থ্যালাসেমিয়া মানেই জীবনের ইতি নয়। চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ ও সঠিক যত্নে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরাও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। পড়াশোনা, কর্মজীবন, বিয়ে ও সংসার সব ক্ষেত্রেই অন্যদের মতোই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
থ্যালাসেমিয়া নামটি শুনলেই অনেকের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়। এখনও সমাজের বড় অংশের মধ্যে এই রোগ সম্পর্কে নানা ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। কেউ মনে করেন থ্যালাসেমিয়া ছোঁয়াচে, কেউ আবার ভাবেন এই রোগে আক্রান্ত হলে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব নয়। বাস্তবে এই দুই ধারণাই ভুল। থ্যালাসেমিয়া একটি জিনগত রক্তরোগ, যা এক জনের থেকে অন্য জনের শরীরে সংক্রমিত হয় না। আবার আধুনিক চিকিৎসার সাহায্যে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরাও দীর্ঘদিন সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারেন।
তবে চিকিৎসকদের মতে, থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সচেতনতা। কারণ এই রোগের মূল কারণ জিনগত ত্রুটি। তাই বিয়ে বা সন্তান পরিকল্পনার আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা না করালে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়। বিশেষ করে যখন বাবা ও মা দু জনেই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তখন সন্তানের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়।
থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তরোগ। আমাদের শরীরে হিমোগ্লোবিন নামক প্রোটিন রক্তের মাধ্যমে অক্সিজেন বহন করে। হিমোগ্লোবিন তৈরির জন্য নির্দিষ্ট কিছু জিন প্রয়োজন হয়। এই জিনগুলির মধ্যে ত্রুটি থাকলে শরীর পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে না। ফলস্বরূপ রক্তে লোহিত কণিকার সংখ্যা কমে যায় এবং রক্তাল্পতা
অ্যানিমিয়ার সমস্যা দেখা দেয়।
থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে এই জিনগত ত্রুটি বাবা-মায়ের কাছ থেকে সন্তানের শরীরে আসে। অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণ বংশগত রোগ। কোনও জীবাণু ভাইরাস বা সংক্রমণের মাধ্যমে এই রোগ হয় না।
এক কথায় উত্তর না।
থ্যালাসেমিয়া কোনও ছোঁয়াচে রোগ নয়। আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া হাত মেলানো বা রক্তদান ছাড়া অন্য কোনও উপায়ে এই রোগ অন্য কারও শরীরে ছড়ায় না। তাই থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিদের সামাজিকভাবে আলাদা করে রাখার কোনও প্রয়োজন নেই।
অনেক মানুষ থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করেন, কিন্তু তাঁদের শরীরে রোগের কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। এঁদের বলা হয় থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার বা বাহক।
বাহক ব্যক্তিরা সাধারণত সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। অনেক সময় তাঁরা নিজেরাও জানেন না যে তাঁদের শরীরে থ্যালাসেমিয়ার জিন রয়েছে। সমস্যাটি তখনই গুরুতর হয়ে ওঠে, যখন দুই বাহক ব্যক্তির মধ্যে বিয়ে হয় এবং তাঁরা সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করেন।
চিকিৎসকদের মতে, যদি বাবা ও মা উভয়েই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তা হলে প্রতিটি গর্ভধারণের ক্ষেত্রে সন্তানের জন্য তিন ধরনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
এই ক্ষেত্রে শিশুটি বাবা ও মা উভয়ের কাছ থেকেই ত্রুটিপূর্ণ জিন পায়। ফলে সে থ্যালাসেমিয়া মেজর নিয়ে জন্মায়। এটি রোগের সবচেয়ে গুরুতর রূপ।
এই ধরনের শিশুর জন্মের কয়েক মাস পর থেকেই তীব্র রক্তাল্পতা দেখা দিতে পারে। নিয়মিত রক্ত দিতে হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
এই ক্ষেত্রে শিশুটি একটি স্বাভাবিক ও একটি ত্রুটিপূর্ণ জিন পায়। ফলে সে নিজে গুরুতর অসুস্থ হয় না, তবে থ্যালাসেমিয়ার বাহক হয়ে থাকে।
বড় হয়ে সে সুস্থ জীবনযাপন করতে পারলেও পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে রোগটি ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে।
এই ক্ষেত্রে শিশুটি বাবা মা উভয়ের কাছ থেকেই স্বাভাবিক জিন পায়। ফলে সে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তও হয় না, আবার বাহকও হয় না।
