Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

উন্নয়ন চাইছে MSME-খাত: গুণমান বাড়াও,বাজারে প্রবেশ করো বললেন V. Anantha Nageswaran

ভারতের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম MSME—Micro, Small and Medium Enterprises। দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৪৫%, রপ্তানির ৪০% এবং কর্মসংস্থানের ৩০% আসে এই খাত থেকে। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও MSME খাত বহুদিন ধরেই নানা সমস্যায় জর্জরিত বিলম্বিত পেমেন্ট, ব্যাংক ঋণে প্রবেশাধিকার কম, প্রযুক্তির অভাব, গুণমানে দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া। এই প্রেক্ষাপটেই প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. ভি. আনন্দ নাগেশ্বরন MSMEদের উন্নয়নের রোডম্যাপ তুলে ধরলেন এবং স্পষ্ট বার্তা দিলেন উন্নয়ন চাইলে উদ্ভাবন ও গুণমান ছাড়া কোনো পথ নেই। একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট প্রকাশ উপলক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নাগেশ্বরন বলেন ভারতের MSME দের এখন শুধু টিকে থাকার জন্য নয়, বরং বিশ্ববাজারে জায়গা করে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। তাঁর মতে, আজকের বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, চীনের সাপ্লাই-চেইন সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারের পুনর্বিন্যাস সবই ভারতের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে MSME দের ছোট থাকার চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে বড় ভাবতে হবে।

উদ্ভাবন, গুণমান এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা—MSME-খাতকে বিশ্ববাজারে নিয়ে যাওয়ার রোডম্যাপ দিলেন প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি. আনন্দ নাগেশ্বরন

ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত MSME Micro, Small and Medium Enterprises এই খাতের বর্তমান পরিবেশ, উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে দিকনির্দেশনা দিলেন ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা (CEA) ড. ভি. আনন্দ নাগেশ্বরন। ভারতীয় অর্থনীতিতে যেখানে GDP বৃদ্ধির প্রচেষ্টা, স্থানীয় উৎপাদন, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থান সবচেয়ে বড় স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে MSME খাত, সেখানে তাঁর বক্তব্য শুধু একটি সাধারণ বক্তৃতা নয়; বরং ভারতীয় শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য একটি নীতিগত সতর্কবার্তা এবং একই সঙ্গে একটি উন্নয়ন রোডম্যাপ।

নাগেশ্বরন পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন—উদ্ভাবন ছাড়া, গুণমান ছাড়া, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছাড়া ভারতীয় MSME-রা বিশ্ববাজারে জায়গা করতে পারবে না। তাঁর মতে, ভারত এখন এমন এক সুযোগের দশকে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে দেশীয় উৎপাদন ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোগগুলোর জন্য বিশ্বমঞ্চে প্রবেশের সম্ভাবনা তীব্র গতিতে বাড়ছে। চীনের সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তন, যুক্তরাষ্ট্র-সহ নানা দেশের বাণিজ্যনীতির রদবদল, বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের চায়না প্লাস ওয়ান কৌশল—এসব বিষয় ভারতের শিল্পখাতে একটি অনন্য সুবিধা এনে দিয়েছে। কিন্তু এই সুযোগকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে, MSME খাতকে নিজের খোলস ভেঙে বেরিয়ে গুণমানমুখী উৎপাদন, ডিজিটাল দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক মান গ্রহণ করতে হবে।

নাগেশ্বরন বলেন—দেশের MSME-রা যদি আজও ছোট থাকাই ভালো, যা আছে সেটাই যথেষ্ট এই মনোভাব ধরে রাখে, তবে এই খাতে কোনও বড় ধরনের রূপান্তর সম্ভব হবে না। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন—“আপনি যদি নিজের অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকেন, তাহলে সেটাই আপনার সবচেয়ে বড় বাধা। শিল্পে টিকে থাকতে হলে উন্নয়নকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।”

বর্তমান MSME-খাতের চ্যালেঞ্জগুলো যে ক্ষুদ্র নয়, তা রিপোর্ট ও পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। FY22 বা 2021-22 অর্থবছরে যেখানে MSME-দের প্রতি বিলম্বিত পেমেন্ট ছিল প্রায় ₹১০.৭৬ লক্ষ কোটি টাকা, FY24-এ তা কমে ₹৮.১৪ লক্ষ কোটিতে এসেছে। এটি ৭%-এর একটি উন্নতি হলেও, তা যথেষ্ট নয়। কারণ একই রিপোর্টেই উল্লেখ করা হয়েছে—এখনও MSME খাতে ₹২৫ লক্ষ কোটি টাকার সমপরিমাণ “অপূর্ত ক্রেডিট চাহিদা” রয়েছে। অর্থাৎ ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনও বড় বাধার মুখোমুখি। ফর্মাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও NBFC-দের সীমাবদ্ধতা, ক্রেডিট স্কোরের অনিশ্চয়তা, ঋণের শর্ত কঠোরতা—এসব কারণে MSME-রা সহজে মূলধন জোগাড় করতে পারছে না।

