শিল্পা শেট্টির নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া AI তৈরি ভুয়ো ছবির বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিল বোম্বে হাইকোর্ট।আদালতের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিকে অবিলম্বে সেই সব ছবি সরিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে।ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও পরিচয় সুরক্ষার প্রশ্নে এই নির্দেশকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডিজিটাল যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি যেমন নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, তেমনই তার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগও বাড়িয়েছে বহুগুণ। সেই উদ্বেগ এবার স্পষ্ট আইনি রূপ পেল বোম্বে হাইকোর্টের এক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশে। বলিউড অভিনেত্রী শিল্পা শেট্টির নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া AI-তৈরি ভুয়ো ছবির বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিল আদালত। বোম্বে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিকে অবিলম্বে ওই সব ছবি সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে। এই রায়কে ডিজিটাল গোপনীয়তা, সেলিব্রিটি অধিকার এবং AI প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রযুক্তির সুবিধা যেমন মানুষের কাজকে সহজ করছে, তেমনই এর অপব্যবহার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সম্মান ও নিরাপত্তাকে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটে বলিউড অভিনেত্রী শিল্পা শেট্টিকে কেন্দ্র করে বোম্বে হাইকোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া শিল্পা শেট্টির নামে তৈরি AI-জেনারেটেড ভুয়ো ছবিগুলি অবিলম্বে সরিয়ে ফেলতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি নির্দিষ্ট ঘটনার নিষ্পত্তি নয়, বরং ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির।
ঘটনার সূত্রপাত কয়েক সপ্তাহ আগে। শিল্পা শেট্টির নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যেগুলি দেখতে বাস্তব মনে হলেও আদতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি। এই ছবিগুলিতে অভিনেত্রীর মুখাবয়ব ব্যবহার করে এমন ভঙ্গি ও পরিস্থিতি দেখানো হয়, যার সঙ্গে বাস্তবে তাঁর কোনও সম্পর্ক নেই। দ্রুতই এই ছবি ভাইরাল হয়ে পড়ে এবং তা নিয়ে নেটমাধ্যমে শুরু হয় জল্পনা ও বিভ্রান্তি। সাম্প্রতিক সময়ে শিল্পা শেট্টির মুখাবয়ব ব্যবহার করে তৈরি কিছু ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে, যেগুলি বাস্তব নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নির্মিত। এই ছবিগুলি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে সাধারণ দর্শকের পক্ষে সেগুলিকে আসল ও নকলের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই কনটেন্ট ভাইরাল হয়ে যায় এবং তা শিল্পা শেট্টির ভাবমূর্তি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
শিল্পা শেট্টির আইনজীবীদের দাবি, এই ধরনের AI-তৈরি ছবি শুধু অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত সম্মান ও ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করেনি, বরং তা সরাসরি তাঁর গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন করেছে। বিষয়টি সামনে আসতেই অভিনেত্রীর পক্ষ থেকে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া হয়। আবেদনে জানানো হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ছবি ছড়িয়ে পড়লে তা শুধুমাত্র একজন সেলিব্রিটির ক্ষেত্রেই নয়, সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
বোম্বে হাইকোর্টে এই মামলার শুনানিতে আদালত স্পষ্ট জানায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কারও ছবি বা পরিচয় বিকৃত করা গুরুতর বিষয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, AI প্রযুক্তির ব্যবহার আইনসম্মত হলেও তার অপব্যবহার কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে কোনও ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তাঁর মুখাবয়ব ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর বা ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরি করা ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দেয়, শিল্পা শেট্টির নামে তৈরি সমস্ত AI-জেনারেটেড ছবি দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। একই সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাগুলিকে সতর্ক করা হয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ পেলে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। আদালতের নির্দেশে বলা হয়, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার অজুহাত দেখিয়ে দায় এড়ানো চলবে না।
এই রায় সামনে আসতেই বিনোদন জগতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রী প্রকাশ্যে শিল্পা শেট্টির পাশে দাঁড়ান। তাঁদের মতে, আজ একজন পরিচিত মুখ আক্রান্ত হলেও আগামী দিনে সাধারণ মানুষও এই ধরনের AI অপব্যবহারের শিকার হতে পারেন। বিশেষ করে নারী সেলিব্রিটিদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও বেশি উদ্বেগজনক।
