Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

গলসির মিঠাপুরে সর্পদংশনে প্রাণ হারাল পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী কবিতা বাউরী

গলসির মিঠাপুর শ্রী দুর্গা হাই স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী কবিতা বাউরী, যাকে রিমি নামেও পরিচিত, সরলতা ও অসচেতনার কারণে সর্পদংশনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। মিঠাপুর ভাঙ্গা বাঁধে তার পরিবারের সাথে থাকত এবং তার বাবা খোকন সরদার ও মা দিনমজুর। একদিন স্কুলে যাওয়ার আগে ঘরে নাতা দিতে গিয়ে কবিতা সর্পদংশিত হয়, তবে সে বিষয়টি গোপন রেখে স্কুলে চলে যায়। স্কুলে পৌঁছানোর পর রাস্তায় অসুস্থতা অনুভব করলেও, পরীক্ষা চলাকালীন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় এবং শিক্ষকদের নজরে আসে। তখনই তারা কবিতার সর্পদংশনের ব্যাপারে জানার পর দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং পরিবারের সদস্যদের খবর দেয়। আদ্রাহাটি ব্লক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসার পর কবিতাকে বর্ধমান রেফার করা হয়, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। তিনি সেখানে মৃত্যুবরণ করেন। পুরো ঘটনা এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে এবং সবাই একে অপরকে দোষারোপ করছে যদি সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া যেত, তবে কবিতা হয়তো বেঁচে থাকতে পারত।

দুর্ঘটনা

গলসির মিঠাপুরে সর্পদংশনে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী কবিতা বাউরীর মর্মান্তিক মৃত্যু: এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি ও সামাজিক সতর্কবার্তা 

 

 

ভূমিকা: এক অপ্রত্যাশিত দুর্যোগের ছায়া

 

পূর্ব বর্ধমানের গলসি ২ নম্বর ব্লকের মিঠাপুর এলাকায় নেমে আসা শোকের ছায়া আজ আর শুধুমাত্র বাউরী পরিবারের গণ্ডিতে আবদ্ধ নেই। পঞ্চম শ্রেণির এক সদ্য প্রস্ফুটিত কুঁড়ি, কবিতা বাউরী (ডাকনাম রিমি), এক নিদারুণ সর্পদংশনের শিকার হয়ে পৃথিবী থেকে অকালে বিদায় নিয়েছে। এই ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং দারিদ্র, অসচেতনতা এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর দুর্বলতার এক করুণ সংমিশ্রণ। মেধাবী এই শিক্ষার্থীর জীবনাবসান গলসির মিঠাপুর শ্রী দুর্গা হাই স্কুল, তার সহপাঠী এবং গোটা এলাকার মানুষকে গভীর শোকস্তব্ধ করেছে। এই ট্র্যাজেডি আমাদের সমাজকে একটি অনিবার্য প্রশ্ন সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে: কেন আজও সামান্য অসাবধানতা এবং তথ্যের অভাবে একটি অমূল্য জীবন এভাবে ঝরে যায়? কীভাবে নিশ্চিত করা যায় যে, প্রাথমিক চিকিৎসার গুরুত্ব এবং দ্রুত পদক্ষেপ প্রতিটি গ্রামীণ বাড়িতে সমানভাবে পৌঁছেছে?

কবিতা বাউরীর এই মৃত্যু কেবল একটি হৃদয়বিদারক সংবাদ নয়, এটি স্বাস্থ্যসচেতনতা, সর্পদংশন প্রতিরোধী ব্যবস্থা এবং সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে জরুরি চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রে আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। এই ঘটনার প্রতিটি স্তরকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন—ক্ষুদ্র গ্রামজীবনের সরলতা থেকে শুরু করে শিক্ষকের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ, হাসপাতালে পৌঁছানোর কঠিন পথ এবং শেষ মুহূর্তের ব্যর্থ প্রয়াস।


 

১. কবিতা বাউরী: একটি প্রস্ফুটিত কুঁড়ির পরিচিতি

 