নাগেশ্বরনের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার ইতিমধ্যে MSME–দের পেমেন্ট সুরক্ষায় একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। TReDS—Trade Receivables Discounting System—এমএসএমই–দের দ্রুত পেমেন্ট নিশ্চিত করতে চালু হলেও, এর ব্যবহার এখনও সীমিত। Income Tax আইনের Section 43B(h) অনুযায়ী MSME–দের সময়মতো পেমেন্ট বাধ্যতামূলক করা হলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন এখনও যথেষ্ট নয়। অনেক কর্পোরেট এখনও সময়মতো পেমেন্ট না করার প্রবণতা বজায় রেখে চলেছে, যা MSME-দের নগদ প্রবাহে বড় সংকট তৈরি করে।

নাগেশ্বরন তাই জোর দিয়ে বলেছেন—“আইন আছে, নীতি আছে, কিন্তু সবচেয়ে জরুরি হলো সঠিক প্রয়োগ। MSME উন্নয়নের বড় বাধা নীতি নয়—বাস্তবায়ন।” তিনি এও বলেন যে শুধুমাত্র সরকারের ওপর দায়িত্ব ছুঁড়ে দিলে চলবে না; MSME-দের নিজেদের ভেতরেও পরিবর্তন আনা জরুরি। তাদের পণ্যের গুণমান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, R&D (Research and Development)-এ মনোযোগ দিতে হবে এবং ব্র্যান্ড তৈরি করতে হবে। কারণ আজকের বিশ্ব প্রতিযোগিতার বাজার ‘দাম কম’—এই লড়াইয়ে জেতার জায়গা নয়; এখানে জিততে হলে জিততে হয় গুণমান, আস্থা, ব্র্যান্ড, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনে।

ভারতের MSME-খাত বর্তমানে দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৪৫%, রপ্তানির ৪০%, এবং দেশের কর্মসংস্থানের ৩০% জোগান দেয়। এত বড় একটি খাত যদি আধুনিক না হয়, উদ্ভাবন-নির্ভর না হয়, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চলে, তবে ভারতীয় অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে না। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে নাগেশ্বরনের বক্তব্য শুধু উপদেশ নয়—একটি প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতা।

এই শিল্পের সমস্যা শুধু পুঁজির অভাব নয়, বরং পণ্য ডিজাইন, উৎপাদন, গুণমান, ব্র্যান্ডিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, এবং রপ্তানির সক্ষমতা—সবকিছুতে উন্নয়ন প্রয়োজন। ভারতের বহু MSME আজও প্রচলিত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে উৎপাদন চালায়। তাদের কাছে আধুনিক যন্ত্রপাতি, অটোমেশন, রোবোটিক্স বা উন্নতমানের টেস্টিং সুবিধা নেই, ফলে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সমস্যা হয়। নাগেশ্বরন বলেন—“উদ্ভাবন মানে শুধু নতুন পণ্য নয়; পুরনো প্রক্রিয়াকে আধুনিক করা, মান-পরীক্ষা উন্নত করা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা—এসবই উদ্ভাবন।”

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববাজারে ভারতীয় MSME–দের জায়গা করে নিতে হলে “অ্যাম্বিশন”—উচ্চাকাঙ্ক্ষা—এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ইঙ্গিত দেন, বিস্তীর্ণ ভারতীয় বাজারকে ছাড়াও বিদেশে প্রবেশের চেষ্টা করতে হবে। রপ্তানিকে লক্ষ্য না করলে MSME-দের বৃদ্ধির পথ সীমিত হয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভারতীয় MSME-রা যদি শুধু দেশের ভেতরের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তারা বড় ধরনের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করতে পারবে না।

রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতের MSME রপ্তানি সম্ভাবনা প্রায় ১০ গুণ বাড়তে পারে যদি—

  • পণ্যের গুণমান উন্নত হয়

  • আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন মেলে

  • প্যাকেজিং উন্নত হয়

  • লজিস্টিকস খরচ কমে

  • ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি বাড়ে

কিন্তু বর্তমানে MSME-দের একটি বড় অংশ এ বিষয়গুলোতে পিছিয়ে আছে। নাগেশ্বরন বলেন—“পণ্য তৈরি করাই MSME–দের কাজ নয়; পণ্যকে বাজারে পৌঁছে দেওয়া, ব্র্যান্ড বানানো এবং গ্রাহকের আস্থা অর্জন করা—এসবই শিল্পের দায়িত্ব।”

বিশ্ববাজারে ভারত এখন “উইন্ডো অফ অপরচুনিটি”—সুযোগের জানলা পেয়েছে। কিন্তু এই জানলা চিরকাল খোলা থাকবে না। চীনের সরবরাহ শৃঙ্খলার পরিবর্তন যদি স্থিতিশীল হয়, বা বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি যদি বদলে যায়, তবে ভারতীয় MSME-রা প্রতিযোগিতার সুবিধা হারাবে। তাই সরকার এখন ‘Make in India’-র সঙ্গে ‘Design in India’, ‘Brand in India’ এবং ‘Global Quality in India’—এই ধারণাগুলিকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।

