Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

‘আগের মতো আর নেই’, রহমানের ‘ধর্মীয় বিভাজন’ বিতর্কে সম্মতি জাভেদ জাফরীর! কী বললেন তিনি?

কটাক্ষের মুখে রহমান। বলিউডের অনেকেই এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। এ বার মুখ খুললেন জাভেদ জাফরী। তিনি সুরকারের সঙ্গে সহমত। গত আট বছরে হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে বহু পরিবর্তন এসেছে। তাই এই গত আট বছরে বহু কাজ হাতছাড়া হয়েছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন এআর রহমান। তার পর থেকেই কটাক্ষের মুখে তিনি। বলিউডের অনেকেই এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। এ বার মুখ খুললেন জাভেদ জাফরী। তিনি সুরকারের সঙ্গে সহমত।

জাভেদের মতে, সত্যিই নানা বদল এসেছে। তবে তা শুধুই চলচ্চিত্রজগতেই নয়, সর্বত্র। তাঁর কথায়, “সারা বিশ্বে যেমন পরিবর্তন এসেছে, এই ইন্ডাস্ট্রিতেও তেমনই বদল এসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসেছে। বিশ্বের পরিবর্তন হচ্ছে। ফ্যাশন ও খাওয়াদাওয়ার ধরনে পরিবর্তন আসছে। মানুষের মূল্যবোধ বদলাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের ধৈর্যক্ষমতাও কমছে। তারা কোনও কিছুতে মাত্র ৬ সেকেন্ড মনোযোগ দিতে পারে।” নতুন প্রজন্মের অস্থির মনভাবের কথা মাথায় রেখেই ‘কনটেন্ট’ তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন চ্যানেলে, মত জাভেদের।

অন্য দিকে লেখক মনোজ মুনতাশির আবার জানিয়েছেন, ধর্মীয় বিভাজন কোনও ভাবেই কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি বিনোদনজগতে। তাই এখনও বলিউডের তিন ‘সুপারস্টার’ শাহরুখ খান, সলমন খান ও আমির খান। তাঁর কথায়, “লেখকদের মধ্যেও রয়েছেন জাভেদ আখতার, সাহির লুধিয়ানভি ও মজরু সুলতানপুরি। এই দেশেই এক সময়ে ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলেন মহম্মদ আজ়হারউদ্দিন। তাই আমি কোনও ভেদাভেদ দেখতে পাই না এই ইন্ডাস্ট্রিতে।”

উল্লেখ্য, ধর্মীয় বিভাজন নিয়ে মন্তব্য প্রসঙ্গে দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিয়েছেন এআর রহমান। তাঁর বক্তব্য, তিনি সঙ্গীতের মাধ্যমে সবসময়ে ভারতের সংস্ক়ৃতিকে শ্রদ্ধা জানাতেই চেয়েছেন। তিনি নিজেও ভারতবাসী হিসাবে গর্বিত এবং ভারতীয় বলেই বিপুল স্বাধীনতার মধ্যে তিনি কাজ করতে পারেন। যদিও অনেকের দাবি, চাপে পড়েই এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন সুরস্রষ্টা।

জাভেদ আখতারের বক্তব্য থেকে শুরু করে মনোজ মুনতাশির ও এ আর রহমানের মন্তব্য—ভারতীয় বিনোদনজগতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, সামাজিক পরিবর্তন এবং প্রজন্মগত মানসিকতার বিবর্তন নিয়ে এক গভীর আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই আলোচনা শুধুমাত্র চলচ্চিত্র বা সঙ্গীতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা ছড়িয়ে পড়ে সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এই পরিবর্তনগুলোকে বিশ্লেষণ করা জরুরি, কারণ বিনোদনজগৎ বরাবরই সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করেছে।

জাভেদ আখতার স্পষ্টভাবে বলেছেন, পরিবর্তন কেবলমাত্র বলিউড বা চলচ্চিত্রশিল্পে আসেনি—পরিবর্তন এসেছে সর্বত্র। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী যে রূপান্তর ঘটছে, তার প্রভাব ভারতীয় বিনোদনজগতেও সমানভাবে পড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence) আগমন এই পরিবর্তনের একটি বড় উদাহরণ। আজকের দিনে চিত্রনাট্য লেখা থেকে শুরু করে ভিজুয়াল এফেক্টস, সম্পাদনা, এমনকি সঙ্গীত সৃষ্টিতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যেমন কাজের গতি বাড়িয়েছে, তেমনই শিল্পীদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জও এনে দিয়েছে—মানবিক সৃজনশীলতা কীভাবে প্রযুক্তির সঙ্গে সহাবস্থান করবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