 

ক. জীবনচিত্র ও পারিবারিক পটভূমি

 

কবিতা বাউরী, বা তার পরিচিত ডাকনাম 'রিমি', মিঠাপুরের ভাঙ্গা বাঁধে তার দিনমজুর বাবা খোকন সরদার ও গৃহিণী মায়ের সাথে বসবাস করত। এই অঞ্চলে বহু পরিবারের মতোই বাউরী পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। নিত্যদিনের সংগ্রামই ছিল তাদের জীবনের প্রধান অংশ। খোকন সরদার দিন এনে দিন খেতেন, সামান্য উপার্জনে কোনোমতে সংসারের চাকা সচল রাখতেন। দারিদ্রের কশাঘাতে জর্জরিত হওয়া সত্ত্বেও, এই পরিবারটি তাদের সন্তানদের শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করেছিল। তারা মনে করতেন, শিক্ষাই তাদের সন্তানদের এই দারিদ্রের চক্র থেকে মুক্তি দিতে পারে।

 

খ. শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও মেধা

 

কবিতা ছিল মিঠাপুর শ্রী দুর্গা হাই স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির একজন অত্যন্ত উজ্জ্বল ও মেধাবী শিক্ষার্থী। তার সহপাঠী এবং শিক্ষক মহলে তার পরিচিতি ছিল একজন শান্ত, বিনয়ী এবং পড়াশোনায় অত্যন্ত মনোযোগী ছাত্রী হিসেবে। তার মেধা শুধু পাঠ্যপুস্তকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, স্কুলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সহপাঠ্যক্রমিক কর্মকাণ্ডেও সে সক্রিয় অংশগ্রহণ করত। শিক্ষকরা প্রায়শই তার অধ্যবসায় এবং শেখার আগ্রহের প্রশংসা করতেন। তার শিক্ষাজীবনের এই সূচনাপর্বই তার পরিবার এবং স্কুলের জন্য ছিল এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন। তার অকাল প্রয়াণ শুধুমাত্র একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ নয়, এটি সমাজের সম্ভাব্য একজন মেধাবী ব্যক্তিত্বের অপরিণত বিদায়।


 

২. ঘটনার দিনলিপি: সরলতা ও অসচেতনতার করুণ পরিণতি

 

 

ক. মর্মান্তিক সর্পদংশনের মুহূর্ত

 

মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে স্কুলে যাওয়ার ঠিক আগে। প্রচলিত গ্রামীণ প্রথা অনুযায়ী, সকালে বাড়ির কাজ সারতে গিয়েছিলেন কবিতা। ঘরে নাতা (মাটি লেপে পরিষ্কার করার কাজ) দেওয়ার সময়, অসাবধানতাবশত একটি বিষধর সাপ তাকে দংশন করে। নাতা দেওয়ার সময় মনোযোগ নিচে বা মাটির দিকে নিবদ্ধ থাকায়, সাপটির উপস্থিতি সে টেরও পায়নি। গ্রামীণ এলাকায়, বিশেষ করে বর্ষার সময় বা কাঁচা বাড়িতে এই ধরনের ঘটনা অত্যন্ত সাধারণ হলেও, এর পরিণতি প্রায়শই ভয়াবহ হয়।

 

খ. গোপন রাখা এবং বিলম্বিত পদক্ষেপ

 

সাপের কামড় অনুভব করার পর কবিতা তাৎক্ষণিক ব্যথা অনুভব করেছিল, তবে তার সরলতা এবং সম্ভবত সাপে কামড়ানোর ভয় তাকে বিষয়টি গোপন রাখতে বাধ্য করে। গ্রামীণ কুসংস্কার বা প্রাথমিক অজ্ঞতার কারণে বহু ক্ষেত্রে শিশুরা আঘাতের তীব্রতা বুঝতে পারে না বা ভয়ে পরিবারকে জানায় না। কবিতা সেই মুহূর্তের যন্ত্রণা সহ্য করেও, তার দৈনিক রুটিন মেনে ব্যাগ কাঁধে তুলে নেয় এবং স্কুলের পথে পা বাড়ায়। এটিই ছিল জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিলম্ব।

 

গ. স্কুলে অসুস্থতার লক্ষণ প্রকাশ

 

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেই কবিতার অসুস্থতা অনুভূত হতে শুরু করে। শরীরে এক অস্বাভাবিক দুর্বলতা, ঝিমুনি এবং দংশিত স্থানে জ্বালা-যন্ত্রণা তাকে ক্রমশ কাবু করতে থাকে। কিন্তু স্কুলের প্রতি তার আগ্রহ এতটাই ছিল যে, সে থামেনি। স্কুলে পৌঁছে পরীক্ষা চলাকালীন তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব এবং নিস্তেজতা—এগুলোই ছিল বিষক্রিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ। ক্লাসরুমে তার অস্বাভাবিক শারীরিক অবস্থা সহজেই শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।


 

৩. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের তাৎক্ষণিক ভূমিকা

 

 

ক. শিক্ষকদের দ্রুত এবং মানবিক সাড়া

 

কবিতার ক্রমশ অবনতিশীল অবস্থা দেখে তার ক্লাসের শিক্ষক এবং অন্যান্য শিক্ষাকর্মীরা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করেননি। তারা তৎক্ষণাৎ পরিস্থিতি বুঝতে পারেন এবং ছাত্রীর সমস্যাটি নিয়ে গভীরভাবে খোঁজ নেওয়া শুরু করেন। এই জরুরি জিজ্ঞাসাবাদেই কবিতা অত্যন্ত দুর্বল কণ্ঠে সর্পদংশনের বিষয়টি স্বীকার করে। শিক্ষকেরা কোনোপ্রকার কুসংস্কার বা দেরি না করে, সর্পদংশনের গুরুত্ব অনুধাবন করেন। তাদের এই তাৎক্ষণিক এবং বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ ছিল সেই মুহূর্তে ছাত্রীর জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টা।

 

খ. জরুরি যোগাযোগ ও স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত

 

শিক্ষকেরা অবিলম্বে কবিতার পরিবারকে খবর দেন এবং একই সাথে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। স্কুলের পক্ষ থেকে নেওয়া এই দ্রুত সিদ্ধান্তটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির দায়িত্বশীলতা এবং মানবিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। যদিও এই পদক্ষেপটি কবিতার জীবন বাঁচাতে পারেনি, তবে এটি প্রমাণ করে যে, জরুরি পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি দ্রুত এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারে। শিক্ষকেরা আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর আস্থা রেখে তাকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন, যা গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রশংসনীয়।


 

৪. স্বাস্থ্যসেবা পরিকাঠামোয় দৌড়: ব্যর্থতার কারণ ও বিশ্লেষণ

 

 

ক. আদ্রাহাটি ব্লক স্বাস্থ্য কেন্দ্র: প্রাথমিক চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা

 

শিক্ষকদের সহযোগিতায় এবং পরিবারের উপস্থিতিতে কবিতাকে দ্রুত আদ্রাহাটি ব্লক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সর্পদংশনের ক্ষেত্রে যত দ্রুত অ্যান্টি-ভেনম সিরাম (Anti-Venom Serum - AVS) প্রয়োগ করা যায়, জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা তত বাড়ে। আদ্রাহাটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু হলেও, কবিতার দেহে বিষের মাত্রা এবং তার প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা চিকিৎসকদের প্রত্যাশার বাইরে ছিল। সর্পদংশনের ফলে সময় যত গড়িয়েছিল, বিষ ততটাই তার স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছিল।

 

news image
আরও খবর

খ. বর্ধমানে রেফার: সময়ের বিরুদ্ধে এক কঠিন লড়াই

 

