ভারতের ৯০% সাপই বিষাক্ত নয় কিন্তু ভুল বা কুসংস্কারের ফাঁদে পড়লে তা বিপদজনক হতে পারে বিষধর সাপের কামড় শনাক্ত করে হাসপাতালে যাওয়ার সঠিক উপায় জানুন।
গ্রীষ্মের আগমনে সাপেরা গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে, আর এর ফলে সাপের কামড়ে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে সামান্যতম অসাবধানতাও মারাত্মক হতে পারে। গ্রীষ্মের এই সময়ে সাপেরা মানুষের কাছে এসে পড়ে, এবং এর জন্য সাপের কামড়ের ঘটনা বাড়ছে। তবে, সাপের কামড়ের ঘটনায় আতঙ্কিত না হয়ে কীভাবে জীবন বাঁচানো যেতে পারে, সে বিষয়টি জানানো অত্যন্ত জরুরি।
আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের এএমইউ বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সতীশ কুমার জানিয়েছেন, সাপের কামড়ে মৃত্যুর ঘটনা প্রায়শই তখন ঘটে, যখন মানুষের কাছে সঠিক তথ্যের অভাব থাকে বা কেউ সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন না। সঠিক তথ্য এবং সতর্কতার মাধ্যমে সাপের কামড়ের মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকেও বাঁচা সম্ভব। অধ্যাপক সতীশ কুমারের মতে, ভারতে প্রায় ৪০০ প্রজাতির সাপ রয়েছে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশেরও কম সাপ বিষধর।
ভারতের সবচেয়ে বিপজ্জনক সাপগুলির মধ্যে কোবরা, ক্রেইট এবং চন্দ্রবোরা অন্যতম। এদের মধ্যে কোবরা সাপ যথেষ্ট পরিচিত এবং ভয়ঙ্কর। তবে, সবচেয়ে বিপজ্জনক সাপের মধ্যে চন্দ্রবোরা উল্লেখযোগ্য। সাপের কামড় হলে প্রথমেই যদি পরিস্থিতি আতঙ্কিত না হয় এবং সঠিক সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো যায়, তবে মৃত্যুও প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সাপ সাধারণত মানুষের থেকে দূরে থাকে এবং মানুষের কাছাকাছি আসতে চায় না। সাপের কামড় সাধারণত তখনই হয় যখন সাপ বিপদে পড়লে আত্মরক্ষার জন্য কামড়াতে উদ্যত হয়। যদি সাপের কামড় হয়ে থাকে, তবে অতিরিক্ত নাড়াচাড়া না করা অত্যন্ত জরুরি। শরীরের ওই অংশটিকে বেশি নাড়াচাড়া না করে কিছুটা উঁচু অবস্থানে রাখতে হবে। সাপের কামড়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অল্প সময়ে হাসপাতালে পৌঁছানো উচিত, যেখানে দ্রুত প্রতিষেধক দেওয়া যেতে পারে।
ভারতের গ্রামাঞ্চলে সাপের কামড়ের পর অনেকেই এখনও আঞ্চলিক জাদুকর বা ওঝার শরণাপন্ন হন, যা মারাত্মক হতে পারে। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সঠিক চিকিৎসার অভাবে বিষধর সাপের কামড়ের পর রোগী মারাও যেতে পারে। তাই, সাপের কামড়ের পর দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে এবং যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে এখন সাধারণ প্রতিষেধক পাওয়া যায়, যা বিষধর সাপের কামড়ের প্রভাব নিষ্ক্রিয় করে।
সাপের কামড়ের পর কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি
১ কামড়ানো শরীরের অংশটিকে অত্যাধিক নাড়াচাড়া করবেন না।
২ কামড়ানো অংশকে একটু উঁচু অবস্থানে রাখুন।
৩ সেখানে একটি কাপড় বা ব্যান্ডেজ আলতো করে বেঁধে দিন, তবে খুব শক্ত করে না বাঁধুন।
৪ ক্ষতস্থান কেটে ফেলা বা বিষ চুষে বের করার মতো ভুল করবেন না।
৫ অ্যালকোহল বা ব্র্যান্ডি দেওয়া পরামর্শ অনুসরণ করবেন না, এটি কোনো উপকারে আসবে না।
তবে, সাপের কামড়ের পর তার ধরন জানাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি কামড়ের স্থানে দুটি গভীর বিষদাঁতের দাগ থাকে, তবে এটি একটি বিষধর সাপের ইঙ্গিত হতে পারে। যদি কামড়ের স্থানে হালকা আঁচড়ের মতো দাগ থাকে, তবে এটি প্রায়শই বিষহীন সাপ হতে পারে। ক্রেইট সাপের কামড় সবচেয়ে বিপজ্জনক কারণ এটি প্রথমে ব্যথাহীন থাকে এবং কয়েক ঘণ্টা পরে হঠাৎ করে তীব্র ব্যথা শুরু হয়।
এছাড়াও, সাপের কামড়ের পর রাতের বেলা বাইরে যাওয়ার সময় সাপের উপর পা পড়া এড়াতে টর্চ বা কোনো লাইট ব্যবহার করা উচিত। সাপের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা দরকার, কারণ সাপরা পরিবেশের অংশ এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। সাপদের অনেক প্রজাতি যেমন ধামান সাপ, মানুষের জন্য ক্ষতিকারক নয় এবং কৃষকদের সাহায্য করে ইঁদুর খেয়ে ফসল রক্ষা করে।
তবে, আধুনিক কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে সাপদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, কারণ এই বিষটি সাপদের জন্য ক্ষতিকর। সঠিক তথ্য এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ করাই সাপের কামড় থেকে বাঁচার সবচেয়ে নিশ্চিত উপায়।
