Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

উজ্জৈনের আশ্রমে ১৭ প্রতিবন্ধী শিশুর মৃত্যু! স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হস্তক্ষেপ মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্টের, দু’সপ্তাহের মধ্যে জবাব তলব

সূত্রের খবর, গত ১৪ মাসে ওই ৮৬ শিশুর মধ্যে ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়। তাদের বয়স ১০ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। ঘটনা জানাজানি হতেই পুলিশ একটি মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করে।মধ্যপ্রদেশের উজ্জৈনের অঙ্কিত সেবাধাম আশ্রমে ১৭ প্রতিবন্ধী শিশুর মৃত্যুকে ঘিরে হুলস্থুল পড়ে গিয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই জরুরি ভিত্তিতে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হস্তক্ষেপ করল সে রাজ্যের হাই কোর্টের ইনদওর বেঞ্চ। কী ভাবে এই ঘটনা, তার কারণ জানতে চেয়ে রাজ্যের কাছে দু’সপ্তাহের মধ্যে জবাব তলব করল আদালত।

সূত্রের খবর, এই মর্মে নোটিস জারি করে জবাব চাওয়া হয়েছে রাজ্যের মুখ্যসচিব, প্রধান সচিব, মহিলা ও শিশুকল্যাণ দফতরের কমিশনার, উজ্জৈনের জেলাশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা শিশু ও নারীকল্যাণ আধিকারিক এবং সেবাধাম আশ্রম কর্তৃপক্ষকে। সূত্রের খবর, ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর ৮৬ জন প্রতিবন্ধী শিশুকে ইনদওরের যুগপুরুষ আশ্রম থেকে উজ্জৈনের সেবাধাম অঙ্কিত আশ্রমে নিয়ে আসা হয়। উজ্জৈন শহর থেকে এই আশ্রমের দূরত্ব ২২ কিলোমিটার।

সূত্রের খবর, গত ১৪ মাসে ওই ৮৬ শিশুর মধ্যে ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়। তাদের বয়স ১০ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। ঘটনা জানাজানি হতেই পুলিশ একটি মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করে। কিন্তু বার বার কেন মৃত্যু হচ্ছে, এ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মামলাটিতে জরুরি ভিত্তিতে হস্তক্ষেপ করে মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্ট। নির্দেশ দেয়, এই মামলাটিকে যেন জনস্বার্থ মামলা হিসাবে দেখা হয়। ইনদওরের যুগপুরুষ আশ্রমেও ১০ শিশুর মৃত্যু হয়। অসুস্থ হয়ে পড়ে ৬০ জন।২০২৫ সালে যে সময় যুগপুরুষ আশ্রমে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটে, সেই সময় ইনদওরের জেলাশাসক ছিলেন আশিস সিংহ। শিশুমৃত্যুর ঘটনা নিয়ে যখন হুলস্থুল চলছে, ইনদওরের তৎকালীন জেলাশাসক দাবি করেন, তিনি ৮৬ প্রতিবন্ধী শিশুকে সেবাধাম আশ্রমে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। তাঁর সেই পদক্ষেপও এখন তদন্তের আওতায়। চরক ভবন হাসপাতালে চিকিৎসক চিন্ময় চিঞ্চোলেকর জানিয়েছেন, যে সব শিশুকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল, তাদের অবস্থা শোচনীয় ছিল। তাঁর দাবি, অনেককে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়। কারও অবস্থা সঙ্কটজনক ছিল। কেউ আবার চিকিৎসার সময় মারা যায়। বেশির ভাগ মৃত্যুর সঙ্গে ভয়ানক রক্তল্পতার যোগ রয়েছে।

যুগপুরুষ আশ্রমে শিশুমৃত্যু: প্রশাসনিক ব্যর্থতা, চিকিৎসা অবহেলা ও সমাজের দায়

২০২৫ সালে মধ্যপ্রদেশের ইনদওরে অবস্থিত যুগপুরুষ আশ্রমকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া শিশুমৃত্যুর ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত একটি আশ্রমে একের পর এক প্রতিবন্ধী ও অসহায় শিশুর মৃত্যু শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়নি, বরং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব অবস্থা নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর শুরু হয় তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক, প্রশাসনিক তদন্ত এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সরব প্রতিবাদ।

