Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

উনি তো সব সময় ‘অ্যাটিটিউড’ দেখান, কার তোপের মুখে করিনা কপূর খান! আবার কী ঘটালেন?

ক্রিকেট খেলা দেখতে গিয়েছিলেন সপরিবারে। সেখানে গিয়েও নাকি ‘কাণ্ড’ ঘটিয়েছেন নবাবপত্নী! কী কারণে তাঁর ‘আচরণ’ নিয়ে আলোচনা?করিনা কপূর খান কি নাকউঁচু? এই নিয়ে বলিউড দ্বিধাবিভক্ত। সিংহভাগের দাবি, কপূর পরিবারের কন্যা এবং নবাব পরিবারের ঘরণি তিনি। হয়তো তাই তিনি নিজেকে নিয়ে একটু বেশিই সচেতন। হয়তো সেই কারণেই তিনি অন্যদের থেকে নিজেকে একটু তফাতে রাখেন। বাকিরা কি সেই আচরণকে ‘অ্যাটিটিউড’ ভাবেন?

উনি তো সব সময় ‘অ্যাটিটিউড’ দেখান, কার তোপের মুখে করিনা কপূর খান! আবার কী ঘটালেন?
Bollywood News

কেন করিনাকে ঘিরে বাকিদের এই ধারণা? সদ্য তিনি দুই সন্তান তৈমুর আলি খান, জেহ্‌ আলি খান আর স্বামী সইফ আলি খানকে নিয়ে আইএসপিএল-এর ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন। দর্শকাসন থেকে তাঁদের দল ‘কলকাতা অফ টাইগার্স’-এর হয়ে গলা ফাটাতেও দেখা গিয়েছে সইফ-করিনাকে। সেখানেই নাকি ‘কাণ্ড’ ঘটেছে।

খান পরিবারের মতো খেলা দেখতে এসেছিলেন ‘বিগ বস ১৩’-খ্যাত আরতি সিংহও। তিনি তাঁর মা এবং স্বামী দীপক চৌহনকে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁদের মুখোমুখি সইফ-করিনার। এর পরেই তিনি মাকে নিয়ে সইফের সঙ্গে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। করিনাকে পাত্তা না দিয়েই! এই ঘটনা নাকি খুব ভাল চোখে দেখেননি করিনা। সঙ্গে সঙ্গে তিনি নাকি আরতির দিকে বাঁকা নজরে তাকান। বিষয়টি বুঝতে পারেন সইফ। একটুও দেরি না করে তিনিই ডেকে নেন বেবোকে। একসঙ্গে ছবিও তোলেন। কিন্তু তত ক্ষণে যা ঘটার ঘটে গিয়েছে। করিনা ক্যামেরার সামনে পোজ় দিতে গিয়েও ফের কড়া নজরে দেখেন আরতিকে।পুরো ঘটনা ভিডিয়ো হয়ে ছড়িয়ে যায় সমাজমাধ্যমে। দেখতে দেখতে অভিনেত্রীর আচরণ সমালোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। করিনাকে যাঁরা অপছন্দ করেন, এই সুযোগে তাঁরা কটাক্ষে বিদ্ধ করেছেন তাঁকে। অনেকেই ভিডিয়োর মন্তব্য বিভাগে গিয়ে লেখেন, “ওঁর ‘অ্যাটিটিউড’ দেখুন! সব সময়ে উনি এ ভাবেই ‘অ্যাটিটিউড’ দেখান।” যদিও অন্য একটি ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, ছবি তোলার আগে আরতীর সঙ্গে হাসিমুখেই কথা বলছেন করিনা।

পুরো ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যে ভিডিয়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সমাজমাধ্যমে। একটি ছোট ক্লিপ, কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্য—আর তাতেই শুরু হয়ে যায় বিচারপর্ব। অভিনেত্রীর আচরণ ঘিরে তৈরি হয় বিতর্ক। সেই অভিনেত্রী করিনা কপূর খান। যাঁরা তাঁকে অপছন্দ করেন, তাঁরা যেন বহুদিনের অপেক্ষায় ছিলেন এমনই একটি মুহূর্তের। ভিডিয়ো ভাইরাল হতেই কটাক্ষে ভরে যায় মন্তব্য বিভাগ। “ওঁর অ্যাটিটিউড দেখুন!”—এই বাক্যটি যেন বহুবার কপি-পেস্ট হয়ে ঘুরতে থাকে। কেউ লেখেন, “সব সময়ে উনি এ ভাবেই অ্যাটিটিউড দেখান।” কেউ আবার আরও এক ধাপ এগিয়ে তাঁর ব্যক্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তোলেন।

সমাজমাধ্যমে করিনাকে নিয়ে এই ধরনের প্রতিক্রিয়া নতুন নয়। দীর্ঘ কেরিয়ারে তিনি বরাবরই এক ধরনের আত্মবিশ্বাসী, স্পষ্টভাষী এবং আপসহীন ইমেজ তৈরি করেছেন। আর ঠিক এই জায়গাটাই অনেকের চোখে ‘অ্যাটিটিউড’ হয়ে ওঠে। বাস্তবে যা আত্মসম্মান বা আত্মবিশ্বাস, তা অনেক সময়েই জনতার একাংশের কাছে অহংকার বলে মনে হয়।

ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিয়োয় কী দেখা গিয়েছে? খুব সাধারণ একটি মুহূর্ত—একটি অনুষ্ঠান বা প্রকাশ্য স্থানে ছবি তোলার সময় করিনার মুখভঙ্গি বা আচরণ কারও কারও চোখে রূঢ় মনে হয়েছে। কিন্তু সমস্যা এখানেই। ভিডিয়োটি ছিল অসম্পূর্ণ, প্রেক্ষাপটহীন। তার আগে কী হয়েছিল, পরে কী হয়েছে—সেই তথ্য বাদ দিয়েই শুরু হয় সমালোচনা। কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্য দিয়েই গোটা ব্যক্তিত্বের বিচার।

এই ঘটনাটি আসলে আরও একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি সমাজমাধ্যমে খুব সহজেই কাউকে ‘ভাল’ বা ‘খারাপ’ তকমা লাগিয়ে দিচ্ছি না? বিশেষ করে তারকাদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও প্রবল। কারণ তাঁরা পরিচিত মুখ। তাঁদের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি ক্যামেরাবন্দি হয়। আর সেই ক্যামেরার ফ্রেমের বাইরে থাকা মানুষটিকে বোঝার চেষ্টা খুব কমই করা হয়।

করিনার ক্ষেত্রে এই ‘অ্যাটিটিউড’ তকমা বহু পুরনো। তিনি নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি ভান করতে পারেন না। ভাল লাগলে হাসবেন, না লাগলে মুখে ফুটে উঠবে। এই স্বাভাবিকতাই অনেক সময় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ সমাজ আজও চায়—অভিনেত্রীরা সব সময় মিষ্টি হবেন, সবার সঙ্গে সমান ভাবে হাসবেন, কোনও বিরক্তি বা ক্লান্তি প্রকাশ করবেন না। সেই প্রত্যাশার সঙ্গে করিনার ব্যক্তিত্বের সংঘাত অনিবার্য।

এই ঘটনার পরই আবার সামনে আসে আর একটি ভিডিয়ো। সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি। দেখা যায়, ছবি তোলার আগে আরতীর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছেন করিনা। কোনও বিরক্তি নেই, কোনও ঔদ্ধত্য নেই। স্বাভাবিক, আন্তরিক কথোপকথন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই ভিডিয়োটি ভাইরাল হলেও তার প্রভাব প্রথম ভিডিয়োর মতো তীব্র হয়নি। সমালোচনার ঝড় থামেনি। কারণ নেতিবাচক গল্পই বেশি আকর্ষণীয়।

এটাই সমাজমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সমস্যা—নেগেটিভিটি দ্রুত ছড়ায়। একটি হাসিমুখের ভিডিয়ো হয়তো কয়েক হাজার লাইক পায়, কিন্তু ‘অ্যাটিটিউড’ লেখা মন্তব্যে ভরা একটি ক্লিপ মুহূর্তে লক্ষ লক্ষ ভিউ ছুঁয়ে ফেলে। করিনার ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও সামনে এসেছে তারকাদের ব্যক্তিগত পরিসরের প্রশ্ন। কোনও অভিনেত্রী কি সব সময় ক্যামেরার জন্য প্রস্তুত থাকতে বাধ্য? ক্লান্তি, ব্যক্তিগত চিন্তা, শারীরিক অসুস্থতা—এসব কি তাঁর মুখে ফুটে উঠতে পারে না? সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে যা স্বাভাবিক, তারকাদের ক্ষেত্রে তা যেন অমার্জনীয় অপরাধ।

আরও লক্ষণীয় বিষয় হল—এই সমালোচনার সুর অনেক সময় লিঙ্গনির্ভর। পুরুষ তারকারা যদি মেজাজ হারান বা মুখ গোমড়া করেন, তা ‘স্টার মুড’ বলে মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু কোনও অভিনেত্রী একই আচরণ করলে সঙ্গে সঙ্গে তা ‘অ্যাটিটিউড’ হয়ে যায়। করিনা দীর্ঘদিন ধরে এই দ্বিচারিতার মুখোমুখি হয়েছেন।

news image
আরও খবর

যাঁরা করিনাকে অপছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এই ভিডিয়ো যেন হাতে পাওয়া অস্ত্র। তাঁরা অতীতের নানা ঘটনা টেনে এনে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন—“দেখুন, আমরা আগেই বলেছিলাম।” কিন্তু যাঁরা করিনার কাজ ও ব্যক্তিত্ব বোঝেন, তাঁদের অনেকেই পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন—একটি অসম্পূর্ণ ভিডিয়ো দেখে কি এত বড় রায় দেওয়া যায়?

