১৫ বছর বয়সি বিস্ময় প্রতিভা বৈভবের অভিষেক নিয়ে অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হল। সুযোগ না মেলায় হতাশ ক্রিকেটপ্রেমীরা, আর কোচের সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।
আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি সিরিজে ভারতের চুনকাম হওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে টিম ম্যানেজমেন্টের নির্বাচননীতি। দু’ম্যাচের সিরিজে ভারত প্রত্যাশিত ক্রিকেট খেলতে পারেনি। ব্যাটিং ব্যর্থতা, পরিকল্পনার অভাব, পরিস্থিতি বোঝার ভুল এবং চাপের মুহূর্তে সিদ্ধান্তহীনতা—সব মিলিয়ে এই সিরিজ ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই হারের থেকেও বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে ১৫ বছর বয়সি বিস্ময় প্রতিভা বৈভব সূর্যবংশীর অভিষেক না হওয়া।
ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন প্রতিভাদের নিয়ে সবসময়ই বড় প্রত্যাশা থাকে। বিশেষ করে কোনও ক্রিকেটার যদি অল্প বয়সেই বড় মঞ্চে নজর কাড়েন, তা হলে তাঁকে ঘিরে আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। বৈভব সূর্যবংশীর ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। আইপিএল এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে তাঁর ব্যাটিং দেখে অনেকেই মনে করেছিলেন, আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে তুলনামূলক সহজ সিরিজেই তাঁকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পরীক্ষা করে দেখা উচিত ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে একাদশে জায়গা দেওয়া হয়নি।
প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, আয়ারল্যান্ড ভারতের বিরুদ্ধে দুই ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ ২-০ ব্যবধানে জিতেছে। দ্বিতীয় ম্যাচে ভারত অল্প ব্যবধানে হারে, আর সেই ফলের পর ভারতীয় দলের ব্যাটিং পরিকল্পনা নিয়ে আরও বেশি প্রশ্ন ওঠে।
ভারতের ব্যাটিং কোচ রায়ান টেন দুশখাতে সিরিজ শেষে বৈভবকে নিয়ে মুখ খুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, বৈভব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য তৈরি, কিন্তু তাঁকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কোচিং স্টাফের যুক্তি, একজন তরুণ ক্রিকেটারকে শুধু প্রতিভার ভিত্তিতে বড় মঞ্চে নামিয়ে দেওয়া যায় না। তাঁকে মানসিকভাবে, টেকনিক্যালি এবং পরিস্থিতি সামলানোর দিক থেকেও প্রস্তুত করে তুলতে হয়। রিপোর্টে দুশখাতে বলেছেন, বৈভবের প্রতিভা নিয়ে সন্দেহ নেই, তবে ভারতীয় দল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা মাথায় রেখেই এগোতে চায়।
কিন্তু প্রশ্ন হল, আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে যদি তাঁকে না খেলানো হয়, তা হলে কখন খেলানো হবে? এই প্রশ্নটাই এখন ক্রিকেট মহলে সবচেয়ে বেশি ঘুরছে। কারণ আয়ারল্যান্ড সিরিজকে অনেকেই নতুন ক্রিকেটারদের পরীক্ষা করার আদর্শ সুযোগ বলে মনে করেছিলেন। সিরিজের আগে প্রত্যাশা ছিল, ভারতের নতুন নেতৃত্ব, নতুন পরিকল্পনা এবং তরুণ ক্রিকেটারদের সামনে সুযোগ থাকবে নিজেদের প্রমাণ করার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারত সিরিজ হারল, আর বৈভব ডাগআউটেই থেকে গেলেন।
সঞ্জু স্যামসনের প্রসঙ্গ এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সঞ্জু ভারতীয় দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। তিনি এর আগে বড় ম্যাচে পারফর্ম করেছেন এবং দলের জয়ে অবদান রেখেছেন। টিম ম্যানেজমেন্টের যুক্তি, সাম্প্রতিক সাফল্যের জন্য সঞ্জুকে এক-দু’টি ম্যাচের ব্যর্থতায় সরিয়ে দেওয়া উচিত নয়। এই যুক্তির মধ্যে অবশ্যই যুক্তি আছে। কোনও ক্রিকেটারকে দীর্ঘমেয়াদি ভরসা দিলে তাঁকে সুযোগও দিতে হয়। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, যখন সিরিজের প্রথম ম্যাচেই ভারত হেরে যায়, দ্বিতীয় ম্যাচে কি বৈভবকে সুযোগ দেওয়ার সাহস দেখানো যেত না?