জাভেদের মতে, কেবল প্রযুক্তিই নয়—মানুষের জীবনযাত্রার ধরনেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ফ্যাশন, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক আচরণ—সব কিছুই বদলাচ্ছে দ্রুতগতিতে। এক সময় যেখানে পরিবারকেন্দ্রিক গল্প বা দীর্ঘ সময়ের আবেগঘন বর্ণনা দর্শকের মন জয় করত, সেখানে আজকের দর্শক অনেক বেশি তাড়াহুড়োপ্রবণ। এই প্রসঙ্গে জাভেদ আখতারের সবচেয়ে আলোচিত মন্তব্যটি হলো নতুন প্রজন্মের ধৈর্যক্ষমতা। তাঁর কথায়, বর্তমান প্রজন্ম মাত্র ছয় সেকেন্ড কোনও কিছুর উপর মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। এই মন্তব্য হয়তো বিতর্কিত, কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল অস্বীকার করা যায় না।

সোশ্যাল মিডিয়া, শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং দ্রুতগতির ডিজিটাল কনটেন্ট মানুষের মনোযোগের ধরন বদলে দিয়েছে। আজকের দর্শক দ্রুত ফলাফল চায়—দ্রুত বিনোদন, দ্রুত উত্তেজনা, দ্রুত আবেগ। এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই বিভিন্ন চ্যানেল ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে। ওয়েব সিরিজ, শর্ট ফিল্ম, রিলস বা ক্লিপভিত্তিক বিনোদনের জনপ্রিয়তা তারই প্রমাণ। ফলে নির্মাতাদেরও গল্প বলার ধরন বদলাতে হচ্ছে। দীর্ঘ ভূমিকা বা ধীরগতির চরিত্র নির্মাণের জায়গায় এখন এসেছে দ্রুত সংঘাত, আকর্ষণীয় ভিজ্যুয়াল এবং তাৎক্ষণিক আবেগ।

এই পরিবর্তনের ফলে প্রশ্ন উঠছে—গভীরতা কি হারিয়ে যাচ্ছে? অনেক সমালোচকের মতে, দ্রুত মনোযোগ আকর্ষণের দৌড়ে গল্পের গভীরতা ও সাহিত্যিক মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে অন্য একদল মনে করেন, এটি কেবল একটি রূপান্তর, অবক্ষয় নয়। প্রতিটি যুগ তার নিজস্ব ভাষা ও ছন্দ তৈরি করে নেয়, আর বিনোদনজগৎ সেই ছন্দের সঙ্গেই তাল মিলিয়ে চলে।

এই প্রসঙ্গেই মনোজ মুনতাশিরের মন্তব্য একটি ভিন্ন দিক উন্মোচন করে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ধর্মীয় বিভাজন বিনোদনজগতে কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বলিউডে এখনও তিন খান—শাহরুখ খান, সলমন খান ও আমির খান—সুপারস্টার হিসেবে সমানভাবে জনপ্রিয়। দর্শকের কাছে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা তাঁদের কাজের গুণমান ও ব্যক্তিত্বের উপর নির্ভর করে, ধর্মীয় পরিচয়ের উপর নয়।

মনোজ মুনতাশির তাঁর বক্তব্যকে আরও জোরালো করতে অতীতের উদাহরণ তুলে ধরেছেন। জাভেদ আখতার, সাহির লুধিয়ানভি, মজরু সুলতানপুরির মতো কিংবদন্তি লেখকরা ভারতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে। একইভাবে, ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হিসেবে মহম্মদ আজহারউদ্দিনের নেতৃত্বও ভারতের ক্রীড়াজগতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই উদাহরণগুলো দেখিয়ে মনোজ মুনতাশির বোঝাতে চেয়েছেন, প্রতিভা ও দক্ষতার ক্ষেত্রে ধর্ম কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

তবে বাস্তবতা এতটা সরল কি না, সে প্রশ্নও উঠছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক মাধ্যমে এবং কিছু রাজনৈতিক বক্তব্যে ধর্মীয় মেরুকরণের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। বিনোদনজগতও যে এই বিতর্কের বাইরে নয়, তা এ আর রহমানের প্রসঙ্গে দেখা গেছে। ধর্মীয় বিভাজন নিয়ে মন্তব্য করার পর তাঁকে দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। এ আর রহমান জানিয়েছেন, তিনি সবসময় তাঁর সঙ্গীতের মাধ্যমে ভারতের সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছেন। তিনি গর্বিত ভারতবাসী এবং ভারতীয় পরিচয়ের মধ্যেই তিনি সৃষ্টিশীল স্বাধীনতা অনুভব করেন।