এই ঘটনার সময় ইনদওরের জেলাশাসক ছিলেন আশিস সিংহ। শিশুমৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে যখন হুলস্থুল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তখন তিনি দাবি করেন যে তিনি ৮৬ জন প্রতিবন্ধী শিশুকে সেবাধাম আশ্রমে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত এবং তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও তদন্তের আওতায় চলে আসে। প্রশ্ন ওঠে—এই স্থানান্তর কি যথাযথ পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়েছিল, নাকি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত ছিল?


ঘটনার সূত্রপাত

যুগপুরুষ আশ্রম দীর্ঘদিন ধরে অনাথ, প্রতিবন্ধী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের আশ্রয় দেওয়ার কাজ করছিল। স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠানটির একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি থাকলেও ভিতরে কী পরিস্থিতি চলছিল তা দীর্ঘদিন নজরের বাইরে ছিল। ২০২৫ সালের শুরুতে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় বাসিন্দা আশ্রমে শিশুদের অসুস্থতা ও অপুষ্টির বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

ক্রমে জানা যায়, আশ্রমে থাকা বহু শিশু মারাত্মক অসুস্থ। তাদের শরীরে অপুষ্টির চিহ্ন স্পষ্ট, অনেকের ওজন বয়সের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে কম, এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রায় অপ্রতুল। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক শিশুর মৃত্যুর খবর সামনে আসে।

এই মৃত্যুগুলো প্রথমে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখানো হলেও পরে বোঝা যায় যে এটি একটি বৃহত্তর মানবিক সংকট।


চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ: ভয়াবহ বাস্তবতা

চরক ভবন হাসপাতালের চিকিৎসক চিন্ময় চিঞ্চোলেকর জানান, আশ্রম থেকে যেসব শিশুকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আনা হয়েছিল তাদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী—

  • অনেক শিশুকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়।

  • কয়েকজনের শারীরিক অবস্থা এতটাই সংকটজনক ছিল যে চিকিৎসা শুরু করার আগেই তারা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিল।

  • কিছু শিশু চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

  • অধিকাংশ মৃত্যুর সঙ্গে ভয়াবহ রক্তাল্পতার সরাসরি সম্পর্ক ছিল।

চিকিৎসকদের মতে, এই রক্তাল্পতা একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের অপুষ্টি, সঠিক খাদ্যের অভাব এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার অভাবই এই পরিস্থিতির মূল কারণ।


রক্তাল্পতা: নীরব ঘাতক

এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো শিশুদের মধ্যে চরম মাত্রার রক্তাল্পতা। রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া সাধারণত আয়রনের অভাব, পুষ্টিহীনতা বা দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার কারণে হয়। কিন্তু এখানে যে মাত্রার অ্যানিমিয়া দেখা গেছে তা প্রমাণ করে যে শিশুদের দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত পুষ্টি দেওয়া হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে—

  • শিশুদের নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হয়নি।

  • ভিটামিন ও আয়রন সাপ্লিমেন্টের অভাব ছিল।

  • স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ প্রায় অনুপস্থিত ছিল।

  • গুরুতর অসুস্থ শিশুদের সময়মতো হাসপাতালে পাঠানো হয়নি।

এই বিষয়গুলো শুধু অবহেলা নয়, বরং শিশু অধিকার লঙ্ঘনের সামিল বলে মনে করছেন অনেক মানবাধিকার কর্মী।


প্রশাসনের ভূমিকা ও বিতর্ক

ঘটনার পর ইনদওরের তৎকালীন জেলাশাসক আশিস সিংহ জানান যে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি ৮৬ প্রতিবন্ধী শিশুকে সেবাধাম আশ্রমে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। তাঁর দাবি ছিল, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে তদন্ত শুরু হওয়ার পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—

  1. স্থানান্তরের আগে কি স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছিল?

  2. নতুন আশ্রমে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও অবকাঠামো ছিল কি?

