Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

১১০০ স্থানে জনকল্যাণ শিবির, নন্দীগ্রাম থেকেই রাজ্যজুড়ে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর

মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ১২৫ দিনের কর্মসংস্থান প্রকল্পে চলতি মাসে ২০ দিনের কাজের জন্য ৭০০ কোটি টাকা দিয়েছে কেন্দ্র। পাশাপাশি লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পে ৭৯ লক্ষ মহিলার অ্যাকাউন্টে ৩,০০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে।

১১০০ স্থানে জনকল্যাণ শিবির, নন্দীগ্রাম থেকেই রাজ্যজুড়ে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর
স্থানীয় সংবাদ

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের ক্ষমতায় আসার পর নাগরিক পরিষেবা ও সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে শুরু হয়েছে ‘জনকল্যাণ শিবির’। সরকারের দাবি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রেখে সাধারণ মানুষের কাছে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ। ১৫ জুন থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত তিন দিনের এই কর্মসূচি রাজ্যের বিভিন্ন ব্লক, পুরসভা এবং গ্রামীণ এলাকায় একযোগে আয়োজন করা হয়েছে। মোট ১১০০টি স্থানে এই শিবির বসেছে, যেখানে সাধারণ মানুষ এক ছাতার তলায় একাধিক সরকারি পরিষেবা ও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুযোগ-সুবিধা পেতে পারবেন।

নন্দীগ্রামের রেয়াপাড়ায় এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। উদ্বোধনী মঞ্চ থেকে তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতি, মধ্যস্বত্বভোগী এবং প্রশাসনিক জটিলতার অভিযোগ ছিল। সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটিয়ে প্রকৃত উপভোক্তাদের হাতে সরাসরি সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়াই জনকল্যাণ শিবিরের প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, সরকার চায় এমন একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যাতে রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা সহজে পেতে পারেন।

জনকল্যাণ শিবিরের মূল উদ্দেশ্য তিনটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রথমত, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধাভোগী হিসেবে নতুন আবেদনকারীদের নাম নথিভুক্ত করা। দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারি প্রকল্প সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। তৃতীয়ত, বিভিন্ন প্রকল্পের আবেদনপত্র পূরণ, নথি যাচাই, সংশোধন এবং জমা দেওয়ার কাজ একই জায়গায় সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা। এর ফলে মানুষকে আর একাধিক সরকারি দপ্তরে ঘুরতে হবে না বলে দাবি প্রশাসনের।

সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, এই শিবিরগুলির মাধ্যমে মোট ৫৫ ধরনের সরকারি পরিষেবা ও প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া যাবে। সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন এবং পরিচয়পত্র সংক্রান্ত নানা পরিষেবাকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। অন্নপূর্ণা যোজনা, যুবশক্তি প্রকল্প, প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি, বিধবা ভাতা, বার্ধক্য ভাতা-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে নতুন করে আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। যাঁরা এতদিন কোনও কারণে এই প্রকল্পগুলির আওতায় আসতে পারেননি, তাঁরা সরাসরি শিবিরে গিয়ে আবেদন করতে পারবেন।

শুধু নতুন আবেদন নয়, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের নথিপত্র বা সরকারি রেকর্ডে কোনও ভুল থাকলে তার সংশোধনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নথিতে নাম, বয়স, ঠিকানা বা অন্যান্য তথ্যগত ভুলের কারণে সাধারণ মানুষ সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। জনকল্যাণ শিবিরে সেই সমস্যার দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন।

এ ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতে গিয়ে কেউ যদি সমস্যার মুখে পড়ে থাকেন, কোনও অভিযোগ জানাতে চান বা দীর্ঘদিন ধরে কোনও আবেদন ঝুলে থাকলে, সেটিও শিবিরে জানাতে পারবেন। অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ কাউন্টার রাখা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।

নন্দীগ্রামে জনকল্যাণ শিবিরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন। তিনি জানান, পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যে এ বছর রাজ্যে ১ কোটি ১০ লক্ষ গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শুধু গাছ লাগানোই নয়, সেগুলির পরিচর্যার দায়িত্বও সরকার নেবে। জনকল্যাণ শিবিরের কর্মসূচির সঙ্গে বৃক্ষরোপণ অভিযানকেও যুক্ত করা হয়েছে, যাতে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘‘১৫ থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত রাজ্যের ১১০০টি স্থানে এই শিবির চলছে। কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের ৫৫টি প্রকল্পের সুযোগ-সুবিধা এখান থেকে পাওয়া যাবে। আমি চাই প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও এই সুযোগ গ্রহণ করুন। একটি নির্ভুল তালিকা তৈরি হোক, যাতে কোনও যোগ্য ব্যক্তি সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন।’’

এই সভা থেকেই তিনি পূর্ববর্তী সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। বিশেষ করে লক্ষ্মীর ভান্ডার-সহ একাধিক প্রকল্পে ভুয়ো উপভোক্তার নাম ব্যবহার করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বর্তমান সরকার সেই সমস্ত ভুয়ো অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছে এবং প্রকৃত উপভোক্তাদের হাতে সরাসরি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে।

