ওয়াংখেড়েতে সেমিফাইনালে দুরন্ত ৮৯ রান করে ম্যাচের সেরা হয়েছেন সঞ্জু স্যামসন তবু ভারতের জয়ের আসল কৃতিত্ব জসপ্রীত বুমরাহকেই দিলেন তিনি বললেন বুমরাহ লাখে একজনই হয়। ?
ভারতীয় ক্রিকেটে অনেক সময়ই দেখা যায়—ব্যাটসম্যান ম্যাচ জেতান, আবার কখনও বোলাররা শেষ মুহূর্তে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেন। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই এমন হয় যে ম্যাচের সেরা ক্রিকেটার নিজেই নিজের কৃতিত্ব সরিয়ে অন্য কাউকে সামনে এনে দেন। সেমিফাইনালের উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে ঠিক এমনটাই করলেন ভারতের উইকেটকিপার-ব্যাটার Sanju Samson।
ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত ইনিংস খেলে ম্যাচের সেরা নির্বাচিত হলেও ভারতের জয়ের কৃতিত্ব তিনি নিজের কাঁধে নেননি। বরং সোজাসাপ্টা বললেন—এই জয়ের আসল নায়ক Jasprit Bumrah। তাঁর কথায়, “এ রকম বোলার লাখে একজনই হয়।”
এই বক্তব্য শুধু ম্যাচের ফলাফলকে নয়, বরং দলগত ক্রিকেটের আসল দর্শনকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় মুম্বইয়ের ঐতিহাসিক ক্রিকেট মঞ্চ Wankhede Stadium-এ। এই মাঠ বরাবরই ব্যাটিং-সহায়ক হিসেবে পরিচিত। ছোট বাউন্ডারি, দ্রুত আউটফিল্ড এবং দর্শকদের তুমুল উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে এখানে প্রায়শই উচ্চ স্কোরের ম্যাচ দেখা যায়।
এই ম্যাচেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভারত প্রথমে ব্যাট করে তোলে ২৫৩ রান। লক্ষ্য ছিল ২৫৪। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এই স্কোর নিরাপদ হলেও ওয়াংখেড়ের মতো মাঠে তা মোটেই নিশ্চিত জয় নয়।
কারণ এই মাঠে অতীতেও একাধিকবার বড় রান তাড়া করে জয়ের নজির রয়েছে। ফলে ভারতের ব্যাটিং ভালো হলেও ম্যাচের শেষ পর্যন্ত উত্তেজনা বজায় ছিল।
ভারতের ইনিংসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সঞ্জু স্যামসন। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ব্যাট করতে দেখা যায় তাঁকে।
ইডেনে আগের ম্যাচে অপরাজিত ৯৭ রান করেছিলেন তিনি। সেই ফর্ম নিয়েই ওয়াংখেড়েতেও নামেন। শুরু থেকেই ইংল্যান্ডের বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।
কভার ড্রাইভ, পুল শট, স্ট্রেইট হিট—সব মিলিয়ে তাঁর ইনিংস ছিল পরিপূর্ণ।
৮৯ রানের ইনিংসটি শুধু রানসংখ্যার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল না; বরং ম্যাচের গতিপথও অনেকটাই বদলে দেয়। তাঁর ব্যাটিংয়ের ফলে ভারত বড় স্কোরের দিকে এগোতে পারে।
সঞ্জুর ইনিংসের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য—
দ্রুত রান তোলার ক্ষমতা
পাওয়ারপ্লেতে ঝুঁকি নিয়ে খেলা
স্পিনারদের বিরুদ্ধে আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিং
বড় শটের সঙ্গে স্ট্রাইক রোটেশন
এই ইনিংসের ফলে ভারত ২৫০-এর বেশি রান করতে সক্ষম হয়—যা শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ম্যাচ শেষে যখন তাঁকে ম্যাচের সেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার নিতে ডাকা হয়, তখন অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন সঞ্জু নিজের ইনিংস নিয়ে কথা বলবেন।
কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটলেন।
পুরস্কার নিতে গিয়ে তিনি বললেন—
“পুরো কৃতিত্ব জসপ্রীত বুমরাহের। যে ভাবে ও বল করল তা অসাধারণ। আমার মতে ম্যাচের সেরার মেডেলটা ওরই পাওয়া উচিত ছিল।”
তিনি আরও বলেন—
“২৫০ রান করেও তো আমরা হেরে যাচ্ছিলাম প্রায়। কিন্তু বুমরাহের চার ওভার আমাদের জিতিয়ে দিল। ওই চার ওভার না হলে আমরা হয়তো হেরে যেতাম।”
এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে যায়, দলের সাফল্যকে ব্যক্তিগত অর্জনের ঊর্ধ্বে রাখতেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
ইংল্যান্ড ২৫৪ রান তাড়া করতে নেমে দুরন্ত শুরু করেছিল। এক সময় মনে হচ্ছিল ম্যাচ ভারতের হাত থেকে বেরিয়ে যেতে পারে।
ঠিক সেই সময় বল হাতে আসেন জসপ্রীত বুমরাহ।
চার ওভারে তিনি দেন মাত্র ৩৩ রান এবং নেন একটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট।
সংখ্যা দেখে স্পেলটি সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু ম্যাচের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ১৭তম ওভারটি ছিল ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। সেই সময় ইংল্যান্ডের প্রয়োজন ছিল দ্রুত রান। বুমরাহ সেই ওভারে মাত্র ৬ রান দেন।
এই একটি ওভারই চাপ তৈরি করে দেয় ব্যাটারদের উপর।
পরবর্তী ওভারগুলিতে ইংল্যান্ড ঝুঁকি নিতে গিয়ে উইকেট হারায় এবং ম্যাচ ভারতের দিকে ঘুরে যায়।
বুমরাহকে বিশ্বের অন্যতম সেরা টি-টোয়েন্টি বোলার বলা হয়। তার পেছনে রয়েছে কয়েকটি বিশেষ গুণ—
১. অস্বাভাবিক বোলিং অ্যাকশন
তাঁর রান-আপ এবং ডেলিভারি স্টাইল ব্যাটারদের জন্য অনুমান করা কঠিন।
২. ইয়র্কার দক্ষতা
ম্যাচের শেষ দিকে ইয়র্কার করার ক্ষমতা তাঁকে ভয়ঙ্কর করে তোলে।
৩. স্লোয়ার বলের বৈচিত্র
বিভিন্ন গতির বল ব্যাটারদের বিভ্রান্ত করে।
৪. চাপের মুহূর্তে ঠান্ডা মাথা
ম্যাচের কঠিন মুহূর্তেও তিনি পরিকল্পনা ধরে রাখতে পারেন।
এই সব কারণেই সঞ্জু স্যামসন মনে করেন, ভারতের জয়ের আসল কৃতিত্ব বুমরাহরই।
ম্যাচের পরে সঞ্জু নিজেই বলেন যে এই মাঠে যে কোনও স্কোর তাড়া করা সম্ভব।
তিনি বলেন—
“ওয়াংখেড়েতে যে কোনও রান তাড়া করে জেতা যায়। তাই আমরা যত বেশি সম্ভব রান করতে চেয়েছিলাম।”
এই মন্তব্যের পেছনে রয়েছে মাঠের বাস্তবতা।
ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের বৈশিষ্ট্য—
ছোট বাউন্ডারি
দ্রুত আউটফিল্ড
ব্যাটিং-সহায়ক পিচ
ডিউ ফ্যাক্টর
এই সব কারণে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করা দল প্রায়ই সুবিধা পায়।
সঞ্জু জানান, ব্যাটিংয়ের সময় থেকেই তাঁদের পরিকল্পনা ছিল অন্তত ২৫০ রান করা।
অভিষেক আউট হওয়ার পর তিনি এবং ঈশান দ্রুত রান তোলার চেষ্টা করেন। পরে তিলক এবং হার্দিকও সেই পরিকল্পনাই অনুসরণ করেন।
সঞ্জুর ভাষায়—
“আমরা জানতাম এই উইকেটে ২৫০ রান করতে হবে। না হলে জেতা কঠিন।”