এই ঘটনার আর একটি দিক হল—সমাজমাধ্যমের মন্তব্য বিভাগ। সেখানে অনেক সময় সমালোচনা আর ব্যক্তিগত আক্রমণের সীমারেখা মুছে যায়। করিনার ক্ষেত্রে তা-ই হয়েছে। তাঁর আচরণ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অনেকে তাঁর চরিত্র, কেরিয়ার, এমনকি ব্যক্তিগত জীবনও টেনে এনেছেন। এই প্রবণতা শুধু করিনার নয়—প্রায় সব তারকাকেই কোনও না কোনও সময়ে এর মুখোমুখি হতে হয়।

তবে করিনা এই ধরনের সমালোচনায় নতুন নন। দীর্ঘ কেরিয়ারে তিনি বহুবার ট্রোলড হয়েছেন, আবার নিজের কাজ দিয়েই জবাব দিয়েছেন। এই ঘটনাতেও তিনি কোনও প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া জানাননি। হয়তো তিনি জানেন—এই ধরনের বিতর্ক সময়ের সঙ্গে নিজেই ম্লান হয়ে যাবে।

এই প্রসঙ্গে মনে রাখা জরুরি—একজন মানুষের পুরো ব্যক্তিত্ব কয়েক সেকেন্ডের ভিডিয়োতে ধরা পড়ে না। করিনার ক্ষেত্রেও তা সত্য। একই অনুষ্ঠানে তিনি যেমন এক মুহূর্তে ক্লান্ত বা বিরক্ত দেখাতে পারেন, তেমনই পরের মুহূর্তে হাসিমুখে কথা বলতেও পারেন। দুইটাই তাঁর বাস্তব সত্তা।

সবশেষে বলা যায়, এই ঘটনা শুধু করিনাকে নিয়ে নয়। এটি সমাজমাধ্যমে বিচার করার আমাদের অভ্যাসকে আয়না দেখায়। আমরা কত সহজে সিদ্ধান্ত নিই, কত কম সময় দিই প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য। করিনার সেই হাসিমুখের ভিডিয়ো হয়তো মনে করিয়ে দেয়—একটি গল্পের সব দিক না দেখে রায় দেওয়া কতটা অন্যায্য।

আজ করিনা, কাল অন্য কেউ। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা কি সত্যিই কাউকে বুঝতে চাই, না কি শুধু সমালোচনার সুযোগ খুঁজি? এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো সেখানেই লুকিয়ে আছে।

এই বিতর্কের আর একটি স্তর রয়েছে, যা প্রায়শই আড়ালেই থেকে যায়—তা হল তারকাদের মানসিক চাপ। করিনার মতো অভিনেত্রীদের প্রতিটি প্রকাশ্য উপস্থিতি এক ধরনের পারফরম্যান্স হয়ে দাঁড়ায়। কখন হাসবেন, কখন কথা বলবেন, কার সঙ্গে কতটা আন্তরিক হবেন—এই সব কিছুর অদৃশ্য প্রত্যাশা তাঁদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। সেই চাপের মধ্যে যদি কোনও মুহূর্তে স্বাভাবিক ক্লান্তি বা বিরক্তি ফুটে ওঠে, তা সঙ্গে সঙ্গে ‘অ্যাটিটিউড’ বলে চিহ্নিত করা হয়। অথচ সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও এমন মুহূর্ত প্রতিদিন ঘটে।

এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। অনেক সময় শিরোনামই তৈরি করে দেয় জনমত। “করিনার অ্যাটিটিউড ফের চর্চায়”—এই ধরনের শিরোনাম আসলে দর্শককে আগেই একটি নির্দিষ্ট দিকে ঠেলে দেয়। ফলত ভিডিয়ো দেখার আগেই মানুষ নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে বসে থাকেন। পরে হাসিমুখের ভিডিয়ো এলেও সেই ধারণা বদলাতে খুব কম মানুষই আগ্রহ দেখান।

এই ঘটনাটি আরও একবার প্রমাণ করে, সমাজমাধ্যমে সত্য প্রায়শই খণ্ডিত। একটি ক্লিপ সত্যের একাংশ দেখায়, পুরো ছবিটা নয়। করিনার আরতীর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলার ভিডিয়ো সেই খণ্ডিত সত্যের ফাঁকটাই পূরণ করে। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার, তা হয়ে যায়—সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ে, রায় ঘোষিত হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এই বিতর্ক আমাদের আরও সংবেদনশীল হওয়ার প্রয়োজনীয়তা মনে করিয়ে দেয়। তারকারাও মানুষ, তাঁদেরও অনুভূতি আছে, সীমাবদ্ধতা আছে। কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্য দিয়ে কাউকে দাগিয়ে দেওয়ার আগে হয়তো একটু থেমে ভাবা দরকার—আমরা যদি ওই জায়গায় থাকতাম, আমাদের আচরণ কি আলাদা হতো?

Preview image