ব্লক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায়, চিকিৎসকরা দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে কবিতাকে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে রেফার করার সিদ্ধান্ত নেন। বর্ধমান ছিল উন্নত চিকিৎসার জন্য শেষ ভরসা। কিন্তু এই রেফারেল মানেই সময়ের এক কঠিন পরীক্ষা। ব্লক থেকে জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছানোর এই সময়টুকু সর্পদংশনের মতো পরিস্থিতিতে প্রায়শই জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান গড়ে দেয়। গ্রামীণ রাস্তা, যানবাহনের সমস্যা এবং দূরত্ব—সবই এই মূল্যবান সময়ের অপচয়ে ভূমিকা রাখে।

 

গ. পথেই নিভে গেল জীবনপ্রদীপ

 

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কবিতাকে বর্ধমান নিয়ে যাওয়ার পথেই তার শারীরিক অবস্থার চূড়ান্ত অবনতি ঘটে। বিষক্রিয়া তার শরীরের মূল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলিকে অকেজো করে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত হাসপাতালেও পৌঁছানো হলো না। পথেই চিরঘুমে ঢলে পড়ল পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী কবিতা বাউরী। এই খবর যখন মিঠাপুরে পৌঁছাল, তখন পুরো এলাকা এক গভীর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। দিনমজুর বাবার অসহায়তা এবং মায়ের বুকফাটা কান্না এক নিদারুণ দৃশ্যের সৃষ্টি করেছিল। এক সম্ভাবনাময় জীবন এভাবে চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই শেষ হয়ে গেল, যা গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর দুর্বলতার দিকে আঙুল তোলে।


 

৫. সামাজিক ও স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাব: এক গভীর সংকট

 

 

ক. প্রাথমিক চিকিৎসার অজ্ঞতা ও কুসংস্কার

 

এই ঘটনার মূল ট্র্যাজেডি লুকিয়ে আছে সর্পদংশন নিয়ে আমাদের সমাজে বিদ্যমান অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের মধ্যে। বহু গ্রামীণ পরিবার আজও সর্পদংশনের পরে ওঝা বা কবিরাজের উপর নির্ভর করে, যা মূল্যবান সময় নষ্ট করে। কবিতা বাউরী হয়তো ভয়ে তার পরিবারকে জানাননি, কিন্তু যদি তার পরিবার প্রাথমিক চিকিৎসার গুরুত্ব জানত, তাহলে হয়তো তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যেত। সর্পদংশনের পরে আতঙ্কিত না হয়ে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা, রোগীকে স্থির রাখা এবং দ্রুততম সময়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত পথ। এই শিক্ষা আজও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছায়নি।

 

খ. দরিদ্র পরিবারের অসহায়তা এবং দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থা

 

কবিতার পরিবার ছিল আর্থিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থার ব্যয়ভার বহন করা তাদের জন্য কঠিন ছিল। যদিও স্কুল কর্তৃপক্ষ সহায়তা করেছিল, কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি পরিবহন ব্যবস্থার অভাব প্রায়শই জীবনহানির কারণ হয়। সরকারী স্তরে এই ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে বিনামূল্যে এবং দ্রুত পরিবহন নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন।


 

৬. স্থানীয় বিদ্যালয় ও সমাজের প্রতিক্রিয়া

 

 

ক. মিঠাপুর শ্রী দুর্গা হাই স্কুলের শোক

 

কবিতা বাউরীর মৃত্যু মিঠাপুর শ্রী দুর্গা হাই স্কুলের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। স্কুলের প্রধান শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষক মণ্ডলী এবং সহপাঠীরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ একটি শোকসভার আয়োজন করে এবং কবিতার আত্মার শান্তি কামনা করে। সহপাঠীদের মনে এই ঘটনা এক গভীর দাগ কেটেছে, যা তাদের শৈশবের সরলতাকে বিষাদের এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। শিক্ষকদের মানবিক প্রয়াস সত্ত্বেও ছাত্রীর জীবন বাঁচাতে না পারার বেদনা তাদের কর্মজীবনের এক গভীর দুঃখ হয়ে থাকবে।

 