এই কৌশলই শেষ পর্যন্ত ম্যাচে ভারতের সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করে।
সঞ্জুর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আগের ম্যাচে তিনি অপরাজিত ৯৭ রান করেছিলেন। এই ম্যাচে ৮৯।
দুটি ইনিংসেই তিনি শতরানের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
তবু ব্যক্তিগত মাইলফলক নিয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ নেই।
তিনি বলেন—
“আমি কখনও শতরানের কথা ভাবিনি। টি-টোয়েন্টিতে সেটা ভাবার সুযোগ নেই।”
এই মানসিকতাই তাঁকে দলের জন্য আরও কার্যকর করে তুলেছে।
আধুনিক ক্রিকেটে অনেক সময় ব্যাটাররা ব্যক্তিগত রেকর্ডের দিকে বেশি মন দেন। কিন্তু সঞ্জুর বক্তব্যে পরিষ্কার—তিনি দলকে আগে রাখেন।
তিনি বলেন—
“নিজের মাইলফলকের কথা না ভেবে দলের জন্য খেলার চেষ্টা করি।”
এই মনোভাবই দলের ভেতরে একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করে।
ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ম্যাচ চলাকালীন দর্শকদের উত্তেজনা ছিল চোখে পড়ার মতো।
স্টেডিয়াম ভরে গিয়েছিল সমর্থকে। প্রতিটি বাউন্ডারি, প্রতিটি উইকেটে গর্জে উঠছিল গ্যালারি।
বিশেষ করে শেষ ওভারগুলিতে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়।
সঞ্জু শুধু বুমরাহ নয়, পুরো বোলিং ইউনিটেরও প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন—
“এই উইকেটে বল করা খুব কঠিন। কিন্তু আমাদের বোলাররা সেটা করে দেখিয়েছে।”
এই মন্তব্য দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাকেই সামনে আনে।
এই জয়ের ফলে ভারত পৌঁছে গেছে ফাইনালে। এখন তাদের সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ।
সেমিফাইনালের মতোই ফাইনালেও প্রয়োজন হবে ব্যাটার ও বোলারদের সমান অবদান।
যদি সঞ্জুর ফর্ম বজায় থাকে এবং বুমরাহ একই ধারায় বল করেন, তবে ভারতের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা অনেকটাই বাড়বে।
ক্রিকেট এমন এক খেলা যেখানে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স যেমন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, তেমনই শেষ পর্যন্ত জয় নির্ভর করে পুরো দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার উপর। একটি বড় ইনিংস, একটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট কিংবা শেষ ওভারের নিখুঁত বোলিং—প্রতিটি মুহূর্তই ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে। তাই অনেক সময় দেখা যায়, যিনি স্কোরবোর্ডে সবচেয়ে উজ্জ্বল পারফরম্যান্স করেন, তিনিও বুঝতে পারেন যে দলের অন্য কারও অবদানই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। এই ম্যাচে সেই মানসিকতারই এক সুন্দর উদাহরণ দেখা গেল।
সেমিফাইনালের মতো চাপের ম্যাচে Sanju Samson ব্যাট হাতে অসাধারণ ইনিংস খেলেছিলেন। তাঁর ৮৯ রানের ঝকঝকে ইনিংস ভারতের বড় স্কোর গড়ার ভিত তৈরি করে দেয়। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং, সঠিক শট নির্বাচন এবং দ্রুত রান তোলার ক্ষমতা—সব মিলিয়ে তাঁর ইনিংস ছিল দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাচের শেষে তাঁকেই ম্যাচের সেরা ক্রিকেটার হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা অনেকের কাছেই স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়েছিল।
