Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কেন্দ্রের মেগা সিদ্ধান্ত: ১০,৯০০ ই-বাসের ঐতিহাসিক টেন্ডার সম্পন্ন, অর্ধেকের বেশি বরাত PMI Electro-র হাতে

ভারতের শহুরে গণপরিবহণ ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল কেন্দ্রীয় সরকার। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা জটিলতার পর অবশেষে সম্পন্ন হল দেশের সবচেয়ে বড় ইলেকট্রিক বাস টেন্ডার। মোট ১০,৯০০টি ই-বাস কেনার এই মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের পরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক করে তোলার পথে বড় পদক্ষেপ নিল সরকার। এই ঐতিহাসিক টেন্ডারে সবচেয়ে বড় সাফল্য পেয়েছে দেশীয় সংস্থা PMI Electro Mobility Solutions, যারা একাই প্রায় ৫,২১০টি ই-বাসের বরাত পেয়েছে। অর্থাৎ মোট বাসের প্রায় অর্ধেকই তৈরি করবে এই ভারতীয় সংস্থা।

ভারতের গণপরিবহণে ঐতিহাসিক অধ্যায়

১০,৯০০ ই-বাসের মেগা টেন্ডার সম্পন্ন করল কেন্দ্র, অর্ধেকের বেশি বাসের বরাত পেল PMI Electro

ভারতের শহুরে পরিবহণ ব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা ঘটাল কেন্দ্রীয় সরকার। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, আইনি জটিলতা ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে সম্পন্ন হল দেশের সবচেয়ে বড় ইলেকট্রিক বাস (E-Bus) টেন্ডার। মোট ১০,৯০০টি বৈদ্যুতিক বাস কেনার এই মেগা প্রকল্পে সবচেয়ে বড় সাফল্য পেল দেশীয় ই-বাস নির্মাতা PMI Electro Mobility Solutions, যারা একাই পেয়েছে প্রায় ৫,২১০টি বাসের বরাত। এই সিদ্ধান্ত ভারতের সবুজ পরিবহণ নীতিতে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে

এই টেন্ডারটি বাস্তবায়িত হচ্ছে কেন্দ্র সরকারের উচ্চাভিলাষী PM e-DRIVE (Prime Minister’s Electric Drive Revolution in Innovative Vehicle Enhancement) প্রকল্পের আওতায়। মূল লক্ষ্য—ভারতের বড় শহরগুলিতে দূষণহীন, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক গণপরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

এই টেন্ডারটি বাস্তবায়িত হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী ই-ড্রাইভ প্রকল্পের আওতায়, যার মূল লক্ষ্য শহরের বায়ুদূষণ কমানো এবং ডিজেলনির্ভর গণপরিবহণ থেকে ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় রূপান্তর ঘটানো। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ বাসের উপর নির্ভর করেন, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ডিজেল চালিত বাস শহরের পরিবেশের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। সেই পরিস্থিতিতে বৈদ্যুতিক বাসকে গণপরিবহণের মূল মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলাই সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

PMI Electro-র এই সাফল্য শিল্পমহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত হলেও গত কয়েক বছরে সংস্থাটি ই-বাস প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। দেশীয় প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে তৈরি এই বাসগুলির রেঞ্জ, ব্যাটারি পারফরম্যান্স ও অপারেটিং খরচ অন্যান্য সংস্থার তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় টেন্ডারে তারা এগিয়ে যায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইতিমধ্যেই দেশে বিক্রি হওয়া ই-বাসের বড় অংশ PMI তৈরি করছে এবং এই নতুন অর্ডার তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে তুলল।

এই টেন্ডারে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক বাসের বরাত পেয়েছে EKA Mobility, যারা প্রায় ৩,৪৮৫টি ই-বাস সরবরাহ করবে। তৃতীয় স্থানে রয়েছে Olectra Greentech, যাদের হাতে এসেছে ১,৭৮৫টি বাসের অর্ডার। এছাড়া একটি কনসোর্টিয়ামকে দেওয়া হয়েছে সীমিত সংখ্যক বাসের কাজ। প্রতিযোগিতামূলক এই টেন্ডারে দেশের একাধিক বড় অটোমোবাইল সংস্থা অংশ নিলেও সকলেই সফল হতে পারেনি।

সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা গেছে, টাটা মোটরস ও অশোক লেল্যান্ডের মতো প্রতিষ্ঠিত সংস্থা এই টেন্ডারে কোনও বরাত পায়নি। বিশেষ করে অশোক লেল্যান্ডের একটি সহযোগী সংস্থা নথিগত ও আইনি জটিলতার কারণে সময়মতো দরপত্র জমা দিতে পারেনি বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলায় চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশে দীর্ঘ বিলম্বও হয়েছে। তবে সব আইনি বাধা কাটিয়ে সরকার শেষ পর্যন্ত টেন্ডার চূড়ান্ত করায় স্বস্তি ফিরেছে পরিবহণ ও শিল্পমহলে।