বৈভবকে খেলানো হলে ফলাফল বদলে যেত কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। ক্রিকেটে একজন ক্রিকেটার কখনও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন, আবার চাপের মুখে ব্যর্থও হতে পারেন। কিন্তু তাঁকে না খেলানোর ফলে ভারতের কাছে অন্তত একটি সম্ভাবনা পরীক্ষা করার সুযোগ হারিয়ে গেল। বিশেষ করে যখন ওপেনিং বা টপ অর্ডারে ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি, তখন নতুন মুখকে সুযোগ দেওয়া নিয়ে সমর্থকদের প্রত্যাশা অমূলক ছিল না।
এই জায়গাতেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন কিংবদন্তি সুনীল গাভাসকর। গাভাসকর বরাবরই ভারতীয় দলের নির্বাচনী সিদ্ধান্ত নিয়ে সরাসরি মতামত দেন। তাঁর মতে, তরুণ প্রতিভাকে শুধু স্কোয়াডে রেখে দেওয়া যথেষ্ট নয়। যদি কোনও ক্রিকেটারকে জাতীয় দলে নেওয়া হয়, তবে তাকে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে খেলিয়ে দেখা উচিত। বিশেষ করে আয়ারল্যান্ডের মতো সিরিজে, যেখানে ভারতের উচিত ছিল ভবিষ্যতের পরিকল্পনা পরীক্ষা করা, সেখানে বৈভবকে না খেলানো নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
গাভাসকরের অসন্তোষের মূল জায়গা এখানেই—ভারত কি খুব বেশি নিরাপদ ক্রিকেট খেলছে? ভারতীয় ক্রিকেটে অনেক সময় দেখা গেছে, প্রতিভাবান তরুণদের স্কোয়াডে রাখা হয়, কিন্তু একাদশে সুযোগ দেওয়া হয় না। এতে ক্রিকেটারের অভিজ্ঞতা বাড়ে না, বরং চাপ আরও বাড়ে। কারণ দর্শক, মিডিয়া এবং প্রাক্তন ক্রিকেটারদের প্রত্যাশা ক্রমশ বাড়তে থাকে। বৈভবের ক্ষেত্রেও সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
১৫ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ড্রেসিংরুমে থাকা নিজেই বড় ব্যাপার। কিন্তু এই বয়সে মাঠে নামার সুযোগ পেলে তা ইতিহাস তৈরি করতে পারত। বৈভবের নাম নিয়ে যে আলোড়ন তৈরি হয়েছে, তা শুধু তাঁর বয়সের জন্য নয়, তাঁর ব্যাটিংয়ের ধরন, আত্মবিশ্বাস এবং আগ্রাসী মনোভাবের জন্যও। তিনি এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলতে শিখেছে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এই মানসিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
তবে টিম ম্যানেজমেন্টের যুক্তিও সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একজন ১৫ বছর বয়সি ক্রিকেটারকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নামানো মানে শুধু ব্যাট হাতে নামানো নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মিডিয়ার চাপ, সমর্থকদের প্রত্যাশা, ব্যর্থতার ভয়, প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব। প্রথম ম্যাচেই ব্যর্থ হলে বা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে সেই চাপ একজন কিশোর ক্রিকেটারের ওপর কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, সেটাও ভাবার বিষয়।
কিন্তু এখানেই পাল্টা যুক্তি আসে। যদি তাঁকে এতটাই সামলিয়ে রাখতে হয়, তাহলে তাঁকে স্কোয়াডে নেওয়া হল কেন? জাতীয় দলে ডাক পাওয়া মানেই তো টিম ম্যানেজমেন্ট বিশ্বাস করছে যে ক্রিকেটার অন্তত কোনও পর্যায়ে প্রস্তুত। তাঁকে শুধু নেটে ব্যাট করানো বা দলের সঙ্গে ঘোরানো কি যথেষ্ট? সমর্থকদের একাংশ মনে করছে, ভারতের উচিত ছিল অন্তত এক ম্যাচে তাঁকে দেখে নেওয়া।
