত্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে অনিশ্চয়তার কারণে। ডলার ইনডেক্স ১০৬-এর উপরে পৌঁছানোর পর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতের বাজার থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়েছিলেন। এর ফলে রুপির মান ৮৮.১০-এর কাছাকাছি দুর্বল হয়েছিল। ঠিক এই সময় RBI বাজারে হস্তক্ষেপ করে, এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে রুপির পতন ঠেকায়।
এই পদক্ষেপে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। RBI-এর দৃঢ় অবস্থান আন্তর্জাতিক বাজারে এক ইতিবাচক বার্তা পাঠায় যে ভারতীয় রুপির উপর সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ আছে এবং তা অচল নয়। এই পদক্ষেপের পরেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় বন্ড মার্কেটে আগ্রহ দেখাতে শুরু করেন।
Bloomberg ও Livemint-এর তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি তহবিলের বিনিয়োগ আগের সপ্তাহের তুলনায় ৪৬ গুণ বেড়েছে — যা গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিশেষ করে ১০ বছরের সরকারি বন্ডে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন, যার বর্তমান ফলন বা yield প্রায় ৬.৫ শতাংশ।
এই উচ্চ রিটার্ন অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির তুলনায় অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, চীনের বন্ড ইয়েল্ড বর্তমানে ২.৩ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার বন্ড ইয়েল্ড প্রায় ৬ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ ভারতীয় বন্ড বর্তমানে নিরাপদ ও লাভজনক দুই-ই।
1️⃣ রুপির স্থিতিশীলতা: RBI-এর হস্তক্ষেপে রুপির পতন রোধ হয়েছে, ফলে বিনিয়োগকারীরা মুদ্রা ঝুঁকি (currency risk) কম মনে করছেন।
2️⃣ উচ্চ ফলন: ভারতীয় সরকারি বন্ডের রিটার্ন অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি হওয়ায় তা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয়।
3️⃣ ম্যাক্রো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: ভারতের GDP বৃদ্ধির হার ৭%-এর উপরে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এবং বৈদেশিক রিজার্ভ শক্তিশালী — এই সব কারণেই আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজাররা ভারতকে "stable emerging market" হিসেবে দেখছেন।
4️⃣ বন্ড ইনডেক্সে অন্তর্ভুক্তি: ২০২৫ সাল থেকে ভারতীয় সরকারি বন্ড JP Morgan Emerging Market Bond Index-এ অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, যা বৈদেশিক বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
RBI-এর রুপির রক্ষা অভিযানের পর থেকে বন্ড মার্কেট ও বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ১০ বছরের বন্ডের ইয়েল্ড ৬.৫৩%-এর কাছাকাছি স্থিতিশীল এবং রুপি ৮৭.৭৫-৮৭.৮০ পরিসরে স্থির রয়েছে।
দেশীয় বাজারে Sensex ও Nifty-ও সামান্য বৃদ্ধি দেখিয়েছে, কারণ বৈদেশিক ফান্ড প্রবাহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে তারল্য (liquidity) বাড়িয়েছে। সরকারি নীতিনির্ধারকরা এই প্রবণতাকে ভারতের আর্থিক সিস্টেমে "আস্থা পুনরুদ্ধারের চিহ্ন" হিসেবে দেখছেন।
যদিও এই প্রবাহ ইতিবাচক, তবু অর্থনীতিবিদরা সতর্কতা দিচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের পুনরুদ্ধার বা মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলে ভারতীয় বন্ড মার্কেটে নতুন চাপ আসতে পারে।
যদি RBI রুপিকে রক্ষা করতে অতিরিক্ত ডলার বিক্রি করে, তাহলে বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
এছাড়া, বৈশ্বিক মন্দা বা ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা (যেমন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত) বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
Kotak Institutional Equities-এর বিশ্লেষকরা বলেছেন, “RBI-এর দৃঢ় হস্তক্ষেপ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। তবে ভবিষ্যতে টেকসই বিনিয়োগ প্রবাহ ধরে রাখতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি।”
অন্যদিকে, Morgan Stanley মন্তব্য করেছে, “ভারতীয় বন্ড মার্কেট আগামী বছর থেকে বৈশ্বিক বিনিয়োগ মানচিত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করবে, বিশেষ করে JP Morgan Index অন্তর্ভুক্তির পর।”
অর্থ মন্ত্রকের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিদেশি তহবিল প্রবাহের এই উত্থান সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতির ফলাফল। ভারতের অর্থনীতি স্থিতিশীল, এবং RBI রুপির মান রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে — এই বিশ্বাস আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সরকার এখন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বন্ড মার্কেটে আরও স্বচ্ছতা ও প্রবেশযোগ্যতা আনার পরিকল্পনা করছে। একইসঙ্গে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কর কাঠামো ও বন্ড ইস্যু প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হবে বলে জানা গেছে।
ভারতীয় বন্ড মার্কেটে বিদেশি বিনিয়োগের এই উত্থান দেশের আর্থিক খাতের জন্য এক বড় স্বস্তি। রুপির স্থিতিশীলতা, RBI-এর সক্রিয় নীতি এবং উচ্চ রিটার্ন মিলিয়ে ভারত এখন বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি নির্ভরযোগ্য গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
তবে, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবাহ টিকিয়ে রাখতে RBI এবং সরকার— উভয়কেই মুদ্রানীতি ও আর্থিক ভারসাম্য রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধারা বজায় থাকলে ভারত শুধু এশিয়ার নয়, বরং বৈশ্বিক বন্ড বাজারেও এক প্রভাবশালী খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পারে।