  3. প্রশাসন আগে কেন পরিস্থিতি বুঝতে পারেনি?

  4. নিয়মিত পরিদর্শন কি আদৌ হয়েছিল?

সমালোচকদের মতে, প্রশাসন সময়মতো ব্যবস্থা নিলে এতগুলো মৃত্যু এড়ানো যেত।


নজরদারি ব্যবস্থার ব্যর্থতা

ভারতে শিশু আশ্রমগুলোর ওপর সরকারি নজরদারি ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। যুগপুরুষ আশ্রমের ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ উঠে আসে।

তদন্তে জানা যায়—

এই ব্যর্থতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসে।


সমাজের দায়

এই ঘটনা শুধু প্রশাসনের ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি সমাজের নীরব উদাসীনতার প্রতিফলনও। আশ্রমগুলো সাধারণত সমাজের সবচেয়ে অসহায় শিশুদের আশ্রয় দেয়। কিন্তু অনেক সময় সমাজ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিতরের বাস্তবতা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করে না।

যদি স্থানীয় মানুষ, স্বেচ্ছাসেবক এবং সামাজিক সংগঠনগুলো আগে সক্রিয় হতো, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হতো না।


শিশু অধিকার ও আইনি দৃষ্টিকোণ

ভারতে শিশু সুরক্ষার জন্য একাধিক আইন রয়েছে, যেমন—

  • Juvenile Justice Act

  • Child Protection Guidelines

  • National Commission for Protection of Child Rights (NCPCR) নির্দেশিকা

এই আইনের অধীনে শিশুদের খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। যুগপুরুষ আশ্রমের ঘটনা দেখায় যে আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ সবসময় হয় না।


রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর বিরোধী দল প্রশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শুরু করে। সরকার দাবি করে যে তদন্ত চলছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজনৈতিক বিতর্কের মাঝেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি থেকে যায়—কেন এতদিন কেউ সমস্যাটি লক্ষ্য করেনি?


মানসিক স্বাস্থ্য ও মানবিক দিক

প্রতিবন্ধী ও অনাথ শিশুদের শুধু খাবার ও চিকিৎসা নয়, মানসিক যত্নও প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, অবহেলা ও অনিরাপদ পরিবেশ শিশুদের মানসিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এই আশ্রমে কর্মীর অভাব এবং প্রশিক্ষণের ঘাটতির কারণে শিশুদের মানসিক যত্নও উপেক্ষিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।


তদন্তের অগ্রগতি

তদন্তে কয়েকটি দিক বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে—

  • আশ্রম পরিচালনার আর্থিক হিসাব

  • খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা

  • চিকিৎসা নথি

  • প্রশাসনিক তদারকি

  • শিশু স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত

প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলা দায়েরের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।


ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা

যুগপুরুষ আশ্রমের ঘটনা ভারতের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। এই ঘটনা দেখিয়েছে যে শুধু প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; নিয়মিত নজরদারি ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সুপারিশ করেছেন—

  1. সব আশ্রমে বাধ্যতামূলক মাসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা।

  2. ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা।

  3. স্বতন্ত্র সামাজিক অডিট।

  4. প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভার নিয়োগ।

  5. নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি।


উপসংহার

যুগপুরুষ আশ্রমে শিশুমৃত্যুর ঘটনা শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার কাহিনি নয়; এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধেরও পরীক্ষা। যেসব শিশু সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশ, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে উন্নয়নের দাবি অর্থহীন হয়ে পড়ে।

আশিস সিংহের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আশ্রম কর্তৃপক্ষের ভূমিকা, চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা—সবকিছুই এখন তদন্তের আওতায়। কিন্তু তদন্তের ফল যা-ই হোক, হারিয়ে যাওয়া শিশুদের জীবন আর ফিরবে না।

এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিশুদের সুরক্ষা কোনো দয়া নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের মৌলিক দায়িত্ব। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো আশ্রমে এমন মর্মান্তিক ঘটনা না ঘটে, সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, দায়বদ্ধ প্রশাসন এবং সচেতন সমাজ।

Preview image