এই ১০,৯০০টি ই-বাস দেশের একাধিক বড় শহরে ধাপে ধাপে চালু করা হবে। দিল্লি, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, আহমেদাবাদ, সুরাটসহ বিভিন্ন মহানগরে এই বাস পরিষেবা সম্প্রসারিত হবে বলে জানা গেছে। যাত্রীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সহ এই বাসগুলি শহরের দৈনন্দিন যাত্রাকে আরও আরামদায়ক করে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে ই-বাস চালুর সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে আসছে চার্জিং পরিকাঠামো। শুধুমাত্র বাস কিনলেই হবে না, প্রয়োজন হবে পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশন, উন্নত বিদ্যুৎ সংযোগ এবং দক্ষ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মিলিতভাবে এই পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে। সফলভাবে এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে আগামী দিনে ভারতে ই-বাস শিল্প একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেমে পরিণত হতে পারে।

পরিবেশবিদদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে লক্ষ লক্ষ লিটার ডিজেল সাশ্রয় হবে এবং কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এর ফলে শহরের বায়ুগুণমান উন্নত হবে এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের উপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে এই প্রকল্প থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বহু মানুষের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।

সব মিলিয়ে ১০,৯০০ ই-বাসের এই মেগা টেন্ডার শুধুমাত্র একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভারতের ভবিষ্যৎ পরিবহণ নীতির স্পষ্ট দিকনির্দেশ। এই উদ্যোগ সফল হলে আগামী দিনে আরও বড় আকারে বৈদ্যুতিক যান ব্যবহারের পথ খুলে যাবে এবং ভারত ধীরে ধীরে সবুজ ও টেকসই পরিবহণ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


 কেন এই টেন্ডার এত গুরুত্বপূর্ণ?

ভারতের শহরগুলিতে প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ বাসের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ডিজেল ও সিএনজি চালিত বাসের কারণে—

  • বায়ুদূষণ বাড়ছে

  • কার্বন নিঃসরণ ভয়াবহ আকার নিচ্ছে

  • জ্বালানির আমদানি নির্ভরতা বাড়ছে

  • স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে সাধারণ মানুষের

এই বাস্তবতায় বৈদ্যুতিক বাসকে গণপরিবহণের মূল স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলাই সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য।

১০,৯০০টি ই-বাস একসঙ্গে রাস্তায় নামলে—
ভারতের শহুরে পরিবহণ ব্যবস্থায় কার্বন নিঃসরণ বছরে লক্ষ লক্ষ টন কমবে, এমনটাই মনে করছেন পরিবেশবিদরা।


 PMI Electro: অপ্রত্যাশিত কিন্তু শক্তিশালী বিজয়ী

এই মেগা টেন্ডারে সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে PMI Electro Mobility Solutions। বহু পুরনো ও বড় অটোমোবাইল সংস্থাকে পিছনে ফেলে PMI একাই দখল করেছে প্রায় অর্ধেক টেন্ডার।

PMI Electro সম্পর্কে সংক্ষেপে

PMI Electro একটি ভারতীয় ই-বাস নির্মাতা সংস্থা, যাদের উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে—

  • হরিয়ানা

  • উত্তরপ্রদেশ

  • গুজরাট

সংস্থাটি মূলত—

  • সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তি

  • ভারী বৈদ্যুতিক বাস নির্মাণ

  • দীর্ঘ রেঞ্জ ও কম অপারেটিং কস্ট

এই তিন বিষয়ের উপর জোর দিয়েছে।

২০২৫ সালেই দেশে বিক্রি হওয়া মোট ই-বাসের প্রায় ২৫ শতাংশ ছিল PMI-র তৈরি। এই নতুন অর্ডারের ফলে PMI-র অর্ডার বুক আরও শক্তিশালী হয়ে উঠল এবং সংস্থাটি কার্যত ভারতের ই-বাস মার্কেট লিডার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল


 টেন্ডারের পূর্ণ বণ্টন: কারা কত পেল?

এই ১০,৯০০ ই-বাসের টেন্ডারে অংশ নেয় একাধিক বড় ও মাঝারি সংস্থা। চূড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী—

  • PMI Electro – ৫,২১০টি বাস

  • EKA Mobility (Pinnacle Group) – ৩,৪৮৫টি বাস

  • Olectra Greentech – ১,৭৮৫টি বাস

  • Anthony Travels Consortium – ৪২০টি বাস

এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট, প্রতিযোগিতা ছিল প্রবল এবং সরকার মূল্য, প্রযুক্তি ও ডেলিভারি সক্ষমতা—সব দিক বিচার করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে


 বড় ধাক্কা: কেন বাদ পড়ল Tata, Ashok Leyland?