নাগেশ্বরন বলেন—“লোকাল থেকে গ্লোবাল হওয়ার একমাত্র রাস্তা হলো—গুণমান।” MSME ব্যবসায়ীরা যদি তাদের পণ্যের মান বাড়াতে পারেন, তবে তাদের বাজার বাড়বে, ক্রেডিট পাওয়া সহজ হবে, গ্রাহকের আস্থা বাড়বে এবং দামও বাড়াতে পারবেন। কারণ উন্নতমানের পণ্য সবসময় দাম নির্ধারণে সুবিধা এনে দেয়।

কিন্তু গুণমান বৃদ্ধির পথে বড় বাধা হলো—

এজন্য সরকার “ZED Certification”—Zero Defect, Zero Effect—বহুদিন ধরে প্রচার করছে। এর লক্ষ্য হলো MSME–দের গুণমান বৃদ্ধিতে উৎসাহ দেওয়া। কিন্তু এই সার্টিফিকেশন পাওয়ার হার এখনও খুব কম। কারণ ব্যবসায়ীরা মনে করেন—“এভাবে মান বাড়াতে খরচ হবে।” নাগেশ্বরন বলেন—“খরচ হবে না, বরং খরচ বাঁচবে। কারণ defect যত কমবে, রিটার্ন কমবে, ক্ষতি কমবে।”

রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে—MSME–দের ডিজিটালাইজেশন অত্যন্ত জরুরি। যারা ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, তাদের ব্যবসা ২–৩ গুণ দ্রুত বাড়ছে। ডিজিটাল অ্যাকাউন্টিং, ক্লাউড সফটওয়্যার, সার্ভার-বেসড সিআরএম, অনলাইন অর্ডার সিস্টেম, ডিজিটাল মার্কেটিং—এসব ব্যবহারকারীদের প্রভাব বেশি।

সরকার বলছে—কোনো MSME যদি ডিজিটাল পথ না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে টিকে থাকা কঠিন হবে।

রিপোর্টে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো—বিলম্বিত পেমেন্ট। কর্পোরেটরা MSME–দের পেমেন্ট প্রায়ই সময়মতো করে না। ফলে ছোট উদ্যোগগুলোর ক্যাশ ফ্লো সংকট তৈরি হয়, উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং ঋণের ফাঁদে পড়ে। Section 43B(h) এই সমস্যা সমাধানের জন্য থাকলেও, শিল্প মহলের চাপের কারণে অনেক কর্পোরেট এখনও নিয়ম মানছে না।

নাগেশ্বরন বলেন—“MSME–দের পেমেন্ট সময়মতো দেওয়া হলে, তাদের অর্ধেক সমস্যা কমে যাবে।”

অন্যদিকে MSME–দের নিজেদেরও ভুল আছে। অনেক MSME modern accounting বা GST compliance–এ দুর্বল, ফলে ব্যাংকের চোখে তারা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই ঋণের খরচ বাড়ে।

তাই সরকার চাইছে—

  • MSME–দের আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়ুক

  • GST রিটার্ন নিয়মিত হোক

  • বজেটিং ও ক্যাশ ফ্লো প্ল্যানিং উন্নত হোক

MSME শিল্পে শ্রমিক প্রশিক্ষণের অভাবও অন্যতম সমস্যা। স্কিলড মেশিন অপারেটর, ডিজিটাল মার্কেটিয়ার, কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ার—এদের অভাব রয়েছে। স্কিল ইন্ডিয়া মিশন এ জন্য কাজ করলেও, গতিকে আরও বাড়াতে হবে।

সব মিলিয়ে ভারতের MSME খাতে সংস্কারের প্রয়োজন এখন অত্যন্ত জরুরি।
নাগেশ্বরনের মতে—
“এখন সময় উৎপাদন নয়—উৎপাদনের গুণমানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার।”
তিনি বলেন—“চীনের মতো সস্তা সাপ্লাই নয়; ভারতের শক্তি হতে হবে গুণমান।”

রিপোর্টের শেষ অংশে তিনি বলেন—“যদি ভারতীয় MSME–রা উদ্ভাবনে, গুণমানে, ডিজাইনে, প্রযুক্তিতে আগান—তাহলে বিশ্ববাজারে ভারত সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় হয়ে উঠবে।”

এ কারণেই সরকার এখন MSME-খাতকে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিন হিসেবে দেখছে। নতুন নীতি, নতুন প্রণোদনা, প্রযুক্তি-সুবিধা, সুদের ভর্তুকি, স্কিল প্রশিক্ষণ—সবই MSME–দের বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে তৈরি করা হচ্ছে।

Preview image