কিন্তু সঞ্জুর প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। তিনি নিজের ইনিংসের কথা সামনে না এনে বারবার তুলে ধরলেন দলের এক বোলারের নাম—Jasprit Bumrah। তাঁর মতে, ম্যাচের আসল মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন বুমরাহই। যখন প্রতিপক্ষ দ্রুত রান তুলছিল এবং ম্যাচ ভারতের হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছিল, ঠিক সেই সময় বল হাতে এসে চাপ সামলে দেন তিনি। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সঠিক লাইন-লেন্থ, ধীরগতির বলের বৈচিত্র এবং ব্যাটারদের উপর ক্রমাগত চাপ তৈরি করার দক্ষতা—এই সব মিলিয়েই ম্যাচের সমীকরণ বদলে যায়।
সঞ্জুর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল যে ক্রিকেটে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়েও দলের জয় তাঁর কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাচসেরার পুরস্কার হাতে নিয়েও তিনি বলেন, তাঁর মতে সেই পুরস্কার আসলে বুমরাহরই প্রাপ্য ছিল। কারণ, শেষের গুরুত্বপূর্ণ ওভারগুলিতে বুমরাহ যেভাবে রান আটকেছেন, সেটাই ভারতের জয়ের মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়ায়।
এই ধরনের মন্তব্য শুধু একজন সতীর্থের প্রশংসা নয়, বরং একটি দলের ভিত কতটা শক্ত তা-ও প্রকাশ করে। ক্রিকেটে অনেক সময় ব্যাটাররা আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন, কিন্তু বোলারদের অবদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টির মতো ফরম্যাটে যেখানে কয়েকটি ওভারই পুরো ম্যাচের ফলাফল বদলে দিতে পারে, সেখানে বোলারদের ঠান্ডা মাথা এবং দক্ষতা অমূল্য।
সঞ্জু স্যামসনের এই মনোভাব ভারতীয় ক্রিকেটের এক গুরুত্বপূর্ণ দিককে তুলে ধরে—দলগত ঐক্য। একজন ক্রিকেটার যতই ভাল খেলুন না কেন, দলের অন্যদের অবদান ছাড়া জয় সম্ভব নয়। আর সেই কারণেই অনেক সময় প্রকৃত নেতৃত্ব বা পরিণত মানসিকতা বোঝা যায় ম্যাচের পরে দেওয়া মন্তব্যেই।
এই ম্যাচে সঞ্জুর ইনিংস যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে, তেমনই তাঁর বিনয়ী মন্তব্যও ক্রিকেটপ্রেমীদের মন জয় করেছে। কারণ, একজন ক্রিকেটার যখন নিজের সাফল্যের কৃতিত্ব অন্যকে দেন, তখন তা শুধু সতীর্থের প্রতি সম্মানই নয়, বরং পুরো দলের প্রতি দায়বদ্ধতারও প্রমাণ।
ভারতীয় ক্রিকেটে অতীতেও এমন উদাহরণ রয়েছে যেখানে দলের জয়কে ব্যক্তিগত রেকর্ডের উপরে রাখা হয়েছে। সঞ্জুর এই মন্তব্য সেই ধারাকেই আরও শক্তিশালী করে। তাঁর বক্তব্যে যে সরলতা এবং আন্তরিকতা ছিল, তা দ্রুতই ক্রিকেটমহলে ছড়িয়ে পড়ে।
আর সেই কারণেই তাঁর বলা একটি লাইন ম্যাচের পর থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে—
“বুমরাহ লাখে একজনই হয়।”
এই এক বাক্যেই যেন ধরা পড়েছে একজন বোলারের প্রতি সতীর্থের গভীর শ্রদ্ধা, ম্যাচের আসল গল্প এবং দলগত ক্রিকেটের প্রকৃত সৌন্দর্য।