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়—ভারতের অটোমোবাইল জগতের দুই দিকপাল
Tata Motors ও Ashok Leyland এই মেগা টেন্ডারে কোনও অর্ডার পায়নি।

Tata Motors

Tata Motors বহু বছর ধরে ই-বাস তৈরি করলেও—

  • দাম

  • ডেলিভারি শর্ত

  • নির্দিষ্ট টেকনিক্যাল প্যারামিটার

এই তিন ক্ষেত্রেই তারা পিছিয়ে পড়ে বলে জানা গেছে।

Ashok Leyland

Ashok Leyland-এর একটি সাবসিডিয়ারি সংস্থা টেন্ডারে অংশ নিতে চেয়েছিল, কিন্তু কিছু আইনি জটিলতা ও নথিগত সমস্যার কারণে তারা সময়মতো দরপত্র জমা দিতে পারেনি। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে দিল্লি হাইকোর্টে মামলা দায়ের করা হয়েছে, যা এখনও বিচারাধীন

এই ঘটনাকে অনেকেই ভারতের অটোমোবাইল শিল্পে একটি বড় সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন।


 দীর্ঘ আইনি লড়াই ও বিলম্ব

এই টেন্ডার প্রক্রিয়া সহজ ছিল না। প্রায় এক বছর ধরে—

সব মিলিয়ে প্রকল্পটি বারবার পিছিয়েছে।

অবশেষে কেন্দ্রীয় সরকার সমস্ত আইনি বাধা অতিক্রম করে টেন্ডার চূড়ান্ত করে, যা শিল্পমহলে স্বস্তির বার্তা দিয়েছে।


 কোন কোন শহরে চলবে এই ই-বাস?

এই ই-বাসগুলি দেশের একাধিক বড় শহরে বরাদ্দ করা হবে। সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে—

  • দিল্লি

  • বেঙ্গালুরু

  • হায়দরাবাদ

  • আহমেদাবাদ

  • সুরাট

  • পুনে

  • চেন্নাই

  • কলকাতা (পরবর্তী পর্যায়ে)

প্রতিটি শহরের প্রয়োজন অনুযায়ী—

  • ৯ মিটার

  • ১২ মিটার

  • এয়ার কন্ডিশন্ড ও নন-এসি

বাস চালু করা হবে।


 চার্জিং অবকাঠামো: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

ই-বাস মানেই শুধু বাস নয়, সঙ্গে চাই—

  • ডিপো-লেভেল চার্জিং স্টেশন

  • ফাস্ট চার্জার

  • গ্রিড আপগ্রেড

  • ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম

এই প্রকল্পের সঙ্গে সমান্তরালভাবে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মিলিতভাবে চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তুলবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প সফল হলে আগামী পাঁচ বছরে ভারতে ই-বাস ইকোসিস্টেম একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পে পরিণত হবে।


 পরিবেশগত প্রভাব: সবুজ ভারতের পথে এক ধাপ

১০,৯০০টি ই-বাস চালু হলে—

  • বছরে লক্ষ লক্ষ লিটার ডিজেল সাশ্রয়

  • CO₂ নিঃসরণ বিপুল পরিমাণে হ্রাস

  • শহরের বায়ুগুণমান উন্নত

  • শব্দদূষণ কমবে

বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণদের স্বাস্থ্যের উপর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।


 কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি

এই প্রকল্প সরাসরি ও পরোক্ষভাবে—

  • হাজার হাজার নতুন চাকরি

  • MSME সাপ্লাই চেইন শক্তিশালীকরণ

  • ব্যাটারি, মোটর, সফটওয়্যার শিল্পে বিনিয়োগ

সব মিলিয়ে ভারতের বৈদ্যুতিক যান শিল্পে নতুন গতি আনবে।


 ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ

এই টেন্ডার সফল হলে—

  • আরও বড় ই-বাস প্রকল্প আসবে

  • আন্তঃনগর ই-বাস চালুর পথ খুলবে

  • ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের বড় শহরগুলিতে ডিজেল বাস কার্যত উঠে যেতে পারে

সরকারের লক্ষ্য—Net Zero India।


 উপসংহার

১০,৯০০ ই-বাসের এই মেগা টেন্ডার শুধুমাত্র একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়। এটি ভারতের—

  • পরিবহণ নীতি

  • পরিবেশ ভাবনা

  • প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা

এই তিনটির এক যুগান্তকারী মিলনবিন্দু।

PMI Electro-র সাফল্য দেখিয়ে দিল—দেশীয় সংস্থাও বিশ্বমানের প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, এই ই-বাসগুলি কত দ্রুত রাস্তায় নামে এবং সাধারণ মানুষের যাত্রাপথ কতটা বদলে দেয়।

ভারতের গণপরিবহণের ভবিষ্যৎ যে বৈদ্যুতিক—এই টেন্ডার সেই কথাই স্পষ্ট করে দিল। 

Preview image