এ আর রহমানের এই বক্তব্য অনেকের কাছে আন্তরিক বলে মনে হলেও, একাংশের দাবি—তিনি চাপে পড়েই এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এই বিতর্ক আমাদের আবার সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—শিল্পী কতটা স্বাধীন? সমাজ ও রাজনীতির চাপ কি শিল্পীর কণ্ঠরোধ করছে? নাকি শিল্পী নিজেই সচেতনভাবে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার চেষ্টা করছেন?

ভারতীয় বিনোদনজগৎ বরাবরই বহুত্ববাদী সংস্কৃতির প্রতিফলন। বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম, অঞ্চল ও সংস্কৃতির মানুষ এখানে একসঙ্গে কাজ করেছেন এবং করছেন। এই সহাবস্থানই ভারতীয় শিল্পের শক্তি। তবে বর্তমান সময়ে সামাজিক সংবেদনশীলতা অনেক বেড়েছে। একটি মন্তব্য, একটি গান বা একটি দৃশ্যও বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। ফলে শিল্পীদের আরও সতর্ক হতে হচ্ছে।

এই সতর্কতা কি সৃজনশীলতার পরিপন্থী? কেউ কেউ মনে করেন, অতিরিক্ত সতর্কতা শিল্পকে বেঁধে ফেলছে। আবার অন্যদের মতে, শিল্প সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না; সমাজের অনুভূতিকে সম্মান করাও শিল্পীর দায়িত্ব। এই দ্বন্দ্বই হয়তো বর্তমান বিনোদনজগতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রজন্মগত পরিবর্তনের প্রসঙ্গে ফিরে গেলে দেখা যায়, নতুন প্রজন্ম শুধু অস্থির নয়—তারা অনেক বেশি সচেতন ও প্রশ্নকর্তা। তারা বৈচিত্র্য চায়, প্রতিনিধিত্ব চায়, নতুন কণ্ঠস্বর চায়। তাই আজকের কনটেন্টে উঠে আসছে ভিন্নধর্মী গল্প—নারীকেন্দ্রিক আখ্যান, প্রান্তিক মানুষের কথা, মানসিক স্বাস্থ্য, পরিচয়ের সংকট ইত্যাদি। এই পরিবর্তনকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার বদলে, একে সময়ের দাবি হিসেবে দেখাই হয়তো যুক্তিযুক্ত।

news image
আরও খবর

সব মিলিয়ে বলা যায়, জাভেদ আখতার, মনোজ মুনতাশির ও এ আর রহমান—তিনজনের বক্তব্য একই বাস্তবতাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছে। পরিবর্তন অনিবার্য, বিতর্ক স্বাভাবিক, আর শিল্প সেই পরিবর্তন ও বিতর্কের মাঝেই নিজের পথ খুঁজে নেয়। ভারতীয় বিনোদনজগৎ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—যেখানে প্রযুক্তি, প্রজন্ম, সামাজিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক পরিচয় একে অপরের সঙ্গে মিশে নতুন রূপ নিচ্ছে। এই রূপান্তর কতটা সুস্থ ও টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে শিল্পী, দর্শক এবং সমাজ—তিন পক্ষের সম্মিলিত বোধ ও দায়িত্বশীলতার উপর।

জাভেদ আখতারের বক্তব্য থেকে শুরু করে মনোজ মুনতাশির ও এ আর রহমানের মন্তব্য—ভারতীয় বিনোদনজগতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, সামাজিক পরিবর্তন এবং প্রজন্মগত মানসিকতার বিবর্তন নিয়ে এক গভীর আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই আলোচনা শুধুমাত্র চলচ্চিত্র বা সঙ্গীতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা ছড়িয়ে পড়ে সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এই পরিবর্তনগুলোকে বিশ্লেষণ করা জরুরি, কারণ বিনোদনজগৎ বরাবরই সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করেছে।

জাভেদ আখতার স্পষ্টভাবে বলেছেন, পরিবর্তন কেবলমাত্র বলিউড বা চলচ্চিত্রশিল্পে আসেনি—পরিবর্তন এসেছে সর্বত্র। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী যে রূপান্তর ঘটছে, তার প্রভাব ভারতীয় বিনোদনজগতেও সমানভাবে পড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence) আগমন এই পরিবর্তনের একটি বড় উদাহরণ। আজকের দিনে চিত্রনাট্য লেখা থেকে শুরু করে ভিজুয়াল এফেক্টস, সম্পাদনা, এমনকি সঙ্গীত সৃষ্টিতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যেমন কাজের গতি বাড়িয়েছে, তেমনই শিল্পীদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জও এনে দিয়েছে—মানবিক সৃজনশীলতা কীভাবে প্রযুক্তির সঙ্গে সহাবস্থান করবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

জাভেদের মতে, কেবল প্রযুক্তিই নয়—মানুষের জীবনযাত্রার ধরনেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ফ্যাশন, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক আচরণ—সব কিছুই বদলাচ্ছে দ্রুতগতিতে। এক সময় যেখানে পরিবারকেন্দ্রিক গল্প বা দীর্ঘ সময়ের আবেগঘন বর্ণনা দর্শকের মন জয় করত, সেখানে আজকের দর্শক অনেক বেশি তাড়াহুড়োপ্রবণ। এই প্রসঙ্গে জাভেদ আখতারের সবচেয়ে আলোচিত মন্তব্যটি হলো নতুন প্রজন্মের ধৈর্যক্ষমতা। তাঁর কথায়, বর্তমান প্রজন্ম মাত্র ছয় সেকেন্ড কোনও কিছুর উপর মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। এই মন্তব্য হয়তো বিতর্কিত, কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল অস্বীকার করা যায় না।

সোশ্যাল মিডিয়া, শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং দ্রুতগতির ডিজিটাল কনটেন্ট মানুষের মনোযোগের ধরন বদলে দিয়েছে। আজকের দর্শক দ্রুত ফলাফল চায়—দ্রুত বিনোদন, দ্রুত উত্তেজনা, দ্রুত আবেগ। এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই বিভিন্ন চ্যানেল ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে। ওয়েব সিরিজ, শর্ট ফিল্ম, রিলস বা ক্লিপভিত্তিক বিনোদনের জনপ্রিয়তা তারই প্রমাণ। ফলে নির্মাতাদেরও গল্প বলার ধরন বদলাতে হচ্ছে। দীর্ঘ ভূমিকা বা ধীরগতির চরিত্র নির্মাণের জায়গায় এখন এসেছে দ্রুত সংঘাত, আকর্ষণীয় ভিজ্যুয়াল এবং তাৎক্ষণিক আবেগ।

এই পরিবর্তনের ফলে প্রশ্ন উঠছে—গভীরতা কি হারিয়ে যাচ্ছে? অনেক সমালোচকের মতে, দ্রুত মনোযোগ আকর্ষণের দৌড়ে গল্পের গভীরতা ও সাহিত্যিক মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে অন্য একদল মনে করেন, এটি কেবল একটি রূপান্তর, অবক্ষয় নয়। প্রতিটি যুগ তার নিজস্ব ভাষা ও ছন্দ তৈরি করে নেয়, আর বিনোদনজগৎ সেই ছন্দের সঙ্গেই তাল মিলিয়ে চলে।

এই প্রসঙ্গেই মনোজ মুনতাশিরের মন্তব্য একটি ভিন্ন দিক উন্মোচন করে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ধর্মীয় বিভাজন বিনোদনজগতে কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বলিউডে এখনও তিন খান—শাহরুখ খান, সলমন খান ও আমির খান—সুপারস্টার হিসেবে সমানভাবে জনপ্রিয়। দর্শকের কাছে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা তাঁদের কাজের গুণমান ও ব্যক্তিত্বের উপর নির্ভর করে, ধর্মীয় পরিচয়ের উপর নয়।

মনোজ মুনতাশির তাঁর বক্তব্যকে আরও জোরালো করতে অতীতের উদাহরণ তুলে ধরেছেন। জাভেদ আখতার, সাহির লুধিয়ানভি, মজরু সুলতানপুরির মতো কিংবদন্তি লেখকরা ভারতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে। একইভাবে, ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হিসেবে মহম্মদ আজহারউদ্দিনের নেতৃত্বও ভারতের ক্রীড়াজগতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই উদাহরণগুলো দেখিয়ে মনোজ মুনতাশির বোঝাতে চেয়েছেন, প্রতিভা ও দক্ষতার ক্ষেত্রে ধর্ম কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