শ্রেয়স আইয়ারের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নতুন অধিনায়ক হিসেবে তাঁর সামনে সিরিজটা ছিল নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ। কিন্তু আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে হার তাঁর নেতৃত্বের শুরুতেই চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টির পর শ্রেয়স স্বীকার করেছেন যে আয়ারল্যান্ড পরিস্থিতি ভালো বুঝেছে এবং ভারতকে পিছনে ফেলেছে।
এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারতের মতো শক্তিশালী দলের কাছে শুধু প্রতিভা থাকাই যথেষ্ট নয়। পরিস্থিতি বোঝা, পিচ পড়া, সঠিক কম্বিনেশন তৈরি করা এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া—সবই জরুরি। আয়ারল্যান্ড সিরিজে ভারত সেই জায়গাগুলিতে পিছিয়ে পড়েছে। আর এই ব্যর্থতার সঙ্গে বৈভবকে না খেলানোর সিদ্ধান্ত যুক্ত হয়ে বিতর্ককে আরও বড় করেছে।
আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজ হার ভারতের জন্য শুধু একটি ফলাফল নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে কোনও দলকেই হালকা ভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ছোট দল বলে যাদের ভাবা হয়, তারাও নির্দিষ্ট দিনে বড় দলকে হারিয়ে দিতে পারে। আয়ারল্যান্ড সেটাই দেখিয়েছে। তাদের বোলিং পরিকল্পনা, ফিল্ডিং এনার্জি এবং চাপের মুহূর্তে স্থিরতা ভারতকে চাপে ফেলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বৈভব সূর্যবংশীর মতো তরুণ ক্রিকেটারকে নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র। কারণ ভারতীয় ক্রিকেট এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের উপর আস্থা রাখা জরুরি, অন্যদিকে ভবিষ্যতের তারকাদের দ্রুত তৈরি করাও প্রয়োজন। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই সবচেয়ে কঠিন কাজ।
সঞ্জু স্যামসনকে বসানো উচিত ছিল কি না, তা নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। সঞ্জু একজন প্রতিভাবান এবং অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। তাঁকে বারবার সুযোগ দেওয়ার দাবি দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। এখন যখন তাঁকে নিয়মিত সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তখন দু’ম্যাচের ব্যর্থতায় তাঁকে সরিয়ে দেওয়া কঠিন সিদ্ধান্ত হত। কিন্তু একই সঙ্গে ভারতীয় দল কি বৈভবকে অন্য কোনও জায়গায় ব্যবহার করতে পারত না? ব্যাটিং অর্ডারে সামান্য পরিবর্তন এনে কি তাঁকে সুযোগ দেওয়া যেত না? এই প্রশ্নের উত্তর টিম ম্যানেজমেন্টকেই দিতে হবে।
আয়ারল্যান্ড সিরিজের পর ইংল্যান্ড সিরিজ আরও বড় পরীক্ষা। ইংল্যান্ডের মাটিতে, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে, কঠিন পরিস্থিতিতে যদি বৈভবকে অভিষেক করানো হয়, তাহলে চাপ আরও বেশি হবে। তাই অনেকেই বলছেন, আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে তুলনামূলক কম চাপের পরিবেশে তাঁকে খেলানোই ভালো হত। সেখানে ব্যর্থ হলেও শেখার সুযোগ ছিল, সফল হলে আত্মবিশ্বাস বাড়ত।
দুশখাতে বলেছেন, বৈভবকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বক্তব্য ইতিবাচক হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—পরিকল্পনার বাস্তব প্রয়োগ কোথায়? শুধু স্কোয়াডে রেখে ভবিষ্যতের কথা বলা যথেষ্ট নয়। একজন ক্রিকেটারকে তৈরি করতে হলে তাকে ম্যাচ পরিস্থিতির মধ্যে ফেলতে হয়। নেট প্র্যাকটিস এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচের চাপ এক জিনিস নয়।