খ. সমাজের আত্মসমালোচনা ও আফসোস

 

এই ঘটনার পর স্থানীয় গ্রামবাসী এবং সচেতন মহল একটিই আফসোস করছে—যদি সময়মতো জানা যেত, যদি আরও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যেত, তবে হয়তো কবিতা বেঁচে থাকত। এই আফসোসই সমাজের প্রতি এক নীরব বার্তা। গ্রামের প্রবীণরা এই ঘটনাকে স্থানীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত না করে, একে বৃহত্তর সামাজিক সচেতনতার অভাবের ফল হিসেবে দেখছেন। কীভাবে গ্রামীণ পরিবারগুলিকে আধুনিক চিকিৎসার দিকে উৎসাহিত করা যায়, তা নিয়ে স্থানীয় স্তরে আলোচনা শুরু হয়েছে।


 

৭. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সরকারের ভূমিকা: করণীয়

 

 

ক. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জরুরি স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ

 

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত শুধু শিক্ষাদান নয়, বরং প্রাথমিক চিকিৎসা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। প্রতিটি স্কুলে ফার্স্ট এইড কিট (First Aid Kit) এবং সর্পদংশন সংক্রান্ত জরুরি প্রোটোকল সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা আবশ্যক। শিক্ষার্থীদেরও বিপদকালীন সময়ে নিজেদের এবং অন্যদের সাহায্য করার প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া উচিত।

 

খ. গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবার মানোন্নয়ন

 

সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের উচিত প্রত্যন্ত অঞ্চলের ব্লক স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যান্টি-ভেনম সিরামের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীকে দ্রুত উচ্চতর চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তরের জন্য ২৪/৭ অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা চালু রাখা। প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী এবং আধুনিক সরঞ্জাম গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, অনেক ক্ষেত্রেই ব্লক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে উন্নত সাপোর্টিভ কেয়ারের অভাব থাকে।

 

গ. ব্যাপক সচেতনতামূলক অভিযান

 

জেলা প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য দফতরের উদ্যোগে ব্যাপক আকারে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত। মাইকিং, পথনাটিকা এবং স্থানীয় ভাষায় প্রচারপত্রের মাধ্যমে সর্পদংশনের পর করণীয় এবং বর্জনীয় বিষয়গুলি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে ওয়াকিবহাল করতে হবে। 'ওঝা নয়, ডাক্তারই একমাত্র ভরসা'—এই বার্তাটি প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে হবে।


 

উপসংহার: এক মর্মস্পর্শী শিক্ষা

 

গলসির মিঠাপুরের কবিতা বাউরীর অকালমৃত্যু এক ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হলেও, এর গভীরতা একটি বৃহত্তর সামাজিক সমস্যার প্রতি ইঙ্গিত করে। এটি একটি করুণ reminder যে, জীবন অত্যন্ত মূল্যবান এবং প্রতিটি জীবনকে রক্ষা করার জন্য আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। প্রাথমিক অজ্ঞতা, দারিদ্র এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার দুর্বলতা—এই ত্রিমুখী সংকটই কবিতার মতো সম্ভাবনাময় জীবনকে ছিনিয়ে নিয়েছে।

কবিতার মৃত্যু যেন এক জ্বলন্ত সতর্কবার্তা। এটি আমাদের শেখায় যে, সময়মতো সচেতনতা, দ্রুততম পরিবহন ব্যবস্থা এবং বিজ্ঞানসম্মত প্রাথমিক চিকিৎসা—এই তিনটি স্তম্ভই সর্পদংশনের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচানোর একমাত্র উপায়। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারকে সজাগ করা যায়, যদি প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে আরও শক্তিশালী করা যায়, তবেই হয়তো আর কোনো কবিতাকে এভাবে অকালে ঝরে যেতে হবে না। তার এই মর্মান্তিক বিদায় যেন আমাদের সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধির অনুঘটক হয়ে ওঠে—এটাই আজ সময়ের দাবি।

Preview image