শুনানির সময় আদালত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলে। বিচারপতির মন্তব্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র ব্যবহারকারীরাই নয়, কনটেন্ট ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবেও এই প্ল্যাটফর্মগুলির একটি সামাজিক ও আইনি দায়িত্ব রয়েছে। আদালত নির্দেশ দেয়, অবিলম্বে শিল্পা শেট্টির নামে ছড়িয়ে পড়া সমস্ত AI-তৈরি ভুয়ো ছবি সরিয়ে ফেলতে হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের কনটেন্ট আবার প্রকাশ না পায়, সে বিষয়ে সতর্ক ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপফেক ও AI-জেনারেটেড কনটেন্ট শনাক্ত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। উন্নত সফটওয়্যার ব্যবহার করে এমন বাস্তবসম্মত ছবি ও ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে, যা চোখে দেখে বোঝা প্রায় অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে আইন ও প্রযুক্তির সমন্বয় ছাড়া সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে তথ্যপ্রযুক্তি আইন থাকলেও AI-নির্ভর অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট আইন এখনও অপর্যাপ্ত। বোম্বে হাইকোর্টের এই নির্দেশ ভবিষ্যতে নতুন আইন প্রণয়নের পথ প্রশস্ত করতে পারে। আদালতের এই অবস্থান আইনপ্রণেতাদের কাছেও একটি স্পষ্ট বার্তা।
এই মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ডিজিটাল গোপনীয়তা। ব্যক্তির ছবি, নাম ও পরিচয় ডিজিটাল সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত কি না—এই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তির ডিজিটাল পরিচয়ও তাঁর ব্যক্তিগত অধিকারের অংশ।
শিল্পা শেট্টির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল, কারণ তিনি একজন জনপরিচিত ব্যক্তি। তাঁর জীবনের প্রতিটি দিক নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল থাকলেও, তার মানে এই নয় যে তাঁর গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা যাবে। আদালতের রায় এই বিষয়টিকেই নতুন করে প্রতিষ্ঠা করল।
এই নির্দেশের পর ডিজিটাল দুনিয়ায় নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা। প্রযুক্তিবিদ, আইন বিশেষজ্ঞ এবং বিনোদন জগতের একাংশ মনে করছেন, এই রায় AI-এর অপব্যবহার রুখতে একটি শক্ত বার্তা দিল। এতদিন ডিপফেক বা AI-তৈরি কনটেন্ট নিয়ে আলোচনা হলেও আইনি পদক্ষেপ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। বোম্বে হাইকোর্টের এই নির্দেশ ভবিষ্যতে এমন মামলার ক্ষেত্রে নজির হয়ে থাকতে পারে।
শিল্পা শেট্টি নিজে প্রকাশ্যে এই বিষয়ে সংযত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গিয়েছে, তিনি এই ঘটনাকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখছেন না, বরং বৃহত্তর সামাজিক সমস্যার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তির অপব্যবহার রুখতে এখনই কড়া আইন ও সচেতনতা জরুরি।
এই মামলার পর বিনোদন জগতের বহু তারকাই AI-তৈরি ভুয়ো কনটেন্ট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই মনে করছেন, আজ একজন সেলিব্রিটি আক্রান্ত হলেও আগামী দিনে সাধারণ মানুষও এই ধরনের সমস্যার শিকার হতে পারেন। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে AI-এর অপব্যবহার আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের ডিজিটাল আইন এখনও AI-এর মতো নতুন প্রযুক্তির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। যদিও তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও ডেটা সুরক্ষা সংক্রান্ত কিছু বিধান রয়েছে, তবে AI-তৈরি ডিপফেক কনটেন্টের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ও শক্ত আইন এখনও প্রয়োজন। বোম্বে হাইকোর্টের এই নির্দেশ সেই দিকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এতদিন অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ উঠেছে, ভুয়ো বা ক্ষতিকর কনটেন্ট সরাতে দেরি করে প্ল্যাটফর্মগুলি। আদালতের নির্দেশের পর তারা কত দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, ভবিষ্যতে এই ধরনের বিষয়ে গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না।
ডিজিটাল গোপনীয়তা রক্ষার প্রশ্নে এই রায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যক্তির ছবি, পরিচয় ও ভাবমূর্তি যে তার মৌলিক অধিকারের অংশ, তা আবারও স্পষ্ট করল আদালত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নির্দেশের ফলে সাধারণ মানুষও ভবিষ্যতে এমন সমস্যার ক্ষেত্রে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার সাহস পাবেন।
AI প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন সিনেমা, বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট তৈরিতে নতুন দিগন্ত খুলেছে, তেমনই তার অপব্যবহার সমাজে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই মামলার মাধ্যমে সেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আদালত একটি স্পষ্ট বার্তা দিল—প্রযুক্তি মানবকল্যাণের জন্য, কোনও ব্যক্তির সম্মান বা নিরাপত্তা নষ্ট করার জন্য নয়।
সব মিলিয়ে শিল্পা শেট্টির AI-তৈরি ছবি অপসারণের নির্দেশ শুধু একটি অভিনেত্রীর সুরক্ষার বিষয় নয়, বরং ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষার একটি বড় দৃষ্টান্ত। এই রায় ভবিষ্যতে AI-এর অপব্যবহার রুখতে আইন প্রণেতা ও প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। ডিজিটাল দুনিয়ায় সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা যখন ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে, তখন এই ধরনের আইনি হস্তক্ষেপই আগামী দিনের নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ তৈরির পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।