থ্যালাসেমিয়া মেজর হল রোগটির সবচেয়ে মারাত্মক রূপ। এই রোগে আক্রান্ত শিশুদের শরীর পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে না।
ফলে দেখা দিতে পারে
এ ধরনের রোগীদের বাঁচিয়ে রাখতে নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টও করা হতে পারে।
থ্যালাসেমিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধরন হল আলফা থ্যালাসেমিয়া। এই রোগের ক্ষেত্রে চারটি জিনের মধ্যে এক বা একাধিক জিন ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে।
সাধারণত কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। ব্যক্তি বাহক হিসেবে জীবনযাপন করেন।
মৃদু রক্তাল্পতা দেখা দিতে পারে। একে বলা হয় আলফা থ্যালাসেমিয়া ট্রেট বা মাইনর।
মাঝারি থেকে গুরুতর উপসর্গ দেখা দেয়। একে বলা হয় হিমোগ্লোবিন এইচ ডিজিজ।
সবচেয়ে গুরুতর অবস্থা তৈরি হয়, যাকে আলফা থ্যালাসেমিয়া মেজর বা হাইড্রোপস ফিটালিস বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
থ্যালাসেমিয়ার ধরন অনুযায়ী উপসর্গ ভিন্ন হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে
তবে বাহক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সাধারণত কোনও উপসর্গ থাকে না।
চিকিৎসকেরা মনে করেন, বিয়ে বা সন্তান পরিকল্পনার আগে থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে পরিবারের কারও এই রোগ থাকলে অবশ্যই পরীক্ষা করানো উচিত।
থ্যালাসেমিয়া নির্ণয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলির একটি হল HPLC বা High Performance Liquid Chromatography।
এই পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে বিভিন্ন ধরনের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা নির্ণয় করা যায়।
রক্তে হিমোগ্লোবিন ও লোহিত কণিকার পরিমাণ জানা যায়।
হিমোগ্লোবিনের অস্বাভাবিক ধরন শনাক্ত করতে এই পরীক্ষা করা হয়।
জিনগত ত্রুটি নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করার জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।
বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে গর্ভাবস্থাতেই জানা সম্ভব যে গর্ভস্থ ভ্রূণ থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত কি না।
গর্ভাবস্থার প্রায় ১০ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে এই পরীক্ষা করা হয়।
প্লাসেন্টা থেকে ক্ষুদ্র টিস্যুর নমুনা সংগ্রহ করে ভ্রূণের জিন পরীক্ষা করা হয়। এর মাধ্যমে জানা যায় শিশুটি থ্যালাসেমিয়া মেজর, বাহক নাকি সম্পূর্ণ সুস্থ।
প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যামনিওসেন্টেসিস এবং উন্নত জিনগত পরীক্ষাও করা হতে পারে।
থ্যালাসেমিয়া পুরোপুরি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল সচেতনতা ও স্ক্রিনিং।
অনেক বিশেষজ্ঞই বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ দেন। এতে দুই জনই বাহক কি না তা জানা যায়।
বাহক দম্পতিদের অবশ্যই জেনেটিক কাউন্সেলিং করানো উচিত।
প্রয়োজনে CVS বা অন্যান্য জিনগত পরীক্ষা করিয়ে শিশুর অবস্থা জানা যেতে পারে।
পরিবারে থ্যালাসেমিয়ার ইতিহাস থাকলে পরীক্ষা করানো আরও জরুরি।
চিকিৎসকদের মতে, অবশ্যই পারেন। নিয়মিত চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় রক্ত সঞ্চালন, ওষুধ এবং চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে অনেক থ্যালাসেমিয়া রোগী পড়াশোনা, চাকরি, বিয়ে এবং সংসার সবই স্বাভাবিক ভাবে করতে পারেন।
বিশ্বজুড়ে বহু থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি সফল পেশাজীবন গড়েছেন এবং দীর্ঘ জীবন কাটাচ্ছেন। তাই থ্যালাসেমিয়া মানেই জীবন শেষ এই ধারণার কোনও ভিত্তি নেই।
থ্যালাসেমিয়া এমন একটি রোগ, যা সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানলে অনেক ক্ষেত্রেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। বাবা মা দু’জনেই বাহক হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া মেজরে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে ঠিকই, কিন্তু আধুনিক স্ক্রিনিং, জিনগত পরীক্ষা এবং চিকিৎসা পরামর্শের মাধ্যমে সেই ঝুঁকি আগেভাগেই চিহ্নিত করা যায়। তাই বিয়ে বা সন্তান পরিকল্পনার আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।