IMF-এর World Economic Outlook অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ভারতের অর্থনীতি ৬.৬% হারে বৃদ্ধি পাবে, যা চীনের ৪.৮% প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যাবে। শক্তিশালী দেশীয় চাহিদা, সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও স্থিতিশীল নীতিগত পরিবেশ ভারতের এই দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল কারণ। এটি ভারতের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেতৃত্বের এক নতুন অধ্যায় সূচিত করছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) সম্প্রতি প্রকাশিত World Economic Outlook প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, ভারতের অর্থনীতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৬.৬ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। এই পূর্বাভাস ভারতের অর্থনীতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, কারণ এটি স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে ভারত এখন বিশ্বের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল বড় অর্থনীতি। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই বৃদ্ধি চীনের ৪.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি-র তুলনায় অনেক বেশি, যা ভারতকে এশিয়ার প্রধান প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন হিসেবে স্থাপন করছে।
IMF-এর মতে, ভারতের শক্তিশালী দেশীয় চাহিদা, স্থিতিশীল নীতি কাঠামো এবং অবকাঠামোগত বিনিয়োগ বৃদ্ধিই এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি। ২০২৪–২৫ সালে ভারতের বৃদ্ধি ছিল ৬.৩ শতাংশ, যা এখন আরও দ্রুত হয়ে ৬.৬ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এই ধারাবাহিকতা ভারতের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং নীতিনির্ধারকদের কার্যকরী পদক্ষেপের প্রতিফলন।
দেশীয় চাহিদা এখন ভারতের প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় শক্তি। ভোক্তা ব্যয়ের বৃদ্ধি, উৎসবমুখী খরচ, এবং সেবা খাতের পুনরুজ্জীবন ভারতের GDP-কে গতিশীল রেখেছে। একই সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন, যেমন সড়ক, রেল ও ডিজিটাল নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতাকে ত্বরান্বিত করছে।
IMF-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি মূলত দুটি দিক থেকে শক্তিশালী হচ্ছে —
1️⃣ সরকারি বিনিয়োগ ও নীতি সহায়তা: কেন্দ্রীয় সরকারের ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার (CapEx) বৃদ্ধির কারণে নির্মাণ, শিল্প ও অবকাঠামো খাতে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।
2️⃣ সেবা ও শিল্পখাতের সম্প্রসারণ: IT, টেলিকম, ফিনটেক এবং ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন খাতের ধারাবাহিক উন্নয়ন GDP বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
IMF আরও উল্লেখ করেছে যে, ভারতের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে, যা ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি করেছে। RBI-এর নীতিগত ভারসাম্য—একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা—অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় সহায়ক হয়েছে।
ভারত ও চীনের মধ্যে প্রবৃদ্ধির পার্থক্যটি বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। চীনের অর্থনীতি এখনও রিয়েল এস্টেট সংকট, ডেমোগ্রাফিক চাপ এবং কমে আসা বৈদেশিক বিনিয়োগের কারণে দুর্বল। অন্যদিকে ভারত এই মুহূর্তে জনসংখ্যাগত সুবিধা, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের বিস্তার এবং সরকারি নীতির মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে।
চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায়, IMF-এর অনুমান অনুযায়ী, ভারতের প্রবৃদ্ধির হার কমপক্ষে ১.৮ শতাংশ বেশি থাকবে। এটি ভারতকে আগামী দশকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও ভোক্তা অর্থনীতিগুলির একটিতে পরিণত করতে পারে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ভারতের প্রতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই FDI প্রবাহ ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার বেশিরভাগই প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে এসেছে। IMF রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতের নীতি স্বচ্ছতা এবং কর কাঠামোর সংস্কার (GST, কর্পোরেট ট্যাক্স হ্রাস) বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় ভূমিকা রাখছে।
তবে, IMF সতর্ক করেছে যে, রপ্তানি ক্ষেত্রটি এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে। বৈশ্বিক চাহিদার অনিশ্চয়তা এবং বাণিজ্যিক উত্তেজনা ভারতের রপ্তানি বৃদ্ধিকে কিছুটা সীমাবদ্ধ করছে। তবে, দেশীয় বাজারের স্থিতিশীলতা এই ঝুঁকিকে অনেকটাই সামাল দিচ্ছে।
IMF জানিয়েছে, যদিও ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৬.৬ শতাংশে থাকবে, তবে ২০২৬–২৭ সালে তা কিছুটা কমে ৬.২ শতাংশ হতে পারে। এর কারণ হিসেবে ধীরে ধীরে বৈশ্বিক আর্থিক নীতির কঠোরতা এবং বাণিজ্য ভারসাম্যের চাপকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবুও, ভারতের জন্য এটি এক স্বাস্থ্যকর প্রবৃদ্ধি হার। ৬ শতাংশের উপরে ধারাবাহিক বৃদ্ধি একটি বড় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন বেশিরভাগ উন্নত দেশ ২–৩ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ভারতের সামনে এখন তিনটি প্রধান ক্ষেত্র ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি হতে পারে:
ডিজিটাল রূপান্তর: UPI, ONDC এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের বিস্তার অর্থনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করছে।
উৎপাদন ও রপ্তানি সম্প্রসারণ: “Make in India” ও “PLI Scheme” বিদেশি উৎপাদকদের ভারতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে।
সবুজ শক্তি বিনিয়োগ: সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ ভারতের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
IMF-এর এই পূর্বাভাস ভারতের অর্থনৈতিক গতিশীলতার ওপর আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন। ৬.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি শুধু সংখ্যাগত নয়, এটি ভারতের নীতি স্থিতিশীলতা, সংস্কার প্রয়াস এবং অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।
চীনের তুলনায় এগিয়ে থাকা ভারতের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ভারত বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে, তবে আগামী এক দশকে ভারত বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হয়ে উঠবে।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, IMF-এর পূর্বাভাস ভারতের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদের নতুন বার্তা দিচ্ছে—ভারত কেবল দক্ষিণ এশিয়ার নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালক।