Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

শীতে শিশুর ত্বকে নারকেল তেলের মালিশ ঠান্ডা লাগার ঝুঁকি কি সত্যিই আছে

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মালিশের ক্ষেত্রে সর্ষের তেলের তুলনায় নারকেল তেলই অনেক বেশি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর। কারণ সর্ষের তেলের কিছু উপাদান শিশুর কোমল ত্বকে জ্বালাভাব সৃষ্টি করতে পারে। তাই কোমল ত্বকের যত্নে নারকেল তেলই বেশি উপযোগী। তবে প্রশ্ন আসে শীতের সময়ও কি নারকেল তেলে মালিশ করা যায় বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার করলে শীতকালেও নারকেল তেল শিশুর ত্বকের জন্য ভালোই কাজ করে।

বাঙালির ঘরোয়া জীবনযাপনে ছোট্ট শিশুকে তেল মালিশ করানোর রেওয়াজ যেন এক অনবদ্য, অমলিন ঐতিহ্য—এক এমন চিত্র যা সময়ের সঙ্গে বদলায়নি, বরং আরও গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে রয়েছে প্রতিটি বাঙালি পরিবারের মনে। জন্মের পর মুহূর্ত থেকেই শিশুকে তেল মালিশ করানোর প্রথা যত্ন, স্নেহ, আদর আর মমতার এক স্নিগ্ধ প্রতীক। বাড়িতে নতুন শিশু এলে যে উচ্ছ্বাস, যে খুশির জোয়ার বইতে থাকে, তার সঙ্গেই অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে থাকে দৈনন্দিন তেল মালিশের সময়। সারা বছরই মালিশ চলে, তবে শীতকাল এলেই যেন এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। শীতের নরম রোদে শিশুকে শুইয়ে ধীরে ধীরে মাথা থেকে পা পর্যন্ত তেল মালিশ করার দৃশ্য এখনও বহু বাঙালি বাড়িতে দেখা যায়—যেন এক চিরন্তন সকালবেলার আচার।

ঠাকুমা বা মা যখন নিজেদের দুই হাতের তালুর উষ্ণতা শিশুর কোমল ত্বকে ছড়িয়ে দেন, তখন সেই মুহূর্তটি শুধু ত্বকের যত্ন নয়—বরং গভীর আবেগের স্পর্শে ভরা একটি ভালোবাসার অভিজ্ঞতা। শিশুটি সেই উষ্ণতাকে অনুভব করে, মায়ের হাতের চাপড়ের ছন্দে আরাম পায়, আর ধীরে ধীরে তার মুখে ফুটে ওঠে নিরাপত্তার শান্ত হাসি। তেল মালিশ শিশুর শরীরকে যেমন আরাম দেয়, তেমনই তার মনকেও শান্ত করে, কারণ এটি এক ধরনের প্রাকৃতিক ‘টাচ থেরাপি’ যা শিশুর মানসিক বিকাশে অপরিসীম ভূমিকা রাখে।

বছরের পর বছর ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এই তেল মালিশের অভ্যাস শুধু ঐতিহ্যের সূত্রেই নয়, বাস্তব উপকারিতার কারণেও এতটা জনপ্রিয়। জন্মের পর শিশুদের ত্বক খুবই সংবেদনশীল থাকে। ঠান্ডা হাওয়া বা শুষ্ক আবহাওয়া সহজেই ত্বক খসখসে করে দিতে পারে। নিয়মিত তেল মালিশ ত্বকের শুষ্কতা কমায়, ময়েশ্চার ধরে রাখে এবং রক্তসঞ্চালন বাড়ায়, ফলে শিশুর সার্বিক শারীরিক বিকাশে তা বিশেষ উপকার করে। অনেক সময় শিশুর খিদেও বাড়ে, ঘুম আরও গভীর হয় এবং অস্থিরতা কমে আসে।

সব মিলিয়ে ছোট্ট শিশুর তেল মালিশ শুধু একটি ঘরোয়া অভ্যাস নয়—এটি বাঙালি পরিবারের সংস্কৃতির এক মমতামাখা অংশ, যেখানে শিশুর যত্ন, স্নেহ, ঐতিহ্য এবং পরিবারের আবেগ সবই একসঙ্গে মিলেমিশে যায়।

শিশুর তেল মালিশের গুরুত্ব বহু দিক থেকেই অপরিসীম। শিশু জন্মের পর প্রথম কয়েক মাস তাদের ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকে। ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ বা স্কিন ব্যারিয়ার তখনও পুরোপুরি শক্ত হয়ে ওঠে না। ফলে সামান্য ঠান্ডা হাওয়ায় বা শুষ্ক আবহাওয়াতেও শিশুর ত্বক খসখসে হয়ে যেতে পারে, লালচে দাগ উঠতে পারে বা চুলকানি হতে পারে। নিয়মিত তেল মালিশ এই সমস্যাগুলিকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। তেল মালিশ করলে ত্বকের আর্দ্রতা বজায় থাকে, রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং পেশি শিথিল হয়। এর ফলে শিশুর সার্বিক শারীরিক উন্নতিও হয়। অনেক শিশু ছোট থেকেই অস্থির হয় বা ঘ্যানঘ্যান করে। মালিশ করলে শরীর রিল্যাক্স হয়, ফলে অস্থিরতা কমে আসে, আর শিশুর ঘুমও গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন হয়।

তেল মালিশ শুধু শারীরিক উন্নতিই ঘটায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাবা-মায়ের সঙ্গে শিশুর গভীর আবেগগত সম্পর্ক গড়ে ওঠার বিষয়টিও। মালিশের সময় মা বা বাবার স্পর্শ, শিশুর শরীরে তেলের উষ্ণ অনুভূতি, মায়ের মিষ্টি সুরের কথা—সব মিলিয়ে এটি শিশুর জন্য এক ধরনের 'টাচ থেরাপি'। এই থেরাপি শিশুর মানসিক বিকাশে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত টাচ থেরাপি শিশুর মস্তিষ্কে ‘অক্সিটোসিন’ নামক একটি হরমোন বাড়ায়, যা তাকে শান্ত করে, নিরাপত্তার অনুভূতি দেয় এবং তার আবেগের বিকাশকে সুস্থ পথে পরিচালিত করে। ফলে তেল মালিশ শুধু স্বাস্থ্যগত উপকারই নয়, শিশুর মানসিক ও আবেগগত বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

news image
আরও খবর

বছরের পর বছর বাঙালি পরিবারে সর্ষের তেলকে তেল মালিশের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা গেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিশুরোগ চিকিৎসকরা সর্ষের তেলের ব্যবহারে সতর্ক করছেন। সর্ষের তেলে এমন কিছু উপাদান থাকে যা শিশুর কোমল ত্বকে জ্বালা ধরাতে পারে। অনেক সময় দেখা যায় সর্ষের তেল লাগানোর পর শিশুর ত্বকে লালচে র‍্যাশ ওঠে, চুলকানি শুরু হয় বা ত্বক দগদগে হয়ে যায়। এই সমস্যাগুলিকে এড়াতে এখন অধিকাংশ চিকিৎসক শিশুর তেল মালিশের ক্ষেত্রে নারকেল তেল ব্যবহারের পরামর্শ দেন। নারকেল তেল তুলনামূলকভাবে অনেক কোমল, ত্বকের সঙ্গে সহজে মিশে যায় এবং কোনও ধরনের জ্বালা বা ইনফ্ল্যামেশন সৃষ্টি করে না। বরং নারকেল তেলে থাকা অ্যান্টিফাঙ্গাল ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণ ত্বককে নানা ধরনের সংক্রমণ থেকেও রক্ষা করে।

শীতকালে নারকেল তেল ব্যবহার নিয়ে অনেক বাবা-মায়ের মনে দ্বিধা থাকে। তারা ভাবেন, শীতে নারকেল তেল ব্যবহার করলে শিশুর ঠান্ডা লেগে যেতে পারে কি না। এই প্রসঙ্গে শিশুরোগ চিকিৎসক অর্পণ সাহা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, নারকেল তেল সঠিকভাবে ব্যবহার করলে শীতে শিশুর ঠান্ডা লাগার কোনও সম্ভাবনাই থাকে না। বরং নারকেল তেলে থাকা উপকারী উপাদানগুলি শিশুর ত্বককে আরও বেশি রক্ষা করে। তিনি বলেন, নারকেল তেল ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে, যা শীতকালে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ফলে শুষ্ক বাতাসের কারণে ত্বকের যে ক্ষতি হতে পারে, নারকেল তেল তা অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

তবে নারকেল তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কিছু নিয়ম মানা জরুরি। স্নানের আগে মালিশ করা সবচেয়ে ভালো, কারণ স্নানের পর ত্বক ভেজা থাকে এবং তখন তেল লাগালে শরীরের তাপমাত্রা কমে ঠান্ডা লাগার আশঙ্কা থাকে। শীতকালে নারকেল তেল জমে যায়, তাই ব্যবহারের আগে সামান্য গরম করে নেওয়া উচিত। হাতে ঘষে উষ্ণ করা, রোদে কিছুক্ষণ রেখে দেওয়া বা গরম জলে বাটি ডুবিয়ে হালকা গরম করা—এই যেকোনো পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কখনোই অতিরিক্ত গরম করা উচিত নয়। রাতে মালিশ করা উচিত নয়, কারণ রাতে তেল লাগালে শিশুর শরীর ঠান্ডা হয়ে যেতে পারে। মালিশের সময় জানালা বন্ধ রাখা ও ঠান্ডা হাওয়া এড়ানোও জরুরি।

শীতকালে নারকেল তেল কেন উপকারী—এর ব্যাখ্যাও বেশ আকর্ষণীয়। নারকেল তেলে আছে মিডিয়াম চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড, লরিক অ্যাসিড এবং ভিটামিন ই-এর মতো উপাদান, যা শিশুর ত্বককে গভীরভাবে পুষ্টি দেয়। এগুলি ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে, ফলে ত্বক বাইরের শুষ্ক হাওয়ার ক্ষতি থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারে। শিশুর নরম ত্বক শীতকালে সহজেই খসে যায় বা ফেটে যায়, এবং নিয়মিত নারকেল তেলের মালিশ এই সমস্যাগুলিকে অনেকটাই প্রতিরোধ করতে সক্ষম।

শিশুর তেল মালিশের আরেকটি চমৎকার দিক হল, এটি শিশুর সার্বিক শারীরিক বিকাশের সঙ্গে মানসিক উন্নতির এক অনন্য সমন্বয় ঘটায়। একদিকে পেশির নমনীয়তা, হাড়ের মজবুতি এবং ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো থাকে, অন্যদিকে মা-বাবার সঙ্গে শিশুর আবেগগত বন্ধন আরও মজবুত হয়ে ওঠে। মালিশের সময় যখন শিশুটি হাসে, হাত-পা নাড়ে বা চোখ বুজে আরাম নেয়—তখন সেই দৃশ্য শুধু স্নেহেরই নয়, সম্পর্কের গভীরীভূত হওয়ার এক উজ্জ্বল প্রমাণ হয়ে ওঠে। মা-বাবার স্পর্শে শিশুর শরীর যেমন উষ্ণ হয়, তেমনি মনও উষ্ণতা পায়।

সব দিক বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয়, নারকেল তেল শিশুর তেল মালিশের জন্য সত্যিই নিরাপদ, কার্যকর এবং প্রয়োজনীয়। তবে এটি অবশ্যই খাঁটি ও সুগন্ধিবিহীন হওয়া উচিত। কোল্ড-প্রেসড বা ভির্জিন নারকেল তেল হলে আরও ভালো। সঠিক নিয়ম মেনে ব্যবহার করলে শীতকালে নারকেল তেল শিশুর ত্বক, স্বাস্থ্য এবং সার্বিক বিকাশ—সব কিছুর জন্যই একদম আদর্শ। ঠান্ডা লাগার ভয় না করে সঠিক সময়ে ও সঠিক পদ্ধতিতে নারকেল তেল ব্যবহার করলে শিশুর ত্বক থাকবে নরম, কোমল এবং সুস্থ, আর তার মন থাকবে শান্ত ও আনন্দে ভরা।

Preview image