তিনি বলেন, ‘‘এখন সরকার এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করছে, যেখানে কোনও দুর্নীতি থাকবে না, কোনও প্রতারণা থাকবে না এবং কোনও মধ্যস্বত্বভোগীর প্রয়োজন হবে না। নাগরিকদের যা যা প্রয়োজন, সরকার সরাসরি তাদের কাছে পৌঁছে দেবে।’’

news image
আরও খবর

মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, পূর্বের ১০০ দিনের কর্মসংস্থান প্রকল্পকে সম্প্রসারিত করে বর্তমানে ১২৫ দিনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যে ৮৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। শুধুমাত্র চলতি মাসেই অতিরিক্ত ২০ দিনের কাজের জন্য ৭০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই অর্থের মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকার কর্মসংস্থান আরও বৃদ্ধি পাবে এবং দরিদ্র পরিবারগুলির আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্প নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে ৭৯ লক্ষ মহিলা এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছেন এবং তাঁদের প্রত্যেককে ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি ঘোষণা করেন, আগামী ২০ জুলাই থেকে আবাস যোজনার সমীক্ষা শুরু হবে। যাঁরা প্রকৃতপক্ষে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও আবাস প্রকল্পের সুবিধা পাননি, তাঁরা টোল-ফ্রি নম্বরে যোগাযোগ করে অভিযোগ জানাতে পারবেন। অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

তবে সরকারের এই বৃহৎ উদ্যোগ ঘিরে প্রথম দিন থেকেই কিছু অভিযোগও সামনে এসেছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে শিবিরে অব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পরিকাঠামোর অভাব এবং আবেদনপত্র না পাওয়ার মতো সমস্যার খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে উত্তরপাড়ায় শিবিরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।

উত্তরপাড়া পুরসভা এলাকার মণীন্দ্র ভবনে আয়োজিত জনকল্যাণ শিবিরে গিয়ে স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক দীপাঞ্জন চক্রবর্তী ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, এত মানুষের সমাগম হওয়া সত্ত্বেও সেখানে পর্যাপ্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। গরমের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

বিধায়কের অভিযোগ, উত্তরপাড়া পুরসভার চেয়ারম্যান দিলীপ যাদব এবং এক্সিকিউটিভ অফিসার ইচ্ছাকৃতভাবে এই অব্যবস্থা তৈরি করেছেন। তিনি দাবি করেন, ‘‘কোন্নগর পুরসভায় একই ধরনের শিবিরে অনেক বেশি মানুষের উপস্থিতি থাকলেও সেখানে সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ উত্তরপাড়ায় পানীয় জল পর্যন্ত রাখা হয়নি। চেয়ারম্যানের মোবাইল ফোনও বন্ধ ছিল। বিষয়টি পরিকল্পিত অন্তর্ঘাত বলেই মনে হচ্ছে।’’

তিনি আরও জানান, এই বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের নজরে আনা হবে। যদিও পুরসভার পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এই অভিযোগের কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, পুরুলিয়া শহরের এমএসএ ইন্ডোর স্টেডিয়ামে আয়োজিত জনকল্যাণ শিবিরেও দেখা যায় দীর্ঘ লাইন। তীব্র গরম এবং চড়া রোদ উপেক্ষা করে বহু মানুষ সকাল থেকেই সেখানে উপস্থিত হন। পুরুলিয়া-১ ব্লকের শিবিরেও একই ধরনের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। তবে অনেকেই অভিযোগ করেন, প্রয়োজনীয় ফর্ম পাওয়া যাচ্ছে না বা আবেদন পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হচ্ছে না।

অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য আবেদন করতে আসা মালতী মাহাতো নামে এক মহিলা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘এত দূর থেকে গরমের মধ্যে এসে জানতে পারছি আবেদন অনলাইনে করতে হবে। আগে থেকে যদি এই তথ্য জানানো হত, তাহলে এত কষ্ট করে আসতে হত না।’’ তাঁর মতো আরও অনেকেই শিবিরে এসে প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ করেন।

কিছু মানুষের অভিযোগ, রাজ্যের রেশন কার্ড থাকার কারণে তাঁরা আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে আবেদন করতে পারছেন না। বিষয়টি নিয়ে শিবিরে উপস্থিত কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের বচসাও হয় বলে জানা গিয়েছে। ফলে সরকারের উদ্যোগ প্রশংসিত হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও উন্নত সমন্বয় ও প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

সব মিলিয়ে জনকল্যাণ শিবির রাজ্য সরকারের একটি বৃহৎ প্রশাসনিক কর্মসূচি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। একদিকে সরকারের দাবি, এই উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও সহজ পরিষেবা পাবেন। অন্যদিকে, প্রথম দিনেই বিভিন্ন জায়গায় অব্যবস্থার অভিযোগ সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে বাস্তবায়নের দক্ষতা নিয়ে। আগামী দিনগুলিতে এই শিবির কতটা সফলভাবে মানুষের কাছে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দিতে পারে এবং অভিযোগগুলির সমাধান কত দ্রুত হয়, তার উপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে এই কর্মসূচির সাফল্য।

Preview image