এর মাধ্যমে জানা যায় যে, সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা এবং সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণই জীবন বাঁচানোর একমাত্র উপায়।
সাপের কামড়ের পর সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সঠিক সময় ও সঠিক চিকিৎসা না পেলে জীবন সংহতির শঙ্কা হতে পারে। সাপের কামড় হলে অনেকেই প্রথমে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, কিন্তু আতঙ্ক পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলতে পারে। তাই, সাপের কামড়ের পর শান্ত থাকতে হবে এবং সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাপের কামড়ের পর কিভাবে সঠিক চিকিৎসা পাওয়া যাবে এবং কতটুকু সময় আছে হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য। অনেক সাপ বিষধর নয়, কিন্তু কিছু সাপ যেমন কোবরা, ক্রেইট বা চন্দ্রবোরা অত্যন্ত বিষধর এবং দ্রুত চিকিৎসা না পেলে পরিস্থিতি সংকটজনক হতে পারে। সাপের কামড়ের পর অতিরিক্ত আতঙ্কিত হওয়া বা অবাঞ্ছিত পদক্ষেপ যেমন অ্যালকোহল খাওয়ানো বা বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করা বিপজ্জনক হতে পারে এবং এর ফলে জীবন হারানোর সম্ভাবনা আরও বৃদ্ধি পায়।
শরীরের ক্ষতস্থানটি খুব বেশি নাড়াচাড়া না করে, এটি অল্প কিছু উঁচুতে রাখতে হবে, যাতে বিষের বিস্তার রোধ করা যায়। পাশাপাশি, সাপের কামড়ের স্থানটি আলতোভাবে ব্যান্ডেজ করে বন্ধ করতে হবে, তবে অত্যাধিক শক্ত করে নয়, কারণ খুব শক্ত ভাবে বাঁধলে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা আরও বেশি ক্ষতির কারণ হতে পারে। সঠিক চিকিৎসা এবং প্রতিষেধক সময়মতো না পাওয়ার কারণে অনেকেই সাপের কামড়ের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তবে, সরকারি হাসপাতালে দ্রুত প্রতিষেধক পেলে বিষের প্রভাব নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়।
সাপের কামড়ের পর যা করা উচিত, তা হলো প্রথমে সাপের কামড়ের প্রকার চিহ্নিত করা। যদি কামড়ের স্থানে দুটি গভীর দাগ দেখা যায়, তবে এটি একটি বিষধর সাপের কামড় হতে পারে। এছাড়া, সাপের কামড়ের পরে কিছু সাপ যেমন ক্রেইট সাপের কামড় প্রথমে ব্যথাহীন থাকে, কিন্তু এক দুই ঘণ্টার মধ্যে তীব্র ব্যথা শুরু হতে পারে। এর ফলে, সঠিক তথ্য ও সতর্কতার মাধ্যমে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে।
সাপের কামড় থেকে বাঁচার জন্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গ্রীষ্মের মৌসুমে সাপেরা বেশি সক্রিয় থাকে এবং গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে, তাই সন্ধ্যা বা রাতে বাইরে যাওয়ার সময় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। সাপের উপর পা পড়ে যাওয়ার ঘটনা এড়াতে রাতের বেলা টর্চ বা লাইট ব্যবহার করতে হবে। সাপের কামড় হলে প্রথমেই যে কিছু ভুল করা হয় তা হলো, অ্যালকোহল বা অন্যান্য উপকরণ দেওয়া যা কোনও কাজে আসে না এবং বিপজ্জনক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামের অঞ্চলে এখনো সাপের কামড় হলে অনেকেই পুকুর, নদী বা হাওড়ে স্নান করানোর বা জাদুকরের শরণাপন্ন হওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু এ ধরনের পন্থা কার্যকর নয় এবং সঠিক চিকিৎসার অভাবে ক্ষতি হতে পারে। সঠিক তথ্য ও সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে সাপের কামড়ের পর বেঁচে থাকা সম্ভব।
উল্লেখযোগ্য যে, সাপের কামড়ে আক্রান্ত হলে কোনোভাবেই নিজের হাতে চিকিৎসা করার চেষ্টা করা উচিত নয়, যেমন ক্ষতস্থান কেটে ফেলা, মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করা বা রাসায়নিক প্রয়োগ করা। এগুলি সবই বিপজ্জনক এবং মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সাপের কামড়ের পরে সঠিক হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য যতটা সম্ভব দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত এবং সেখানে প্রতিষেধক প্রয়োগ করা খুব জরুরি।
সাপের কামড়ের পর সঠিক পদক্ষেপ ও সচেতনতা অবলম্বন করা সবার জন্য অত্যন্ত জরুরি, বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলে যেখানে সাপের কামড়ের ঘটনা বেশি ঘটে। এজন্য সাপের বিষ সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা এবং সাপের কামড়ের পরে কী করতে হবে তা জানা আমাদের জীবন বাঁচানোর অন্যতম উপায়।