তবে বাস্তবতা এতটা সরল কি না, সে প্রশ্নও উঠছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক মাধ্যমে এবং কিছু রাজনৈতিক বক্তব্যে ধর্মীয় মেরুকরণের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। বিনোদনজগতও যে এই বিতর্কের বাইরে নয়, তা এ আর রহমানের প্রসঙ্গে দেখা গেছে। ধর্মীয় বিভাজন নিয়ে মন্তব্য করার পর তাঁকে দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। এ আর রহমান জানিয়েছেন, তিনি সবসময় তাঁর সঙ্গীতের মাধ্যমে ভারতের সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছেন। তিনি গর্বিত ভারতবাসী এবং ভারতীয় পরিচয়ের মধ্যেই তিনি সৃষ্টিশীল স্বাধীনতা অনুভব করেন।

এ আর রহমানের এই বক্তব্য অনেকের কাছে আন্তরিক বলে মনে হলেও, একাংশের দাবি—তিনি চাপে পড়েই এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এই বিতর্ক আমাদের আবার সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—শিল্পী কতটা স্বাধীন? সমাজ ও রাজনীতির চাপ কি শিল্পীর কণ্ঠরোধ করছে? নাকি শিল্পী নিজেই সচেতনভাবে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার চেষ্টা করছেন?

ভারতীয় বিনোদনজগৎ বরাবরই বহুত্ববাদী সংস্কৃতির প্রতিফলন। বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম, অঞ্চল ও সংস্কৃতির মানুষ এখানে একসঙ্গে কাজ করেছেন এবং করছেন। এই সহাবস্থানই ভারতীয় শিল্পের শক্তি। তবে বর্তমান সময়ে সামাজিক সংবেদনশীলতা অনেক বেড়েছে। একটি মন্তব্য, একটি গান বা একটি দৃশ্যও বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। ফলে শিল্পীদের আরও সতর্ক হতে হচ্ছে।

এই সতর্কতা কি সৃজনশীলতার পরিপন্থী? কেউ কেউ মনে করেন, অতিরিক্ত সতর্কতা শিল্পকে বেঁধে ফেলছে। আবার অন্যদের মতে, শিল্প সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না; সমাজের অনুভূতিকে সম্মান করাও শিল্পীর দায়িত্ব। এই দ্বন্দ্বই হয়তো বর্তমান বিনোদনজগতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রজন্মগত পরিবর্তনের প্রসঙ্গে ফিরে গেলে দেখা যায়, নতুন প্রজন্ম শুধু অস্থির নয়—তারা অনেক বেশি সচেতন ও প্রশ্নকর্তা। তারা বৈচিত্র্য চায়, প্রতিনিধিত্ব চায়, নতুন কণ্ঠস্বর চায়। তাই আজকের কনটেন্টে উঠে আসছে ভিন্নধর্মী গল্প—নারীকেন্দ্রিক আখ্যান, প্রান্তিক মানুষের কথা, মানসিক স্বাস্থ্য, পরিচয়ের সংকট ইত্যাদি। এই পরিবর্তনকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার বদলে, একে সময়ের দাবি হিসেবে দেখাই হয়তো যুক্তিযুক্ত।

সব মিলিয়ে বলা যায়, জাভেদ আখতার, মনোজ মুনতাশির ও এ আর রহমান—তিনজনের বক্তব্য একই বাস্তবতাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছে। পরিবর্তন অনিবার্য, বিতর্ক স্বাভাবিক, আর শিল্প সেই পরিবর্তন ও বিতর্কের মাঝেই নিজের পথ খুঁজে নেয়। ভারতীয় বিনোদনজগৎ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—যেখানে প্রযুক্তি, প্রজন্ম, সামাজিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক পরিচয় একে অপরের সঙ্গে মিশে নতুন রূপ নিচ্ছে। এই রূপান্তর কতটা সুস্থ ও টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে শিল্পী, দর্শক এবং সমাজ—তিন পক্ষের সম্মিলিত বোধ ও দায়িত্বশীলতার উপর।

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, বিনোদনজগৎ আর একমুখী ধারায় এগোবে না। প্রেক্ষাগৃহ, টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—তিন মাধ্যমই পাশাপাশি সহাবস্থান করবে এবং দর্শকের রুচি অনুযায়ী নিজস্ব ভাষা তৈরি করবে। এই বহুমুখী যাত্রাপথে শিল্পীদের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে তাঁদের সততা ও সৃজনশীল সাহস। সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারাই টিকে থাকার শর্ত, কিন্তু সেই পরিবর্তনের মধ্যেও শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখাই ভারতীয় বিনোদনজগতের প্রকৃত পরিচয় হয়ে উঠতে পারে।

Preview image